কবির দুঃসময় কবিতার দুঃসময় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবির দুঃসময় কবিতার দুঃসময় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কবির দুঃসময় কবিতার দুঃসময়



কবির দুঃসময় কবিতার দুঃসময়

রাজনৈতিক দলের তল্পিবাহক কবি সাহিত্যিকদের এখন বড়ো সুসময়। অর্থ যশ প্রতিপত্তি সকল বিষয়েই তাঁদের পৌষমাস। গ্ল্যামারের ছটাও অনেক বেশি। কবিখ্যাতির থেকে জনপ্রিয়তার খ্যাতির রোশনাই এত বেশি যে এক লাইনও কবিতা না পড়া পাবলিকের কাছেও অনেকেই হিরো হয়ে উঠছেন আজ। এবং এই তল্পি বহন ক্ষমতা যাঁর যত বেশি, সমাজে তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তিও তত অধিক। ভক্তবৃন্দ থেকে স্তাবক পরিবৃত জনপ্রিয়তার মোহ এমনই যে নিজের কলমের উপর ভরসা করার মতো সময় ও অবসর আর থাকছে না। ভরসা করতে হচ্ছে অন্ধ স্তাবকতার বদান্যতার উপরেই। আর সেই বদান্যতায় অনেক কবি সাহিত্যিকদেরই আজ আর পা পড়ছে না মাটিতে। সহ্য হচ্ছে না বিরুদ্ধ সমালোচনা। অন্ধ স্তাবকতার প্রভাব এমনই যে কোনরকম সমালোচনা মেনে নেওয়ার মতো সহনশীলতাও আর অবশিষ্ট থাকে না। আর তখনই একজন কবি হারিয়ে ফেলতে থাকেন তাঁর সবচেয়ে বড় আযুধ, ‘সংবেদনশীলতা’। তিনি সব কিছুই তখন দেখতে থাকেন ঠিক সেই ভাবেই, যেভাবে তিনি দেখতে চান। এই ভাবে চলতে চলতে অচিরেই স্বকল্পিত বাস্তবতার বিভ্রমে দিকভ্রান্ত হয়ে সমাজ ও সমকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন কবি নিজেই। যে কোন কবির পক্ষেই সেটি সবচেয়ে বড়ো দুঃসময়।

কবিতা লেখার থেকেও সাহিত্য বাজারের উপর ছড়ি ঘোরানোর দায়িত্ব বেড়ে যায় তখনই। ক্ষমতাচর্চার কেন্দ্রে থাকায় নানবিধ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা বিলি বণ্টনের দায় দায়িত্ব ও সুবর্ণ সুযোগ হাতে এসে যাওয়ায় কবিও নিজেকে বিরাট শক্তিমান ভাবতে শুরু করে দেন। বিস্মৃত হন আসল সত্যের। বিস্মৃত হন আত্মপরিচিতির। ভুলে যান নিজের অজান্তেই কখন রাজনৈতিক ক্ষমতাগুলির হাতের পুতুল হয়ে উঠেছেন নিজেই। আর ভোট রাজনীতির সমরাঙ্গনে তিনিও তখন বোড়ের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পড়েন। স্তাবক পরিবৃত কবির কিছুই তখন আর দৃষ্টিগোচর হয় না যদিও। দম দেওয়া পুতুলের মতো নাচতে থাকেন ব্যস্ততম জনপ্রিয়তম কবি।

ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা যখন পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে, ব্যক্তি মানুষের তখন সত্যই আর হুঁশ থাকে না বিশেষ। সময় থাকে না আত্মসমীক্ষার। অবসর থাকে না নিজেকে দেখার। নিজের চারপাশে নিজের গ্ল্যামারের ছটার প্রতিফলনেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আর একজন কবির পক্ষে এর থেকে অস্বস্তিকর আর কিই বা হতে পারে। বেহুঁশ কলম তখন চলতে থাকে নিজে নিজেই। কবির আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না তার উপর। স্তাবকবৃন্দের পঞ্চমুখ প্রশংশায় বিশ্বাস দৃঢ় হতে থাকে নিজের সম্বন্ধে। আত্মপ্রসাদ এসে গ্রাস করে নেয় সমগ্র কবিসত্ত্বাকেই। কবির খোলস পড়ে দাঁড়িয়ে থাকে জনপ্রিয়তার জৌলুসটুকু শুধু। আর সেই সময়ই কবির কলম এককোণে নিশ্চুপে পড়ে থাকে নির্জীব হয়ে। সেই কলমে আর যাই হোক কবিতার সৃষ্টি হয় না আর। সৃষ্টি হতে পারে স্লোগানের। সৃষ্টি হতে পারে ভাষণের। যে স্লোগান যে ভাষণের হাল থাকে না কবির নিজের হাতে। কারণ তল্পিবাহক কবি ততক্ষণে রাজনৈতিক শক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে পড়েছেন। অভিমন্যুর ব্যূহের মতো যার প্রবেশ পথ থাকে। থাকে না পালানোর কোন পথ।

মরা নদীর স্রোতের মতো শুকিয়ে পড়ে কবি প্রতিভা। অর্থ যশ প্রতিপত্তির জৌলুস আর অন্ধ স্তাবকতার ঢক্কানিনাদে আত্মহারা কবি টেরও পান না কি ভয়ঙ্কর সর্বনাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হয়ে। রাজনৈতিক শক্তির তল্পি বহন করতে করতে কবি নিজেই নিজের সর্বনাশের রূপকার হয়ে ওঠেন দিনে দিনে ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই।

মৃত নদীর মজা খালের স্রোতহীন বদ্ধ জলাশয়ের মতো কবির কবিতাও তখন স্পন্দনহীন স্থবির শব্দের কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকে। সাহিত্যের সামগ্রী বলে তাকে চালাতে গেলে অপমান করা হয় সাহিত্যকেই। কিন্তু অর্থ যশ ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির জোরও তো কম নয়। সেই অসাহিত্যই তখন স্কুলপাঠ্যও হয়ে উঠতে পারে সরকারী বদান্যতায়। যে কোন দেশের সাহিত্যের পক্ষেই তখন কবিতারও দুঃসময়।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, কাঁটাতারের দুই পারেই বাংলা সাহিত্যের দিগন্তে আজ পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলির তল্পিবাহক কবিদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ফলে আজকের সাহিত্যের হাটে কবিতার লেবেল দিয়ে যা চালানো হচ্ছে, তার কতভাগ যে অকবিতা আর কতভাগ কবিতা সে হিসাব সত্যই গভীরতর গবেষণার বিষয়। অনেকেই নিশ্চিন্তে আছেন এই ভেবে যে, মহাকালের রাজপথ চিরকালই যা রাখার নয় তা ফেলে দিয়ে, শুধুমাত্র রাখার অংশটুকুকে’ই সোনারতরীতে উঠিয়ে নেয়। কেন না ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। খুবই সত্য। কোন ভুল নাই। কিন্তু এই যে নিশ্চিন্তে চোখ বুঁজে থাকার অভ্যাস। এর পরিণতিও কিন্তু মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে অচিরেই। অসাহিত্যের হাট যত বেশি জাঁকিয়ে বসবে, যত বেশি ধাঁধিয়ে দেবে মানুষের চোখ, তত বেশিই অগভীর হয়ে পড়তে থাকবে মানুষের বোধের দিগন্ত। তত বেশিই অসাড় হয়ে পড়ে থাকতে শুরু করবে আমাদের চিন্তা করার রসভোগ করার সামগ্রিক শক্তিই। আর তত বেশিই আমরা পিছিয়ে পড়তে থাকবো। তত বেশিই আমরা এগিয়ে যেতে থাকবো নাস্তির দিকে। সাহিত্য নয় সাহিত্যের মোড়কই আমাদের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠবে। পড়ে থাকবো সেইটুকু নিয়েই। ভিতরের ভুষিমালের অস্তিত্বই সাহিত্যের সামগ্রী বলে জানান দিতে থাকবে। আর ঠিক এইভাবে এগোতে এগোতে একদিন একটা জাতির সাহিত্যের আগাগোড়াই পচনের কবলে পড়ে যেতেও পারে। যদি যায়, সেদিন কিন্তু মহাকালের দরিয়ায় সোনারতরীর আয়তন যত বড়ই হোক না কেন, তাতে ভরার মতো কোন সামগ্রীই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। শূন্যতরী দুলতে থাকবে দিকশূন্যপুরের অভিমুখে। তাই আজকে যারা মহাকালের উপরেই ভরসা করে বর্তমান অবস্থাকে উপেক্ষা করাই সমীচীন বোধ করছেন, ভুল করছেন তাঁরাও।

কাঁটাতারের দুই পারেই কবিতার এই সামগ্রিক দুঃসময়ে তাই আমাদের একমাত্র কাণ্ডারী হতে পারে আত্মসমীক্ষা। আমরা কি চোখ বুঁজেই মেনে নেব কবি ও কবিতার এই দুঃসময়কে? আমরা কি বোধের গভীরে ডুব দিয়ে সমস্যার শিকড়গুলিকে চিহ্নিত করতে পারবো না ঠিক মতো? নাকি এড়িয়ে যেতে চাইবো সেই দায়িত্ব? এই এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাকেই আমরা চালিয়ে নিয়ে যাবো বিচক্ষণতা বলে? আমরা কি এতই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছি যে, সমালোচনা করলে পাছে ঘরের জানলায় ঢিল পড়ে ভেবে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবো শামুকের মতো? একদিকে চরম উদাসীনতা নয়তো অন্যদিকে সন্ত্রস্ত ভয় আমাদেরকে যদি সত্যিই আজ মূক ও বধির, কানা ও খোঁড়া করে রাখে, তবে অপর দিকে অন্ধ স্তাবকতার জোয়ার বাংলা সাহিত্যের পক্ষে কতটা মারাত্মক সর্বনাশের পথ খুলে দিতে পারে, সেকথা যদি আমরা আজও না ভাবি , তবে হয়তো আর ভাবার সময়ও পাওয়া যাবে না একদিন। ততদিনে হয়তো বাংলা ভাষার স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণের দিগন্ত থেকে হারিয়েই যাবে তার সাহিত্যরসের ভাণ্ডার।

১৫ই পৌষ ১৪২৫

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত