কবি শঙ্খ ঘোষ ও আমরা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবি শঙ্খ ঘোষ ও আমরা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কবি শঙ্খ ঘোষ ও আমরা



কবি শঙ্খ ঘোষ ও আমরা

সংবেদনশীল কবির অন্তর্দৃষ্টিতে সত্যের অনেকান্ত রূপ ধরা পরে। এটি শাশ্বত ঘটনা। এর মধ্যে আশ্চর্য্যের কিছুই নাই। শক্তিশালী কবি তাঁর অর্জিত প্রজ্ঞায় আপন জীবনবোধে জারিত করে সেই সত্যকে পাঠকের জন্যে রসসিক্ত করে সৃজন করেন সাহিত্যিক প্রতীতিতে। সেই করার মধ্যেই তাঁর শক্তি ও সৌন্দর্য্য। তাঁর কবিত্ব ও মনুষ্যত্ব। তাঁর গৌরব ও মূল্য। আর ভাবীকাল সত্যের সেই আলোতেই তাঁর সমকালকে সুস্পস্টরূপে উপলবদ্ধি করতে পারে। এবং নিজেদের সময়কেও সঠিক ভাবে দিশা দেখাতে পারে। একজন প্রকৃত কবির সাহিত্যের মধ্যেই রয়ে যায় এমনই বিপুল শক্তির প্রত্যয়। যা পরবর্তী অনেকগুলি যুগকেই পথনির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা ধরে। এই জন্যেই একজন কবিই শুধুমাত্র কবি। এইকারণেই জীবনানন্দ বলে গিয়েছিলেন সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। এবং সেই হাতে গোনা গুটিকয়েক কবির মধ্যেই অনন্য কবি শঙ্খ ঘোষ। আমাদের গৌরব আমাদের সমকালের কবি তিনি। আমাদের ভরসা আজও তিনি সৃষ্টিশীল। সৃজনশীল। আমাদের শক্তি, আজও তিনি সক্রিয় ভাবে আমাদের দিবানিদ্রায় সত্যের শঙ্খধ্বনি করতে অক্লান্ত। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার সময়েও সময় তাকে স্থবির করে দিতে পারে নি।

পারে নি বলেই আজকের এই স্থবির মানসিকতার সময়েও, যখন আমরা আমাদের বিবেকের ঘরে তালা ঝুলিয়ে সকল আদর্শকে বলি দিয়ে নিশ্চিন্তে দিবানিদ্রা দিচ্ছি আর চোখবুঁজে হজম করে চলেছি নৈতিকতার সমস্ত রকম চুড়ান্ত অধঃপতন; তিনিই তখন আমাদের সামনে সত্যের শঙ্খধ্বনি দিয়ে একটা ঘুমন্ত জাতিকে জাগানোর চেষ্টা করে চলেছেন অক্লান্ত ভাবে। না এই লেখার বিষয় কবি শঙ্খ ঘোষ নন। এই লেখা তাঁর সাহিত্যকীর্তির মূল্যায়ন নিয়েও নয়। এই লেখার বিষয় আমরাই। আমরা যারা চোখবুঁজে হজম করে চলেছি সব কিছু। কবি যা দেখছেন, আমরাও তাই দেখছি। কবি আমাদের থেকে আলাদা কিছু দেখছেন না। দেখছেন না নতুন কোন ঘটনা বা সত্য। কবি শুধু সত্যের উপলব্ধির প্রতি দায়বদ্ধ। আর আমরা অস্বীকার করে বসে আছি সমস্ত দায় ও দায়িত্ব। তাই আমাদের উপলব্ধি কবির মতো নয়। মূল পার্থক্য এইখানেই। আমরা আমাদের নাগরিক কর্তব্যের প্রতি, সামাজিক কর্তব্যের প্রতি, কোনভাবেই দায়বদ্ধ নই। নই বলেই যে যার মতো করে, যে যার স্বার্থের মতো, যে যার সুবিধার মতো প্রতিটি ঘটনার ভিন্ন রকমের বিশ্লেষণ করি। যার কোনটাই সত্যমূলক নয়। সুবিধামূলক। স্বার্থমূলক। ফলে এক এক জনের কাছে, এক এক পক্ষের কাছে এক এক রকমের। কিন্তু সত্যের কোন রকমফের হয় না। সত্য সত্যই থাকে। কবির কাছেও যা সত্য, আমাদের কাছেও সেই একই সত্য। আমাদের লজ্জা আমরা সেই সত্যকে স্বীকার করি না, কখনো ভয়ে, কখনো লোভে, কখনো স্বার্থের বেআব্রু দায়বদ্ধতায়।

আমরা যখন সাধারণ জনসাধারণ, তখন ভয় আমাদের সত্যকে স্বীকার করতে দেয় না। যার প্রভাব পড়ে ব্যালট বাক্সে, বা ইভিএমএ। আমরা যখন সুযোগ সন্ধানী বুদ্ধিমান বিভিন্ন পক্ষের সক্রিয় কর্মী সমর্থক, তখন লোভ আমাদের সত্যকে স্বীকার করতে বাধা দেয়। আমরা সানন্দে সত্যকে ধামাচাপা দিতে প্রবল পক্ষের হয়ে ওকালতি করি সম্পূর্ণ মিথ্যার বেসাতি করে। আর আমরা যখন সমাজে বেশ একটু মান্যিগন্যি হয়ে উঠি, মানুষ আমাদেরকে বুদ্ধিজীবী বলে সমীহ করে, তখন আমরা আমাদের নিজ নিজ ব্যক্তি স্বার্থের বেআব্রু দায়বদ্ধতায় সত্যকে অস্বীকার করি। তখন আমাদের হাতের অস্ত্র হয়ে ওঠে ছল ও চাতুরী। আর সেই ছল ও চাতুরী দিয়েই আমরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার বিষয়ে ক্ষিপ্র হয়ে উঠি। সত্যকে ধামাচাপা দিতে পারলেই রাজ অঙ্গুরীয় হাতের মুঠোয়। ফলে তখন আমাদের সত্যিই সুদিন। আর সেই সুদিনের মুখাগ্নি করতে তখন নিশ্চয় আমরা কোন এক শঙ্খ ঘোষের পক্ষ নিতে দাঁড়াবো না। নামবো না পথে। আমাদের তখন একটাই কাজ হবে মানুষকে বিভ্রান্ত করে যাওয়া। যে যত বেশি করে বিভ্রান্ত করতে পারবো, সে তত বেশি পেয়ারের লোক হয়ে উঠতে পারবো ক্ষমতার অলিন্দে। আর তত বেশি করেই রাজ অনুগ্রহ জুটবে আমাদের।

হ্যাঁ একটি জাতির বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অধিকাংশই যখন রাজ অনুগ্রহের কৃপাপ্রার্থী হয়ে দুই হাত প্রসারিত করে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন সমাজে একটা মস্ত বড়ো শূন্যতার সৃষ্টি হয়। আর সেই শূন্যতাকেই ঢাল করে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি সকল রকম অনৈতিকতাকেই বৈধতা দিয়ে রাজত্ব চালিয়ে যায়। অবশ্যই, সমস্ত রকমের অনৈতিকতাকে বৈধতা দিয়ে রাজত্ব চালাতে গেলে, পথ একটাই। আর সেটি হলো আইনের রক্ষককে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখে গুলি বোমা বন্দুকের ভাষায় কথা বলতে শুরু করা। যেখানে লক্ষ্য একটাই। সত্যের কন্ঠকে নির্বাক করিয়ে দেওয়া। আর সেটি করতে গেলে গুলি বোমা বন্দুকের ভাষায় কথা বলা ছাড়া উপায়ই বা কি? তাই বুদ্ধিজীবী সম্প্র্দায়ের তৈরী করে যাওয়া এই ভয়াবহ শূন্যতার হাত ধরেই উত্থান ঘটে স্বৈরতন্ত্রের। একজন সংবেদনশীল কবির পক্ষে সেই শূন্যতায় একা কুম্ভ হয়ে লড়াই করার উপায় থাকুক বা না থাকুক, কবি কি কখনো চুপ করে বসে থাকতে পারেন? তাই তাঁর কলমই তখন কথা বলতে শুরু করে। ফলে তাঁর জাগ্রত সচল কলমকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও তখন তীব্র হতেই বাধ্য। হচ্ছে। হবেও। কিন্তু কোন প্রকৃত কবির পক্ষেই স্বৈরতন্ত্রের এই উত্থানকে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না কখনোই। যারা মেনে নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন ভিড় করে, তারা কবি নন। রাজ অনুগ্রহের কৃপাপ্রার্থী তারা। হাজার পাতা কবিতা লিখলেই কবি হওয়া যায় না। তাদের জন্যে মানুষ গর্বিত হতে পারে না। তাদের জন্য মানুষের করুণাই হয়। শব্দের জাল বুনে বুনে ক্ষমতার অলিন্দে কৃপাভিক্ষা করার বেশি আর কোন প্রতিভা নাই তাদের। তাই তাদের পক্ষে কবির পাশে দাঁড়ানো সম্ভবও নয়। নিজের মেরুদণ্ডের সেই জোর কোথায় পাবেন তারা? অস্থিমজ্জায় লোভের বিষবৃক্ষ মহীরুহ হয়ে উঠেছে তো ভিতরে। আর তাই মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যেই কলমে স্তাবকতার কালি ঢালতে শুরু করবেন তখন তারা। এ আর বিচিত্র কি?

কিন্তু আমরা? কি করবো আমরা? আমরা আগেই দেখিয়েছি, আমরা মূলত তিনটি প্রধান শ্রেনীতে বিভক্ত। একটি শ্রেণী চোখবুঁজে সব হজম করতে করতে দিবানিদ্রা দিই। কারণ ভয় আমাদেরকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে দেয় না। এত গুলি বোমা বন্দুকের আস্ফালনের স্বার্থকতা আমাদের এই শ্রেনীটির জন্যেই। আমরা ভয় পাই বলেই ভয় দেখানোর কারখানায় আজ এত কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। হাতে বন্দুক মুখে গামছা। কথায় হুঙ্কার। আমরা ভয়ে সেঁটিয়ে যে যার ঘরে। আচ্ছা বাবা তাই সই, যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। এতো আপ্তবাক্য। এখন তোমাদের সময়। যা বলবে তাই সই। দ্বিতীয় শ্রেণীর পৌষমাস এখন। যার যতটুকু বুদ্ধির দৌড়, সেই ততটুকু গুছিয়ে নিচ্ছি এখনই। কারণ এইতো সময়। বুদ্ধি কম থাকলেও অসুবিধা নাই। মিথ্যার হয়ে ওকালতি করে গেলেও চুঁইয়ে পড়া প্রসাদের যথকিঞ্চিত ভাগের সম্ভাবনা রয়ে যায় এই সময়ে। ক্ষমতার উচ্ছৃষ্টের হরিরলুট চলছে এখন, তাই সেই হরিরলুটের প্রসাদ পেতেই আমাদের পরস্পরের মধ্যে তীব্র গুঁতাগুঁতির সময় এখন। সবাইকেই ভাগ পেতে হবে অন্যকে পাশ কাটিয়ে। ফলে সত্যকে ধামাচাপা দিতে মিথ্যার হয়ে ওকালতি করতে আমরা সকলেই এক পায়ে খাড়া। বাকি থাকল সেই তৃতীয় শ্রেণীটি। যাদের কথা যতই বলা যাক না কেন কমই বলা হয়। সেখানে আমাদের উপরেই তো ভার জনগণকে বিভ্রান্ত করার। কারণ জনগণ আমাদের মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে।

সিনেমার পর্দা থেকে টিভি সিরিয়ালের সন্ধ্যায়। সঙ্গীতের জলসা থেকে নাট্যকারের চিত্রনাট্যে। শিল্পীর ক্যানভাস থেকে লেখকের অটোগ্রাফে। পাল্টি খাওয়া বুদ্ধিজীবী থেকে খাবি খাওয়া কবিত্বে। সর্বত্র আমাদের কথার উপরেই তো মানুষের শেষ ভরসা। তাই ক্ষমতা আমাদেরকে যখন যে মিথ্যাকে সত্যি করে তোলায় নির্দেশ দেয়, আমরা ঠিক সেইটিই করি। করেছি। করবোও। আমাদের সাফল্যের নিক্তিতেই আমাদের পুরস্কার। সরকারী আতিথ্য থেকে সরকারী উপঢৌকনে। তাই আমাদের স্বার্থের এই বেআব্রু দায়বদ্ধতায়, কবি শঙ্খ ঘোষ বিচলিত হলেন কি না, সেটা নিয়ে আমাদের ভাবনা নয়। আমাদের ভাবনা মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখার যে দায় আমাদের উপর, সেই কাজে কবি শঙ্খ ঘোষ জল ঢেলে দিলেন কিনা? দিলেও কতটা। কারণ সেই মতোই তো মেরামতির ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই আমাদের কোড অফ কন্ডাক্ট।

না কবি, আমরা তাই কেউই আপনাকে নিয়ে ভাবিত নই। আমরা ভাবছি আমাদেরকে নিয়েই। যে যার শ্রেণীচরিত্রের মতো করেই। ফলে রাজ্যরাজনীতির যে মোড়ে দাঁড়িয়ে আপনি অসম্মানিত হলেন আজ, সেখানে রাজ্যবাসীর কোন দায় নেই। ভুল তো আপনারই। আপনি আমাদের কোন একটি শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হবেন না, অথচ বিদ্বান সর্বত্র পুজ্যতে বলে বিশ্বাস করবেন তাই বা কি করে হয় বলুন। তাই আজকে আপনাকে একলা চলতেই হবে কবি। সত্যের সাথেই হোক আর নিজের সাথেই হোক। আমরা দেখুন কেমন বিশ্বস্ত ভাবেই না নিজের নিজের শ্রেণীচরিত্রের সাথে চলেছি।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত