ক্ষমতার আস্ফালনই শেষ কথা
পোস্ট মর্টেম:
পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮
পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ কয়েকটি সত্যকে দৃঢ়
ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিল। প্রথমত, কোন নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন যদি শাসকদল সরকার
এবং পুলিশবাহিনীর সম্মিলিত জোটের পক্ষ নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করে তাহলে সেই
নির্বাচনে কি কি ঘটনা ঘটতে পারে এবং নির্বাচন কতটা প্রহসনে পরিণত হতে পারে, সেটা
জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, এটাই বোঝা গেল যে, এইরকম অবস্থায় ভারতীয়
সংবিধানেরও নির্বাচনী প্রহসন ঠেকানোর মতো কোন শক্তি নাই। তৃতীয়ত, এক তৃতীয়াংশের
বেশি আসনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে না দিয়ে, একতরফা
ওয়াকওভার জোগার করে নেওয়াও ভারতীয় সংবিধানের পরিসরেই সম্ভব। এবং সেই সূত্রেই
চৌত্রিশ শতাংশের বেশি আসনে বিনা নির্বাচনে জয়ও সেই ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী বৈধ হতে
পারে। চতুর্থত, সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরার সামনেই ঘটে চলা অবাধে বুথ দখল, ছাপ্পা
ভোট, বুথে বুথে গুণ্ডা বাহিনীর সশস্ত্র তাণ্ডব এমনকি ভোটগণনা কেন্দ্রেও পুলিশের
চোখের সামনেই হেরে যেতে থাকা প্রার্থীকেও জেতাতে শাসকদলের হয়ে ছাপ্পা মারতে দেখা
সত্বেও ভারতীয় সংবিধান কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ। এবং পঞ্চমত, নির্বাচন মানেই সাধারণ
মানুষের মৃত্যু। তাজারক্তে ভাসা রাজপথ। যে পথ দিয়েই গণতন্ত্রের জয়োল্লাসের আবীর
খেলা হয় ভোট গণনার পরপরেই। ফলে স্বভাবতঃই প্রশ্ন উঠছে এত মৃত্যু মিছিলের পথ ধরে কি
দরকার এইরকম নির্বাচনী প্রহসন সংগঠিত করার? শাসকদল সরকার ও পুলিশি মদতে যে যেখানে
মস্তানি করতে চায়, করুক না কেন। গ্রামে গ্রামে জোর যার মুলুক তার। এটাই যখন সত্য,
তখন সেই সত্যকেই মেনে নেওয়া যাক না। কি দরকার তাকে ভারতীয় সংবিধানের ছাপ দিয়ে
বৈধতা দেওয়ার। যে বৈধতা দিতে গিয়েই এত মানুষের প্রাণহানি? এবং যে বৈধতা দিতে হয়
সবরকম ভাবেই সেই সংবিধানেরই সকল রকমের বিধিব্যবস্থাকে ভঙ্গ করেই? মূল প্রহসনটা
কিন্তু এখানেই। এবং আরও বড়ো একটি প্রশ্নও এরই সাথে জড়িয়ে রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানে
কেনই বা সম্ভব এই ধরণের প্রহসন সংগঠিত করা? কে কোন দলের। কে কোন দলের পক্ষ নিয়ে
কতটা অনৈতিকতার দিকে কতটা নির্লজ্জ ভাবে ঝুঁকে ক্ষমতায় থাকার জন্যে সওয়াল করছেন
সেটা তত বড়ো বিষয় নয়। অনেক বড়ো বিষয় হলো ভারতীয় সংবিধানের দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে, সেই জনগণই সংবিধানের
সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নির্বাচনী প্রহসনও যদি সাংবিধানিক বৈধতা পেয়ে যায়, তবে
জনগণের শেষ আশ্রয় বলে আর অবশিষ্ট থাকে না কিছুই। এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন আমাদেকে
ঠিক এই মহাসঙ্কটের সামনেই দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছে। এবারের এই নির্বাচনের মূল
সাফল্য কিন্তু এইখানেই।
এবং এইখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একটি জাতির
বুদ্ধিজীবীদের ভুমিকা। রাজনীতিবিদরা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যে সকল
রকমের অনৈতিক কার্যকলাপের আশ্রয় নিতেই পারেন। আইনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার
সবরকমের অনৈতিক প্রচেষ্টা করতেই পারেন তারা। কারণ রাজনীতির মূল লক্ষ্যই হলো
ক্ষমতার দখল নিয়ে সরকারী অর্থ ভাণ্ডারের উপর একছত্র অধিকার কায়েম করা। এবং সেই
উদ্দেশ্যে তারা প্রয়োজনে সংবিধানেরও পরিমার্জন করে নিতে পারেন আসন ক্ষমতা জোরে।
খুব ঠেকায় পড়লে। ফলে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে জনসাধারণের আর কোন আশা ভরসার জায়গাই
অবশিস্ট নাই। জনগণও স্পষ্টতঃই জানে, যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। বরং আত্মরক্ষায়
তাগিদেই সেই রাবণেরই শরণাপন্ন হয়ে থাকতে হয় ঢাল তলোয়ারবিহীন সাংবিধানিক রক্ষা
কবচহীন সাধারণ জনগণকেই। ঠিক এইখানে ভেসে ওঠে দেশের বুদ্ধিজীবীদের মুখগুলির
প্রতিচ্ছবি। একমাত্র বুদ্ধিজীবীদের নাগরিক পরিসরের পক্ষেই সম্ভব জনমানসে নেতৃত্ব
দিয়ে জনগণকে সঠিক আন্দোলনের দিশা দেখানো। বুদ্ধিজীবীরাই পারেন, আইন ও সংবিধান যাতে
যথাযথ ভাবে দেশ ও জাতির রক্ষাকবচ হয়ে কার্যক্ষম থাকে, সেই বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে
তুলে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদেরকে সঠিক পথে চলতে বাধ্য করতে। সেই ক্ষমতা থাকে যে কোন
দেশের বুদ্ধিজীবীদের সম্মিলিত নৈতিকতার দায়বোধের সজীব ও সক্রিয় পরিসরে। যে দেশে যে
জাতির জীবনে বুদ্ধিজীবীরা এই বিষয়ে যতটা বেশি সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন, সেই দেশ
সেই জাতি ততটাই নিরাপদ ও সমৃদ্ধশালী থাকে।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজ্যে ২০১১
সালের ঘটা রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যে দিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তারই সরাসরি
ফলশ্রুতিতে আজকের বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতার তল্পিবাহক হয়ে সুখনিদ্রায় নিমগ্ন। উপঢৌকনের
ভারে, সরকারী নানান সুযোগসুবিধার ভারে, সরকারী খেতাবের ভারে তাদের শিরদাঁড়া আজ
এতটাই নুয়ে পড়েছে যে, তাঁরা আর সাদাকে সাদা, কালোকে কালো দেখতে পাচ্ছেন না। বা বলা
ভালো দেখতে চাইছেনই না কোন ভাবেই। কোনভাবেই তাদের দিবানিদ্রার নিশ্চিত সুখের শীতল
আরামের আশ্রয় ছেড়ে তারা আর বাইরে বেড়িয়ে আসতে রাজি নন কোনমতেই। এই রাজ্যের অবস্থা
যতই বিপর্যস্ত হোক না কেন, তারা আজ সুরিক্ষিত। ক্ষমতার তল্পিবাহক হওয়ার সুবাদে তাদের
নিঃশ্ছিদ্র সুরক্ষায় কোন ফাটল চোখে পড়ছে না আজ।
ফলে বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে,
ক্ষমতার সুরক্ষায় থাকা সরকারী সুযোগসুবিধা প্রাপ্ত শাসকদলের স্নেহধন্য এইসব
বুদ্ধিজীবীদের জবাবদিহির দায়ও নাই। দায়িত্বও নাই। তারা গুছিয়ে নিতে পেরেছেন
নিজেদের। গণতন্ত্রের এই চুড়ান্ত প্রহসনেও তাদের হিমশীতল নিরবতা এই রাজ্যের
রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় একটি দমবন্ধ করা অধ্যায়ের সূচনা করে দিয়েছে। মানুষ তবে
তাকাবে কোন দিকে? কার দিকে?
সংবিধান রক্ষা করার দায় যাদের, সেই রাজনীতিবিদদের কায়েমী
স্বার্থের কাছেই বলি সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা স্বাধীনতা। ফলে সংবিধানের শেষ
আশ্রয়টুকুও হারিয়েছেন তারা। বাকি ছিল বুদ্ধিজীবীদের বরাভয়, সেখানেও ধূ ধূ মরু। ফলে
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া সাধারণ জনগণের আর
কোন উপায় নাই। একমাত্র রাস্তা ক্ষমতার তল্পি বহন করা ছাড়া। কিন্তু সেখানেও সকলের
স্থানসংকুলান তো আর সম্ভব নয়। ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। ফলে পড়ে পড়ে মার
খাওয়া ছাড়া আপাতত আর কোন পথই খোলা নাই জনসাধারণের।
বস্তুত এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই এই সরল সত্যগুলিই নতুন
করে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল আবার। কোন দল ভোটে জিতল সেটা কোন বড়ো বিষয় নয়। বড় বিষয়
নয় কোন দল হেরে গেল গো হারা। এবং এটাও খুব একটা বড়ো বিষয় নয় ঠিক কিভাবে জিতল আর
কিভাবে হেরে গেল। তার থেকে অনেক অনেক বড়ো এবং গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধানের কোন
ফাঁক দিয়ে এই ভাবে জয় পরাজয়ের মীমাংসা হলো। হচ্ছে। কি করছে ভারতীয় সংবিধান? কি
ভাবছে দেশের বুদ্ধিজীবী মহল? অনেক বেশি ভয়াবহ বিষয় হলো এই দুটি বিষয়। কিভাবে ভোট
হলো, কোথায় কত ভোট লুঠ হলো, কারা ভোট লুঠ করলো। কাদের প্রশ্রয়ে চলল অবাধে ভোট
লুঠের এই পর্ব, কোথায় কতটুকুই বা সংগঠিত হলো মানুষের প্রতিরোধ। গণতন্ত্রের এই
ধর্ষণের বিপক্ষে প্রতিবাদেই বা সামিল হলেন কতজন, এই সবই সকলেই দেখলেন। বুঝলেন।
জেনে গেলেন। ফলে এই বিষয়গুলি নিয়ে কিন্তু কোন ধোঁয়াশা নাই আর। সকলের কাছেই এটা
পরিস্কার, যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। সকলেই জোর যার মুলুক তার এই সত্যের কাছে নতি
স্বীকার করতে বাধ্য। কোন মুলুকে কার কত জোর, সেই নিয়েও সন্দিহান নয় কেউই। ভোটের
পর্বেই সব কিছু তাই জলের মতো পরিস্কার সকল রাজ্যবাসীর কাছেই। এখন, যে যার সুযোগ
সুবিধা ও স্বার্থ অনুযায়ীই পক্ষ বিপক্ষ বেছে নেবেন। সেটাই স্বাভাবিক। তাই এই
বিষয়গুলি নিয়ে কারুর মনেই আর নতুন কোন সংশয় নাই। নাই নতুন কোন প্রশ্ন। কিন্তু
প্রশ্ন হলো, এ কোন গণতন্ত্র? এবং এ কি ধরণের সংবিধান, যে সংবিধানের সাংবিধানিক
পরিসরেই এই রকমের ভয়াবহ প্রহসনও সঘটিত হতে পারে, এমনই চক্ষুলজ্জাবিহীন ভাবেই। তাই
আজকের মূল প্রশ্ন, সত্যই কি আর দরকার আছে নির্বাচনী গণতন্ত্রের এই চক্ষুলজ্জাবিহীন
সাংবিধানিক কার্যক্রমের? যেখানে ক্ষমতার আস্ফালনই শেষ কথা?
১৭ই মে ২০১৮
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

