জাস্টিস ফর আসিফা
জাস্টিস
ফর আসিফা। উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া। উত্তাল সারা দেশ। না যে শিশুটি খুনই হয়ে গিয়েছে
দিনের পর দিন নির্মম অত্যাচারের পর, তার কাছে
ভারতীয় আইনের বিচার আর গিয়ে পৌঁছাবে না কোনদিনই। আইনের হাত অতটা লম্বা নয়। তাহলে
কার জন্যে জাস্টিস? আসিফার হত ভাগ্য মা বাবার জন্যে? যাঁরা সন্তানের জন্ম দিলেও পাশবিক সমাজ থেকে শিশু কন্যাকে
রক্ষা করতে পারেন নি? পারার কোন উপায়ও ছিল না যাদের
হাতে। উপায় না থাকার কারণ বহুবিধ। মূল কারণ ভারতবর্ষের মতো নানা জাতি নানান্
সম্প্রদায়ের এই মহা মানবের মিলন তীর্থের সামাজিক ধর্ষণের আবহমান ঐতিহ্য। তার সাথে
যুক্ত হওয়া রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অবাধ বিস্তার। শঠতা আর ক্ষমতার আস্ফালনের
সামাজিক সংস্কৃতি। এবং ভারতীয় আইনরক্ষকদের কর্ম দক্ষতা তৎপরতা আর নৈতিকতার
ত্রিবেণী সঙ্গম। ফলে যে পুলিশের উপরেই ভরসা করেছিলেন আসিফার মা বাবা, সেও ছিল অন্যতম ধর্ষক। এবং আঞ্চলিক রাজনীতি, যেখানে গণধর্ষণ রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে যখন যেখানে যেমন
প্রয়োজন। এরই নাম ভারতবর্ষ। সেই ভারতবর্ষেই তাহলে জাস্টিস ফর আসিফা কার জন্যে আসলে? কাকে
জাস্টিস দেওয়ার জন্যে সারা দেশ জুড়ে জাস্টিস ফর আসিফার ঝড়?
ভারতবর্ষে ধর্ষণ বিশেষ করে গণধর্ষণ প্রতিদিনের সূর্য ওঠার আর অস্ত যাওয়ার মতোই
নিত্ত নৈমিত্তিক বাঁধাধরা একটি ঘটনা। কোন জনগণই এই বিষয়টি নিয়ে হতচকিত হন না আর।
রোজকার সংবাদ পত্র থেকে টিভি চ্যানেল খুললেই সবচেয়ে বেশি যে ঘটনার কথা জানা যায়, সেটি ধর্ষণ গণধর্ষণ আর পথ দুর্ঘটনা। কোনটিতেই আমরা সাধারণ
মানুষ কোনভাবে বিচলিত হই না। যতক্ষণ না ঘটনাটা নিজের ঘরে ঘটছে। আমার মেয়ে ঠিকমত
বাড়ি ফিরে এলেই আমার নিশ্চিন্ত ঘুম। যে মেয়েটির আজ আর বাড়ি ফেরা হলো না, তার কথা ভাববো, অবসর সময়ে
বরং। ফলে ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনাও আমাদের কাছে অনেক স্বাভাবিক একটি সামাজিক
ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা হয়তো খুব বেশি হলে মেয়েদের পোশাক আসাকের ধরণ ধারণের
সেন্টিমিটার মিলিমিটার নিয়ে মাপজোক চালাবো। কারণ আমরা আসলেই কাপুরুষ। আমাদের যত
লম্ফঝম্প সবই ঘরের ভিতর। টিভির সামনে নয়তো অধুনা প্রচিলত সোশ্যাল সাইটের ওয়াল থেকে
ওয়ালে। আচ্ছা, চোখের সামনে যদি কয়েকজন দুস্কৃতি
মিলে কোন মেয়েকে জোর করে টেনে নিয়ে যেতে দেখি, আমি
আপনি মেয়েটিকে বাঁচানোর কোন চেষ্টা করবো তো আদৌ? নাকি
নিজের ওজন মেপে, চোখবুঁজে ইস্ট নাম জপতে জপতে
যতদ্রুত সম্ভব কেটে পড়বো অকুস্থল থেকে? এমনকি
পুলিশেও কি খবর দেবো? কথায় বলে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। আর
পুলিশে গেলে?
না অপরিচিত কোন মেয়ের জন্যে অফিস কাছারী ছেড়ে থানা পুলিশে দৌড়াদৌড়ি করতে পারবো
না আমরা কেউই। তারপর কোর্টে কেস উঠলে, অপরাধীদের
নিশানায় পড়ে যেতে কতক্ষণ। তখন কোন পুলিশ এসে পাহারা দেবে আমাকে? আমার পরিবারকে? কিন্তু
বিবেকের দংশন বলেও তো একটি বিষয় আছে না কি? আছে
বই কি, আছে বলেই না জুকারবার্কদের জাদু
দেওয়ালে আমাদের সকল বিপ্লব গিয়ে আছড়ে পড়ছে প্রতি ঘন্টায় প্রতি মিনিটে। হ্যাঁ বন্ধু, ঠিক এই কারণেই জাস্টিস ফর আসিফা। আমাদের সেই বিবেক দংশনের
ভেন্টিলেশনের জন্যে এমন একটা কার্যকারি
ব্যবস্থা করে দিয়েছে মার্কীণ মুলুকের ছেলেমেয়েরা, আর
আমরা সেই সুযোগটা কাজে লাগাবো না, তাই আবার
হয় নাকি? হয় না। হয় না বলেই জাস্টিস ফর
আসিফা। ঠিক যেমন জাস্টিস ফর নির্ভয়া করেছিলাম আমরাই। জাস্টিস ফর কামদুনি করেছিলেন
আরও হয়তো কয়েকজন। আগের প্রতিটি জাস্টিস ফরের সময়েই কি আমারা জানতাম না যে এই শেষ
নয়? পরের মুহূর্ত্তেই আরও একটি মেয়ে এই
ভারতের মহামানবের সাগরতীরে ধর্ষণের শিকার হবে? এই
যে এখন জস্টিস ফর আসিফার কোলাহলে উত্তাল মিডিয়া, এর
মধ্যেই কি একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি? ঘটেছে, ঘটছেই। আরও ঘটবে। এ সবই আমাদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।
জানি অনেকেই প্রতিবাদ করে উঠবেন। অনেকেই বলবেন, না
আমরা কেউই এতটা নপুংসক নই। আর নই বলেই নির্ভয়া কাণ্ডের দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড়ে
সরকারকে তড়িঘড়ি করে আইনের সংশোধন করতে হয়েছিল। আরও কড়া আইন নিয়ে আসতে হয়েছিল। ঠিক
যেমন জাস্টিস পর আসিফার দাবিতেই বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই সরকারকে নতুন
অর্ডিন্যান্স জারি করে শিশু ধর্ষেণের জন্যে কড়া শাস্তির আইন জারি করতে হয়েছে। খুবই
সত্যি। হয়তো এইটুকুও হতো না, যদি না
আমাদের বিবেকের ভেন্টিলেশনের জন্যে সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালগুলি খুলে দেওয়া হতো বিদেশ
থেকে। তাহলে কার জন্যে এই জাস্টিস ফর আসিফা? আমাদেরই
বিবেকের সেই দংশনের জন্যেই না কি? যেখানে
সবকিছু জেনে শুনেও আমাদের নপুংসকের মতো চোখবুঁজে ঘাড় কুঁজো করে সমাজে চলাফেরা করা
ছাড়া কোন পথ থাকে না?
আমরা প্রত্যেকেই জানি, দোষীদের
উপযুক্ত শাস্তিই হোক আর দোষীরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাক, আসিফার
কাছে কোন জাস্টিসই আর গিয়ে পৌঁছাবে না। আসিফার মা ও বাবাও ফিরে পাবে না তাদের
শিশুকন্যাকে কোনদিন। কিন্তু আমরা, যারা
প্রতিদিন প্রতিটা অন্যায়ের সামনে থেকে চোখবুঁজে ঘাড় গুঁজে নতমস্তকে কেটে পড়ি, দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পেলে সেই আমাদের কাছে একটা জাস্টিস
অন্তত ফিরে আসবে। হ্যাঁ আমাদের সম্মিলিত কোলাহল আইনকে আইনের পথে ঠিক মতো চলতে
বাধ্য করেছে। আইনের এই বাধ্যবাধকতাটুকুই আমাদের মতো ভীরুদের কাছে একটা চুড়ান্ত
জাস্টিস। না নিজে হাতে আইন তুলে নেওয়ার কুপরামর্শের কথা হচ্ছে না। নাগরিক সমাজের
যে ন্যূনতম সামাজিক দায় দায়িত্ব থাকে, যেটি
আমাদের কাছ থেকে ছিনতাই করা সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীনতার সাত
দশকে, সেই সামাজিক দায়িত্ব কর্তব্যটুকুই
যদি আমরা রক্ষা করতে পারতাম তাহলে অনেক ধর্ষণই
হয়তো ঠেকেই দেওয়া যেত। আইনের ক্ষমতা ধর্ষণের যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়াতেই
সীমাবদ্ধ। ধর্ষণ ঠেকানোতে বিশেষ কিছু নয়। কিন্তু জাগ্রত নাগরিক সত্ত্বার সুস্থ সবল
সমাজই পারতো অনেক বেশি পরিমানে ধর্ষণ রোধের উপযুক্ত পরিসর ও পরিবেশ তৈরী করতে। ঠিক
যে কাজটিই আমরা কোনদিন করে ওঠার কথা স্বপ্নেও ভাবি নি। ভাবি না। ভাবার ক্ষমতাই
নাই। নাই কারণ, দুই শত বছরের পরাধীনতার অভিশাপে
আমরা সামজিক ভাবে পঙ্গু ও খর্ব হয়ে গিয়ে সবকিছুর উপরেই সরকার বা প্রশাসকমুখী হয়ে
পড়েছি। যে কারণে সমাজের আজ আর কোন নিজস্ব মুখ নাই। সমাজ রাজনীতির দাসানুদাসে পরিণত
হয়ে গিয়েছে। সেই রাজনীতিই সমাজকে দুইবেলা ওঠাচ্ছে আর বসাচ্ছে। ভারতবর্ষের দুর্নীতি
দুর্বৃত্তায়নের এটাই মূল কারণ। আর ধর্ষণ গণধর্ষনের ব্যাপকতা ও বীভৎসতা বৃদ্ধি এই
কারণেরই সরাসরি ফলশ্রুতি।
ফলে আজ যদি আমরা ভেবে থাকি জাস্টিস ফর আসিফার কোলাহলেই আমাদের সামাজিক দায় ও
দায়িত্ব ঠিকাঠাক পুরণ করা হয়ে গেল, সেও হবে
মস্ত বড়ো এক ইনজাস্টিস। আইন ও আইনের রক্ষক দিয়ে সমাজ সুরক্ষিত রাখা যায় ততক্ষণই, যতক্ষণ জাগ্রত নাগরিক সত্ত্বার সমাজ অতন্দ্র সজাগ ও সজীব
থাকে। তাই শুধুমাত্র কড়া থেকে আরও কড়া আইন প্রণয়নের উপর ভরসা করে বসে না থেকে
সমাজকেই নড়ে চড়ে বসতে হবে। না শুধুমাত্র ধর্ষণ ঠেকাতে নয়। সমাজকে সুস্থ ও সবল করে
তুলতে। সমাজ যদি না সুস্থ ও সবল হয়, তবে আইনের
সীমাবদ্ধ ক্ষমতা পরবর্তী একটি আসিফাকেও রক্ষা করতে পারবে না। পারে নি। পারছে না।
তাই জাস্টিস ফর আসিফা থেকে আমাদের এগোতে হবে জাস্টিস ফর সোসাইটিতে। সেই কাজ ভারতীয়
আইন ব্যবস্থার নয়। সেই কাজ ভারতীয় নাগরিক সমাজের। সেই কাজ ঘরে বসে সোফায় হাত পা
ছড়িয়ে কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ওয়াল পোস্টে নয়। সেই কাজ করতে পথে নামতে হবে
জাতি বর্ণ ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে। সমাজকে রাজনীতি থেকে মুক্ত করার যুদ্ধ
দিয়েই শুরু করতে হবে সেই লড়াই। সে অনেক দিনের সাধনার কাজ।
৬ই মে ২০১৮
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

