জায়গায় জায়গায় যে শীতলকুচি হবে বলে
ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেই শীতলকুচির একটি লাইভ ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে অবশেষে।
যেটি আইটিসেল প্রচারিত ফেক ভিডিওগুলির মতো নয়। সাধারণ ভোটার বা স্থানীয় জনতার তোলা
চিত্র। এখন এই একটি চিত্রেই বিভিন্ন জন মানুষ বিভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছেন। এই ভিডিওটি
অভিনব নাকি নানান রকম ভাবে দেখা ও দেখানোর বিযটি অভিনব তার বিচার সময় করবে। যিনি বা
যাঁরা হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের প্রবক্তাদের সমর্থন করেন, তাঁরা গোটা ভিডিটি একভাবে
দেখছেন। আবার যাঁরা তথাকথিত সেকুলার তাঁরা আরেক ভাবে একই ছবি দেখছেন। মা মাটি মানুষের
সমর্থকদের দেখার ভঙ্গির সাথে মিল হচ্ছে না দশ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষজনের দেখা।
সব মিলিয়ে একটি ভিডিও দেখার ভিতর দিয়েই স্পষ্ট হচ্ছে শত ভাগে বিভক্ত বাঙালিয়ানার ঐতিহ্যমণ্ডিত
শতাব্দী প্রাচীন ছবিটিও। তা হোক। এখন এই বিভিন্ন ভাবে দেখার একটা কোলাজের ভিতর দিয়ে
বেশ কিছু গভীর তথ্য উঠে আসছে।
প্রথমে স্বীকার করে নেওয়া
ভালো, দিল্লীর পরিকল্পনা মতো পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির ভিতরে এক ধরণের সাম্প্রদায়িক বিভাজন
মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এমনটা নয়, বাঙালির রক্তে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষ ছিল না কোন
কালেই। ছিল তো নিশ্চয়। কিন্তু সেই বিষ মন্থনের এমন উদগ্র রাজনীতি এক দশক আগেও ছিল না।
এটা একেবারেই হাল আমলের ঘটনা। যা অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ঘটনো
হয়েছে। ঘটানো চলেছে। এবং চলবে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি এখন এতটাই প্রকাশ্যে
চলে এসেছে যে, জনসমাজে এই বিষয়টি ইতিমধ্যেই মান্যতা পেয়ে গিয়েছে। যদিও সার্বিক ভাবে
জনগণ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তবুও রাজনীতির আবহাওয়ায়
বিভাজনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া জনতার পাল্লাই ভারী বলে আশংকা হচ্ছে। শীতলকুচির ঘটনা
ও ভিডিও ছবির সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া থেকে তেমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। এটা
খুবই সঠিক কথা। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণ চলা কালে বুথের ধারে কাছে আশেপাশে লাঠি
হাতে মানুষজনের ঘোরার কথা নয়। শীতলকুচির এই ভিডিওয় সেটাই কিন্তু প্রথমে দেখা গিয়েছে।
খুব বেশি জনসমাগম না হলেও যে জনা পঞ্চাশেকের মতো মানুষজনকে পাঁচিল ও গেটের আশে পাশে
ঘুরতে দেখা গিয়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেকের হাতেই লাঠি ছিল।
এখন প্রথমেই দুটি প্রশ্ন
জাগা উচিত। এক, স্কুলের গেটের কাছে কোন পুলিশ পোস্টিং ছিল কিনা। থাকলে পুলিশের উপস্থিতিতে
স্থানীয় মানুষজন লাঠি হাতে ঘোরাফেরা করছিল কি করে? ছবিতে স্পষ্টতই দেখা গিয়েছে মানুষজন
বিনা বাধায় লাঠি হাতে এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ভাবেও অবাধে বড়ো রাস্তা ও স্কুল গেটের
ভিতর দিয়ে ঘোরাফেরা করছে। যাদের চলাফেরা নেহাতই বুথের লাইনে দাঁড়াতে যাওয়ার মতোন ছিল
না। কিংবা ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার মতোনও ছিল না। ছবিতে স্পষ্ট, স্থানীয় জনগণ কোন না কোন
কারণে শংকিত হয়েই স্কুল গেটের ধারে জড়ো হচ্ছিল। যাদের ভিতর কিছুজনের হাতে লাঠি ছিল।
দুই, স্থানীয় মানুষ হঠাৎই বা লাঠি হাতে ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছিল কেন? তারা
কি ভেবে শংকিত ছিল? তাদের হাতের লাঠি, আত্মরক্ষার জন্যেই ছিল না’কি হামলা করার উদ্দেশে
ছিল? যদি হামলা করার উদ্দেশেই থাকে, তবে আমরা গোটা ঘটনায় লাঠি হাতে কোন মানুষকে কোন
পুলিশ বা অন্য কোন মানুষের উপরে চড়াও হতে দেখলাম না কেন? হ্যাঁ চার জনের লাশ মাটিতে
পড়ে যাওয়ার পরে, জনা কয়েক যুবককে দেখা গিয়েছে স্কুলের দরজায় লাঠি হাতে হামলা চালাতে।
কিন্তু তার আগেই চারজন বাঙালির লাশ পরে গিয়েছিল বাংলার মাটিতেই। জনতার ক্ষোভ প্রশমিত
করার জন্য বা বুথ রক্ষার জন্য সেই মুহুর্তে কোন পুলিশ বা আধাসামরিক বাহিনীর ফৌজকে দেখা
যায়নি। ফলে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থার সুযোগ নিয়ে লাঠিধারী যুবকদের কয়কেজন দরজা ভাঙার
চেষ্টা করছিল। এর বাইরে লাঠি হাতে জড়ো হওয়া স্থানীয়দেরকে কারও উপরে বা কোন কিছুর উপরে
হামলা করতে দেখা যায়নি কিন্তু। ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পক্ষে থাকা দর্শকরা যতই হামলা
হামলা করে হামলে পড়ুক না কেন, ছবি কিন্তু হামলার কথা বলছে না।
নির্বাচন চলাকালে ভোট
গ্রহণের সময়ে পুলিশ বা আধাসেনা বাহিনীর ফৌজদের মূল দায়িত্ব বুথ রক্ষা করা। এবং ভোটারদের
ভোটদান যাতে নিরাপদে সম্পন্ন হয় তার নিশ্চয়তা রক্ষা করা। ফলে শুধু বুথ রক্ষা করাই নয়।
ভোটারদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব কর্তব্যরত পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীরই। শীতলকুচির এই
ভিডিওয়ে এটা পরিস্কার, কর্তব্যরত পুলিশের ভুমিকা অত্যন্ত সন্দেহজনক। বিশেষ করে চার
চারটি বাঙালির লাশ মাটিতে ফেলে দিয়ে পুলিশ বা সিআইএসএফের বাহিনীকে যেভাবে বেড়াতে বেড়াতে
অকুস্থল ছেড়ে চলে যেতে দেখা গেল, সেটি সম্পূর্ণ অভুতপূর্ব অপ্রত্যাশীত। এবং বেআইনী।
অভুতপূর্ব কেননা, কোন গণ্ডগোলে পুলিশ একশান নিলে, পুলিশকে এইভাবে তৎক্ষণাৎ অকুস্থল
ছেড়ে চলে যেতে দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের নাই। বেআইনী কারণ। পুলিশ বা সিআইএসএফ চারজনকে
মেরে ফেলে দিয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বুথের সুরক্ষা, ভোটারদের নিরাপত্তার কোন দায়িত্বই
পালন না করে পালিয়ে গেল। এইরকম একটি পরিস্থিতিতে তাদের একশান সংঘটিত করে দিয়ে বুথকে
অরক্ষিত রেখে হাওয়া হয়ে যাওয়া সম্পূ্র্ণ ভাবেই বেআইনী। এবং একটা লাঠিধারী জনতার হাতে
অরক্ষিত বুথ ফেলে দিয়ে চলে যাওয়া কোনভাবেই আইনী প্রক্রিয়া বা দায়িত্ব পালনের বিষয় হতে
পারে না। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পক্ষে থাকা বাঙালির পক্ষে এই সহজ কথাটা বোধগম্য না
হওয়ারই কথা। এবং হয়ও নি। তারা ভিডিও চিত্রে জনতার হাতে লাঠি দেখেই গুলির স্বপক্ষে এবং
লাশ ফেলে দেওয়ার স্বপক্ষে যুক্তিজাল বিস্তার করতে ব্যস্ত। আর সেটাই স্বাভাবিক। যদিও,
নির্বাচনী বিধিতে কোথাও বুথের আশেপাশে লাঠিধারী জনতা দেখলেই দেখামাত্র বুক লক্ষ্য করে
গুলি চালানোর নির্দেশ ভারতীয় আইনে দেওয়া সম্ভব নয়।
শীতলকুচির এই ভিডিওতে
এটা পরিস্কার নয়, যে চারজনের বুক লক্ষ্য করে গুলি চালনা হয়েছিল তাদের হাতে লাঠিসোটা
ছিল কি ছিল না। বরং এটা দিনের আলোর মতোন পরিস্কার যে, স্কুলের পাঁচিল ও গেটের আশেপাশে
লাঠি হাতে ঘোরাফেরা করা জনতার বুক তাক করে গুলি ছোঁড়া হয়নি। কারণ আমরা য়খন পরপর ছয়
রাউন্ড গুলির আওয়াজ শুনলাম, তখন ভিডিও গ্রাহকসহ আরও দশ পনেরোজনকে গেটের মুখেই জটলা
করতে দেখা গেছে। এবং তাদের ভাবভঙ্গিতে গোলাগুলির আশঙ্কাজনিত উদ্বেগও সেভাবে চোখে পড়েনি।
অর্থাৎ গোলাগুলি যে চলতে পারে, তেমন কিছু তারা আশা করে ছিল না। এবং তাদের উপরে গুলি
চলেও নি। গুলি চলেছে একেবারে বুথের কাছাকাছি। সম্ভবত ভোটের লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের
বুক লক্ষ্য করেই। অর্থাৎ আমরা গেট ও পাঁচিলের আশেপাশে যাদেরকে লাঠি হাতে ঘোরাফেরা করতে
দেখলাম, সিআইএসএফের জওয়ানরা কিন্তু তাদেরকে নিরস্ত্র করতে গুলি চালায়নি। সাম্প্রদায়িক
বিভাজনের পক্ষে থাকা জনতা এই বিষয়ে স্বভাবতই নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছে।
এবং লাঠি হাতে ঘোরাফেরা করা জনতা সিআইএসএফ জওয়ানদের উপরে কোনভাবেই চড়াও হয়ে সশস্ত্র
হামলাও চালায় নি। ফলে লাঠি হাতে এবং ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রসহ কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপরে চড়াও
হয়ে হামলার অভিযোগ যে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ, সেকথা বুঝতে অসুবিধা
হওয়ার কথাও নয়। অভিযোগে আরো বলা হয়েছিল, প্রায় শপাঁচেক সশস্ত্র জনতা সিআইএসএফের জওয়ানদের
উপরে হামলা করেছিল। তাদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতেই সিআইএসএফের জওয়ানরা আত্মরক্ষার্থে
গুলি চালিয়েছিল। এই ভিডিওতে দেখা গিয়েছে বুথে ও বুথের আশেপাশে কখনোই অত সংখ্যক জনতা
সমবেত ছিল না। হামলা করা তো দুরস্থান। ফলে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালনার সংবাদও সর্বৈব
মিথ্যা রটনা।
হ্যাঁ এটা, মিথ্যে রটনা
রটিয়ে দিয়ে দাঙ্গা বাধানোর কাল। মানুষকে বোকা বানানোর কাল। এবং অনৈতিক উপায়ে রাজনৈতিক
জমি দখল করারও কাল। এবার তার সাথে যুক্ত হলো, মিথ্যে রটনা রটিয়ে দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত
করে নির্বাচনে জেতারও কাল। এই মিথ্যে রটনা আবার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমর্থনও করা হয়ে
থাকে সময় ও সুযোগ বুঝে। এবং বৃহৎ পুঁজির মালিকরা সযত্নে সব রকম মাধ্যমকে নিজেদের মালিকানায়
রেখে মিথ্যে রটনাকে রটিয়ে দেওয়ার কাজ করে চলে। ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের এবং রাজনৈতিক
মেরুকরণের কাজে মিথ্যে রটনার গুরুত্ব সর্বাধিক। কোথায় চারশো পাঁচশো মারমুখী সশস্ত্র
জনতা আর কোথায় জনা পঞ্চাশেক মানুষের জটলা। যাদের কারুর কারুর হাতে লাটিসোটা।
নির্বাচনী কেন্দ্রের
আশেপাশে ভোটগ্রহণ চলাকালে যেমন লাঠি হাতে জটলা করা বেআইনী, ঠিক তেমনই সেই জটলা সরিয়ে
না দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করাও বেআইনী। আবার লাঠি হাতে কাউকে দেখামাত্রই গুলি
করাও বেআইনী। এবং জনতাকে আলটিমেটাম না দিয়ে, আগে জায়গা ফাঁকা করে দূরে সরে যাওয়ার নির্দেশ
না দিয়েই জনতার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালানোও বেআইনী। চারজনকে গুলি করে মাটিতে ফেলে
দিয়ে, সেই ডেডবডির ভার না নিয়ে পুলিশের জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়াও বেআইনী। যে কোন পুলিশি
একশানে গুলি খেয়ে মারা যাওয়া মৃতদেহের ভার নেওয়া রাষ্ট্রের তরফে একমাত্র পুলিশ বা সেনা
বা আধাসেনাদেরই। কিন্তু শীতলকুচির এই ভিডিওয় সিআইএসএফ বা পুলিশের কাউকেই সেই ভার বা
দায়িত্ব নিতে দেখা যায় নি। যেটা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। এবং সম্পূর্ণ বেআইনী। এখন সাম্প্রদায়িক
বিভাজনের রুগী হয়ে পড়লে আইনের এই দিকগুলি সম্বন্ধে নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। ভিডিওতে
দেখা গেল, পাঁচিলের শেষ প্রান্তের দিক থেকে পুলিশ বা সিআইএসএফের জওয়ানরা হঠাৎই সক্রিয়
হয়ে উঠে রাস্তা ছেড়ে মাঠের দিকে দৌড় দিতে শুরু করলো। এক্ষেত্রে হঠাৎ কোন নির্দেশ আসার
কথাই মনে হয়। উপর মহলের কোন নির্দেশেই তাদের এই হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে ওঠা। এবং তার মাত্র
মিনিট কয়েক পরেই পরপর ছয়টি গুলির শব্দ শোনা গেল। যে গুলিতে এবারের নির্বাচনে লাশের
সংখ্যায় আরও চারটি ডেডবডি সংযুক্ত হলো। কিন্তু এখনো জানা যায়নি আর কতজন ঘায়েল হয়েছে।
না শীতলকুচি কাণ্ডে বেআইনী
কাজের এখানেই শেষ নয়। নির্বাচনী রাজনীতিকে পুষ্ট করতে বুথের সামনে চারজন তরতাজা যুবকের
নিথর মৃতদেহ লাশ হয়ে পড়ে রয়েছে। বুথের ভিতরে একটু আগেও ভোটগ্রহণ পর্ব চলছিল। হঠাৎই
সব তছনছ অবস্থা। সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় পুলিশ বা সিআইএসএফ’র, বুথরক্ষার দায়িত্ব না নিয়ে
বুথ ছেড়ে চলে যাওয়াটা সম্পূর্ণতই বেআইনী। এই সোজা কথাটা স্বীকার না করাও আইনভঙ্গের
মতোই সম পর্যায়ের অপরাধ। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পক্ষে থাকা জনতাও এই অপরাধের দায় অস্বীকার
করতে পারে না। চার চারটি মৃতদেহ মাটিতে পড়ে। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রকে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে
অরক্ষিত ভাবে ফেলে রেখে সশস্ত্র পুলিশ ও সিআইএসএফের জওয়ানরা পিছন দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল।
অথচ সেই বিষয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির কুশীলবরা সকলেই
নীরব! শীতলকুচির এই ভিডিওয় কোথাও কিন্তু দেখা যায়নি, সশস্ত্র মারমুখী হিংস্র জনতার
হামলায় বেকায়দায় পড়ে শূন্যে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পুলিশ বা সিআইএসএফের জওয়ানরা পিছু হঠছে।
দেখা গেলে এত কথা বলার অবকাশ জুটতো না।
ঠিক এইখানেই প্রশ্ন উঠছে।
যাদরকে সিআইএসএফের জওয়ান বলে চালানো হচ্ছে। তারা আদৌ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জওয়ান তো? তাদের
আচরণ ও কর্ম পদ্ধতির কোন কিছুই কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সাথে মিলছে না। বরং
সন্দেহ করার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে, তারা উর্দিপরা ভাড়াটে গুণ্ডাও হতে পারে। ভাড়াটে গুণ্ডারা
ঠিক যেভাবে সুপারি নিয়ে মানুষ খুন করে কেটে পড়ে। এরাও ঠিক সেইভাবেই কাজ শেষ করে কেটে
পড়েছে। সন্দেহের আরও বড়ো কারণ, মাত্র মাস দুইয়েক আগেই দিল্লীর সীমান্তে এইরকমই ভাড়াটে
গুণ্ডারা উর্দি পড়ে কৃষকদের উপরে হামলা চালিয়েছিল দিল্লী পুলিশের প্রত্যক্ষ মদতে। এখানে
কোন পুলিশের মদতে এই হামলা, সে বিষয়ে জনতা এখনো পুরোপুরি অন্ধকারে। তবে যেভাবে সাম্প্রদায়িক
বিভাজনের রাজনীতির কুশীলবরা জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি করার আগাম হুমকি দিয়ে রাখছে, তাতে
অন্ধকারেও পরিস্কার আলোকরেখা সুষ্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর এই আলোর রেখা যতটা সুষ্পষ্ট। সাম্প্রদায়িক
বিভাজনের পক্ষে থাকা জনসমর্থনও ততটাই উদ্দীপ্ত এমন শীতলকুচি করে দেওয়ার হাড়হিম করা
কর্মকাণ্ডে। অর্থাৎ যেখানে সংখ্যালঘুদের ভিড়। সেখানেই ভোটের লাইনে এক আধটা শীতলকুচি
ভোটের সব অংককে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মেরুকরনের স্বপক্ষে নিয়ে গিয়ে জড়ো করে দিতে পারে।
সেই সম্ভাবনাই ষোলআনা। না হলে জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি করে দেওয়ার হুমকি উঠতো না কখনোই।
হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের প্রবক্তাদের সমর্থনে থাকা জনতা শীতলকুচি কাণ্ডে যথেষ্ঠই
উদ্দীপ্ত। শীতলকুচির অনুপ্রেরণা পরবর্তী ভোটের ফলাফলে একটা ভালো রকমের প্রভাব ফেলতে
চলেছে। বিশেষ করে জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি করে দেওয়ার আগাম হুমকিতে জনসমর্থনের পাল্লা
দিনে দিনে ভারী হয়ে উঠবে বলেই বিশ্বাস। ফলে যে রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে এই শীতলকুচি কাণ্ড।
যে কারণে বুথের সিসিটিভিও লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে ঘটনার ঠিক অকুস্থলে হাজির
একাধিক ভোটারের মোবাইল ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেই রাজনৈতিক সমীকরণ পশ্চিমবঙ্গের
রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মেরুকরণ অত্যন্ত সাফল্যের সাথেই সংঘটিত করতে পারছে
বলেই ঘটনার অভিমুখ দিক নির্দেশ করছে।
সবশেষে, একথা অস্বীকার
করার কোন রকম উপায় নাই, উর্দিধারীরা যদি সরকারী বাহিনীরই সদস্য হয়, কিংবা নকল পোশাকের
ভাড়াটে সৈন্য কিংবা গুণ্ডা। যাই হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজ্যে এই যদি একুশ
শতকের চিত্র হয়। তবে সামনের দিন খুবই ভয়ঙ্কর। এই ভাবে রাষ্ট্রীয় মদতে যেকোন ধরণের অপকর্মই
আইনী তকমা পেতে থাকলে সাধারণ জনগণের জীবন সম্পূর্ণতই অরক্ষিত এবং বিপদসঙ্কুল। বিপদের
আরও বড়ো দিক হলো, এই ধরণের অপকর্মও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনৈতিক মেরুকরণে একটা বড়ো
অংশের জনসমর্থন পেয়ে চলেছে। এই জনসমর্থন দিনে দিনে বাড়িয়ে তোলার জন্যেই কি জায়গায় জায়গায়
শীতলকুচি করে দেওয়ার আগাম হুমকি? যত বেশি হুমকি। তত বেশি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পক্ষে
জনসমর্থন লাভ। আর সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পক্ষে যত বেশি জনসমর্থন, হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের
পরিকল্পনায় তত বেশি অগ্রগতি। আর সেটাই পাখির চোখ কেন্দ্রে সরকারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত
রাজনৈতিক শক্তির। শীতলকুচির ভিডিও চিত্র কে কিভাবে দেখছে ও দেখাচ্ছে। সেটা তত বড়ো বিষয়
হয়তো নয়। যত বড়ো বিষয় হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের অগ্রগতিতে শীতলকুচির মতো ষড়যন্ত্রের
মারাত্মক প্রভাব ও গুরুত্ব। এখন সেই ভয়ঙ্কর প্রভাবের ভয়াবহ গুরত্বকে প্রতিহত করে রাষ্ট্রশক্তিকে
পরিশোধন করার শক্তি জনগণের কবে হবে বা আদৌ হবে কিনা, সে প্রশ্নের কোন উত্তরই হয়তো এই
সময়ে কারুর কাছেই নেই।
১৫ই এপ্রিল ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত

