একটি দেশ একটি সমাজ
সে
এক দিন ছিল যখন বাংলা আজ যা ভাবতো ভারত তা ভাবতো কাল। গঙ্গা পদ্মা দিয়ে তারপর কত
জলই না গড়ালো। সে দিনও নাই সে বাংলাও আর নাই। কাঁটাতারে ভাগ হয়ে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে
আস্ত একটা জাতি! একটা জাতি তখনই বিভক্ত হয়, যখন তার টানটান শিরদাঁড়াটা দিনে দিনে
ক্ষয়ে ক্ষয়ে দূর্বল হয়ে যায়। বৃটিশ অধীনস্ত পরাধীন ভারতবর্ষের মানচিত্রে সমাজ
বিবর্তনের ধারায় বাঙালির জাতীয় জীবনে ঠিক সেইটাই ঘটেছিল ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিত
ভাবে। তার পরেও কেটে গিয়েছে প্রায় সাতটি দশক। অর্থাৎ আরও প্রায় তিন প্রজন্ম বয়স
বেড়ে গিয়েছে বাঙালির। আজ সে বৃটিশও আর নাই, পরাধীনতাও আর নাই। কিন্তু জাতির
অস্থিমজ্জায় জড়িয়ে গিয়েছে পরাধীন মানসিকতার অভিশাপ! সেই অভিশাপ থেকেই আবর্তিত
হচ্ছে দুই বাংলার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসর ও জনজীবনের রোজনামচা। স্বাধীন
বাংলাদেশের কথা আজ নয়! আজ আমাদের আলোচনার বিষয় পরিবর্ত্তনের বঙ্গ ও তার নিত্যরঙ্গে
ভরপুর সমাজ জীবন! বিগত বাম আমলের সাড়ে তিনদশকের সংগঠিত দলীয় শাসনের নিস্তরঙ্গ
জনজীবনে প্রথম স্বাদ বদলায় সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম ও তার রাজনৈতিক সমীকরণ। আর সেই
সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের হাত ধরেই পরিবর্ত্তনের পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যাকাশে নবদিগন্তের
উদ্বোধন!
আজ
সেই নবদিগন্তে বিশ্ব কস্মিনকালেও যা কল্পনা করতে পারতো না, বাংলা আজকেই তা হাতে
কলমে করে দেখাচ্ছে! কি অপূর্ব দক্ষতার ক্রমবিকাশ আজ সারা রাজ্যের সকল প্রান্তে।
কার্শিয়াং থেকে কাকদ্বীপ বনগাঁ থেকে বাঁকুড়া আলিপুরদূয়ার থেকে আলিপুর সর্বত্র আজ
মানুষই শেষ কথা বলছে। পরিবর্ত্তনের স্লোগান ছিল মা মাটি মানুষ। সেই মানুষের হাতেই
আজ অসীম ক্ষমতার ভাণ্ডার! শুধু হাতে একটি দলীয় পতাকা আর মুখে দিদির নামে জয়ধ্বনি!
তাহলেই চিচিংফাঁক! খুলে যাবে যেমন ইচ্ছে যে ভাবে ইচ্ছে চলার মসৃণ রাজপথ। যে পথের
টোলট্যাক্সের ঠিকানা নবান্ন। সেই পথেরই রোজনামচায় শিরোনামে এবঙ্গের মুখ। প্রতিদিন
আলোকিত টিভি ক্যামেরার ফ্ল্যশলাইটের ঝলকানিতে।
সম্প্রতি
সেই ঝলকানিতেই শিরোনামে উঠে এসেছে তিনটি কুকুরের মুখ। যার দুটি মৃত কুকুরের কংকাল
আর একটি কিডনীর অসুখে অসুস্থ। প্রথম দুটির মালিকের একজন আর ইহজগতে নাই। দ্বিতীয়
জনের ঠাঁই হয়েছে আপাতত মানসিক আরগ্যোনিকেতনে। কারণ তাঁর হাতে লেগে ছিল না কোনো
দলীয় পতাকার বিচিত্র রঙ! কিন্তু গোল বেঁধেছে তৃতীয় কুকুরটিকে নিয়ে। সাংবাদিকের
হাজার ক্যামেরাও তার নাগাল পায়নি এখনো। কারণ কুকুরের মালিক তেমনটি চাননি এখনো!
তিনি শুধু চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় কুকুরের ডায়ালসিস! রাজ্যের সুপার স্পেশালিস্ট এক
নম্বর সরকারী হাসপাতালে। খুবই স্বাভাবিক সেই চাওয়া নিয়েই শোরগোল পড়ে গিয়েছে
প্রশাসনের ভেতরে থেকে বাইরে। চাপা হাসির
মিছিলে পা মেলাচ্ছেন হয়তো অনেকেই কিন্তু সবই পর্দার আড়ালে। আর এই সঙ্কট কালেই
রাজ্যের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টকও নেমে পড়তে হয়েছে ড্যামেজ কন্ট্রোলের কাজে। তবে
সেটা সরকারী ভাবে নয়! সরকারী ভাবে “জীবে প্রেম করে যেই জন”- সেই জন সেবিছে
(নবান্ন) এমনই সংকেত দেওয়া হচ্ছে দীঘা থেকে দার্জিলিঙ।
আর
সেই জীবে প্রেম করতে গিয়েই স্পটলাইটে উঠে এসেছে বর্তমানে এরাজ্যের স্বাস্থ্যের
প্রকৃত চিত্রটি। সেই চিত্রেরই অন্যতম মুখ হিসেবে বিভিন্ন সরকারী আধিকারিক ও
পেশাজীবি উচ্চপদস্থ মানুষজনের মুখ ও মুখোশের পার্থক্য ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ক্ষীণ
হয়ে আসছে মা মাটি মানুষের স্লোগানটির বিশ্বাসযোগ্যতাও। এই যেমন রাজ্যের একমাত্র
সুপারস্পেশালিটি সরকারী হাসপাতাল এসএসকেএমের চিকিৎসা বন্দোবস্তের নমুনা! কিডনীর
অসুখে ভুগতে থাকা রুগী যাদেরকে ডায়োলসিসের ডেট পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হয় মাসের
পর মাস; তাদেরই নাকের ডগা দিয়ে মানুষের ডায়োলসিসের জন্যে নির্দিষ্ট দূর্মূল্য
যন্ত্রেই কি গভীর তৎপরতা ও দ্রুততার সাথেই না একটি অপরিচিত কুকুরের ডায়োলসিস করার
সব রকম সরকারী বন্দোবস্তও হয়ে গিয়েছিল দৃষ্টান্তমূলক ভাবে। সারা বিশ্বেই এই
প্রথমবারের জন্যে মানুষের জন্যে নির্দিষ্ট যন্ত্রেই হয়েও যেত কুকুরের ডায়োলসিস।
যদি না বাদ সাধতেন (এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা
রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা) হাসপাতালের ভিজিটিং চিকিৎসক। যাঁর দেওয়া নোটের
ভিত্তিতেই ভেস্তে যায় এহন যুগান্তকারী মহৎ পরিকল্পনা। সেই কত দশক আগে মহাকাশে পারি
দেওয়া রুশ কুকুর লাইকার নামের পাশে আমাদের দেশি কুকুরের নাম সোনার অক্ষরে জ্বলজ্বল
করতো- বিশ্বে সর্বপ্রথম মানুষের হাসপাতালে ডায়োলসিস হওয়া কুকুর হিসেবে!
ঠিক!
সেই যুগান্তকারী ঘটনার সাক্ষী থাকা হল না পরিবর্ত্তনের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের। কিন্তু
সেই যুগান্তকারী ঘটনার বন্দোবস্তে যুক্ত ছিলেন যারা পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছে
তাঁদের নাম! কে ছিলেন না সেই তালিকায়? রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব থেকে শুরু করে
সুপারস্পেসালিটি হাসপাতালের নেফ্রলজীর বিভাগীয় প্রধান ও হাসপাতালের ডিরেক্টর
স্বয়ং! এইরকম হেভিওয়েট কম্বিনেশন মিলেই
প্রস্তুত করেছিলেন সেই নীল নকশা! তাও আবার অভাবনীয় দ্রুততার সাথে। খবরে প্রকাশ
স্বাস্থ্যসচিবের থেকে নির্দ্দেশ পেযেই তড়িঘড়ি নেফ্রলজী বিভাগকে কুকুরের ডায়োলসিসের
জন্যে প্রস্তুতি নিতে সবরকম প্রয়োজনীয় নির্দ্দেশ দেন বিভাগীয় প্রধান। আবার সেই
নির্দ্দেশকেই প্রয়োজনীয় ছারপত্র দেন হাসপাতাল প্রধান। কিন্তু কি ছিল সেই নির্দ্দেশে?
খবরের সূত্র অনুযায়ী, এসএসকেম হাসপাতালে ডায়োলসিস করা হয় মূলত দুটি আলাদা যন্ত্রে।
একটি যন্ত্রে কেবলমাত্র এইডসের রুগী ও হেপাটাইটিস সি ও বি-তে আক্রান্ত রুগীদের। আর
অন্য যন্ত্রে অন্যন্য রুগীদের। কারণটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূত্র ধরেই করা হয়ে থাকে।
কারণ ডায়োলসিসের যন্ত্রের মাধ্যমে পরবর্তী রুগীর শরীরে পূর্ববর্তী রুগীর শরীরের
নানান ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায় আগাগোরা! তাই এই সতর্কতা! আর
তাই নেফ্রলজী বিভাগের প্রধানের নির্দ্দেশ মত প্রস্তুত করা হয় সেই ডায়োলসিস
যন্ত্রটি যাতে কেবলমাত্র এইডস ও হেপাটাইটিস বি ও সি’র রুগীদের ডায়োলসিস করা হয়ে
থাকে। যেহেতু এই রুগীদের রোগ প্রতিরোধ করার ন্যূনতম ক্ষমতাটুকুও থাকে না, তাই
পরবর্তীতে এদের দেহে কুকুর বাহিত মারাত্মক ভাইরাস সংক্রমনজনিত রোগ দেখা দিলেও চট
করা ধরা সম্ভব হবে না কুকুরের ডায়োলসিস করা যন্ত্রেই মানুষের ডায়োলসিস করার কারণেই
এমন সাংঘাতিক দূর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে! কি চমৎকার নীলনকশা!
আর
সেই নীলনকশা করেই খবরের শিরোনামে আবার পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্য স্বাস্থ্য পরিসেবার এহন
জীবে প্রেমের নমুনায় আতঙ্কিত রাজ্যবাসীর এখন একটাই জিজ্ঞাস্য কুকুরটা কার? কিন্তু
এই ভিভিআইপি কুকুরটি যারই হোক, তার জীবনের মূল্য যে, সকল রাজ্যবাসীদের থেকেও অনেক
বেশি মূল্যবান সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই কারুর। সন্দেহ নাই এই রাজ্যের সেই বহুল
প্রচারিত পরিবর্ত্তনের ঢক্কানিনাদের তালটুকু নিয়েও! আর সেই তালে তাল মেলানোর
মিছিলে পা মেলাতে কি দীর্ঘ লাইন! কে নেই সেই লাইনে? অধিকাংশ সরকারী অধিকারিক থেকে
শুরু করে, বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষ, সরকারী খেতাব পাওয়া ও পেতে চাওয়া বিশিষ্ট
বুদ্ধিজীবি জনগোষ্ঠী, এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক হেভিওয়েট কুশীলব থেকে
শুরু করে দলীয় নাটবল্টু সম্প্রদায় পর্যন্ত্য! লক্ষ্য একটাই এই পরিবর্ত্তনের ঝড়ে
খড়কুটোর মতো উড়ে না গিয়ে পরিবর্ত্তনের সরকারী প্রসাদ প্রাপ্তির সুযোগটাকে এমন করেই
কাজে লাগানো যাতে করে আগামী চৌদ্দ পুরুষ আর ভাত কাপড়ের জন্যে কোনদিন ভাবতে না হয়!
আর
তাই আত্মমর্য্যাদা, মানবিক মূল্যবোধ পেশাগত নীতিবোধ, কর্মক্ষেত্রের কর্তব্য ও
দায়িত্ব সর্বপরি নিজ ব্যক্তিত্বের শিরদাঁড়াটুকুকেও জলাঞ্জলী দিতে পিছুপা নন কেউই!
লক্ষ্য একটাই পরিবর্ত্তনের ননীমাখনের ভাগিদারিত্ব। আর তাতে মানুষের হাসপাতালে
মানুষের জন্যে নির্দ্দিষ্ট ডায়োলসিস করার যন্ত্রে পশুর চিকিৎসা করতে হলেও নয়! নিজ
কর্মক্ষেত্র থানায় বসেও বিশিষ্ট রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাতে মার খেতে হলেও নয়! নিরোগ
কয়েদীকে মাসের পর মাস নিয়ম বহির্ভূত ভাবে সরকারী হাসপাতালে জামাই আদরে রাখতে হলেও
নয়! না এই না’য়ের আর শেষ নেই এরাজ্যে! আর
তখনই সত্যি করেই সামান্য একটি প্রশ্নই জেগে ওঠে! কতটা সুস্থ্য আছে আজ এই রাজ্য?
কদিন
আগেই রাজ্য রাজধানীর খাস অভিজাত এলাকায় ৩নং রবিনসন স্ট্রীটে প্রিয় দিদি ও পোষা
কুকুরের কঙ্কাল নিয়ে মাসের পর মাস এক ঘরে কাটানোর জন্যে আদালতের তত্বাবধানে
পার্থ’দের বর্তমান ঠিকান হয় মানসিক আরগ্যনিকেতন। তারই ঠিক কদিনের মাথায় ঢিল ছোঁড়া
দুরত্বে অবস্থিত সুপারস্পেসালিটি একমাত্র সরকারী হাসপাতালে জীবে প্রেম করায়
উদ্বুদ্ধ হয়ে কুকুরের ডায়োলসিসের বন্দোবস্ত হচ্ছিল মানুষের জন্যে নির্দ্দিষ্ট
যন্ত্র ও পরিসেবায়! কি অদ্ভুত সমাপতন! কিন্তু রাজনীতির রঙ ও রঙ্গের কি অপার মহিমা!
সেই রঙে নিজেকে রাঙাতে পারলেই কেল্লাফতে, আর না পারলেই ঠিকানা মানসিক হাসপাতাল!
শুধুই কি রাজনীতিই এর কারণ? না কারণ আরও গভীরে। বস্তুত সমাজদেহের অনেক গভীরেই পচন
না ধরলে উপরে এইরকম সব সিমটম দেখা যে যায় না, বুঝতে হবে আমাদের সেই সত্যটুকুও।
দেশভাগের
পর থেকেই এই অবক্ষয়ের শুরু। একটা জাতিকে সংগঠিত করে সমগ্র দেশকে গড়ে তোলার যে একটি
সামাজিক চেতনা, দূর্ভাগ্যক্রমে এই রাজ্যের জন্মলগ্ন থেকেই কোনোদিনের জন্যেই সেই
সামাজিক সচেতনতার উন্মেষই ঘটেনি। কেবলমাত্র নিজের ও নিজের পরিবারের স্বার্থরক্ষার
শিক্ষাই চর্চিত হয়ে এসেছে ঘরে ও বাইরে। আর সকল দূর্নীতির আঁতুর ঘরই হল
আত্মকেন্দ্রিকতা চর্চার এই শিক্ষা। যার থেকে মুক্ত নই আমরা কেউই। ফলে অখণ্ড জাতিসত্ত্বার উদ্বোধন না ঘটার কারণে আমরা
কেউই সমগ্র দেশকে আমাদের ব্যক্তিঅস্তিত্বের পরতে অনুভব করতে পারি না, শিখিনি
উপলব্ধি করতে । নিজেকে একটি অখণ্ড জাতির একজন বলেও উপলব্ধি করি না। আর করি না বলেই
গোয়ালা হয়ে দুধে জল মেশাই, একবারের জন্যেও ভাবি না সেই দুধ খেয়েই আমারই জাতির
শিশুরা দূর্বল শরীরে বেড়ে উঠবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতির ভবিষ্যৎ। শিক্ষক হয়ে
ছাত্রকে সাজেস্টেড নোট মুখস্থ করা শিখিয়ে পরীক্ষার বৈতরনী পার করতে সাহায্য করে
একতলা বাড়ি দোতলা করে নিই। একবারও ভাবি না আমারই জাতির মেধা সম্পদকে কিভাবে পঙ্গু
করে তুলছি! সরকারী আধিকারিক হয়ে ঘুষের বিনিময়ে বেআইনী কাজে সহায়তা করে নিজের সম্পদ
বৃদ্ধি করার সময়েও একবার ভাবি কি গোটা দেশের ভিতটিকেই কতটা নড়বড়ে করে যাচ্ছি দিনের
পর দিন? বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি সেজে নানান রকম অবৈধ সুযোগসুবিধে পাওয়ার জন্যে
সমস্তরকম নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে চৌদ্দপুরুষের আখের গুছিয়ে যাওয়ার সময়েও ভাবি না,
ভাবি ইতিহাসে কি রকম কলঙ্কে স্বাক্ষর করছি নিজেরই নাম! আর জাতির ভবিষ্যতের জন্যে
রেখে যাচ্ছি দিশাহীন অথর্ব্যতার বীজ! আসলে আমার সবাই একটি কথাই ভাবি, ভাবি আমার
কাজটা তো হয়ে যাক! আমি তো সুখে সম্পদে থাকি! সে সুখ যে পথেই আসুক না কেন! কিন্তু
ভেবে দেখিনা চোরাপথে আনা সুখের সমৃদ্ধি চোরাবালির ওপরেই প্রাসাদ বানানোর সমতুল্য।
ধ্বস যেদিন নামবে, সেদিন আর উপায় থাকবে না ঠেকানোর!
কুকুরটা
কার, তাই সেটা কোনো বড়ো প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হল- কুকুরটি যারই হোক, তিনিও ক্ষমতার
দম্ভেই সেই কথাটাই ভেবেছিলেন আমার কুকুরটিতো বাঁচুক! তারপর কি হতে পারে সেটুকু
অনুধাবন করার মতো শিক্ষা তো তিনি কোনোদিনই অর্জন করেন নি। করেননি তাঁর সমাজ সংসার
থেকেই। আমাদের সমাজের মূল রোগটা ঠিক সেখানেই! আত্মকেন্দ্রিকতার সীমাহীন চর্চার এক
অভিশপ্ত ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার! যা ভেতরে ভেতরে ঝাঁঝরা করে দেয় সমাজদেহের সর্বত্র।
৩নং রবিনসন স্ট্রীটের গল্পটাও সেই অভিশাপেরই আর একটা দিক। প্রিয় দিদির কঙ্কাল
প্রিয় কুকুরের কঙ্কালের বাইরে জগতের আর কোনো অস্ততিত্বই ছিল না চল্লিশার্ধ পার্থ
দে’র। সেই কঙ্কালের সাহচর্য্যকেই তিনি জীবনের সারাৎসার মনে করে তার মধ্যেই নিজের
আস্তিত্বকে অনুভব করতেন। সুস্থ মানবিক চেতনায় আমরা যাকে মানসিক বিকার বা
ভারসাম্যহীনতা বলে বিচার করে বসি।
ঠিক
সেইরকমই মানুষের ভোটাধিকারে একবার ক্ষমতার গদীতে পৌঁছাতে পারলেই তখন আর নিজের
ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক স্বার্থের বাইরে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও জগতের
আর কোনো অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন না! আর তখনই দূর্নীতির সমর্থনেও আইনকে নিজেদের
গোষ্ঠীস্বার্থে পরিচালিত করতেই সর্বশক্তি দিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। তাই তখন সমগ্র
রাজ্যবাসীর থেকেও পোষ্য কুকুরের জীবনও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতেই পারে
তাঁদের কাছে। পারে বলেই তখন মানুষের হাসপাতালেও অসুস্থ রুগীর চিকিৎসার থেকেও বড়ো
হয়ে ওঠে পোষ্যর জীবন। তাই তখন মানুষের জন্যে নির্দিষ্ট যন্ত্রে নিজের বাড়ীর
কুকুরের চিকিৎসা করানোর ইচ্ছেটাও বড়ো স্বাভাবিক বলেই মনে হতে থাকে তাঁদের। তখন
পার্থ’দের নিজের প্রিয় দিদি ও কুকুরদের
কঙ্কাল বাড়িতে রেখে দেওয়ার পরিকল্পনার মতোই তাঁদেরকেও রাজ্যের একমাত্র
সুপারস্পেসালিটি সরকারী হাসপাতালে মূমূর্ষু রুগীদের ডিঙিয়ে একটি কুকুরের
ডায়োলসিসের জন্যে সবরকম নীতি নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়ার বন্দোবস্তই করতে হয়! আর সেটাকেই
৩নং রবিনসন স্ট্রীটের চল্লিশার্ধ আত্মকেন্দ্রিকতার চর্চা করা মানুষটির মতোই তাঁরাও
জীবে প্রেম করা বলেই ভাবতে থাকেন। শুধু ভাবতে পারেন না এই আসুস্থতার শেষ পরিণাম
কখন কবে কি ভাবে দূয়ারে এসে কড়া নাড়বে!
সেই
কড়া নাড়ার দিনটির কথা বিগত সাড়ে তিনদশকের বাম আমলেও প্রবল প্রতাপশালী সরকারী দলটিও
কল্পনা করতে পারে নি, তাঁদের সুখনিদ্রা দেওয়ার দিনেও! কিন্তু রাজা আসে রাজা যায়।
বড়ো কথা সেটাও নয়! অসুস্থতার যে বীজ সমাজদেহের অস্থিমজ্জায় ক্যানসারের মতো
বংশবিস্তার করেছে আসল চিন্তার কারণ সেখানেই। সেই রোগের চিকিৎসা না করতে পারলে এই
ট্র্যাডিশান সমানে চলতেই থাকবে। দ্বিখণ্ডিত শিরদাঁড়ার এই বঙ্গ যতদিন না বলতে
পারবে, রাজা তোর কাপড় নেই।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত
