এদেশের বুকে আঠারো এসেছে নেমে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এদেশের বুকে আঠারো এসেছে নেমে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

এদেশের বুকে আঠারো এসেছে নেমে



এদেশের বুকে আঠারো এসেছে নেমে


“এ বয়স জেনো ভীরু কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোন সংশয়-
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।“
                    
                                ------সুকান্ত ভট্টাচার্য্য

সকালে উঠে, পুবের রোদ গায়ে মেখে শীতের আমেজে লেখার মেজাজে ধরা যাক আপনার মনে কবিতা এসেছে। খুব ভালো কথা। যে এসেছে, তাকে আসতে দিন। সদ্য ভুমিষ্ঠ কবিতার লাইনে দাঁড়িয়ে আপনি যদি আপনার সময় ও সমাজকে দেখতে ও দেখাতে পারেন, সে তো খুব ভালো কথা। সেটাই তো সাহিত্যের জলসায় কবির কাছে পাঠকের দাবি। আপনার কবিতার লাইনে আপনার সাথে আপনার পাঠকও দাঁড়াবার জায়গা পাচ্ছে কিনা, সেটিই কিন্তু আসল কথা। যদি দেখা যায়, আপনার কবিতার অক্ষরের সারিতে আপনি একাই সম্রাট নীরোর মতো বেহালা বাজিয়ে চলেছেন, আর চারপাশে পাঠকের জীবনে আগুন লেগে গিয়েছে, তবে ব্যর্থ আপনার কাব্যচর্চা।

যে ভারতের মহামানবের সাগরতীরে শিখ হুনদল মোগল পাঠান এক দেহে হলো লীন, সেই ভারতের সংবিধান রক্ষায় মানুষ যখন পথকে করেছে পাথেয়, আমি আপনি তখন যদি সাহিত্যের জন্য সাহিত্যের ধুয়ো তুলে দলবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত ইত্যাদি মাত্রার জাল বুনে ছন্দের সাথে ছন্দকে ধরার খেলাতেই নিমগ্ন থাকি তবে মানুষের বৃত্ত থেকে ছিটকে যেতেই পারি কিন্তু। অন্তত সেই সম্ভাবনাই ষোলআনা। সাহিত্যের সাথে যুক্ত রয়েছে মূল যে অর্থটি, সেটি হলো মিলন বা পরস্পর সংযোগ। সকলের সাথে থাকা। আরও স্পষ্ট করে বললে, সকলের সাথে থাকাই সাহিত্য। এবং সকলের হিতার্থে। এই যে জনহিতার্থে পরস্পরের সাথে থাকা, পরস্পরের মননের সাথে থাকা, আশা আকাঙ্খার সাথে থাকা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনার সাথে থাকা, সংকল্প ও শপথের সাথে থাকা; এই থাকা ও থাকতে পারাতেই সাহিত্যের ভরকেন্দ্র। পারলে তা সাহিত্য। না পারলে তা কবির ভাষায় শৌখীন মজদুরী।

আজ ভারতবর্ষের পথে মানুষের ঢল নেমেছে। মানুষ সংবিধানকে মান্যতা দিতেই অসাংবিধানিক একটি আইনের বিরোধীতায় আওয়াজ তুলেছে। প্রতিবাদের ধ্বনিকে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে নানা জাতি নানা ভাষার ভারতবর্ষের কোণে কোণে। আর সেই মানুষকে পথ দেখাচ্ছে নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক দল নয়, এতবড় দেশের নানা জাতির নানা ভাষার নানা ধর্মের ছাত্রসমাজ। জাতি ধর্ম ভাষার উর্ধে উঠে। সব ধরণের রাজনৈতিক মতবাদের উর্ধে উঠে। সমাজিক প্রকরণের উর্ধে উঠে। এবং শ্রেণী স্বার্থের উর্ধে উঠে, গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের আবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে এই বিরাট ছাত্রসমাজ আজ যে শুধু নিজেরাই পথে নেমেছে তাই নয়, গোটা দেশকে পথ দেখেচ্ছে। দেশের সংবিধানকে রক্ষা ও নাগরিকের নাগরিকত্বকের রক্ষার লড়াইয়ে ছাত্রসমাজ সকলের পুরো ভাগে থেকে পৌরহিত্য করছে। করছে দেশহিতার্থে। করছে জনহিতার্থে।

রাষ্ট্রের রোষানলে পড়েও তারা এযাবৎ পিছু হটে নি কোনভাবে। মাথায় পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়েও মাথা ঠিক রেখেছে। বিভ্রান্ত হয়নি সংগঠিত মিথ্যা প্রচারে। কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়াতেও ধোঁয়াটে করে দেওয়া যায়নি তাদের দৃষ্টিশক্তিকে। এবং মনে রাখতে হবে, এই ছাত্রসমাজ সারাদেশের শ্রেষ্ঠ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নিজেদের মেধার উৎকর্ষতায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলির নাটবল্টু হয়ে যারা শিক্ষাক্ষেত্রে আস্ফালন প্রদর্শন করে, তাদের থেকে এই ছাত্রসমাজের প্রধান পার্থক্য এইখানেই। এবং এরাই আশু ভবিষ্যতে ভারতবর্ষের কাণ্ডারী। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতির জন্য জরুরী যে মেধা, সেই মেধাই এই ছাত্রসমাজের অধিকৃত। তাই এই ছাত্রসমাজকে অস্বীকার করলে, তাদের মেধাকে নানান ভাবে স্তব্ধ অবরুদ্ধ করে দিলে, আজ থেকে দুই তিন দশকের ভিতর ভারতবর্ষের অগ্রগতি থমকে যাবে। মেধাহীন পেশিশক্তির যে আস্ফালন দেখা যায়, ভারতীয় রাজনীতির আঙিনায়, সেই পেশিশক্তি দিয়ে কোন দেশের কোন ধরণের অগ্রগতিই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ, শ্রেষ্ঠ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মেধাবী ছাত্রসমাজের হাতেই। রাজনৈতিক দলগুলির নিয়ন্ত্রণাধীন মেধহীন যুবশক্তির হাতে নয়।

আজকের লড়াই তাই সেই তরুণ মেধার সাথে রাষ্ট্রশক্তির ছদ্মবেশে দেশবিরোধী শক্তির লড়াই। এই লড়াইয়ে ব্যক্তিগত ভাবে কে কোন পক্ষ নেবে না নেবে সেটি ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বড়ো কথা নয়। ইতিহাসের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ এটাই যে, ভারতবর্ষের ছাত্রসমাজের শ্রেষ্ঠ মেধারা আজ জেগে উঠেছে এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে। এবং আশার কথা, তাদের ডাকে ধীরে ধীরে হলেও জনমানসের শুভবোধসম্পন্ন অংশ কিছুটা হলেও সাড়া দিচ্ছে দলমত নির্বিশেষে। অন্তত প্রতিদিনের ঘটনা পরম্পরায় সেই চিত্রই দেখা যাচ্ছে। না, এই লড়াই শুধুমাত্র ছাত্রসমাজের একার লড়াই নয়। এই লড়াই বস্তুত প্রতিটি ভারতবাসীর অস্তিত্বের লড়াই। ছাত্রসমাজ কোন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী বা শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করছে না। করছে আপামর দেশবাসীর প্রতিনিধিত্ব। এইটিই ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দেশের সংবিধান রক্ষায়, প্রতিটি দেশবাসীর নাগরিকত্ব রক্ষায় ছাত্রসমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন অনেকের চেতনায় বিশেষ ভাবেই নাড়া দিতে পেরেছে। তাই অনেকেই সন্তানসম এই ছাত্রসমাজের সাথে পা মেলাতে আজ পথে নেমে পড়েছেন। পথে নেমেছেন। নামছেন প্রতিদিন। দলমত সম্প্রদায় শ্রেণীর উর্ধে উঠে জাতীয় পতাকাকে হাতে করে। এই জাতীয় পতাকা রক্ষার দায় সকলের। দেশবিরোধী শক্তির হাত থেকেই এই পতাকাকে রক্ষা করতে হবে। এমনটাই মনে করছে আজকের প্রজন্ম। তাই আজকের প্রজন্ম সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। যারা সাম্প্রদায়িক বিভেদকে হাতিয়ার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার পক্ষপাতি, যারা দেশের মানুষকে সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করে রেখে দেশের সম্পদ লুঠ করার কারবার ফেঁদেছে, ছাত্রসমাজ কিন্তু গর্জে উঠেছে ঠিক তাদেরই দেশবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে। ছাত্রসমাজ বুঝতে পেরে গিয়েছে, দেশের মানুষকে আজ এই লাইন, কাল সেই লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আঁচে উত্তপ্ত করে রেখে মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার খর্ব করার এই চক্রান্ত আসলে কাদের। এবং কোন উদ্দেশে।

দেশবিরোধী শক্তি তাই আজ ছাত্রসমাজের উপরে এত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। ছলে বলে কৌশলে এই ছাত্রসমাজের ঐক্যকে ছত্রভঙ্গ করার রাজনৈতিক ছলনার আশ্রয় নিচ্ছে। আশ্রয় নিচ্ছে রাষ্ট্রশক্তির গুলি বোমা বারুদের। নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্রসমাজ তারপরেও অকুতভয়ে এদেশের বুকে কবির স্বপ্নের আঠারো নামিয়ে আনতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় এগিয়ে চলছে প্রতিদিন। এই ছাত্র সমাজ সোজা কথাগুলি অনেক সহজ ভাবেই বুঝতে পেরেছে বলেই, তারা আজ পথে নেমেছে। কেননা পথে না নামা ছাড়া আজ আর কোন পথ খোলা নাই। আমি আপনি বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত বুদ্ধির অলিন্দে বসে লাভ ক্ষতির হিসাব করি, সুবিধা অসুবিধার বিষয়গুলির তালিকা প্রস্তুত করতে ব্যস্ত থাকি আমাদের বদ্ধ মনের সংকীর্ণ স্বার্থের পরিসরে। কিন্তু ছাত্রসমাজ তাদের নির্মল মননে বিবেক ও আদর্শের উপর ভর রাখতে পারে। তাই তারা সংকীর্ণ লাভক্ষতি ব্যক্তিগত সুবিধা অসুবিধার তোয়াক্কা না করে দেশ ও দেশবাসীর স্বার্থে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধেও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। অকুতভয়ে। এখানেই আঠারো নেমে আসার মূল স্বার্থকতা। ভারতবর্ষ বহুদিন এই আঠারোর অপেক্ষায় প্রহর গুনেছে।

আজ আমার আপনার কবিতার খাতার পাতা বরং সাদা থাকাও অনেক ভালো, যদি না যুগসন্ধিক্ষণের এই সুর এই ধ্বনি এই কণ্ঠ আমার আপনার কবিতার শিকড়ে প্রাণের সাড়া পায়। যদি না পায়, তবে সেই লেখা সম্রাট নীরোর বেহালাবাদনের মতোই মানুষের ইতিহাসে ধিকৃত হবে বারে বারে। আজ তাই সকালের শীতের আমেজে কবিতা লেখার মেজাজ আমাদের কোন পথরেখার দিশা দেখাবে, সেখানেই আমাদের সাহিত্যের বর্তমান নোঙর। আজকের সাহিত্য, ভাবীকালে কোন বাণীকে পৌঁছিয়ে দেবে, সেও কিন্তু নির্ধারিত হবে এই পথেই। না, অন্য কোন পথে নয়। কারণ আর কোন বিকল্প পথ নাই। মানুষের ইতিহাস, সমাজের ইতিহাস, সভ্যতার ইতিহাস আমাদের বারবার সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা যদি সে কথা আজ বুঝতে না পারি, তবে কালের যাত্রাপথে আমাদের আজকের অক্ষরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত ধুসর হয়ে যেতে বিলম্ব হবে না আদৌ।

২৫শে পৌষ’ ১৪২৬

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত