চুমু খেতেও ভালো খেলেও ভালো লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চুমু খেতেও ভালো খেলেও ভালো লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

চুমু খেতেও ভালো খেলেও ভালো




চুমু খেতেও ভালো খেলেও ভালো

চুমু। না, বাংলায় প্রকাশ্যে মদ খাওয়া গেলেও চুমু খাওয়া মুশকিল। আপনি পান  বিঁড়ি সিগারেট খান। প্রকাশ্য রাস্তায় পানের পিক ফেলুন বুক ফুলিয়ে। কোন অসুবিধা নাই। নিজের নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বার করে অন্যের নিঃশ্বাসে সজোরে ধাক্কা দিন। কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু নিজের একান্ত আপন প্রিয় সাথীকে প্রকাশ্যে চুমু খেলেই সমাজ রে রে করে উঠবে। আপনি চায়ের কাপে চুমুক দিন। পান পাত্রে চুমুক দিন টলমল পায়ে। কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু প্রিয় মানুষটির আদরে চুমুক দিতে গেলেই সর্বনাশ। তাই জীবনসঙ্গী কিংবা প্রেমের সাথীকে চুমু খেতে গেলে আপনাকে আড়াল আবডাল খুঁজে নিতে হবে। চুমু নিয়ে বাঙালির কেন এত চুলকানি জানা যায় না। কাউকে প্রশ্ন করলে একটা মোটা দাগের উত্তর আসতেই পারে। নরনারীর একান্ত সম্পর্ককে প্রাকশ্যে মেলে ধরা শোভনীয় নয়। ওসব কালচার ইউরোপ আমেরিকায় চলে। আমাদের সমাজের একটা সংস্কৃতি রয়েছে। যেন ইউরোপ আমেরিকার সমাজে কোন সংস্কৃতি নাই।

কি আশ্চর্য্য! যে জিনিসটা খেলে তৃতীয় কোন ব্যক্তির কোনরকম অসুবিধার কারণ ঘটে না। ঘটার কথাও নয়। সেই জিনিসটি খেতে গেলেই সমাজের চোখরাঙানি দেখতে হবে। আর যে জিনিসগুলি খেলে দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ একাধিক মানুষের অসুবিধা ঘটতে পারে। সেই সময় সমাজের কোন আপত্তি দেখা যায় না। এটিই যদি আমাদের সংস্কৃতি হয়। তবে আর যাই হোক তাকে মহান বলে প্রচার করার মানে হয় না।

একটু ভেবে দেখুন তো। দুইজন মানুষ যখন নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে পরস্পর চুম্বনে মিলিত হয়। তখন সেই দুইজন মানু্ষের মতো শান্তি প্রিয় প্রেমে টইটুম্বর মানুষ আসে পাশে দেখা যায় কি? চুম্বনের মুহুর্তে নিশ্চয় নর নারী পারস্পরিক ঈর্ষা পরশ্রীকাতরতা, রাগ দ্বেষ, হিংসে ও হিংসা’র মতো খারাপ অনুভুতিগুলির থেকে অনেক দূরবর্তীই থাকে। অর্থাৎ মানুষের হৃদয়বৃত্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহুর্তকে বাংলায় মানুষ শ্রদ্ধা করতে সক্ষম নয় আজও। তাই প্রকাশ্যে চুম্বনরত নরনারীকে নিয়ে সমাজের এত মাথাব্যাথা। প্রকাশ্যে উর্দিধারী পুলিশকে ঘুষ খেতে দেখলে, বাঙালি অবাক হয় না। কোনরকম প্রতিবাদ করে না। প্রকাশ্য মঞ্চে রাজনৈতিক নেতারা ধর্মীয় বিষোদ্গার থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক মন্তব্য করলেও আমারা প্রকাশ্যে আপত্তি করার হিম্মত রাখি না। নেতাদের মুখে অন্য দলের নেতানেত্রী সম্বন্ধে গালাগালিও আমাদের কাছে আপত্তি করার মতোন বিষয় হয়ে ওঠে না। আমরা বড়ো জোর নেতাদের আড়ালে সমালোচনা করতে পারি। কিন্তু সামনা সামনি কোন নেতাকে এই কথা বলার হিম্মত রাখি না, মশাই ভদ্রভাবে কথা বলুন। বলতে পারি না, সত্য কথা বলুন। বলতে পারি না, আপনি দিনের আলোয় পরিস্কার মিথ্যা কথা বলছেন। রাজপথে নিরীহ মানুষের উপরে গুণ্ডা বদমায়েশদেরকে অন্যায় করতে দেখলেও আমরা কেমন চোখ বুঁজে থাকার কায়দা প্র্যাকটিশ করি। আমাদের কোন রকম অসুবিধা হয় না। প্রকাশ্যে গোলাগুলি, বোমাবাজি, তোলাবাজি, এবং রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজিও আমরা নিরবে মেনে নিই মাথা পেতে। মেরুদণ্ডটিকে ঘরের শিকেয় তুলে রেখে দিয়ে।

কিন্তু সেই আমাদেরই সর্বাঙ্গ জ্বলে যায়। ছেলে মেয়েদের প্রকাশ্যে চুমু খেতে দেখলে। আমাদের তখন টনক নড়তে থাকে, সমাজটা উচ্ছন্নে গেল ভেবে। বাকিরা এদের দেখে কি শিখবে ভেবে আমাদের সামাজিক মন মনন সাংস্কৃতিক বোধবুদ্ধি ও সমাজিক দায় দায়িত্ব সব মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। প্রায় ভিসুভিয়াসের মতোনই তীব্র বেগে। সেই আমাদেরই। যে আমারা বাকি সময়ে চোখের সামনে সব ধরণের অপকর্ম কুকীর্তি ও নৃশংসতম অপরাধ সংঘটিত হতে দেখলেও মুখে লিকোপ্লাস্টার লাগিয়ে রাখি। আর একটা অদৃশ্য পটিতে নিজেদের চোখ বেঁধে রেখে গান্ধারী সেজে ঘোরা ফেরা করি। এই সব সময়ে আমাদের বোবা কালা অন্ধ সাজার পারদর্শীতা যে কোন অস্কার জয়ী অভিনেতা অভিনেত্রীদের লজ্জায় ফেলে দেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। আমাদের এমন অসাধারণ পারদর্শীতার জন্য কোন অস্কার দেওয়ার রেওয়াজ রাখে নি হলিউড। রাখলে প্রতিবছর সেই পুরষ্কার শুধুমাত্র বাংলাতেই আসতো। কাঁটাতারের উভয় পারেই। এই বিষয়ে আমাদের মধ্যে কোন হিন্দু মুসলিম সংস্কৃতির বিভেদ বা পার্থক্য নাই।

অথচ একমাত্র চুমুই খাওয়া যায় নিখরচায়। না, খরচের বিষয়টি মুখ্য নয়। কিন্তু মানুষের পৃথিবীতে এই একটি জিনিস বাদে আর কোন কিছুই নিখরচায় খাওয়ার কোন উপায় নাই। ফেল কড়ি মাখো তেল। কাউকে না কাউকে পয়সা খসাতেই হবে। একমাত্র ঘুষ খেতে পয়সা খসাতে হয় না। কিন্তু যার কাছ থেকে ঘুষ খাওয়া হয়। তার পয়সা খসে বিস্তর। শুধু যে খসেই তা নয়। তার তো পুরোটাই লস। যার যেমন সাধ্য সেই লসটা উদ্ধার করে নেয় অন্যদের ঠকিয়ে। কিন্তু চুমু খেতে এতসব ঝামেলা নাই। শুধু হৃদয়বৃত্তির সৌকর্যে পরস্পরকে একান্ত করে ভালোবাসলেই খাওয়া যায়। সমাজ যেটি খেতে দেখলেই মাথা গরম করে ফেলে, সবকিছু রসাতলে গেল বলে। দুজন দুজনকে একান্ত আদরে চুমু খেলে সমাজ কি করে রসাতলে যাবে বোঝা দায়। ধরা যাক অন্যদের চুমু খেতে দেখে, আরও বেশ অনেকেই পরস্পর প্রকাশ্যে চুমু খেতে শুরু করে দিল। সমাজপতিদের টিকি থাকুক আর নাই থাকুক। তারা যে সান্ধ্যটিভির ক্যামেরার ফোকাসে বসে ঘনঘন মাথা নাড়তে থাকবেন, সেটা বোঝাই যায়। তা তারা নাড়তেই থাকুন বরং। কিই বা ক্ষতি তাতে। মাথা থাকলে নয়, একটা ভয় থাকতো ভিতরের ঘিলুটিলুগুলি যদি ঘুলিয়ে যায়!

তাদের কথা থাক। আমরা বরং কল্পনা করে দেখার চেষ্টা করি। সমাজের সর্বত্র নরনারী পারস্পরিক ভালোবাসাজাত আদরে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে পরস্পরকে চুমু খেয়ে আরও বেশি একান্ত আদরে কাছে টেনে নিচ্ছে। একবার ভাবুন তো। যত বেশি করে আরও বেশি সংখ্যায় নরনারী পারস্পরিক আদরে অন্তত কিছুটা সময় হলেও পরস্পর চুমু খেতে ব্যস্ত থাকবে, ততক্ষণ অন্তত সেই মানুষগুলি, হিংসা দ্বেষ পরশ্রীকাতরতা ঈর্ষা রাগ ক্ষোভ বিক্ষোভ ক্রোধ ক্রুদ্ধতা হিংস্রতা জিঘাংসা লোভ লালসা ইত্যাদি খারাপ অতি খারাপ অত্যন্ত খারাপ দোষগুলি থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে পারবে। এবং এদের দেখেও বাকিরা অনেক অনেক বেশি সংখ্যায় তাদের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ হতে পারবে। এবং এইভাবে পারস্পরিক আদরের একটা ঢেউ গোটা সমাজের ভিতরে জমে থাকা বিষাক্ত দূষিত বদ্ধ বাতাসকে, প্রবল একটা ঠেলা দিতেও পারে। বড়ো বড়ো মনীষীদের জীবনী ও বাণীও যে কাজটি করতে পারেনি আজ অব্দি। শুধু যদি পারস্পরিক আদরের চুম্বনরত দুর্লভ মুহুর্তই সেই কাজটি করতে পারে। ক্ষ‌তি কি? ক্ষতি কার?

হ্যাঁ রাজনীতি আর ধর্মব্যবসায়ীদের একটা মস্ত বড়ো ক্ষতি হতে পারে। তাদের দলে দিনে দিনে ভিড় কমতে থাকতেই পারে। মানুষে মানুষে বিভেদ বিদ্বেষ বিচ্ছেদ ছড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রমগুলির ধার অনেক ভোঁতা হয়ে যেতে পারে। দলীয় ও সাম্প্রদায়িক ঝাণ্ডা নিয়ে লাঠালাঠি মারামারি করার লোকবলে কম পড়তে পারে। এমনকি নির্বাচনী বুথে বুথে বুথ জ্যাম করে ছাপ্পা ভোট দেওয়ার ছেলে পাওয়াও দুস্কর হতে পারে। পথে ঘাটে শপিংমলে কর্মক্ষেত্রে শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বত্র চুম্বনে দীক্ষিত নরনারীকে হয়তো আর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিথ্যাচার আর ঢপবাজি দিয়ে আলাদা করে রাখা যাবে না। বরং চুম্বনে দীক্ষিত নরনারীর হাত ধরে সারা বাংলায় একটা নিরব বিপ্লবও হয়ে যেতে পারে। যে বিপ্লবের অভিমুখ প্রেমে প্রেমে একাত্ম হওয়ার গানে। আদরে আদরে মিলনের গানে। প্রীতি আর ভালোবাসায় ভালো মানুষ হয়ে ওঠার গানে।

ঠোঁটে ঠোটে ছুঁয়ে ছেনেই যদি সম্পূর্ণ নিখরচায় সমাজের এত বড়ো একটা উপকার হয়েই যায়। তবে তার বিরোধিতা করলে, মানুষ চেনাও সহজ হয়ে যেতে পারে। সেটিও একটি মস্ত বড় লাভ। তখন গনশত্রুদের একঘোরে করে, চাইকি তাদেরকেও চুমুর মন্ত্রে দিনে দিনে দীক্ষিত করে তোলার কোন কার্যক্রম নিতেই পারে সমাজ। এবং ঠিক মতো চুমুর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে উঠলেই তাদেরকে আবার সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়েও আনা যাবে। তাতে সমাজের ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকবে না। ভেবে দেখতে পারেন। সামান্য চুমু। কিন্তু কি অপরিমেও শক্তির আধার! তবে একটা বিষয়েই খেয়াল রাখতে হবে শুধু। আড়ালে আবডালে নয়। প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার সংস্কৃতিকে সমাজে আমদানী করতে না পারলে, শুধু ফুলশয্যার খাটে উঠে চুমু খেলেই সমাজবিপ্লব সম্ভব হবে না। নামতে হবে রাজপথে। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে। পরম মায়া ভরে, তবে আলতো করে নয়, খেতে হবে একান্ত নিবিড় ভাবে ভালোবাসার চুমু। সেই চুমুই চমকিয়ে দিতে পারে বাকি বিশ্বকে। বাংলার সমাজবিপ্লবের হাত ধরে।

১৯শে আগস্ট’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত