এক্টিভিটি লগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এক্টিভিটি লগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

এক্টিভিটি লগ

 


এক্টিভিটি লগ

 

বাঙালির জীবনে ফেসবুক এখন প্রতিদিনের দিনপঞ্জী হয়ে উঠেছে। অন্তত যাঁদেরই হাতে একটি স্মর্টফোন রয়েছে। ডেক্সটপ ও ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের মালিকদের তো কথাই নাই। বিশেষ করে বিগত দশ বছরে বাঙালির ফেসবুক চর্চা এমন জয়াগায় পৌঁছিয়ে গিয়েছে। যেখান থেকে বঙ্গসংস্কৃতির বিচার ও বিশ্লেষণে আজকে ফেসবুকের জন্যেই একটা বড়ো অধ্যায় রাখতে হবে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। পরবর্তী সময়ে একুশ শতকের বাঙালির সমাজজীবন নিয়ে গবেষণায় ফেসবুক অন্যতম একটি বিষয় হয়ে উঠতে বাধ্য। এখন ফেসবুক আসায় আমাদের জীবনে কি কি বদল হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেমনই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলার সমাজজীবনের মূল দিকগুলি কতটা ও কিভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। এটা ঠিক, এই বিষয়গুলি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের গবেষণা করার বিষয় নয়। আমরা সেই পথে এগোতেও চাইছি না। সেই পথে এগোবেন তাঁরাই যাঁরা এই সকল বিষয়ের বিশেষজ্ঞ মানুষ। কিন্তু তাহলেও সাধারণ ভাবেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টিপাতে বিষয়গুলি কতটা ও কিভাবে রেখাপাত করে। সেই বিষয়ে সাধারণ ভাবেই আলোচনার পরিসর সজীব রাখা যেতেই পারে। অবশ্যই সেটি নানা মুনির নানা পথ হবে। নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত বা উপসংহারে আসার কথা নয়। কথা হলো, কে কি ভাবছেন। তাই নিয়ে।


অনেকেরই ধারণা ফেসবুক এসে আমাদেরকে অনেক বেশি সামাজিক করে তুলেছে। সারাদিনই সমাজের বহু মানুষের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়ে চলেছে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতের আদান প্রদান থেকে পছন্দ অপছন্দের বিষয়গুলি আমরা বহুজনের সাথে সমান করে ভাগ করে নিচ্ছি। ফেসবুক উদ্ভাবনের আগে যে ঘটনা অলীক কল্পনাতেও ছিল না আমাদের। এই যে একটি সামজিক সংযোগের বিস্তৃত ভুখণ্ড। যে ভুখণ্ডটি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে ফেসবুক। সেটি তো আমাদের হাতে ছিল না দুই যুগ আগেও। ফলে আপাতদৃষ্টিতে আমাদের সমাজজীবনে এ যেন এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি। পারিবারিক এবং আঞ্চলিক বৃত্তের বাইরে এক বিস্তৃত সামাজিক পরিসরে আমরা পা রাখতে পেরেছি। এই ফেসবুকের কল্যাণেই। কবি যেমন বহু যুগ পূর্বেই বলে গিয়েছিলেন, “দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু, পরকে করিলে ভাই”। ফলে আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে ফেসবুক সত্যি করেই আন্দোলিত করে তুলেছে। আমাদের দেখা শোনা চেনা জানার পরিধিটা হঠাৎ করেই এক লহমায় অনেকটা বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। দুই যুগ পূর্বের আমরা আর আজকের আমরা কতটা একই রকম রয়েছি। সেটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। দুই যুগ পিছনে তাকিয়ে দেখলে মনে হয় নাকি, আমরা যেন অনেকটাই পরস্পর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত ছিলাম। ব্যক্তিগত জীবনের চলাচলের বৃত্তের বাইরে সবটাই আমাদের কাছে যেন প্রায় বিদেশের মতো ব্যাপার ছিল। কিন্তু আজ সারা বিশ্বই যেন নিউজ ফীডের আওতায়। মেসেঞ্জারের ঘরে এসে পৌঁছিয়েছে। আরও একটি বিষয় ঘটে গিয়েছে। আমরা এখন প্রত্যেকেই এক একজন ব্রডকাস্টার হয়ে উঠেছি। নিজের বক্তব্য থেকে শুরু করে পছন্দ অপছন্দের সকল বিষয় এবং আমাদের সৃষ্টি ও নির্মাণ নিয়ে আমরা বহুজনের কাছে পৌঁছিয়ে যেতে পারছি। রেডিও টিভির যুগে আমরা শুধুই রিসিভারই ছিলাম। কিন্তু ফেসবুকের যুগে এসে সেই সাথে আমরা ব্রডকাস্টারও বনে গিয়েছি। এইটি কিন্তু খুব একটা বড়ো ব্যাপার। আমাদের সামাজিক জীবন থেকে ব্যক্তিজীবনে এর একটা প্রভাব পড়ছে বইকি। কতটা ও কেমন ধারার প্রভাব পড়ছে, আগেই বলেছি, সেসব বিশেষজ্ঞদের গবেষণার বিষয়। আমরা শুধু বিষয়টা অনুভব করতে পারি মাত্র।


ফেসবুক কি শুধুই সংযোগের সেতু গড়েছে? বিচ্ছিন্নতার আরও একটি অন্যতর নতুন ভুবনও কি গড়ে উঠছে না এই ফেসবুককে কেন্দ্র করেই? আগে একটি টিভিকে ঘিরে পরিবারের সকলেই কিছুটা সময় একত্র হতো। রেডিও প্রচলনের প্রথম যুগেও ঠিক যেমনটি ছিল। কিন্তু ফেসবুক বা আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে ইনটারনেট এসে একই পরিবারের প্রত্যককেই কি পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে না? পূর্বে বাসে ট্রেনে মানুষ অপরিচিত সহযাত্রী সাথেও কিছুটা হলে সময় কাটাতো। মনের কথা আদান প্রদান করতো। ট্রেন তো গল্প আড্ডার একটা বড়ো পরিসরই ছিল। কিন্তু আজকাল সেই পরিসর কতটা বজায় রয়েছে? অধিকাংশ যাত্রীর হাতেই স্মার্টফোনে ফেসবুক চলছে। পাশের যাত্রীর সাথে তৈরী হচ্ছে না কোন সহযাত্রিক সময়। যেমন বাড়ির ভিতরে। তেমনই বাড়ির বাইরেও আমরা প্রত্যেকেই ব্যস্ত। প্রত্যেকের থেকে আলাদা থাকতে। এই যে সবকিছুই ভার্চ্যুয়াল হয়ে উঠছে। পাশের স্বশরীরী মানুষটাকে অগ্রাহ্য করে। এর একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আমাদের প্রত্যেকের ভিতর ক্রিয়শীল থাকছে কিন্তু। মানুষের সাথে মানুষের সংবেদনশীল সম্পর্কের বিষয়টা যেন ঢাকা পড়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। চোখে চোখে যে কথা নয় সমানা সামনি, ভিডিও কলিং করেও কি সেই একই ভাইব্রেশন টের পাওয়া সম্ভব? মনে হয় না। ফলে সোজা কথায় ঘরের ও কাছের মানুষকে অস্বীকার করে আমরা দূরের হাতছানিতে অনেক বেশি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে পাশের মানুষটির প্রতি অনেক বেশি অসংবেদনশীল হয়ে উঠছি কিন্তু।


আরও একটি বিষয় ঘটে চলেছে নিঃশব্দে। ফেসবুকে আমারা হয় কারুর মতের সাথে সহমত হই। না হয় দ্বিমত হই। অধিকাংশ সময়েই অন্যের মতের সাথে আমাদের মতের সরাসরি কোন আদান প্রদান ঘটেই না। যে কোন একটি বিষয়ে, আমাদের পূর্বনির্ধারিত ধারণায় আমরা কাউকে সমর্থন করি। কিংবা কারুর কথা নস্যাৎ করে থাকি। হয় হ্যাঁ, নয় না। এর বাইরে মতের আদান প্রদানের যে সংলাপের রাজপথ। যেটি সামনা সামনি দেখা হলে হতে পারে, হতে পারতো। সেটি কিন্তু সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে হচ্ছে না। এমনও হয়, বহু সময়েই আমাদের মতের সাথে না মিললেই আমরা কাউকে আনফ্রেণ্ড করা থেকে শুরু করে একেবারেই ব্লক করে দিই। শুধু আমাদের মতের সাথে সহমত না হওয়ার কারণে। একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হওয়া সত্তেও আমরা নিজেদের অজান্তেই দিনে দিনে কেমন স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠছি নিজেরাই। না, টের পাইনা কিন্তু আমরা কেউই। কালকের বন্ধুকেই আজ তার মুখের উপরে দরজার বন্ধ করে দিয়েও আমাদের ভিতরে কোন খারাপ লাগার অনুভুতি আজ আর কাজ করতে চায় না। সহজ শিষ্টাচার এবং সামাজিক যে ভদ্রতাবোধ আমাদেরকে সামাজিক ভাবে অনেকের সাথে বেঁধে রাখে, আমাদের বসবাসের ভুখণ্ড থেকে কর্মক্ষেত্রের ভুবনে। ফেসবুকে সেই শিষ্টাচার ও ভদ্রতাবোধ টিকিয়ে রাখার কোন দায় থাকে না আমাদের। এইটি কিন্তু খুব মুশকিলের কথা। আবার এও নয় যে ফেসবুকে এক ক্লিকেই আনফ্রেণ্ড কিংবা ব্লক করার অপশান না থাকলেই আমারা হকে নকে এমন অভদ্র আচরণ থেকে বিরত থাকতাম। বা এই অপশানগুলিই আমাদেরকে শিক্ষাদীক্ষার অনেকটা নীচের স্তরেই নামিয়ে এনেছে। না, তেমনটাও কিন্তু নয়। এই অভদ্রতার বীজ আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই সুপ্ত থাকে। ফেসবুকে এসে সে পেখম মেলে নিজেকে প্রকাশ করার পরিসর পায় শুধু।


কথায় বলে মতান্তর হোক মনান্তর হয় না যেন। কিন্তু প্রতিদিনের ফেসবুক জীবনে আমরা দিনে দিনে অনেক বেশি করে পরমত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। সেটি কতটা সত্য। তা আমদের রেজকার এক্টিভিটি লগ ক্লিক করলেই বোঝা যাবে। ফলে প্রথমেই যে মাধ্যমটিকে মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ গড়ে তোলার একটি বিস্তৃত মাধ্যম বলে মনে হয়েছিল। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে সেই মাধ্যমেই আমরা কিভাবে নিজকে আরও যেন বেশি করে বহু মানুষের থেকেই বিচ্ছিন্ন এবং একাকী করে তুলছি। তুলছি আমাদের স্বভাব দোষেই। আজকে আমরা ফেসবুককে প্রধানত ব্রডকাস্টিং -এর মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করছি। আমার বলার কথাটি, আমার গাওয়া গানটি, আমার নাচার ভিডিওটি আমার লেখা কবিতাটি আমার পাওয়া পুরস্কারটির ছবি ব্রডকাস্ট করে দিয়েই আমি প্রায় ঝাঁপ বন্ধ করে দিচ্ছি। আমি শুধু লাইক আর বাহবা গুনতে ফিরে আসছি পরে। আমি কারুর ফীডব্যাকের তোয়াক্কা করছি না। আমি দেখতে চাইছি, আমার সমর্থনে কয়জন? আমায় পছন্দ কয়জনের। বাকিদের আমার আর প্রয়োজন নাই। প্রয়োজন নাই, তাঁরা আমায় ঠিক কি বলতে চাইছেন। প্রয়োজন নাই তাঁদের মতামতের। আমি শুধু সংখ্যা গুনতে ব্যস্ত। দিনের শেষে আমার একাউন্টে কতজন আমার পাশে রয়েছেন। ভোটে দাঁড়ানো রাজনৈতিক প্রার্থীর মতোই আমি মাথা গুনতে ব্যস্ত। মাথার মানুষটিকে আমার দরকার কি? এও এক বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি। ফেসবুকে আমাদের নিজেদের ওয়ালে, আমরা নিজেদের অজান্তেই প্রতিদিন এই বিচ্ছিন্নতার চর্চা করে চলেছি। মানুষের সাথে মানুষের হৃদয়ের যে সংযোগ। চিন্তা চেতনার যে চলাচল। সেই সংযোগ ফেসবুকে এসেও আমরা কিন্তু তৈরী করতে পারছি না। এটা ফেসবুকের অক্ষমতা নয়। আমাদের অন্তর প্রবৃত্তিজাত অক্ষমতা। আমরা ঠিক ওয়াকিবহাল নই এই বিষয়ে। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের এক্টিভিটি লগ সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। আমরা শুধুমাত্র ব্রডকাস্টিং করেই চলছি। রিসিভার সত্তাটির গলা টিপে ধরে রেখে।


২৫শে জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত