ভোট দিয়ে যায় চেনা
গণতান্ত্রিক নির্বাচন
প্রক্রিয়ায় একটি দলকে ভোট দিয়ে পুনরায় নির্বাচিত করে মসনদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা যে
কোন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ঠিক যেমন নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন সরকারকে ফেলে
দেওয়াও যে কোন নাগরিকের মৌলিক অধিকারে মধ্যেই পড়ে। সে বিষয়ে কারুরই আপত্তি করার
কিছুই থাকতে পারে না। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তাই আপনার ভোটে বিজেপির বিপুল
সংখ্যাগড়িষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা নিয়েও কারুর আপত্তির প্রশ্ন ওঠে না।
বরং দল হিসাবে বিজেপির এই সাফল্যে কোন অভিনন্দনই যথেষ্ঠ নয়। এবং সেই সাফল্যের
অন্যতম অংশীদার হিসাবে একজন সাধারণ নাগরিক হয়েও আপনার ভুমিকাও যথেষ্ঠই ইতিব্যঞ্জক।
আপনি সরাসরি রাজনীতি করেন না। আপনি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্যও নন। নির্দিষ্ট
রাজনৈতিক দলের উপর আপনার বংশগত আনুগত্যও নাই। আপনি স্থান কাল পাত্র বিবেচনা করেই
ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। রাজনৈতিক দলগুলির কার্যক্রম বিচার বিশ্লেষণ করেই আপনার
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের সরকার গড়া উচিৎ। কখনো
আপনার সিদ্ধান্তের ভোটটি সরকার গড়ে তোলে। কখনো পারে না। এবার পেরেছে। পাঁচ বছরের
রাজত্বের শেষে আবার বিজেপিকে সরকারেই অধিষ্ঠিত রাখার আপনার একান্ত ব্যক্তিগত
সিদ্ধান্তটি সফল হয়েছে। তাই বিজেপির এই বিপুল জয়ে আপানার ভুমিকাও অনস্বীকার্য্য।
এখানেই সংসদীয় গণতন্ত্রে একজন নাগরিক প্রধানতম গুরুত্ব। অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে আপনি
সেই গুরু দায়িত্ব পালন করে নির্বাচিত করে দিয়েছেন সপ্তদশ লোকসভার নির্বাচিত সরকার।
আপনার
এই নির্বাচন নিয়ে, না কোন প্রশ্ন নাই। নাই কোন বিতর্কের অবকাশ। কিন্তু আপনার এই
নির্বাচন বেশ কিছু বিষয়ের উপর দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট আলোকপাত করে গেল। আসুন
একবার দেখে নেওয়া যাক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ কয়কেটি বিষয়।
১)
২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে, কালোটাকা দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে, প্রতিটি ভারতীয়ের
ব্যাংক একাউন্টে ১৫ লক্ষ করে টাকা ভরে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অনেকেরই মতো
আপনিও নিশ্চয় বিশ্বাস করে ছিলেন না। কারণ করলে বিশ্বাসভঙ্গের জ্বালা আপনার এবারের
ভোটে নিশ্চয় নির্ণায়ক ভুমিকা নিত। আপনি জানেন, ভারতবর্ষের ভোটের ময়দানে মিথ্যা
প্রতিশ্রুতি দেওয়ার রীতি বহুকালের। ওসব নিয়ে মাথা ঘামালে আর ভোটের লাইনে লোক পাওয়া
যাবে না। তাই এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আপনার এবারের ভোটে কোন প্রভাব ফেলেনি।
গণতান্ত্রিক নির্বাচনে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির এই রেওয়াজ আপনার বিবেচনায় তাই আর
অন্যায় কিছু নয়। সব দলই এই পথে হেঁটে থাকে। আপনি জানেন।
২)
বিগত পাঁচ বছরে, বছরে দুই কোটি কর্মসংস্থানের যে লক্ষমাত্রা ধার্য্য করে ২০১৪-এর
নির্বাচনে ক্ষমতা দখল করেছিল বিজেপি সরকার, তার ধারেকাছেও কর্মসংস্থানের কোন
ব্যবস্থাই এই সরকার বিগত পাঁচ বছরে নেয় নি। জানেন আপনি। আপনি এও জানেন এমনটাই তো
হওয়ার কথা। দ্রুতগতিতে সরকারী সংস্থাগুলির বিলগ্নীকরণ চলতে থাকবে, অথচ বছরে দুকোটি
করে বেকার যুবকযুবতীর কর্মসংস্থানও হবে, এতো সোনার পাথরবাটি। তাই কি হয় নাকি? তাই
ভারতবর্ষ জুড়ে ক্রমবর্ধমান বেকারীত্বের বাস্তবতাকে আর পাঁজনের মতো আপনিও হয়তো
নিয়তির বিধান বলেই মেনে নিয়েছেন। তাই এই বিষয়ে সরকারের আর কিই বা করার থাকতে পারে?
৩)
নোট বাতিলের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে দেশের সব কালোটাকা উদ্ধারের গল্পটিকে আপনিও
অন্য অনেকের মতোই নিশ্চয় বিশ্বাস করেননি! তাই রিজার্ভব্যাংকের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে
দিনের আলোর মতো যখন কালোটাকা উদ্ধারের ফানুসটি ফেটে গিয়েছিল, আপনিও তখন হতবাক হননি
আদৌ। কষ্টও পেতে হয় নি বিশ্বাসভঙ্গজনিত কোন যন্ত্রণায়। নয়তো সেই সরকারকেই বা আবার
ফিরিয়ে আনবেন কেন নির্বাচিত করে।
৪)
জিএসটি নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির হট্টগোলেও আপনি স্থির নিশ্চিত ভাবে আপনার
নাগরিক কর্তব্য করে চলেছেন প্রতিদিনের প্রতিটি খরচের উপর রাষ্ট্রীয় কর প্রদান করে।
আপনি জানেন এটাই প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক দায়িত্ব। তাই জিএসটি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা
যতই থাক, আপনি খুশি এবং ভাগ্যবান জিএসটি চালু হওয়াতে।
৫)
বিগত পাঁচ বছরে ঋণের দায় মাথায় নিয়ে যে কয়েক হাজার কৃষক আত্মহননের পথ বেছে নিল,
আপনি জানেন তা নেহাতই কৃষকদের ব্যক্তিগত বিষয়। একদিকে ঋণ নেবে আবার শোধ করতে না
পারলে ঋণ মকুবের বায়না করবে এতো মামারবাড়ির আব্দার! এইভাবে ঋণ মকুব করলে সরকার
চলবে কি করে? তাই এই হাজার হাজার কৃষকের মৃত আত্মাও আপনার নির্বাচনী ভোটাধিকারে
সময় ছায়াপাত করেনি কোনভাবে।
৬)
বিগত সরকারের জামানায় যে ৬১ জন শিল্পপতি ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে
বেপাত্তা হয়ে গিয়ে গোটা ব্যাংকিং সিস্টেমের ভিত নড়িয়ে দিয়েছে, সেই ঋণখেলাপী অসৎ
শিল্পপতিদের সাথে ক্ষমতাসীন দলের সখ্যতা নিয়েও আপনার মনে কোন বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে
নি। কারণ আপনি জানেন, এমনটাই হওয়ার কথা। পার্টিফান্ডে টাকা দিয়ে নির্বাচনের বৈতরণী
পার করিয়ে দেবে, আর তার ফয়দা লুঠবে না সে আবার হয় নাকি? তাই নীরব মোদীদের নিরবে
দেশের আইনের সীমানার বাইরে পার করিয়ে দেওয়াও আপনার কাছে গর্হিত বলে মনে হয় নি।
৭)
আপনি এও জানেন, এই ঋণখেলাপী বেপাত্তা শিল্পপতিদের অনাদায়ী ঋণের লক্ষ কোটি টাকার
বোঝা সাধারণ মানুষের উপর কর চাপিয়েই সামাল দেওয়া হবে। আপনি এও জানেন, অচিরেই আইন
পাশ করে প্রতিটি ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণের বোঝা প্রতিটি আমানতকারীর ব্যাংক ব্যালেন্স
থেকেই উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ হবুচন্দ্রের ঋণ শোধ করার ভার পড়বে সরাসরি
আমজনতার উপর। ব্যংক ব্যালেন্স আপডেট করাতে গিয়ে জানতে পারবেন ব্যলেন্স কমে গিয়েছে
ব্যাংকের ক্ষতি পুরণ করতে গিয়ে। যে ক্ষতির কারণ আপনি নন। সরকারী দলের মদতপুষ্ট ধনকুবের
কোন এক বা একাধিক শিল্পপতি। সেদিনও নিশ্চয় আপনি খুশিই থাকবেন আজকের বিজয়োল্লাসের
হর্ষধ্বনির মতো।
৮)
আপনি জানেন এই বাংলায় এন আর সি করার বিষয়ে আজকের বিজয়ী দলের দৃঢ় পরিকল্পনার কথা।
স্বভাবতঃই আপনিও খুশি। এইবার বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালগুলোকে খেদানো যাবে। আসামের
মতোই ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে। তারপর ভিটে মাটিগুলো দখল নেওয়া শুধু
সময়ের অপেক্ষা। আপনি শুধু এইটুকুই জানেন না যে, এন আর সি’র লাইনে আপনাকেও কিন্তু
দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে। কারণ আপনার মাতৃভাষায় আপনিও বাঙালি। আপনাকেই প্রমাণ করে
দেখাতে হবে যে ১৯৫১ সালের জমি বাড়ির দলিলে আপনার পুর্বপুরুষের আইনি সত্ব বিদ্যমান
ছিল, এবং প্রমাণ করতে হবে আপনার উত্তরাধিকারও। নাহলে আপনারও ঠিকানা সেই বাঙালদের
সাথেই একই ডিটেনশন ক্যাম্পে। তাই এই খুশির জোয়ারেই প্রাগৈতিহাসিক সেই সব দলিল
দস্তাবেজ খুঁজে পেতে গুছিয়ে রাখতে শুরু করাই ভালো। কারণ সময় চলে যায় চোখের নিমেষে।
৯)
কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। সেই পার্বণের ধরণেও বদল চলে আসায়
স্বভাবতই আপনিও খুব খুশি। নয়তো কোথায় ছিল রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী, দশেরা।
অস্ত্রমিছিল। গনেশ পুজো। দেখুন কেমন তরতর করে বাঙালির উৎসব পার্বণের গতিপথ পরিবর্তন
হয়ে চলেছে। আপনার খুশির কারণ অবশ্যই স্বাভাবিক। এতদিন বাঙালির পার্বণ আর হিন্দুর
পার্বণে ঠিক যেন খাপে খাপে মিলতো না কিছুতেই। কিন্তু এখন দিন বদলাচ্ছে, এখন
হিন্দুর পার্বণ আর বাঙালির পার্বণ একাকার হয়ে ওঠার দিকে চলেছে। তাতে যদি কোনদিন
দুর্গাপুজো কালীপুজো উঠে যায় তো ক্ষতি কি? বরং এই যে দলীয় রাজনীতিই পুজোপার্বণের
অভিমুখ ঠিক করে দিচ্ছে এমন অভিনব ঘটনা আগে দেখেছে কেউ? এইভাবেই হিন্দুত্বের জাগরণ
ঘটানো যাবে।
১০)
অবশ্যই আপনিও চান ১৯৪৭ এর দেশভাগের নীতিকেই মান্যতা দিয়ে পাকিস্তানের মতো একটি
হিন্দুস্তান গড়ে তুলতে, যেখানে হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের স্লোগান সার্থক হয়ে
উঠবে। মুসলিম তোয়াজের রাজনীতির ফলাফল আপনি দেখছেন। তাই হিন্দুস্তান হিন্দুদের এই
মতবাদে আপনিও বিশ্বাসী। মেকি সেকুলারিজমের দিন শেষ। তাই হিন্দুস্তান গড়ে তুলতেই
আপনার ভোট এবারের লোকসভা নির্বাচনে এমন ফলপ্রসু হয়ে উঠল।
১১)
আর দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, ক্রমাগত টাকার অবমূল্যায়ন, রান্নার গ্যাস ও জ্বালানী তেলের
উর্দ্ধমুখী দাম, কর্মসংস্থানের অভাব, সরকারী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে পরিসেবায়
অর্থ বরাদ্দ হ্রাস করার ধারাবহিক প্রক্রিয়া, ইত্যাদি জন অহিতকর বিষয়গুলি কোন
সরকারে আমলে ছিল না বলুন? এর ভিতর নতুনত্ব কি আছে। যে সরকারই আসুক না কেন, এই
বিষয়গুলি যে তিমিরে, সেই তিমিরেই থাকবে। এতো জানা কথাই। ওসব নিয়ে ভেবে আর কে ভোট
দেয় আজ?
১২)
আজকে বরং দেখতে হবে পাকিস্তান চীন প্রভৃতি বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশ ও জাতিকে
বাঁচানোর জন্য একজন শক্তসমর্থ পুরুষসিংহ কে আছে। মুসলিম সন্ত্রাসের হাত থেকে রক্ষা
করার জন্য, গরুর মতো জাতীয় মাতাকে রক্ষা করার মতো গোরক্ষক বাহিনী কাদের আছে।
১৩)
তাই পুলওয়ামায় কোন জাদুতে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সুরক্ষার বলয় ভেদ করে একটি নাবালক
তরুণ সন্ত্রাসী ঢুকে পড়লো সে চিন্তা আপনি করবেন না। ভারতমাতাকি জয় বলে পাকিস্তান
মুর্দাবাদ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে আপনার ভিতেরও দেশপ্রেম জেগে উঠবে প্রবলভাবে।
আপনিও বাকিদের মতো চাইবেন প্রতিবেশী দেশকে পৃথিবী থেকে নিঃশ্চিহ্ন করে দিতে। না
হলো ওরা এইভাবেই আমাদের জওয়ানদের প্রাণ কেড়ে নিতে থাকবে।
১৪)
আর তাই বালাকোটে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়চেতা সামরিক জবাবে পাকিস্তানের থোঁতা
মুখ ভোঁতা হওয়ার মিডিয়া প্রচারে আপনারও দিল খুশ। ঠিক এইরকম পুরুষসিংহেরই তো দরকার
আজ ভারতবর্ষের। নয়তো পাকিস্তান আর চীনকে উচিৎ শিক্ষা কে দেবে? এবং ভারতবর্ষের
সুরক্ষার কারণেই আপনার এবারের ভোটটি এমন ফলপ্রসু হয়ে উঠতে পারলো।
১৫)
তাই তো দেশবাসীর শান্তি কামনায় হিমালয়ের প্রত্যন্ত গুহায় ধ্যানস্ত গৈরিক বসনের
প্রধানমন্ত্রীর ফোটসেশন আপনাকে এতটাই বিমুগ্ধ করে দিয়েছে। আপনিও খুঁজে নিতে পেরেছেন
ভারতমাতার পরিত্রাতাকে।
২৫শে
মে’ ২০১৯
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
