পশ্চিমবঙ্গে একুশের চেতনা
অচল ও অপ্রাসঙ্গিক
বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা। চীনা
ভাষা শুধুমাত্র চীন দেশের পরিসরে সীমাবদ্ধ হলেও সংখ্যাগণনার হিসাবে সবচেয়ে বেশী
মানুষ এই ভাষাতেই কথা বলেন। সারা পৃথিবীতে বহুল ব্যবহৃত ইংরাজী রয়েছে দ্বিতীয়
স্থানে। এরপরই হিন্দীভাষীর সংখ্যা। চতুর্থ
স্থানে স্প্যানিশ,
সারা বিশ্বে প্রায় ২৩টি দেশের মাতৃভাষা হিসেবে। এরপরই আ মরি
বাংলাভাষা। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা
সহ বরাক উপত্যাকার শিলচর কাছার জেলার বিস্তৃত অঞ্চলে যে ভাষা মাতৃভাষা হিসেবেই
পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হল বিশ্বের এই পঞ্চম বৃহত্তম ভাষাটি কেমন আছে?
আমরা জানি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে
বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা বাংলা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী, বাংলায় ৯ই
ফাল্গুন যেখানে মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে প্রাণ দিয়ে ভাষা শহীদ হয়েছিলেন পাঁচ
বাঙালি। বিশ্বে নিজ মাতৃভাষার জন্য শহীদ হওয়ার ঘটনা সম্ভবত সেই প্রথম। ভাষার জন্য
এরপর ১৯৬১ সালে শিলচরে প্রাণ দেন ১১ জন তরতাজা বাঙালি। বাহান্নর সেই ভাষা
আন্দোলনের সুদূর প্রসারী ফলে একাত্তরে পাকিস্তানের অধীনতা থেকে মুক্তি পায় স্বাধীন
বাংলাদেশ। তাই সেখানে আজ আ মরি বাংলা ভাষা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জাতীয়
ভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত, এবং আবিশ্ব স্বীকৃত।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমানা ঘেরা কাঁটাতারের এপারে
বাংলাভাষার স্বীকৃতি রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে তো নয়, বাংলা এখানে একটি প্রাদেশিক ভাষা
মাত্র। ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের মতোই বাংলার স্বীকৃতি তাই আঞ্চলিক ভাষারূপেই।
সেটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনাও। সত্যিই তো বিশাল ভারতবর্ষের এক প্রান্তে পড়ে থাকা খণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ত্রিপুরার
ভাষার, আঞ্চলিক ভাষারূপেই তো স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। হয়েওছে
তাই। ঠিক যেমন তামিল তেলেগু মালায়লাম কর্ণাটকি ভাষা কিংবা অসমীয়া উড়িয়া গুজরাটী
পাঞ্জাবি মারাঠী ভাষা। রাষ্ট্রভাষা আর আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে হয়তো কোন বিরোধ নাই,
কিন্তু দেখতে হবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাদেশে বাংলাভাষার যে
গুরূত্ব, এই বঙ্গে
আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে বাংলার গুরুত্ব তার তুলনায় কতটুকু। কিংবা ভারতের অন্যান্য
আঞ্চলিক ভাষার বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলার প্রকৃত অবস্থা ঠিক কিরূপ।
এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমানে
পশ্চিমবঙ্গে অবাঙালিদের সংখ্যাধিক্যের কথাটিও। বিগত দশকগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে
প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের পার্শ্ববর্তী বিহার ও নবগঠিত ঝাড়খণ্ডের অধিবাসীরা সহ
উত্তরপ্রদেশ গুজরাট রাজস্থান পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্যের মানুষজন ব্যাপক ভাবে এই
বঙ্গে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেছেন। সে তো তারা করতেই পারেন। আর এই প্রবণতা তো
ঠিক একেবারেই নতুন কোন ঘটনা নয়, বৃটিশ আমল থেকেই শুরু হয়েছিল
এই প্রবণতা। আর ভারতবর্ষের নাগরিক মাত্রেই সারা দেশের যে কোনো প্রান্তেই পাকাপাকি
ভাবে যে কেউ বসবাস করতেই পারেন। সকল ভারতবসীরই সেটি সাংবিধানিক অধিকারও বটে। প্রশ্ন সেখানে নয়। দেখতে হবে এই প্রবণতা প্রতিটি রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির উপর কি প্রভাব ফেলছে ও কি
ভাবে, এবং তাতে সেই সেই আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির
উন্নতি না অবনতি- কোনটা ঘটছে।
আমরা জানি স্বাধীনতার পর বিশেষত দক্ষিণ ভারতীয়
ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের স্ব স্ব রাজ্যে অতি সম্মানের স্থান অর্জন করতে পেরেছে।
যাঁদেরই দক্ষিণ ভারতে কিছুদিনের জন্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা ঘটেছে, তারাই জানেন
সেখানে প্রতিটি রাজ্যে, সেই সেই রাজ্যের ভূমিপুত্ররা তাঁদের
নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কতটা গর্ব অনুভব করেন। এবং তাঁদের আপন ভাষা ও সংস্কৃতিকে কি ভাবে বুক
দিয়ে আগলিয়ে রাখেন ও সারা দেশে নিজ ভাষা সংস্কৃতির প্রসারে তাঁরা কতটা আবেগ প্রবণ।
শুধু তাই নয়, প্রতিটি রাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার
পরিসরেও সেই সেই আঞ্চলিক ভাষাগুলির গুরুত্ব কী অপরিসীম।
পরাধীন মানসিকতার নাগপাশ কাটিয়ে উঠে তারা নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রচলন ও প্রসারে কতটা
আপোষহীন ভাবে যত্নবান, সেটা কিছুদিন তাদের মাঝে বসবাস করলেই
বোঝা সম্ভব কিন্তু। এমনটাই তো হওয়ার কথা। আবিশ্ব ইংরাজীর দাপট ও উত্তর ভারতের
হিন্দিবলয়ের দাপটকে প্রতিহত করে কি ভাবে বিদেশী ভাষাকে সঙ্গে নিয়েও নিজের মাতৃভাষা
ও সংস্কৃতিকে সদর্থক ভাবে লালন করে সমগ্র অঞ্চলের স্বজাতির উন্নতি ঘটানো যায়,
সেই বিষয়ে তাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে আমাদের।
শেখার আছে হিন্দী বলয়ের রাজ্যগুলির থেকেও। তারাও
স্বধীনতা উত্তর বিগত দশকগুলিতে নিজেদের মাতৃভাষাকে জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে বহুল
পরিমাণেই প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যার সুফল পড়েছে তাদের সংস্কৃতির
ক্ষেত্রেও। কিন্তু আমাদের এই বঙ্গের চিত্রটি ঠিক কিরকম? আসুন বরং একবার
ভালো করে দেখে নেওয়া যাক সেটা।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ শব্দটি
স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বিশেষ একটি জায়গা করে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক
সীমানা দিয়ে নিরন্তর অনুপ্রবশ ঘটে চলেছে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে। রাজ্য
রাজনীতিতে সেই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে অসরোষও নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসের
সন্ধিক্ষণে দুটুকরো হওয়া বাংলার এক পাড় থেকে আন্তর্জাতিক সীমানা পেড়োলেই
অনুপ্রবেশ। অনুপ্রবেশ বিদেশী নাগরিক হিসেবে সেই একই বাঙালির, যার ভাষা ও
সংস্কৃতি আমাদেরই ভাষা ও সংস্কৃতি। রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যা ভয়ানক অপরাধ।
কিন্তু এরই পাশাপাশি স্বাধীন ভারতবর্ষের নানা রাজ্যের নানান ভাষাভাষী নাগরিক,
যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের থেকে একেবারেই পৃথক ও ভিন্ন; তারা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিন জায়গা জমি কিনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করলেও
সেটা কোনোভাবেই অনুপ্রবেশ নয়। তারা আমাদের স্বজাতি না হলেও, কারণ
তারও আমাদের মতো একই ভারতবর্ষের নাগরিক।
আর সেই অবাঙালি ভারতীয় নাগরিকরা সাংবিধানিক ভাবেই
নিরন্তর এই বাংলায় স্থায়ী ভাবে প্রবেশ করছেন প্রতিদিন- ঝাঁকে ঝাঁকে। প্রশ্ন
সেখানেও নয়। তারা তো অন্যায় কিছু করছেন না। পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে স্বাধীন
দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকারের সীমাতেই তারা এরাজ্যে স্থায়ী ভাবে বসবাস
শুরু করছেন। প্রশ্ন অন্যখানে। প্রশ্ন হল এই অবস্থার প্রেক্ষিতে এই রাজ্যে বাংলা
ভাষা ও সংস্কৃতির উপর ঠিক কিরকম প্রভাব পড়ছে। সেই প্রভাবে আমাদের ভাষা সংস্কৃতির
বর্তমান অবস্থাটি ঠিক কিরকম? এরাজ্যে ভীড় করা অবাঙালিদের মধ্যে অধিকাংশই
হিন্দীবলয় ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলের অধিবাসী। স্বভাবতঃই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ
প্রাপ্ত হিন্দী তাদের মাতৃভাষা হওয়াতে তারা এই রাজ্যে এসেও সেই সুযোগের
সদ্ব্যাবহার করতে পারছেন অতি সহজেই। কর্ম জগতে পেশার ক্ষেত্রে সরকারী ভাষা হিন্দী
ও ইংরেজী হওয়াতে, তারা তাদের মাতৃভাষা হিন্দীতে যত সহজে জীবন
জীবিকায় অংশগ্রহণ করতে পারেন, আমাদের
বাঙালিদের অনেক পরিশ্রম করেই ঐ দুইটি ভাষার কোন একটিতে, বা
ক্ষেত্র বিশেষে দুটিতেই আগে পারদর্শী হয়ে উঠতে হয়, যা যথেষ্ঠ
সময় ও অধ্যাবষয় সাপেক্ষ সন্দেহ নাই। যে কাজ সকলের পক্ষে সহজ নাও হতে পারে। আর সেই
সুযোগেই অবাঙালিরা ব্যাপক ভাবে যত সহজে কর্ম জগতে প্রবেশ করতে পারেন ও সাফল্য
অর্জন করতে পারেন বাঙালিরা আজ আর তা পারে না বলেই, পশ্চিমবঙ্গে
নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যার মধ্যে বাঙালি ও অবাঙালির অনুপাতটি ভয়াবহভাবেই
ভারসাম্যহীন। বিষয়টি পরিস্কার বোঝা যেতে পারে যদি আমরা রাজ্যবাসীর মোট বাঙালির মধ্যে
কতজন বেকার এবং মোট অবাঙালির মধ্যে কতজন বেকার; সেই অনুপাতটি
সঠিক ভাবে খুঁজে বের করি। পরিতাপের কথা, এই ভাবে ভাবলেই
সকলের অভিধানে সংকীর্ণ প্রাদেশিকতাদোষে দুষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় কেউই আজ অব্দি
এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি মনযোগ দেননি। স্বভাবতঃই দেবেনও না। কিন্তু
বাস্তব অতি কঠিন সত্যকেই প্রতিফলিত করে, আমরা সেই সত্যের দিক
থেকে মনযোগ সরিয়ে রাখলেও।
বাস্তব এইটিই যে কি সরকারী কি বেসরকারী, দুই ক্ষেত্রেই
কর্ম জগতে প্রবেশ ও উন্নতির ক্ষেত্রে হিন্দী ও ইংরাজীর গুরুত্ব অপরিসীম। ঠিক
যেখানে আ মরি বাংলা ভাষার কোনো রকমের প্রাসঙ্গিকতাই স্বাধীনতার সাতদশকেও গড়ে ওঠে
নি। সকল রকম গুরুত্বপূর্ণ সরকারী চাকুরীর পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র হিন্দী ও ইংরেজীতে
হওয়ায় হিন্দীভাষী রাজ্যবাসী তাদের মাতৃভাষায় যত সহজে উৎরে যেতে পারে, এরাজ্যের বঙ্গসন্তানের পক্ষে কাজটি তত সহজে হয় না। সেই উৎরানোর কাজটি
সম্পন্ন করতে গিয়ে তাদেরকে অনেকটা সময় ও পরিশ্রম করেই মোটামুটি ভালোভাবে
বিদেশীভাষা ইংরেজীতে দখল অর্জন করতে হয়। যে কাজটি আপামর বাঙালির সন্তানের পক্ষে
মোটেই সহজ সাধ্য নয়। ফলে দিনে দিনে সাধারণ মেধার বাঙালি ছাত্রছাত্রীরা সরকারী ও
বেসরকারী ক্ষেত্রে পেশাগত ভাবে সাধারণ মেধার অবাঙালিদের থেকে পিছিয়ে পড়ছেই। আমরা
অধিকাংশ বাঙালিরাই এই বাস্তব সত্যকে প্রতিরোধ করা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেই
বেশি পছন্দ করি বা সাচ্ছন্দ বোধ করি। বরং এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই আমরা আমাদের
সন্তানদেরকে বেশী করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্ত্তি করতে রাত জেগে লাইনে দাঁড়াই।
আমরা জানি ইংলিশে চৌখস না হলে জীবনে উন্নতি নাই। শুধু তাই নয়, ইংরেজীর সাথে হিন্দীতেও যে ছেলেমেয়েদের চোস্ত হওয়ার দরকার, আমাদের সেদিকেও খেয়াল থাকে এইযুগে। আর এর অবশ্যম্ভাবী পরিণামেই মাতৃভাষা
বাংলাকে আমরাই আরও বেশী করে কোণঠাসা করছি দিনে দিনে অবহেলার চূড়ান্ত চর্চায়।
এই প্রসঙ্গেই স্মরণে রাখা দরকার, বাংলাদেশে
বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের মূল প্রেক্ষিতটা। সেই সময় বাংলা ভাষার প্রতি
স্বতঃস্ফূর্ত আবেগেই কিন্তু এই আন্দোলনের ব্যাপকতা গড়ে উঠেছিল না। সেই আন্দোলন গড়ে
ওঠার মূল কারণ ছিল, তৎকালীন পাকিস্তানী প্রশাসনের, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দ্দুকে ঘোষণা করা। যে ঘোষণার নেপথ্যে ছিল
পাকিস্তানী প্রশাসনের গভীরতর ষড়যন্ত্রমূলক দূরভিসন্ধি। সেদিনের বাংলাদেশের যুবসমাজ
বুঝতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষা উর্দ্দু হলে সমস্ত সরকারী বেসরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে
উর্দ্দু না জানলে কর্মজগতে প্রবেশ ও উন্নতি করা যাবে না। বরং পাকিস্তানের
ছেলেমেয়েরাই মাতৃভাষা উর্দ্দুর সুযোগ নিয়ে একতরফা ভাবে অধিকাংশ কর্মস্থলে অভিষিক্ত
হবে। বাঙালি পর্যবসিত হবে মূলত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। তাই সেদিন
বাংলাদেশের যুবসমাজ বাংলার ইতিহাসে সেই
প্রথম, মাতৃভাষার মূল গুরুত্বটি অনুধাবন করতে
পেরেছিল। তারা বুঝেছিল জীবন জীবিকায় মাতৃভাষার স্থান না থাকলে সার্বিক ভাবে সমগ্র
জাতির উন্নয়ন অসম্ভব। তাই প্রথমত পেটের তাগিদেই যে উর্দ্দুর বিরোধীতা শুরু হয়েছিল,
অচিরেই তা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে বৃহত্তর আন্দোলন হয়ে দেখা দিল।
এইখানেই বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
আর আমাদের এই পারে, পাকিস্তান প্রশাসন ঐ পারে যে ভুলটি করেছিল, ভারতবর্ষের প্রশাসন সেই ভুলটি
কোনোদিনও করেনি। তারা বুঝতে পেরেছিলেন হিন্দীকে জবরদোস্তি রাষ্ট্রভাষা ঘেষণা করে
সারা ভারতের উপর চাপিয়ে দিতে গেলে দেশ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার
ক্ষেত্রে বিদেশী ভাষা ইংরেজীর পাশাপাশি হিন্দীকে রেখে দিনে দিনে সুকৌশলে হিন্দীকে
নানান ভাবে পোষকতা দিয়ে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলেই একদিন কালক্রমে হিন্দীই
রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর গত সাতদশকে ঠিক সেইটিই হয়েছে। এই
বিষয়ে প্রথমাবধি বোম্বাইমার্কা হিন্দী বায়োস্কোপের জনপ্রিয়তা তাদের পরিকল্পনার
পক্ষে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। পরবর্তীতে টিভির পর্দায় হিন্দী সিরিয়াল যে কাজটিকে আজ
ব্যপক ভাবে সফল করে তুলেছে। আর এই ভাবেই হিন্দীবলয়ের বাইরেও ভারতবাসীকে হিন্দীমুখি করে তুলতে সক্ষম হয়েছে ভারতীয় প্রশাসন। তাই এই বঙ্গে হিন্দী আজ আর
বিদেশী ভাষা নয়। অধিকাংশ বাঙালিরই মুখেরও ভাষা হয়ে উঠছে দ্রুত।
ফলত, রাজ্যের শহর ও গ্রাম সর্বত্রই
হিন্দীবলয়ের মানুষের সাথে পাশাপাশি বসবাস করে একদিকে যেমন হিন্দীর প্রতি বাঙালি
মাত্রেই একটি স্বাভাবিক আবেগ গড়ে উঠেছে, ঠিক তেমনই সিনেমা
টিভির দৌলতে হিন্দী আজ এই রাজ্যের বাঙালির কাছে অন্যতম জনপ্রিয় ভাষা। আর কর্ম জগতে
প্রবেশের জন্যে হিন্দীর প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধির সাথে সথেই একই সঙ্গে সর্বত্র
বাংলাভাষার কদর কমে চলেছে অতি দ্রুত থেকে দ্রুততর গতিতে। স্বভাবতঃই এই যে সার্বিক
পরিস্থিতি, এরই প্রক্ষিতে আজ আপামর বাঙালি তার মাতৃভাষার
বর্তমান অবস্থা নিয়ে আদৌ আর ভাবিত নয়। সে জানে কর্মজীবনে জীবিকার ক্ষেত্রে
বাংলাভাষা পুরোপুরি অপ্রসঙ্গিক ও অচল। বরং ইংরেজীতে সরগর হওয়ার সামাজিক সুবিধে
অনেক। কিংবা বিকল্প হিসেবে হাতের কাছে অতি পরিচিত হিন্দী তো রয়েইছে। তাই এই
রাজ্যের বাঙালির কাছে বাংলাভাষা ও একুশের চেতনা আজ শুধু অপ্রসঙ্গিকই নয়, সম্পূর্ণ অচল আবেগ মাত্র।
বুস্তুত দীর্ঘকাল ধরেই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের
উদাসীনতা ও সমাজের প্রাগ্রসর শ্রেণীর এই ভাষাটি সম্বন্ধে উন্নাসিকতা বাংলা ভাষার প্রসার ও প্রচলনে
ধারাবাহিক ভাবেই বাধার সৃষ্টি করে এসেছে। এখন দেখা যাক বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে এই
উদাসীনতা ও উন্নসিকতার সুদীর্ঘকালের প্রভাবটি কিভাবে ক্রিয়াশীল। সার্বিক ভাবে
একদিকে ইংরেজী ভাষার প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও অন্যদিকে হিন্দীকে ভারতের প্রধান ভাষা
বা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদান, আমাদের বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের বাংলা
ভাষা সম্বন্ধে একটি হীনমন্যতা গড়ে তুলেছে। যার সরাসরি প্রভাবে আমরা যার যত বেশি
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী, সেই নিক্তিতে নিজেদের শিক্ষিত
প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ অপ্রয়জনীয় ভাবে হলেও নিজেদের স্বজাতির মধ্যেও পরস্পরে
ইংরাজীতে বাক্যলাপে অধিকতর স্বচ্ছন্দ বোধ করে থাকি। সারা পৃথিবীতে এই মানসিকতার
দৃষ্টান্তে আমরা বাঙালিরা সত্যিই অনন্য। অন্যদিকে এরাজ্য বসবাসকারী বিপুল পরিমাণ
হিন্দীভাষী ও হিন্দী জানা অবাঙালিদের সাথে আমরা স্বতঃপ্রোণদিত হয়েই হিন্দীতেই
যোগাযোগ রাখতে ভালোবাসি, কারণ ভারতীয় নাগরিক হিসাবে আমরা
নিজেদেরকে আগে ভারতীয় তারপর দৈবাত বাঙালি বলে মনে করি বলে আমরা হিন্দীকেই ভারতের
রাষ্ট্রভাষা হিসাবে দেখি। অনেকেই বলবেন তাতে কি হয়েছে। সারা ভারতের একটি সাধারণ
ভাষা থাকলে তো ভালোই। ঠিক কথা। কিন্তু সেই জায়গায় হিন্দীকে তুলে ধরতে গিয়ে নিজের
মাতৃভাষাকে কোণঠাসা করে বলি দেওয়ার কথা সারা ভারতে একমাত্র বাঙালি ছাড়া আর কেউই কিন্তু ভাবে না। ভাববেও না কোনদিন। অনন্য বাঙালি আর অনন্য তার
মানসিকতা। ভূভারতে যার তুলনা নেই।
আমাদের এই মানসিকতার হাত ধরেই সারা রাজ্যে দিনে
দিনে বাংলা ভাষায় পঠন পাঠনের রেওয়াজ কমে আসছে। খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে
যে, নতুন নতুন যত স্কুল চালু হচ্ছে, তার অধিকাংশই কিন্তু
হয় ইংরাজী মাধ্যম নয় হিন্দী। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির উৎকর্ষতাও ক্রমহ্রাসমান,
ভালো মেধার ছাত্র ও উপযুক্ত শিক্ষক উভয়েরই প্রবণতা ইংরাজী মাধ্যম
স্কুল গুলির সাথে যুক্ত হওয়া। আর এই প্রবণতার সুদূরপ্রসারী ফল কিন্তু মারাত্মক।
রাজ্য রাজধানী কলিকাতা সহ শিলিগুরি দূর্গাপুর আসানসোল শিল্পাঞ্চলের শহর ও
শহরতলিগুলিতে এমন বহু হিন্দী মাধ্যম স্কুল রয়েছে যেখানে পঠন পাঠনের বিষয়ের মধ্যে
বাংলার কোনোই স্থান নেই। ফলত এই স্কুলগুলি থেকে শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা এই রাজ্যের
বাসিন্দা হয়েও রাজ্যের ভাষাটির সাথে পরিচিত হচ্ছে না। আমাদের জানা নেই ভারতের
অন্যান্য রাজ্যগুলিতেও এইরকম অস্বাভাবিক কাণ্ডকারখানা প্রচলিত আছে কিনা। থাকলেও
সেখানে সেই বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে চালানো হয় কিনা।
আর ঠিক এইটিই এই বাংলায় নিরন্তর ঘটে চলেছে, যা কিছু
অস্বাভাবিক, তাকেই স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া। বস্তুত
পশ্চিমবঙ্গ আজকে ভারতেরই যেন একটি ক্ষুদ্র সংস্করন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু:খের বিষয়,
অনেক বাঙালিই তাতে শ্লাঘা বোধ করেণ। তারা ভেবে দেখেন না, এই ভাবে একটি রাজ্যে তার ভাষা ও কৃষ্টি প্রতিনিয়ত সঙ্কুচিত হতে থাকলে,
সেদিন আসতে আর বেশি দেরি নাই, যেদিন বাঙালি
তার রাজ্যেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। সে বড়ো সুখের সময় হবে না বঙ্গবাসীর জীবনে। আর এই
প্রবণতার লক্ষ্মণ ইতিমধ্যেই অল্পস্বল্প ধরা পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও প্রশাসনের
বিভিন্ন পদে অবাঙালিদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধির পথে। এরই সুত্র ধরে
রাজ্যরাজনীতিতে তারাই অদূর ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা গ্রহণ করলেও আশ্চর্য্যের
কিছু নাই। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা ও
উন্নাসিকতার হাত ধরে ইংরাজী ভাষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং
হিন্দীভাষা হিন্দুস্তানী সংস্কৃতি আয়ত্ব করার প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার এই বিস্তৃত
পরিসরে ২১শে ফেব্রুয়ারী কিংবা একুশের চেতনা নেহাৎই পড়শী রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক
বিষয় মাত্র। যার সাথে এই বাংলার বাঙালির মন ও মননের কোনো আত্মীয়তা কোনোদিনই গড়ে
ওঠেনি, আর ওঠার কথাও নয়। কারণ ভারতীয় বাঙালি আগে ভারতীয় ও
নেহাৎই দৈবাৎ বাঙালি। কোনো ভাবেই প্রাদেশিকতা দোষে দুষ্ট নয়।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

