বাইশে শ্রাবণ দিল ডাক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাইশে শ্রাবণ দিল ডাক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বাইশে শ্রাবণ দিল ডাক



বাইশে শ্রাবণ দিল ডাক

এই সেই শ্রাবণ! যে শ্রাবণ এলেই মানুষটির কথা একবার মনে পড়বেই। সারাজীবন অনেকগুলি শ্রাবণ পার করলেও এই শ্রাবণে এসেই পূ্র্ণচ্ছেদের সমনাসামনি হলেন কবি। যে মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে আমাদের সারাজীবনের অক্লান্ত প্রয়াস, সেই অমোঘ পরিণতিই কবির জীবনে নিয়ে এল এই শ্রাবণেই। ‘আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে কি এনেছিস বল’; না শ্রাবণের পূ্র্ণিমা না হলেও সেই শ্রাবণই আমাদের জন্যে কবির মৃত্যুকে উপহার দিয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুকেও উপহার? মৃত্যু কি কখনো উপহার হতে পারে? অবাক হতে পারেন অনেকেই। যে বিভীষিকাকে আমরা সর্বদাই চাই এড়িয়ে চলতে, সেই কি কখনো উপহারের সামগ্রী হতে পারে? এমনটাই তো ভেবে থাকি আমরা সকলেই। সাধারণত। আমাদের রোজকার আটপৌরে জীবনে। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাঁরা কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু স্বতন্ত্রই কি? তিনিও কি আমাদের মতো সাধারণ রক্ত মাংসের মানুষ নন? মৃত্যুর বিভীষিকাকে তিনিও কি দূর থেকে এড়িয়ে যেতে চাননি? কবির কথায় জানা যায়, তাঁর জীবনে মৃত্যুর সাথে প্রথম সাক্ষাৎ তাঁর জননীর মৃত্যুর ঘটনায়। কিন্তু একান্নবর্তী বিশাল পরিবারের বালক রবীন্দ্রনাথকে সেই মৃত্যু বিশেষ বিচলিত করেনি। শুধু এইটুকুই বুঝতে পেরেছিলেন দেখা হবে না আর মায়ের সাথে। সেই কষ্টও প্রতিদিনের জীবন প্রবাহে সুসহ হয়ে উঠতে দেরি হয়নি বিশেষ। সে কথা জানা যায় তাঁর নিজের লেখা থেকেই। কিন্তু প্রথম যে মৃত্যু কবির চিন্তাভাবনার ভূমিতে তোলপাড় ফেলে দেয়, সে তার প্রিয় বৌঠাকুরানীর আকস্মিক স্বেচ্ছামৃত্যু। সেই প্রথম মৃত্যুকে পরিস্কার করে প্রত্যক্ষ করলেন যুবক রবীন্দ্রনাথ। বিচ্ছেদের পরিপূর্ণ হাহকারকে অন্তর দিয়ে অনুভব করার অভিজ্ঞতা লাভ করলেন কবি। আমাদেরই সকলের মতো। দুঃখের সেই তিমিরঘন লগ্নেই হয়তো শুরু হয়েছিল তাঁর পথ চলা। যে পথ তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাবে মহাজীবনের তটরেখায়। যে পথে পরের পর হারাতে হবে তাঁকে প্রিয়তম এক একজনকে। আর সেই একটি একটি করে মৃত্যুর অমোঘ লীলার মধ্যে দিয়েই পরিপূ্র্ণ জীবনবোধের অন্তর্দীপ্ত আলোর মহাসমারোহে পৌঁছাবেন কবি নিজে।

জীবনকে তার সত্যমূল্যে অনুভব করতে হলে মৃত্যুর প্রেক্ষিতে তাকে অনুধাবন করা প্রয়োজন! আত্মজীবনীর পরতে পরতে সে কথা উপলব্ধি করেছিলেন কবি তাঁর দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায়! তিরিশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি সদ্য তরুণ অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছিলেন কবি, কিভাবে বুঝতে পরেছিলেন তিনি, যে জীবনকে মৃত্যুর জানলার ভিতর দিয়ে না দেখলে তাকে সত্যরূপে দেখা যায় না! মৃত্যুর আকাশে জীবনের যে বিরাট মুক্তরূপ প্রকাশ পায় আর সকলের মতোই তাঁর কাছেও প্রথমে তা বড়ই দুঃসহ লেগেছিল! কিন্তু তার পরে তার ঔদার্য্য মনকে আনন্দ দিতে থাকে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ! তখন ব্যক্তিগত জীবনের সুখদুঃখ অনন্ত সৃষ্টির ক্ষেত্রে হাল্কা হয়ে দেখা দেয়! সেই কথাই জানিয়ে ছিলেন কবি স্নেহধন্য তরুণ কবি আমিয় চক্রবর্তীকে ৮ই আষার ১৩২৪এ লেখা এক পত্রে। এইভাবেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষজনদের জীবনের অনুভব উপলব্ধির স্তরকেও অতিক্রম করতে হয়েছিল কবিকে। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাই আমরা যেখানে থেমে যাই, জীবন বাস্তবতার অভিজ্ঞতার বড়াই করে, সেইখান থেকেই জীবনের সারসত্যের অভিমুখে এগোতে থাকেন কবি নিজে। সে পথ মোটেই কুসুমাত্তীর্ণ নয়, নয় নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রপ সব পেয়েছির আসর। সে পথে কেবলই পরীক্ষা দিতে হয় নিজের সাথেই নিজেকেই নিজের কাছে। আমরা সাধারণ মানুষরা ঠিক এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ি। জীবনের অনেক পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েও নিজের কাছে পরীক্ষা দেওয়ার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আর পারি না বলেই রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষদেরকে আমরা মহাপুরুষ বানিয়ে এড়িয়ে যেতেই অধিকতর স্বচ্ছন্দ বোধ করি আমাদের এই আটপৌরে জীবনযাপনের প্রাত্যহিকতায়।

জীবনকে সত্য বলে জানতে গেলে মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই যে তার আসল পরিচয় পাওয়া যায় সে কথা রবীন্দ্রনাথই জানিয়েছিলেন দ্ব্যার্থহীন ভাষায়। তাঁর মতে মৃত্যুকে ভয় পেয়ে জীবনকে আঁকড়ে ধরতে গেলে সত্যিকার অর্থে পাওয়া হয় না জীবনকেই। ফাঁকিতে পরে যাই আমরা। আর এই জন্যেই কবির মতে আমরা জীবনের মধ্যে বাস করেও প্রতিদিন মরতে থাকি মৃত্যুর বিভীষিকায়। ঠিক যে বিভীষিকার মধ্যে বাস করতে হয় আমাদেরকে প্রতিদিন। সেই আমাদেরকেই বরাভয় দেওয়ার জন্যে লিখলেন কবি,

এমন একান্ত করে চাওয়া
এও সত্য যত
এমন একান্ত ছেড়ে যাওয়া
সেও সেই মত।“

জীবনকে একান্ত করে চাই ত‌ো আমরা সকলেই। কিন্তু সেই জীবনকে যেদিন একান্ত করে ছেড়ে যাওয়ার লগ্ন এসে উপস্থিত হয়, সেইদিন সেই লগ্নটিকেও একান্ত করে আলিঙ্গন করার মধ্যেই জীবনের পরিপূর্ণ যে উদ্বোধন, সেই সত্য উপলব্ধি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথই। আর তাই বাসন্তী দেবীকে; ১৫ই কার্ত্তিক ১৩৩৮-এ লেখা একটি পত্রে বলেছিলেন কবি "জীবন আর মরণ তো একই সত্ত্বার দুই দিক- চৈতন্যে ঘুম আর জাগরণ যেমন!" একটি বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নয় আর একটি, দুইটিই পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। বন্ধন আর মুক্তি, একান্ত করে চাওয়া আর একান্ত করে ছেড়ে যাওয়া; জীবন আর মৃত্যুর দ্বৈত এই লীলায় বিশ্বসত্ত্বার অস্তিত্ব সার্থক হয়ে ওঠে আমাদের মধ্যে দিয়েই। এই সত্য উপনিষদের ঋষিরাও অনুধাবন করেছিলেন তাঁদের কালে। কবিও করলেন তাঁর জীবন পরিক্রমায় স্নেহ প্রেম ভালোবাসা শ্রদ্ধার মমতার মধ্যে দিয়েই। সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো প্রাত্যহিক জীবন থেকে দূরে সরে গিয়ে জীবনের দায়িত্ব কর্তব্য দুঃখ যন্ত্রনা আশা নিরাশাগুলিকে এড়িয়ে গিয়ে নয়। এইখানেই অনন্য তিনি।

বস্তুত মৃত্যুকে বিভীষিকার ভিতর দিয়ে দেখার মধ্যে যে খণ্ডতার অন্ধকার, আজীবন আলোর তপস্বী রবীন্দ্রনাথের তাতে প্রবল আপত্তি। যতদিন না আমরা এই বিভীষিকার ধারণা থেকে মুক্ত করতে পারব নিজেদের ততদিনই আমরা বেঁচেও কার্যত মরেই থাকবো। সেইটিই আমাদের বিধিলিপি বুঝেছিলেন কবি। তাই তাঁর সৃষ্টির অনুপম স্রোতধারায় বারবার আমাদের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করে গিয়েছিলেন তাঁর অক্লান্ত সাধনায়। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ বলে যাদের প্রতিনিয়ত অহংকার, তারা কি কর্ণপাত করি কবির কথায়? করি না। আর করি না বলেই পদে পদে হোঁচট খাই। বেদনা পাই। ভেঙ্গে পড়ি। আর কপালে কড়াঘাত করি। বঞ্চিত হই জীবনের পরিপূর্ণ উদ্বোধনের স্বাদ থেকে। মৃত্যুকে এড়িয়ে যওয়ার তাগিদে আসলে মরেই থাকি প্রতিদিন। মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে গিয়ে ফাঁকে পড়ে যাই নিজেরাই। জীবনের বৃহত্তর ক্যানভাস থেকে নির্বাসিত হয়ে।

বাইশে শ্রাবণ তাই আমাদের সম্বিত ফেরানোর দিন। বাইশে শ্রাবণ তাই মৃত্যুর পরিপূর্ণতার আলোয় জীবনকে আলোকিত করে পাওয়ার দিন। বাইশে শ্রাবণ তাই  আমাদের প্রতিদিনের প্রাত্যহিকতার মধ্যে কবিকেও সার্থক করে তোলার দিন। অনেকই হয়তো ভ্রূ কুঞ্চিত করবেন, সেকি কথা! কবিকে সার্থক করার আমরা কে? তিনি কি এতদিন তবে নিরর্থক হয়ে আছেন? না। কবির সার্থকতার দুইটি দিক রযেছে। একটি দিক তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্যে সার্থক হয়েছে বলেই তিনি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু আরও একটি মস্ত বড় দিক রযে গিয়েছে। সেইটি হলো আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের সীমানায় কবিকে সার্থক করে তুলতে পারিনি আমরা আজও। আর পারিনি বলেই, ‘জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়াতে যেতে চাই- ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে”। কবির দেখানো পথে জীবনের সম্যক উপলব্ধিতে আমাদের পরিপূর্ণতার মধ্যেই আমাদের ব্যক্তিজীবনে কবিরও সার্থক হয়ে ওঠা। যে সার্থকতা আজও বাঁকি পড়ে রয়েছে আমাদেরই আলস্যে। বাইশে শ্রাবণ সেই আলস্য কাটিয়ে ওঠারও দিন।

তাই কবির ফটোতে মালা দিয়ে নয়, কবির কবিতা মুখস্থ আবৃত্তি করে নয়, কবির সুরে সুর মিলিয়া কটি কলি গেয়ে বা নেচে নয় বাইশে শ্রাবণের প্রকৃত গুরুত্ব জীবনের পরিপূর্ণ উদ্বোধনে মৃত্যুর প্রকৃত ভুমিকা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠা। আর সেই পথে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করে রেখেছেন মৃত্যুহীন প্রাণ অমৃতস্য পুত্রঃ কবি রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন অক্লান্ত সক্রিয়তায়।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত