তথ্য ও সত্য এবং গুজব
খবর জুড়ে একটিই দেশের নাম ঘুরে ফিরে
আসছে। মানুষের মুখে মুখে ফিরছে একটিই নাম। ভারতবর্ষের মানুষ বাঙালি শুদ্ধু সকলেই এখন
জেনে গিয়েছে। জেনে গিয়েছে করোনার উৎপত্তির রহস্য। চায়ের দোকানে। ফেসবুকের গুলতানিতে।
হোয়াটসআপ বিশ্ববিদ্যালয়ের বুলেটিনে। কারুর মনে কোন সন্দেহ নাই। চীনই এই করোনা ছড়িয়ে
দিয়েছে বিশ্বজুড়ে। সন্দেহ থাকবেই বা কি করে? একমেরু বিশ্বের প্রভু স্বয়ং যখন করোনাকে
চীনা ভাইরাস বলে অভিহিত করে দিয়েছেন। ঠিক যেমন সতেরো বছর আগে আমাদের মুখস্থ করিয়ে দেওয়া
হয়েছিল ইরাক বায়োলজিক্যাল উইপেন তৈরী করছে। বিশ্বজুড়ে সেই অস্ত্র প্রয়োগ করে কোটি কোটি
মানুষ মারার পরিকল্পনায়। আমেরিকার মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল, সাদ্দাম হোসেন আমেরিকায়
পারমাণবিক বোমা ফেলল বলে। এসবই এই সেদিনের ইতিহাস। বিস্মরণ হওয়ার কথা নয়। সেই সাদ্দামও
আর নাই। ইরাকও ধ্বংসস্তুপ। আফগানিস্তান লিবিয়া সিরিয়া সব শেষ। এখন নতুন শত্রু খুঁজে
বার করার সময়। শত্রু না থাকলে বিশ্বশুদ্ধু মানুষকে নিজের স্বার্থ পুরণের জন্য হাতের
মুঠোয় আনা যাবে কি করে? তাই দশকে দশকে নতুন শত্রুর এত প্রয়োজন।
তাই আমেরিকার এখন চীনকে বড়ো প্রয়োজন।
এত বড়ো একটি দেশ। এত বড়ো সুপ্রাচীন একটি সভ্যতা। সারা বিশ্বকে সেই চীনের প্রতি খেপিয়ে
তুলতে পারলে বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করার প্রচুর সুবিধা। নিজের দেশের মানুষকেও নিজের বশে
বশীভুত করে রাখতে গেলে সবসময় এক বহিঃশত্রুর উপস্থিতির অত্যন্ত প্রয়োজন। ভারতে যেমন
পাকিস্তান। কিন্তু আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসা ও বছরের পর বছর সাফল্যের সাথে সামরিক ইন্ডাস্ট্রীর
রমরমা বজায় রাখতে হলে এবং বিশ্বকে এই ইণ্ডাস্ট্রীর স্থায়ী বাজারে পরিণত করে রাখতে হলে,
কোন একটি শত্রুর উপর একটানা ভরসা করাও যায় না। জনগণকে জুজুর ভয় দেখিয়ে বশে রাখতে হলেও
নিত্য নতুন জুজুর আমদানী জরুরী। তাই ভিয়েতনামের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন। আবার সোভিয়েত ইউনিয়ন
ও কম্যুনিজম জুজুর পর ইসলামিক টেররিজমের জুজু আমদানী করতে হয়েছে। তার জন্য সাদ্দাম
হোসেন, তালিবান, লাদেন, আইএস ইত্যাদিকে অতি যত্নের সাথে বছরের পর বছর ধরে তৈরী করতে
হয়েছে। কম কাজ?
এর সাথে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার আসন্ন
নির্বাচন। নির্বাচনে ট্রাম্পের তুরুপের তাস একটিই। চীনা আতংক। জনগণের ভিতর এই চীনা
আতংকের ভাইরাস ঠিক মতো ছড়িয়ে দিতে পারলেই নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব। আর ঠিক
সেই কারণেই রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে রীতিমত ইস্তাহার ছাপিয়ে দলীয় কর্মকর্তাদের
বিশেষ নির্দেশ দেওয়াও হয়েছে। সরকারের করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতা ঢাকতে ট্রাম্পের হয়ে
ওকালতি করার বদলে ক্রমান্বয়ে চীনা আতংক ছড়িয়ে যেতে হবে। দেশব্যাপি চীনের বিরুদ্ধে প্রচারকে
নির্বাচনী প্রচারে পরিণত করতে পারলেই কেল্লাফতে। উপরি লাভ, সেই একই প্রচার মিডিয়ার
দৌলতে আবিশ্ব প্রচারিত হয়ে বিশ্বেজুড়ে চীনকে অপরাধী বানিয়ে তোলা সহজ হবে। এক ঢিলে দুই
পাখি। সেই দিকেই তাকিয়ে এই উদ্দেশ্যকে পাখির চোখ করে এগিয়ে চলেছে আমেরিকার শাসক গোষ্টী।
ভারতবর্ষ সহ পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ
শিক্ষিত মার্কীণপ্রেমী জনগণও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আমেরিকার তাঁবেদারিতে নেমে পড়েছেন।
করোনা মোকাবিলায় আমেরিকার বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর ব্যার্থতা ঢাকতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে,
তাঁরাও পাশ্চাত্য মিডিয়ার সুরে গলা মেলাচ্ছেন তারস্বরে। প্রতিদিনের ফেক নিউজ মুখস্থ
করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন দ্রুতহারে। কেউ বলছেন, করোনাকে উহানের ভাইরোলজির গবেষণাগারে তৈরী
করে চীন এই ভাইরাসকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। অবিলম্বে চীনকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।
কেউ আবার অতটা আক্রমণাত্মক হওয়ার পক্ষপাতি নন। তাঁরা জানাচ্ছেন, ভাইরাসটি উহানের ল্যাবরেটরী
থেকে দুর্ঘটনা বশত বেড়িয়ে পড়েছে। চীন ইচ্ছে করে কাজটি করেনি। এটা তাদের অপদার্থতা।
এটা প্রমাণ করে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার মতো যোগ্যতা তাদের নাই। অর্থাৎ যেমনটা আছে
আমেরিকা ইজরায়েল ও ব্রিটেনের। ফলে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা কৃত্রিম ভাইরাস তৈরীর মতো সূক্ষ্ম
কাজগুলি শুধু এই তিন দেশের নিয়ন্ত্রণাধীনই থাকা জরুরী। কেউ কেউ তারস্বরে প্রচার করছেন,
চীন তথ্য গোপন করে দেশে দেশে ভাইরাস ছড়িয়ে যেতে সাহায্য করেছে। অতএব বিশ্বজুড়ে লকডাউনের
জন্য একমাত্র চীনই দায়ী। তাই অর্থনীতির ধ্বসের কারণে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হোক চীনের
কাছ থেকেই। নানা জনের নানা মত। কিন্তু সুরটি ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে খোদ আমেরিকা থেকে।
পাশ্চাত্য মিডিয়ার বিশেষ দক্ষতায় সেই সুরকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘরে ঘরে। তাই নানা জনের
নানা মত হলেও সকলেরই আক্রমণের লক্ষ্য সেই চীন। যেখানে করোনা প্রথম ধরা পড়ে। সকলেরই
বদ্ধমূল বিশ্বাস, হয় চীন এটি তৈরী করেছে কৃত্রিম উপায়। নাহলে চীন তথ্য গোপন করে করোনাকে
ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বজুড়ে।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু
দূর। তাই মার্কীণপ্রেমী বাঙালি প্রভুর বাণীকে অম্লানবদনে বিশ্বাস করেই আনন্দিত। তারা
প্রকৃত তথ্য জানতে চাইবেন না। তথ্য হাতের কাছে মজুত থাকলেও তাকিয়ে দেখবেন না। প্রভুর
বাণী ও তার পারিষদবর্গের কোলাহলকেই প্রমাণ বলে গণ্য করে উজ্জীবিত হয়ে উঠে সেই সুরেই
গলা চড়াবেন। হাজার বার স্মরণ করিয়ে দিলেও তাঁরা স্বীকার করবে না প্রকৃত সত্য। প্রকৃত
তথ্য। তাই তারা অনেকেই জেনেও না জানার ভান করেন। অনেকেই জানেন, এই বছর জানুয়ারীর ৩
তারিখ থেকে চীন নিয়মিত ভাবে প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সহ বিশ্বের নানা
দেশকে নিত্য নতুন তথ্য সরবরাহ করে গিয়েছে। গত ডিসেম্বরের ৩১ তারিখেই চীন প্রথম এই রোগের
কথা জানায়। জানুয়ারীর ১২ তারিখেই তারা করোনার জেনেটিক কোড উদ্ধার করে বিশ্বস্বাস্থ্য
সংস্থার হাতে তুলে দেয়। এবং জানুয়ারীর ২০ তারিখেই তারা নির্দিষ্ট ভাবে জানিয়ে দেয় করোনার
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কথা। এই তারিখগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি অন্ধ মার্কিণপ্রেমী
হতেই পারেন। সেটি আপনার মৌলিক অধিকার। মার্কিণ পতাকা মাথায় বেঁধে কিংবা টি শার্টে মার্কিন
পতাকার ছবি বুকে করে ঘুরে বেড়ানো আপনার স্টাইল হতেই পারে। বস্তুত সেটাই বাংলার হালের
ফ্যাশন। এই তারিখগুলিতে চীনের ভুমিকার কথা আপনি সযত্নে চেপেও যেতে পারেন। সেটি আপনার
প্রকৃতি। কিন্তু তাহলেও সাম্প্রতিক ঘটনার দিনলিপিতে এই তারিখগুলির তাৎপর্য ও গুরুত্ব
মুছে দেওয়া যাবে না।
এখন আসুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
জানুয়ারীর ৩ তারিখে চীন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সহ আমেরিকার স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীনস্ত
সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এণ্ড প্রিভেনশন সংস্থাকে করোনা সংক্রান্ত আপডেট দেওয়া শুরু
করে। জানুয়ারী ৫ তারিখ চীনের আপডেটের উপর নির্ভর করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, সংস্থার
সকল সদস্য দেশকে করোনা সংক্রান্ত বিদ্যমান পরিস্থিতি জানাতে শুরু করে। ৭ই জানুয়ারী
চীন নির্দিষ্ট ভাবে নভেল করোনা ভাইরাসকে চিহ্নিত করতে পারে। ঠিক তার পরের দিনই চীন
আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এণ্ড প্রিভেনশন সংস্থার সাথে এই বিষয়ে প্রযুক্তিগত
সহযোগিতার বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে। এর পরের দিন অর্থাৎ ৯ই জানুয়ারী চীন নভেল করোনা ভাইরাস
জনিত মহামারী বিষয়ে নানান তথ্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাথে শেয়ার করে। বিশ্বস্বাস্থ্য
সংস্থা থেকে চীনের কৃতিত্বকে প্রশংসিত করে বলা হয়, “….preliminary identification of a novel corona
virus in a short period of time is a notable achievement and demonstrate
China’s increased capacity to manage new outbreaks”। এর পরের দিন ১০ই জানুয়ারী চীনের
স্বাস্থ্য আধিকারিকরা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাথে ফোনে আলাপ করেন।
১২ই জানুয়ারী খুবই গুরুত্বপূর্ণ
একটি দিন। চীন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হাতে করোনার জেনেটিক কোড উদ্ধার করে তুলে দিলে
সংস্থা জানায়, “China shared the genetic sequence of novel corona virus on 12th
January, which will be of great importance for other countries to use in
developing specific diagnostic kits….”। আপনি অন্ধ মার্কীণপন্থী
এবং চীন বিদ্বেষী হতেই পারেন। সেটি একান্তই আপনার প্রকৃতি। কিন্তু এই বছর ১২ই জানুয়ারী
চীনের দেওয়া করোনার জেনেটিক সিকোয়েন্সের কোড যে করনো মোকাবিলায় টেস্ট কিট তৈরীর রাস্তা
খুলে দিয়েছিল, সেটি কিন্তু ঘটনা। ফলে এই সত্য আর কোনভাবেই ধামাচাপা দেওয়ার উপায় নাই।
ফলে এ কথাও আর বলার উপায় নাই, চীন তথ্য গোপন না করলে সময় মতো টেস্ট কিট তৈরী করে সংক্রমণ
প্রতিরোধ করা যেত। আসল সত্য বরং ঠিক উল্টো। এবং এরপর ২০শে জানুয়ারী চীন বিশ্বকে জানিয়ে
দেয় করনোরা মানুষ থেকে মানুষকে সংক্রমণের কথা। ২২শে জানুয়ারী চীনের রাষ্ট্রপ্রধান জার্মান
ও ফ্রান্সের রাষ্ট্র প্রধানের সাথে এই বিষয় ফোনালাপও করেন। এবং ঠিক পরের দিনই চীন উহানে
লকডাউন কার্যকর করে।
এবার আসুন ২৪শে জানুয়ারী আমেরিকার
রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প তার টুইটার বার্তায় ঠিক কি বলেছিলেন দেখে নেওয়া যাক।
“China
has been working very hard to contain the Coronavirus. The United States
greatly appreciates their efforts and transparency. It will all work out well. In
particular on behalf of the American people I want to thank President Xi”. তাহলে এটা পরিস্কার আমেরিকার
মতো প্রধান শক্তিধর একটি রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে জানুয়ারীর ২৪ তারিখের ভিতর ট্রাম্প
জেনে গিয়েছিলেন চীনের অভ্যন্তরীন পরিস্থিতি কি রকম ছিল। চীন প্রধানত কি কি পদক্ষেপ
নিচ্ছিল। তিনি এটিও জানতেন করোনা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানো একটি ভাইরাস। জেনে গিয়েছিলেন,
করোনার মোকাবিলায় টেস্ট কিট তৈরীর জন্য করোনার জেনেটিক সিকোয়েন্সও চীন বিশ্বসহ আমেরিকাকেও
জানিয়ে দিয়েছিল ১২ই জানুয়ারীতেই। তার নিজের দেশের স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীনস্ত সিডিসি’র
সাথেও চীনের কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগের কথাও তার অজানা ছিল না। এবং ২৩ তারিখে উহানের
লক ডাউনে যাওয়ার তথ্যও সেই সময় তার হাতেই ছিল। ফলে একটি শ্রেষ্ঠ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান
হিসাবে সেই সময় দেশের মানুষের সুরক্ষার বন্দোবস্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্য
সমূহ তার ও তার সরকারের হাতেই ছিল জানুয়ারীর ২৪ তারিখেই।
হ্যাঁ এরপরেও আমাদের মার্কীনপন্থী
ও চীন বিদ্বেষী বাঙালি চিনের তথ্য গোপনের ভুয়ো খরব ছড়ানো বন্ধ করবে এমনটা ভাবা কিন্তু
মুর্খামী। ২৭শে জানুয়ারী চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের প্রধান মা শিয়াওই মার্কীণ স্বাস্থ্য
সচিব অ্যালেক্স অ্যাজারের সাথে ফোনে কথা বলেন। সে খব পওয়া যায়, অ্যালেক্সের পোস্ট করা
টুইটার বার্তায়। “This morning I Spoke on the phone with Minister Ma Xiaowei of
China regarding the novel #coronavirus outbreak. I conveyed our appreciation
for China’s efforts and we discussed ways to increase the collaboration between
our countries and the @who.”
২৮শে জানুয়ারী চীনের রাষ্ট্র প্রধান
শী জিনপিং বেজিং’এ সফররত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেকটর জেনারেলের সাথে কথা বলে জানান,
এই মহামারী এক অফিশাপ। আমরা একে লুকিয়ে থাকতে দেবো না। পরের দিনই বর্ষীয়ান চীনা আধিকারিক
ইয়াং জিয়েচি আমেরিকার সেক্রেটারী অফ স্টেটস-মাইক পম্পেও’র সাথেও কথা বলেন। ৩০শে জানুয়ারী
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, “In many ways China is
actually setting a new standard for outbreak response. It’s not an exaggeration”.
এইদিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার
টুইট বার্তায় লেখেন, “Just received a briefing of this Coronavirus in
China from all of our GREAT agencies who are also working closely with China.
We will continue to monitor the ongoing developments. We have the best experts
anywhere in the world, and they are on top of it 24/7”. অর্থাৎ মার্কিণ অধিপতি কার্যত স্বীকার করলেন, চীনের
সাথে নিবিড় সংযোগে আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থা করোনা সংক্রান্ত বিষয়ে রাতদিন কাজ করে চলেছে।
অর্থাৎ চীনের উদ্ভুত পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে ২৪ ঘন্টা ব্যাপি। চীনের তথ্য
গোপন করার কোন তথ্যই কিন্তু জানুয়ারীর এই ৩০ তারিখ অব্দি সময়ে খুঁজে পাওয়া গেল না।
বরং একটি বিষয়টি সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া গেল। সেটি হলো এই সময় সীমায় কার্যত গোটা মাস
ব্যাপি চীন কর্তৃক নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করার ঘটনাটি। এবং আরও জানা গেল বিশেষত আমেরিকার সাথে চীন সরাসরি যোগাযোগের ভিতর
দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। ও উদ্ভুত পরিস্থিতি সম্বন্ধে নিয়মিত ভাবে আমেরিকাকে
অবহিত করে গিয়ে ছিল। আরও বড় কথা, এই সকল তথ্য আমরা কিন্তু পেলাম সরাসরি আমেরিকার রাষ্ট্র
প্রধান সহ অন্যান্য উচ্চ পদস্থ আধিকারিকের কাছ থেকেই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বাদ দিয়ে
অন্য কোন তৃতীয় সূত্র থেকেও নয়।
এই দিনই অর্থাৎ জানুয়ারীর ৩০ তারিখেই
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সর্বচ্চো সতর্কতা সরূপ গ্লোবাল হেল্থ এমার্জেন্সী জারি করে।
যেটি বিশ্বের কোন দেশ ও সংবাদ সংস্থারই অজানা থাকার কথা নয়। এবার আমরা আরও একটি প্রয়জনীয়
তথ্যের দিকে নজর দেবো। আমরা জানি জানুয়ারীর ৩ তারিখ থেকে চীন করোনা সংক্রান্ত বিষয়ে
নিয়মিত আপডেট দেওয়া শুরু করেছিল। সেই দিনের পর থেকে ঠিক কত দিন বাদে অন্যান্য কয়েকটি
প্রধান দেশে প্রথম করোনা রুগী ধরা পরে। এই তথ্যই প্রমাণ দেবে অন্যান্য দেশগুলি প্রয়োজনীয়
প্রস্তুতি নিতে হাতে মোটামুটি ন্যূনতম কতদিন সময় পেয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম করোনা
রুগী ধরা পড়ে ২০শে জানুয়ারী। অর্থাৎ ১৭ দিন পর। আমেরিকায় ২১শে জানুয়ারী। অর্থাৎ ১৮
দিন পর। ফ্রান্সে ২৪শে জানুয়ারী অর্থাৎ ২১দিন পর। জার্মানিতে ২৭শে জানুয়ারী। অর্থাৎ
২৪ দিন পর। ইতালীতে ৩০শে জানুয়ারী। অর্থাৎ ২৭ দিন পর। স্পেন ব্রিটেন ও রাশিয়ায় ৩১শে
জানুয়ারী অর্থাৎ ২৮ দিন পর। এবং ভারতে ৩০শে জানুয়ারী অর্থাৎ ২৭ দিন বাদে। হ্যাঁ এরপরেও
এরপর তিন মাস কেটে গেলেও চীন তথ্য গোপন করে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী ছড়িযেছে এই ভুয়ো
খবর প্রচার কিন্তু বন্ধ হয় নি।
বঙ্গজ মার্কীণপ্রেমী শিক্ষিত অতিশিক্ষিত
জনগণ চীনকে তথ্য গোপন করার জন্য দায়ী করার সময় স্মরণে রাখেন না এই তথ্যগুলি। ২০শে জানুয়ারী
থেকে ৩১শে জানুয়ারী অব্দি সময় সীমায় যে যে দেশে করোনার রুগী প্রথম ধরা পড়েছিল, তার
একটি দেশও কিন্তু চীন বা তার কমিউনিস্ট শাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। বরং রাশিয়া বাদে প্রতিটি
দেশই আমেরিকার ছত্রছায়ায় ওঠবোস করে থাকে। ফলে সেই সেই দেশগুলি তখন থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য
সরবরাহ করেছিল না চেপে গিয়েছিল সেই বিষয়ে বঙ্গজ মার্কীণপ্রেমীদের নিরবতা দেখে অবাক
হতে হয়। যদি ধরেই নেওয়া যায়, চীন গোটা জানুয়ারী কোন তথ্যই সরবরহ করে নি, তবে ২০শে জানুয়ারী
থেকে ৩১শে জানুয়ারী বিশ্বের প্রথম সারির আটটি দেশ ও ভারতবর্ষও কি তথ্য গোপন করে বসেছিল?
১২ই জানুয়ারীর চীনের সরবরাহ করা
করোনার জেনেটিক সিকোয়েন্সের উপর ভিত্তি করে সময় মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে টেস্ট কিট তৈরী
ও তা ঠিক মত প্রয়োগ ও ব্যবহার করতে পারলে, প্রথমেই করোনা বহনকারী রুগীদের চিহ্নিত করা
সম্ভব হতো। এই কাজটি ঠিকমত করতে পারলে সামাজিক সংক্রমণের হাত থেকে অনেক দেশই তার নাগরিকদের
রক্ষা করতে পারতো। ঠিক যেমনটি পেরেছে দক্ষিণ কোরিয়া। কিউবা। ভিয়েতনাম। জাপান। বাকি
দেশগুলি সেই পথে না গিয়ে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জারি করা সর্বচ্চো সতর্কতা “গ্লোবাল
হেল্থ এমার্জেন্সী’-কে উপেক্ষা করে পরবর্তী দুই মাস ব্যাপি সমানে আন্তর্জাতিক বিমান
পরিসেবার মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে ছড়িয়ে দিয়েছে প্রতিটি দেশে। এটাই সত্যি। গোটা ফেব্রুয়ারী
ও মার্চ মাস প্রতিটি দেশ আন্তর্জাতিক বিমান পরিসেবা বন্ধ করে দিয়ে নিজ নিজ দেশকে আইসোলেট
করে ফেললেই করোনার এই ব্যাপক সংক্রমণ থেকে আবিশ্ব মানুষকে রক্ষা করা যেত। এবং সেই ক্ষেত্রে
প্রায় কোন দেশকেই লকডাউনের পথে গিয়ে অর্থনীতিতে ধ্বস নামিয়ে আনতেও হতো না। না রাষ্ট্রপুঞ্জও
এই বিষয়ে নীরব থেকেছে। এবং বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের শাসক গোষ্ঠী অত্যন্ত সচেতন ভাবে
করোনাকে হাতিয়ার করে একদিকে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতিকে
ধরাশায়ী করার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেছে। এবং মানুষের নজর থেকে সেই সত্যকে লুকাতেই চীনের
নামে এই মিথ্যাচার রটিয়ে চীনকে ভিলেন বানানের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। চলছে চলবে।
চীনের প্রতি ষড়যন্ত্রের বিষয় নিয়ে
আমাদের কোন মাথাব্যথা নাই। সেটি চীনের অভ্যন্ত্ররীণ বিষয়। আমাদের মাথাব্যাথার কারণ
আরও গভীর। আসল সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার এই প্রবণতা শুধুই কি চীনকে ভিলেন বানানোর জন্য?
না কি দেশের জনসমষ্টিকেই ধোঁকা দেওয়া আসল উদ্দেশ্য। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ডোনাল্ড
ট্রাম্পের দায় আছে আমেরিকার জনসাধারণের নজরকে ঘুরিয়ে দেওয়ার। চীন সেখানে হাতের তুরুপের
তাস। আমরা আগেই বলেছি সেকথা। কিন্তু আমাদের দেশগুলিতেও সেই একই প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে
কেন? আমাদের সামনেই তো কোন নির্বাচন নাই। নাকি নির্বাচন যখনই থাকুক আর নাই থাকুক, করোনা
মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢাকার আন্তর্জাতিক তুরুপের তাসই চীনাতংক?
৭ই মে’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

