ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র


 

তার অপক্ষমব্যবহার এবং আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র


রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পৌঁছাতে জনদরদী কৃষকদরদী শ্রমিকদরদী সাজে নিজেকে রাঙিয়ে নিতে পারলে ক্ষমতায় পৌঁছানোর পথ অনেক মসৃণ হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় পৌঁছিয়ে গেলে অবশ্য দিনে দিনে মুখোশ উন্মোচিত হতে থাকলেও কোন অসুবিধা থাকে না। বিশেষ করে সমগ্র প্রচারযন্ত্রকে যদি নিজের ভেঁপু বাজানোর কাজে লাগিয়ে দেওয়া যায় সারাদিন সারা বছর। ক্ষমতায় থাকার কাজে পুলিশ মিলিটারী যতই আজ্ঞাবহ থাকুক, প্রচারযন্ত্রকে আজ্ঞাবহ করে রাখতে পারলে সোনায় সোহাগা। ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অধিকাংশ শাসকশ্রেণীরই এই পরিণতি হয়ে থাকে। এবং সেই অপব্যববহারের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ গড়ে উঠলেও সেই বিক্ষোভের আগুন যাতে সারাদেশে ছড়িয়ে না পড়ে, সেই বিষয়টা নিশ্চিত করতেই প্রচারযন্ত্রকে নিজের আজ্ঞাবহ করে রাখা এতটাই জরুরী। আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র সবসময় শাসকের হয়ে ঢাক ঢোল বাজাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই একই প্রচারযন্ত্র যদি শাসকের সব রকমের অপকর্ম ও অপশাসনের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তবে সাধারণ জনতার পক্ষে সেটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু দেশ ও জনতার সংকট তখনই আরও গভীর হয়, শাসকের আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র যখন ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা স্বতঃস্ফূর্ত জনবিক্ষোভকেও নানান ছল চাতুরী, মিথ্যা প্রচারের সাহায্যে দমন করতে উঠে পড়ে লাগে। এবং এই দমনমূলক আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র শাসন শোষণ ও নিপীড়নের কাজে লাগাতার কাজ করে যেতে থাকলে যে কোন দেশের মানুষের জীবন দিনে দিনে দুর্বিষহ হয়ে উঠতে বাধ্য।


ক্ষমতার অপব্যবহার আর আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র যখন পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলতে শুরু করে, তখন জনতার জীবনে গভীরতর সঙ্কট নেমে আসতে বাধ্য। বর্তমান ভারতবর্ষ এই ধরণের সঙ্কটের ভিতরেই আটকিয়ে পড়েছে। যে কোন আন্দোলনকে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে দেশবিরোধী রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলন বলে দাগিয়ে দেওয়া সেই সংকটেরই একটি দিক। আর আন্দোলন সরকারী আইন বিরেধী হলে তো কথাই নাই। সরকারের কথায় দুই বেলা ওঠবোস করাই যেখানে দেশপ্রেমের প্রমাণ, সেখানে পান থেকে চুন খসলেই বিপদ। একেবারে হারে রে রে করে তেড়ে আসবে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র। একই মিথ্যা একশ মুখে প্রচার করতে থাকবে। শুনতে শুনতে মানুষের অবচেতনে সেই অপপ্রচারই দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়ে যাবে। সেখানেই অত্যাচারী শাসক আর আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের যৌথ অভিযানের সাফল্য।


এর আরও একটি সুবিধার দিক রয়েছে। প্রচারযন্ত্রের কারসাজিতে জনতার অভিনিবেশ যেকোন দিকে ধরে রেখে অন্যদিকে জনবিরোধী দেশবিরোধী নীতি কিংবা আইন চালু করে দেওয়ার পথ সুগম হয়ে ওঠে অনেকটাই। দেশের সম্পদ লুঠের পক্ষেও জনতার চোখকানকে ইচ্ছামত দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে হাত সাফাইয়ের কাজগুলি সহজেই সম্পন্ন করা যায়। তাই ক্ষমতার অপব্যবহারের কাজে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের জুড়ি মেলা ভার।


বিগত ছয় সাত বছরে, দেশের সম্পত্তি নয়ছয়ের কোন হিসাব নাই। জনগণের কষ্টের অর্থ লুঠ করে নেওয়ারও সঠিক হিসাব নাই। হিসাব নাই সরকারী প্রতিষ্ঠান কেমন ভাবে জলের দরে বেচে দেওয়া চলছে, তারও। হিসাব নাই অসৎ উপায়ে কিভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ গায়েব হয়ে যাচ্ছে সরকারের মদতে। ব্যাঙ্কের পর ব্যাঙ্কে অনাদায়ী ঋণের বোঝা। সরকারের গুড বুকে থাকা ঋণখেলাপী শিল্পপতিরা কিভাবে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ধার নিয়ে গায়েব করে দিচ্ছে। কিভাবে কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত করে চলেছে এক একটা সরকারী নীতি পরিকল্পনা। হিসাব নাই কোটি কোটি রোজগেরে মানুষের বেকার হয়ে যাওয়ার সঠিক পরিসংখ্যানেরও। জনতার দৃষ্টিকে সেই একই সময়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের দিকে। নয়তো বিদেশী শত্রু দিকে। নয়তো জনতাকে ভিড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পরস্পরেরই অভিমুখে। আর এই কাজটি করার জন্যই নিয়োজিত আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র।


আবার এই আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রই ঠিক করে দিচ্ছে কে দেশপ্রেমী। আর কে রাষ্ট্রদ্রোহী। রাষ্ট্রদ্রোহের নতুন ণত্ব ষত্বও স্থির হয়ে গিয়েছে। কোনভাবে সরকারের সমালোচনা করলে বা সরকার বিরোধী আন্দোলনে সামিল হলেই, সেটাই এখন রাষ্ট্রদ্রোহ। এবং শুধু তাই নয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের বিরোধীতা করাও এখন দেশদ্রোহের নামান্তর। একমাত্র দেশপ্রেমী তারাই, যারা বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্লোগান দিতে দিতে দিন শুরু করবে আর শেষ করবে। আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের পাঠশালায় বাধ্য শিক্ষার্থীর মতো হোমটাস্ক সম্পন্ন করবে প্রতিদিন।  দেশপ্রমের এই নতুন ণত্ব ষত্বকে দেশ জুড়ে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে এই আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রই। সাধারণ মানুষের অবচেতনে সেই ণত্ব ষত্বই শেষ কথা হিসাবে জায়গা দখল করে নিচ্ছে। আর এইটিই হলো অন্ধভক্ত তৈরী করার আসল ফর্মুলা। আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের সাফল্য আবার এই অন্ধভক্ত তৈরীর সাফল্যের উপরেই নির্ভরশীল।


যে কোন দেশে যে কোন কালে স্বৈরতন্ত্রের উত্থানের পেছনে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের বিশেষ ভুমিকা থাকে। ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের সাফল্যেই ক্ষমতার অপব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবং সীমাহীন ক্ষমতা শাসককে বস্তুত অন্ধ করে দেয়। ক্ষমতার চুড়ান্ত অপব্যবহার শুরু হয়ে গেলে জনতার কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হবেই। সেটাকেই বলা যেতে পারে বয়েলিং পয়েন্ট। জনবিক্ষোভ দানা বাঁধে ঠিক এইভাবেই। এই পথেই। একমাত্র পাশবিক দমনমূলক নিপীড়নের পথ ছাড়া শাসকের সামনে তখন এগিয়ে চলার আর কোন পথই খোলা থাকে না। কারণ শাসকও জানে অন্য সব পথেই জনতা পিঠের ছাল তুলে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। তাই নিজেরই দেশবাসীর উপরে ভয়াবহ ভাবে নিপীড়ন শুরু না করলে শাসক বিরোধী জনবিক্ষোভ দমন করার আর কোন উপায় থাকে না কোন।


দিনের পর দিন ধরে সাফল্যের সাথে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্র কাজ করে চলতে থাকলে দেশের শাসক ও শোষিত উভয়েই এই পথে পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য। তার পরিণতি দেশ কাল ও অবস্থার উপরে নির্ভর করে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসক বা শাসক গোষ্ঠী কতদিন ক্ষমতায় থাকবে সেও এই সকল হিসাব নিকাশের উপরেই নির্ভরশীল।


এইভাবে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রই যখন শাসকের মুখ হয়ে ওঠে, তখন জনতাকে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে ভাগ করে দিয়ে পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য জনশক্তিকে খর্ব করে রাখা। স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি একমাত্র ভয় পায় এই জনশক্তিকেই। সেই কারণেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের একটা বড়ো কাজই হলো যেভাবেই হোক জনশক্তিকে খর্ব করে রাখা। জনতাকে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে ভাগ করে পারস্পরিক বিদ্বেষের ভিতরে আটকিয়ে রাখতে পারলেই কাজ হাসিল। তাই সেই ভাগ করে রাখা, এবং পারস্পরিক বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ করতে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রই ভরসা। এবং সব থেকে বেশি কার্যকারি।


ভারতবর্ষের বর্তমান রাজনৈতিক গতি প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য রাখলেই এই সকল বিষয়গুলি দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষে এত বিভিন্ন জাতির মানুষের বসবাস। এত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসবাস। এত নানান ধরনের গোষ্ঠীর বসবাস যে, জনতাকে নানাবিধ ভাগে পরস্পর বিভক্ত করে রাখা অনেক সহজ। এবং সময় ও সুযোগ মতো এক একটি ভাগের সাথে অন্য একটি ভাগের ভিতরে পারস্পরিক বিদ্বেষ চর্চার প্রক্রিয়াটুকু সহজেই শুরু করে দেওয়া যায়। এই যেমন ছাত্র আন্দোলনের সময়, বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত ছাত্রছাত্রীদেরকে পরস্পর বিদ্বেষী করে তুলে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামিয়ে দেওয়া। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত বিক্ষুব্ধ জনতাকে সাম্প্রদায়িক ভাবে বিভক্ত করে রেখে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া। কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে পথে নামা কৃষকদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে সাধারণ জনতার চোখে অপরাধী বানিয়ে তোলার প্রয়াস। এই সবই সেই শাসকের আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের কাজ। শাসক যখন ক্ষমতার অপব্যবহারকেই শিরধার্য্য করে নেয়, তখনই সেই অপব্যবহারের কাজে, আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রকেই সে সকলের আগে কাজে লাগিয়ে দেয়। এই যে একটা পদ্ধতি। এটাই বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম অবয়ব।


২রা ফেব্রুয়ারী’ ১৪২৪


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত