নারীবাদ পূনর্নিমাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নারীবাদ পূনর্নিমাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

নারীবাদ পূনর্নিমাণ



নারীবাদ পূনর্নিমাণ

ভুমিকা

নারী মাত্রেই নারীবাদী নন। নারীবাদী মাত্রেই নারী নন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজবাস্তবতায় নারীবাদ নারীর অন্তিম অর্জন না প্রাথমিক শর্ত সেই নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু এটা খুব সত্যি, নারীবাদ পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীর অন্যতম প্রতিরোধ। কিন্তু বর্তমান ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বিশ্বে নারীবাদ কি আদৌ নারীর রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পেরেছে? এই প্রশ্নগুলির সাথে আমরা কতটুকু পরিচিত। আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের সাথে এই প্রশ্নগুলিই বা কতটুকু সংশ্লিষ্ট? আমি বলছি আমাদের সাধারণ জনসাধারণের কথা। আমাদের দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনচর্চার সামাজিক পরিসরে নারীবাদের প্রাসঙ্গিকতাই বা কতখানি? এবং নারী নিজে কি ভাবে দেখে থাকে এই বিষয়গুলি? না বিষয়টি এতটাই ব্যাপক ও বৈচিত্রময় যে, এক কথায় এর কোন উত্তর হয় না। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের পরিসরে, আমাদের সামজিক রীতিনীতির পরতে পরতে উত্তর রয়ে গিয়েছে প্রতিটি প্রশ্নেরই। পিতৃতন্ত্রের স্বরূপ ও ইতিহাস নির্ণয়ের দিকে না গিয়েও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কালের নিয়মেই পিতৃতন্ত্রের প্রকরণ ও অনুষঙ্গেও বদল ঘটেছে বিস্তর। আধুনিক প্রযুক্তির বিপ্লব ও ধনতন্ত্রের একচ্ছত্র বিশ্বায়নেই ঘটেছে এই পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তন কতটা পিতৃতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ প্রকৃতিগত আর কতটা বাইরের সরূপগত সেটি বিতর্কের বিষয় অবশ্যই। তবে একথা বলা যায়, আবিশ্ব বিভিন্ন দেশেই নারী সুরক্ষার বিষয়ে নতুন নতুন আইন প্রণয়ন দিনে দিনে নারীবাদীদের হাত শক্ত করে পিতৃতন্ত্রের আস্ফালনে কেবলই লাগাম পড়ানোর চেষ্টা করে চলেছে। কাজের কাজ কতটুকু হচ্ছে আর হচ্ছে না সেটি পরের বিষয়। কিন্তু এই যে নারী সুরক্ষা বিষয়ক  বিভিন্ন আইন তৈরী হওয়া, এটি কিন্তু আবিশ্ব নারীবাদের প্রসারের সরাসরি অভিঘাত। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ও সমাজ বাস্তবতায় এই অভিঘাতের ধরণ ও পরিমানও ভিন্ন। এক দেশের সাথে আরেক দেশের এই বিষয়ে যে পার্থক্য থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নারীবাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলির বাইরেও একটি পরিসর রয়ে যায়। যেখানে অর্থনৈতিক স্বাধিকারও একটি নারীর স্বঅভিভাবকত্ব সুনিশ্চিত করতে পারে না। এই না পারার কারণগুলিই পর্যালচনা করা সবচেয়ে বেশি জরুরী। সাধারণ ভাবে আর্থিক স্বনির্ভরতাই যেখানে নারীমুক্তির চাবিকাঠি, সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি যে দেশে দেশে সমাজে সমাজে ভিন্ন এবং এক একটি ক্ষেত্রে সম্পূর্ণতই বিপ্রতীপ অবস্থানে অবস্থানরত সেকথা কম বেশি আমরা জানি সকলেই। কিন্তু কেন হয় এরকমটি? অনুসন্ধান করে দেখা দরকার সেটাও।

উন্নত বিশ্বের সমাজ ও অনুন্নত বিশ্বের সমাজ বাস্তবতার ভিন্নতার কারণে দুই সমাজের নারীবাদের প্রকৃতি ও নারীর প্রকৃত অবস্থান ভিন্নরূপ হতে বাধ্য। আবার বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও জাতপাতের বিভেদ এবং অর্থনৈতিক শ্রেনীবিন্যাস এই পার্থক্যগুলির পিছনেও কাজ করতে থাকে। সামাজিক পরিকাঠামোয় একটি মেয়ে কিভাবে বেড়ে উঠবে, কিভাবে তার চিন্তা চেতনার প্রকাশ ঘটতে থাকবে, এবং বংশগত ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার কিভাবে তার সংস্কার ও বিশ্বাসকে রূপ দিতে থাকবে; এই সবগুলি বিষয়ই হিসাবের মধ্যে ধরতে হবে। আর এই বিষয়গুলি দেশ সমাজ ও সম্প্রদায়গত ভাবে এতই বৈচিত্রপূর্ণ যে নারীবাদের প্রকৃতি ও নারীর প্রকৃত অবস্থানও এত বিভিন্ন রকমের। কিন্তু মুশকিল ঘটে তখনই, যখন আমারা এই জটিল বিষয়টিকে একরৈখিক মাত্রায় সরল করে নিয়ে দেখতে ও দেখাতে যাই। তাই শুধুমাত্র আর্থিক স্বনির্ভরতাই নারীর স্বঅভিভাবকত্ব নিশ্চিত করতে পারে না। পাশ্চাত্য সমাজে নারীর অবস্থান ও প্রাচ্যের নারীর অবস্থানজনিত কারণে এই দুই সমাজের নারীবাদের প্রকরণও ভিন্ন। কিন্তু যাঁরা সেটি বিস্মৃত হয়ে আন্তর্জাতিক নারীবাদের প্রবক্তা হয়ে উঠতে চান, তাঁরা ভুল করেন প্রথমেই। ইউরোপ আমেরিকার মেয়েদের সাথে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মেয়েদের সংস্কার ও বিশ্বাস, চাহিদা ও প্রত্যাশার ভিন্নতা খুবই সুস্পষ্ট। সেই বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করা যাবে কি করে। তাই বস্তুত আন্তর্জাতিক নারীবাদ বলে কিছু হয় না। এক একটি দেশে, রাষ্ট্রে, সমাজে ও সম্প্রদায়ে এবং জাতিগত গোষ্ঠীতে নারীর অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন। তার জীবনবোধ ও মূল্যবোধও বিভিন্ন। তার সমস্যা ও সম্ভাবনার দিগন্তও বিশিষ্ট রকমভাবেই ভিন্ন। তাই তাদের চেতনায় নারীবাদ কখনোই একরৈখিক হতে পারে না। আমাদের সেই সত্যটি অস্বীকার করলে চলবে না কিছুতেই। এবং এর সাথে যুক্ত করতে হবে যুগলক্ষ্মণকেও। অর্ধ শতাব্দী পূর্বের নারী আর আজকের নারীর ভুবন, সে- যে দেশগত ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারই বহন করুক না কেন; এক নয় কখনোই। তাই নারীবাদও পাল্টাতে থাকে, থাকবে দশক থেকে দশকে।

নারী ও পিতৃতান্ত্রিক ঘেরাটোপ

পিতৃতন্ত্রের মধ্যেই সবচেয়ে মুখ্য যে বিষয়টি সুপ্ত ভাবে লুকিয়ে থাকে,সেটি হল নারীগর্ভের উপর পুরুষের সত্ত্বাধিকার। কম বেশি, দেশ কাল সমাজ নিরপেক্ষ ভাবে সবখানেই এটাই প্রতিষ্ঠিত সত্য। এবং মানব সভ্যতার আরও বিশেষ করে বললে বলা যায় এইটিই আধুনিক মানব সভ্যতার মূলস্বরূপ। বয়সসন্ধির পরপরই ছেলে মেয়ে উভয়ই এই বিষয়টি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে যায়। সচেতন হয়ে যায় এমন ভাবেই যে বিষয়টি তাদের বিশ্বাস ও সংস্কারের ভিতের মধ্যেই দৃঢ় হয়ে গেঁথে যায়। তাই এই নিয়ে প্রশ্ন করার সচেতনতা জন্মায়ই না সাধারণত। জল হাওয়া মাটি আকাশের মতোই স্বতঃসিদ্ধ সত্য হয়ে যায় তাদের কিশলয় ধারণায়। আর সেই বিশ্বাসই তাদের আজীবন সংস্কারে পরিণত হয়ে ওঠে যৌবন পর্বেই। নারীবাদ এই বিশ্বাস ও সংস্কারকেই প্রশ্ন করে। যে বা যারা সেই প্রশ্নের সরিক হয়ে উঠতে থাকে, সমাজ সংসার তাদেরকেই নারীবাদী বলে দেগে দিতে চায়। দেগে দেয়ও। বিশেষত আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে পারিবারিক সংস্কৃতি ও সমাজিক রীতিনীতিগুলি এমনভাবেই ছেলেমেয়েদের উপর খবরদারি করতে থাকে যে, তাদের স্বাধীন চিন্তার ও অনুভববের পরিসরটিই ক্রমে সংকুচিত ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে থাকে। তাই তারা প্রশ্ন করতে ভুলে যায়। একটি মেয়ে বা ছেলে এই রকম অবরুদ্ধ পরিসরে বেড়ে উঠতে থাকে বলেই পিতৃতন্ত্রের ভিতটা এতটাই মজবুত থাকে। আর সেই মজবুত ভিতটাই মেয়েদরকে গুরুত্বপূর্ণ জীবনপ্রশ্নগুলি থেকে দূরবর্তী করে রাখে। তাকে নির্বাক নিরব করে গড়ে তোলে। মেয়েরা শিখে যায়, না- প্রশ্ন করতে নাই। চিন্তা করতে নাই। অন্যরকম ভাবে ভাবতে নাই। অন্যরকম হতে নাই। এই নিরব আত্মসমর্পণ, পিতৃতন্ত্রের আধিপত্যের কাছে, এটিই তৃতীয় বিশ্বের মেয়েদের আসল ইতিহাস। এবং বর্তমানও। হ্যাঁ প্রযুক্তি বিপ্লবের এই একুশ শতকেও। এই যে অন্যরকম হতে নেই, এই যে সংস্কার এইটিই একটি মেয়েকে নিরব করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ। আর তারপরেও যদি কাজ না হয়, তাহলেই সেই মেয়েটিকে দেগে দেওয়া যাবে নষ্ট তসলিমা বলে। এইটিই পিতৃতন্ত্রের রাজনৈতিক ছক। কজন মেয়ের মধ্যে সেই মানসিক শক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তা আছে, যে এই ছকের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে? বেড়িয়ে আসতে চাইবে চেনা এই ছকের ঘোরতর বাস্তবতার থেকে? মেয়েরা সাধারণতঃ এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাই অন্যরকম হতে চায় না। বরং কেবল একটি দরদী পুরুষের স্বপ্ন দেখতে চায়, যে আদরে সোহাগে সুরক্ষিত করে রাখবে তার প্রেয়সীর জীবন। সেটাই তো ভালোবাসার মাপকাঠি। আমাদের সমাজ সংসার সেই মাপকাঠিটিই প্রতিটি মেয়ের চেতনায় গেঁথে দেয় সফল ভাবে। কেননা তবেই সেই মেয়েটির গর্ভের উপর পিতৃতন্ত্রের সত্ত্বটুকু আরোপ করা যাবে সহজে ও নিশ্চিন্তে।
আর তাই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের এই দেশগুলিতে আর্থিক স্বনির্ভর নারীও অন্যরকম করে ভাবতে পারে না। অন্যরকম হয়ে উঠতে চায় না। যেখানে সে তার গর্ভের উপর পিতৃতন্ত্রের সত্ত্বাধিকার আরোপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে নিজের মতো করে। বই পড়ে নারীবাদী তত্ব মুখস্থ করে নয়, বা নয় সেমিনারে শোনা নারীবাদের আলোচনাকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে। সেইখানে নিজেকে দেখার মতো সাহস ও অধ্যাবসায় নিরানব্বই শতাংশ নারীরই থাকে না। উচ্চশিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা যতই থাকুক না কেন। আর সেইখানেই কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিকত, কি আর্থিক স্বয়ম্ভর, কি স্বামীর অর্থে প্রতিপালিত; সব নারীর চেতনাতেই চলতে থাকে পিতৃতন্ত্রের আরোপিত কার্ফিউ। বরং যে মেয়ে যতবেশি শিক্ষিত ও আর্থিক সয়ম্ভর সে তত বেশি তার থেকে শিক্ষিত ও অর্থবান মনের মানুষ কল্পনা করতে থাকে। যার আদরে সোহাগে সুরক্ষার নিশ্চয়তার নিশ্চিত পরিসরে তুলে দিতে পারবে আপন নারীগর্ভের স্বত্তাধিকার সম্পূর্ণ করে। হ্যাঁ নিরানব্বই শতাংশ নারীই এইখানেই নারী জন্মের মূল সার্থকতা খুঁজে পেয়ে কৃতার্থ হয়ে যায়। ঘটনাচক্রে যাদের জীবনে এই প্রত্যাশা এইরকম মসৃণ ভাবে পরিপূর্ণ হয় না, তারাই বিলাপ করতে থাকে নারী হয়ে জন্মানোর জন্যে। দোষারোপ করতে থাকে আপন ভাগ্যের উপর। তবুও অন্যরকম হয়ে উঠতে পারে না। ভাবতে পারে না অন্যভাবে। অনুধাবন করতে পারে না, গণ্ডগোলটা ঠিক কোথায় ঘটে গিয়েছে। কিভাবে ঘটেছে, বা কেনই বা ঘটলো। এই সমাজ বাস্তবতায় আমাদের দেশীয় পরিস্থিতিতে নারীবাদের চর্চা নেহাৎই ইউরোপ আমেরিকা থেকে আমদানী করা শৌখিন অবসর বিনোদন মাত্র। কিংবা কখনো সখনো সেটাই খ্যাতির চৌকাঠে পা রাখার কৌশল বা পেশাগত দক্ষতা পরিচর্যার একটি মাধ্যম মাত্র।
না নারীর এই অক্ষমতার কারণ নারী নয়। একেবারে শৈশব থেকেই মেয়েদেরকে গড়ে তোলার সাংসারিক ও সামাজিক প্রকরণই এই ঘটনার জন্যে দায়ী। আমাদের সমাজে আমরা মেয়েদেরকে সর্ববিষয়ে খাটো করে গড়ে তুলি। কে কত কলেজ বিশ্বাবিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জন করলো, কিংবা নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতায় কত পারদর্শী হয়ে উঠলো সেটাই শেষ কথা নয়। যে আত্মপ্রত্যয় ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের নির্যাসে স্বাধীন ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে আমাদের সমাজে আমাদের সংসারে মেয়েদেরকে সচেতন ভাবেই তার থেকে অনেক দূরবর্তী করে রেখে দেওয়া হয়। স্বাধীন ব্যক্তিত্ব বলতে ইচ্ছে মতো পেশা নির্বাচন কি স্বামীর অর্থে খেয়াল খুশির মতো শপিং করতে পারাই বোঝায় না। স্বাধীন ব্যক্তিত্ব তাই, যা একটি মানুষকে তার দেহ মন সত্ত্বার কোনটিকিই কোনদিন কোন ভাবে কোথাও কারুর কাছে বন্ধক দিতে প্ররোচিত করে না। এই যে স্বাধীন ব্যক্তিত্ব, দুঃখের বিষয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অনুন্নত সমাজব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ করা যায় কদাচিৎই। আর করলেই সমাজ তাকে একঘরে করতেই উঠে পড়ে লাগে। তাই এই দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে নারীর দশা দশচক্রে ভগবান ভুতের মতো আজো।

পিতৃতন্ত্রের এই ঘেরাটোপে নারীকে খর্ব করে রেখে নারীর গর্ভের উপর পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার কায়েম রাখার আবহমান সংস্কৃতির সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ারই হলো সাম্প্রদায়িক ধর্ম। কম বেশি সকল ধর্মই এই অপকর্মে যথেষ্ঠ পরিমাণে কার্যকরি। এবং পারদর্শী। আজকের প্রযুক্তির এই অভুতপূর্ব সাফল্য ও অগ্রগতির যুগেও সাম্প্রদায়িক ধর্ম নারীর উপর পিতৃতন্ত্রের কর্তৃত্ব কায়েম রাখার বিষয়ে প্রবলভাবেই শক্তিশালী। তাই ধর্ম ও পিতৃতন্ত্র এই বিষয়ে একে অপরের পরিপূরক। আর লিঙ্গরাজনীতির শুরুই এই দুইয়ের অশুভ আঁতাত থেকে। তাই ব্যক্তিগত ভাবে যে কোন নারীর পক্ষেই এই অসম লড়াইয়ে জয়ী হওয়া প্রায় অসম্ভব। আর সেই জন্যে তো নারীবাদকে সেই অসম্ভব কাজটিতে মেয়েদেরকে প্রয়োজনীয় শক্তি যোগানোর কাজে স্বচেষ্ট হতে হয়েছে। আরও বেশি করে হতে হবে। আরও বেশি করে হতে হবে কারণ বিষয়টি, আগেই দেখানো হয়েছে আদৌ এক রৈখিক কোন সমস্যা নয়। তাই পথ ও পদ্ধতি সকল সমাজেই সকল সম্প্রদায়েই একরকমও হতে পারে না। সেই কারণেই নারীবাদকেও হয়ে উঠতে হবে আরও বেশি বাস্তববাদী। এখানে আবেগ সর্বস্ব শ্রেয়বাদের ভুমিকা যত কম হয় ততই ভালো। বাস্তব পরিস্থিতির মোকাবিলায় বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা কেন্দ্রিক বিবেচনার প্রয়োজন। প্রয়োজন নারীশিক্ষা বিস্তারের মধ্যে দিয়েই কাজ শুরু করা। নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার নিশ্চয়তা বৃদ্ধির সাথে তার আত্মপ্রত্যয়ের উদ্বোধনে কাজ করে যেতে হবে নারীবাদকে। এক এক অঞ্চলে এক এক ভাবে। আত্মপ্রত্যয়ের উদ্বোধনের পথেই অর্জিত হবে আত্মশক্তি। লিঙ্গরাজনীতির ঘেরাটোপ কেটে নারীমুক্তির জন্যে যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। একমাত্র তখনই পিতৃতন্ত্রের আস্ফালন ও আধিপত্যের কাছে নিঃশর্ত ও নিরব আত্মসমর্পন না করেও নারী তার নিজস্ব ভুবনে লড়াই করে বেঁচে থাকার সাহসটুকু খুঁজে পাবে। সেইদিনই একজন নারীর কাছে মুক্তির দিন। গর্বিত হওয়ার দিন। পথ দেখানোর দিন বাকিদেরকে।


নারীজন্ম ও ব্যক্তিস্বাধীনতা

আধুনিক সমাজ সভ্যতায় নারীর অবস্থান সব দেশেই অল্পবিস্তর দ্বিতীয় সারিতে। দ্বিতীয় সারি কারণ আবিশ্ব পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সংসার থেকে সামাজিক পরিকাঠামোয় এবং রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক স্তরে সর্বত্রই পুরুষতন্ত্রের হাতেই মূল কর্তৃত্বের চাবিকাঠি। ব্যক্তি নারীকে এই পরিসরেই তার ব্যক্তিস্বাধীনতাকে রচনা করে নেবার জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যেতে হয় আজীবন। ঘরে বাইরে সর্বত্রই তাকে এই পুরুষতন্ত্রের চোখ রাঙানির আশংকাকে মাথায় রেখেই চলাফেরা করতে হয় নিজের ব্যাক্তিস্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েই। ফলে নিজের ব্যাক্তিস্বাধীনতাকে নিজের ইছামতো কার্যকর করা সম্ভব হয় না অধিকাংশ নারীর পক্ষেই। এই পরিসরেই সম্বচ্ছর নারীদিবস পালিত হচ্ছে বিশ্বজুরে কিন্তু এখন প্রশ্ন হল প্রতি বছর নারীদিবসের এই আনুষ্ঠানিকতায় নারীর ব্যাক্তি জীবনে কতটুকু সুফল ফলেছে। বা ফলেছে কিনা আদৌ?

অনেকেই বলবেন কেন ঘরে ঘরেই তো এযুগের নারীরা যথেষ্ঠই স্বাধীনতা ভোগ করে চলেন। এখানে একটা বিষয় বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করার আছে। ‘যথেষ্ঠ স্বাধীনতা’ আর ‘ভোগ করে চলেন’। যথেষ্ঠ অর্থাৎ সম্পূর্ণ নয়। সম্পূর্ণ নয় কেন? কারণ, এটা অর্জিত স্বাধীনতা নয়। পুরুষতন্ত্র স্বাধীনতার যতটুকু পরিসর যখন যেমন যেখানে যেমন দিয়েছে বা দিচ্ছে নারীকে,ঠিক ততটুকুই। তার বেশি নয় মোটে। এবং দ্বিতীয় যে কথাটি  বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় সেটি হল ঐ ‘ভোগ করে চলেন’ যেন এটা তাদের ভোগ করার কথা নয়,অথচ সমাজ এখন তাদের এটা ভোগ করতে দিচ্ছে। এই দেওয়ার মধ্যে সমাজের যেন একটা বদান্যতাই প্রকাশ পাচ্ছে। লক্ষণীয় হল এইটাই যে এইটিই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন। আমাদের গোটা সমাজটাই  নারীস্বাধীনতার বিষয়ে অল্পবিস্তর এই মনোভভাব পোষণ করে। আর ঠিক এই জায়গাতে এসেই ঠোক্কোর খায় নারীস্বাধীনতার মূল বিষয়টি।

আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ঘর সংসারের পরিধিতেই নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার বাস্তব প্রেক্ষাপটটি তৈরী হয়ে যায়। গৃহস্থলীর পরিসরেই শৈশব থেকেই শিশুর ধারণায় পিতা মাতার ব্যক্তিস্বাধীনতার পৃথক ধরণটি মনের মধ্যে গেঁথে যায়। এবং বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথেই সেই ধারণাগুলি আরো পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে চেতন অবচেতন মনের চৌহদ্দিতে। যার থেকে আমরা সহজে আর বেরতেই পারি না। ফলে প্রেম বিবাহ ঘরসংসার সন্তান মানুষ করা থেকে সমাজ সংসারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই ধারণাগুলিই আমাদের পরিচালিত করতে থাকে,কি নারী কি পুরুষকে।

বস্তুত আমাদের ব্যক্তিজীবনে পুরুষ তার ব্যক্তিগত মনোবৃত্তির আঙিনায় তার ভালোবাসার নারীকে,সে তার স্ত্রী কিম্বা কন্যা যাই হোক এমনকি জননী হলেও,যতখানি ভালোবাসতে পারে,ততখানিই স্বাধীনতা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ বর্তমান যুগে নারীর ব্যাক্তিস্বাধীনতার প্রাথমিক পরিসরটিই নিয়ন্ত্রিত হয় তারই ভালোবাসার পিতা কিম্বা স্বামী এমনকি পুত্রের হাতে। আর এখানেই নারীর ব্যাক্তিস্বাধীনতার ধারণাটি সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা খায়। আপাত দৃষ্টিতে মনে হওয়া স্বাধীনতাটি যে ঘরের পুরুষের নিয়ন্ত্রাণাধীন বা ইছাধীন সেকথা আমাদের অনেকেরই খেয়াল থাকে না স্বভাবতই। সমাজচর্চিত নারীবাদের অসারতার এইটি একটি দুঃখজনক দিক। দুঃখজনক কেননা নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণাটি তার ঘরেই সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হতে থাকে। অথচ ওপর থেকে আমরা টের পাইনা তেমন। হ্যাঁ যে সব সংসারে নারী দৃশ্যতই অবরূদ্ধ,সরাসরি পুরুষের অঙ্গুলি হেলনে ওঠা বসা করতে বাধ্য হয় প্রতিনিয়ত,তাদের কথা আলাদা,সেখানে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাবটি স্পষ্টতই ধরা পরে। বোঝা যায়। কিন্তু তথাকথিত প্রাগ্রসর পরিবারেও নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার সুতোটি যে ঘরের পুরুষদেরই হাতে থাকে সেকথা খোলা চোখে ধরা পরে না অধিকাংশ সময়েই।

অথচ দৈনন্দিন জীবন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক স্তরে নারীবাদের আবিশ্ব প্রচার ও উন্মাদনাতেও আমাদের ঘরগেরস্থলীতে নারীর ব্যাক্তিস্বাধীনতার পরিসরটি যেখানে যেমন,সেখানে ঠিক তেমনই দাঁড়িয়ে থাকে। তাতে আমাদের বিন্দুবিসর্গও কোনো পরিবর্ত্তন হয় না। না মনে না চেতনায়,না জীবনবোধের দীপ্তিতে না কর্ম পদ্ধতিতে। ফলে ঘরসংসারের চৌহদ্দিতেই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে নারীবাদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। এই ধারণাটিকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বের করে নিয়ে এসে আমাদের মন মনন মানসিকতার পরিবর্ত্তনের কাজে লাগাতে হবে অত্যন্ত সদর্থক ভাবে। মনে রাখতে হবে আমাদের চেতনার আমুল পরিবর্ত্তন ব্যাতিরেখে নারীবাদের  প্রাসঙ্গিকতা সার্থক করে তলা যাবে না কিছুতেই।

এখন কিভাবে সম্ভব চেতনার এই আমুল পরিবর্ত্তন? শুরু করতে হবে সেই ঘরগেরস্থলী থেকেই। শুরু করতে হবে শিশুর শৈশবের পরিসর থেকেই। শিশুর সামনে পিতা মাতার সমান ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিসরটিকে প্রথমাবধি নিশ্চিত করতে হবে। পারস্পরিক নির্ভরতার সৌহার্দ্যের বাতাবরণটি পারস্পরিক শ্রদ্ধার বেদীমুলে যত দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে,তত সুন্দর ভাবেই গড়ে উঠবে শিশুর চেতনায় পিতা মাতার সমান ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণাটি। শৈশবের এই পরিবেশের প্রভাব শিশুর চেতনায় যে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে,তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে তার ঐ মন মনন মানসিকতার ভিত,যার উপর দাঁড়িয়ে থাকবে তার পরবর্তী জীবনের নারীস্বাধীনতার চেতনার মুল ধারাটি। ঘরে ঘরে এই ভাবে শৈশব থেকেই চেতনার বিকাশ সংঘটিত হলেই সামাজিক পরিসরের অনেক বড়ো গণ্ডিতেই সার্থক হয়ে ওঠার সুযোগ থাকবে নারীবাদের সাফল্য ও তার প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি।

ফলে ভবিষ্যতের নাগরিকদের সঠিক ভাবে গড়ে তোলার মধ্যে দিয়েই নারীর ব্যাক্তিস্বাধীনতার বিষয়টি সুনিশ্চিত হতে পারে। এখন দেখতে হবে কিসের উপর ঘর গেরস্থলীর চৌহদ্দিতে নারী পুরুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়টি নির্ভরশীল? আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঘর সংসারের আর্থিক ব্যায়ভারের দায়িত্বটি যেদিন থেকে পুরোপুরি পুরুষের কাঁধে ন্যাস্ত হয়েছিল মূলত সেইদিন থেকেই নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়টি গুরত্বহীন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সাংসারিক আর্থিক স্বাধীনতা পুরুষের করতলগত হওয়াই নারীর ব্যাক্তিস্বাধীনতার পরিসরটিকে সংকুচিত করে দেওয়ার মূল কারণ। আর এই কারণেই মেয়ের বিয়েতে আর্থিক সচ্ছ্বল পাত্রের খোঁজ পড়ে এত বেশি। এটাই ধরে নেওয়া হয় সংসারের আর্থিক ব্যায়ভার পুরুষের এক্তিয়ার ভুক্ত,আর ঘরগেরস্থলী সামলানোর দায়িত্ব নারীর। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য আর্থিক স্বনির্ভরতা যেহেতু সবচেয়ে বড়ো বিষয়,সেইহেতু সংসারে পুরুষের একাধিপত্য নারীর ব্যাক্তিস্বাধীনতার পরিসরটিকেই সংকুচিত করে দেয়। বর্তমানে দিন অনেক বদলিয়েছে। ঘরে ঘরেই স্বামীস্ত্রী উপার্জনশীল,তথাপি পুরুষ একাধিপত্যের চিত্রটি কিন্তু এতটুকু বদলায়নি। তার আরো দুইটি কারণ রয়েছে। প্রথমত দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বামীর রোজগার স্ত্রীর রোজগারের থেকে বেশি হওয়ার ফলে সংসারের নীতি নির্ধারণ থেকে সংসার পরিচালনা,গুরুত্বপুর্ণ সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ,সব বিষয়েই স্ত্রী স্বামীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল,যার ফলে স্ত্রীর ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিসর স্ত্রীর নিজের গরজেই সংকুচিত। দ্বিতীয়ত,সামাজিক পরিসরে পুরুষ একাধিপত্যের প্রভাবে এবং আজন্ম লালিত চেতনায়,আর্থিক ভাবে বলশালী পুরুষ নারীর ব্যক্তিসাধীনতাকে স্বীকার করতেই রাজী নয়। ফলত এই বিষম ব্যাক্তিস্বাধীনতার পরিসরটিকে দ্রুত বদলাতে না পারলে সমাজ সংসারের পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন সম্ভবই নয়।   
       
তাই নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নটি নির্ভর করছে আর্থিক স্বনির্ভরতা,নারী পুরুষের ভিতর স্বাধিকারবোধের ও সাম্যের প্রতিষ্ঠার উপরেই মূলত। আমাদের সামাজিক পরিসরে তাই এই বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির আশু প্রয়োজন। তবেই নারীবাদের প্রাসঙ্গিকতার সাফল্য ও নারীদিবসের সার্থকতা। সমাজের সকল স্তরেই নারীর অবস্থার উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক ভাবে কাজ করে যেতে হবে। আর সেই কাজের সাথে নারীর চেতনার বিকাশের ধারাটিও উন্মুক্ত রাখতে হবে নিরন্তর। নারীকে বুঝতে হবে জীবনযাপনের জন্যে পুরুষ নির্ভরতার ধারণাটিও বদলানোর সময় এসেছে আজ। একজন পুরুষ যদি স্বউপার্জনে একটি গোটা সংসারের ভার নিতে পারে,তবে একজন স্বনির্ভর নারীও তাই পারে। আর সেই ক্ষেত্রে কোনো পুরুষের একাধিপত্যের অধীনেও তার থাকার প্রশ্ন নেই। বরং পুরুষকেই সে নির্ভরতা দিতে সক্ষম। এই সক্ষমতার চর্চাই নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতাকে বরং সুনিশ্চিত করবে। এই বিশ্বাসের দৃঢ়তাই নারীকে দেবে আপন ভাগ্য জয় করার শক্তি।

এইভাবে নারী যত শক্তিশালী হয়ে উঠবে নারীর সম্বন্ধে পুরুষের চেতনায় ততই সম্ভ্রমবোধ জেগে উঠবে। যে সম্ভ্রমবোধের দীক্ষায় নারীর প্রতি আচরণে ব্যাবহারে পুরুষ আরো মানবিক হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। সক্ষম হবে তার সেই ঘরসংসারের চৌহদ্দি থেকেই। আর যার প্রভাব পড়বে সমাজের সকল স্তর থেকে রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর অলিন্দ হয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরের উন্মুক্ত গণ্ডিতেও। নারীবাদের মূল প্রাসঙ্গিকতা সেখানেই।


নারীর অধিকার

কোন নারী যখন প্রশ্ন তোলে পুরুষ পরস্ত্রীর সাথে বা বহু নারীর সাথে যৌন সুখ উদযাপন করলে দোষ নেই অথচ নারী বহু পুরুষের সাথে যৌন আনন্দ উপভোগ করলেই সমাজ সংসার রসাতলে চলে যায়,এ কেমন বিচার,তখন শুধু মাত্র পুরুষ সত্ত্বায় নয় একজন মানুষ হিসেবেই নিরুত্তর হয়ে যেতে হয় এক অমোঘ অপরাধ বোধে। অপরাধ বোধ সমস্ত মানুষের হয়েই,অপরাধ বোধ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ সভ্যতার উত্তরাধিকারেই। তখন আর এই কথা বলে আত্মপ্রবঞ্চনার ঝুলিটি বোঝাই করতে ইচ্ছে হয় না যে,বহুগামি যৌনতা সমাজ সংসারের পক্ষে শুভ নয় আসলে। কিন্তু কেন শুভ নয়? পিতৃতান্ত্রিক বন্দোবস্তের ভিতটাকে মজবুত রাখতে? যে কাজ পুরুষের পক্ষে ততটা দোষাবহ নয় সেই একই কাজ নারীর দ্বারা সংঘটিত হলেই সে সমাজের চোখে স্বৈরণী বলে প্রতিপন্ন হবেই বা কেন? কেন পুরুষের বহুবিবাহের সমাজ স্বীকৃত কালেও বহুগামি পুরুষে সমাজ যখন রসাতলে যায়নি,তখন নারীর ক্ষেত্রেও কেন একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না? এ কেমন বিচার? এই কথা,এই প্রশ্ন তুললেই বা কেন একজন নারীকে তসলিমা নাসরিন বলে দোষারোপ করা হবে? সেই মানুষটি সততার সাথে পুরুষের গণ্ডীতে সদর্পে প্রবেশ করেছিলেন পুরুষের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্মণ রেখা ডিঙ্গিয়েই বলেই কি? এই ঔদ্ধত্ব বরদাস্ত করতে রাজী নয় পিতৃতন্ত্র।

না পিতৃতন্ত্র নারীকে কোনদিনও সেই অধিকার দেবে না,যে অধিকার বলে সে আবহমান কালব্যাপি সময়সীমায় নারীকে উপভোগ করে এসেছে তার অদম্য যৌন তারণায়। এইটাই তো স্বাভাবিক। এইটাই ক্ষমতাচর্চার চাবিকাঠি। নয় কি? এই যেমন বিশ্বে প্রথম পরমাণু শক্তিধর দেশ ও ইতিহাসে একমাত্র পরমাণু বোমা নিক্ষেপকারী দেশ মার্কীণ যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে, কে পরমাণু শক্তি অর্জন করবে আর কে করবে না,কোন দেশকে পরমাণু বোমা বানানোর মিথ্যে দোষারোপ দিয়ে গোটা দেশটাকে নরক বানিয়ে দেবে তা একাই  ঠিক করে দিয়ে থাকে,ঠিক সেই রকমই। কারণ আবিশ্ব শোষণবাদী এই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রটি জানে যতদিন বিশ্বক্ষমতার ভারসাম্য তার দিকেই ঝুঁকে থাকবে,ততদিনই সে আবিশ্ব শোষণ ব্যবস্থাকে কায়েম রাখতে পারবে। ধরুন আপনার লোকালয়ে সবচেয়ে বড়ো যে মস্তান সে ঠিক করে দিল,সে বাদে আর কারুর বাড়ির দরজায় খিল থাকবে না,বাজারে তালা চাবি বিক্রয় নিষিদ্ধ। কেউ বাড়িতে লাঠিসোটা দা কাটারি রাখতে পারবে না! মার্কীণ যুক্তরাষ্ট্রের আবিশ্ব পরমাণু বোমা বানানোর নিষেধাজ্ঞাও ঠিক সেই রকমেরই। আর এইটিই ক্ষমতাচর্চার মূল চাবিকাঠি। যে দেশ হিরোশিমা নাগাসাকি উড়িয়ে দিয়েও লজ্জিত নয়,নয় ক্ষমাপ্রার্থী,সেই দেশই ঠিক করে দিচ্ছে কোন দেশ পরমাণু শক্তিধর হবে আর হবে না। এইটাই জগতের নিয়ম। কারণ ক্ষমতাধরের সবসময় ভয় থাকে ক্ষমতা হারানোর। তাই সে প্রাণপনে চেষ্টা করে, সে যাকে শোষণ করছে,সে যেন ক্ষমতাধর হয়ে না ওঠে কোনদিন। এই প্রয়াসের সাফল্যের মধ্যেই তার ক্ষমতাচর্চার প্রাণভোমরা।

পিতৃতন্ত্রও ঠিক সেই কাজটিই করে আসছে আবহমান কালব্যাপি সময় সীমায়। আর আমরা পুরুষরা,যার যেমন রুচি,শিক্ষাদীক্ষা,সুযোগ,সামর্থ্য;সেইমত এই পিতৃতন্ত্রের বরমাল্য পড়ে বসে আছি। তাই যে কাজ পুরুষ করলে আমরা বিশেষ আমল দিই না,সেই একই কাজ একজন নারী করলেই আমরা দলবেঁধে রে-রে করে তেড়ে উঠি। কারণ আমাদের ভয় থাকে,নারীর বহুগামিতা সমাজ মেনে নিলে ঘরের বৌটিকে সামলিয়ে রাখতে পারবো তো আদৌ? তার দেহ মন যৌনতার উপর স্বামী হিসেবে আমার একান্ত যে একছত্র অধিকার,সেই অধিকার চর্চায় বিঘ্ন ঘটে যাবে না তো একদিন? তাই আমরা কেউই এই ঝুঁকিটা নিতে পারি না। যে যত বেশিই নারীবাদী হই না কেন।

কিন্তু নারী? তার পিতৃতান্ত্রিক মগজ ধোলাইয়ের লক্ষ্মণরেখার বাইরে গিয়ে যদি সত্যই প্রশ্ন করতে চায়,যে দেহটি তার নিজের;সেই দেহের যৌন আনন্দ উপভোগের স্বাধীনতা তার থাকবে নাই বা কেন? আমরা তখনই পাল্টা প্রশ্নে শান দেব,যৌনতা যৌন আনন্দতো শুধুই দেহ সর্বস্ব নয়! পশুর সাথে মানুষের তো এইখানেই তফাৎ! ঠিকই তো,আর ঠিক সেই জায়গায়তেই একজন নারীও তো তার যুক্তিটি মেলে ধরতে পারে এই বলে যে,প্রতিদিন একই মানুষের সাথে সহবাসে সে তো মানসিক ভাবেও তৃপ্তি নাও পেতে পারে। দাম্পত্যের সেই তৃপ্তিহীন নিরানন্দ নিত্যনৈমিত্তিক যৌনতাও কি পাশবিক নয়? যা শুধুই শরীর সর্বস্ব! মনের আনন্দ যেখানে গিয়েছে ফুরিয়ে,বা হারিয়ে? আর সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দটুকু যদি সে অন্য পুরুষের সাহচর্যে খুঁজে পেতে চায়? তার সেই চাওয়াটুকু পেতে যদি তার সংসারকে ভাসিয়ে দিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের চুরান্ত পরিণতিরদিকে এগিয়ে না গিয়েই এই দুই দিকের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য তৈরী করতে চায় সে,সমাজ সংসার কেন তখন তার দিকে ব্যাভিচারের আঙুল ওঠাবে? মূল প্রশ্নটা কিন্তু এইখানেই। যার উত্তর দেওয়া,বা দেওয়ার মতো হিম্মত সত্যই কি পুরুষতন্ত্রের আছে আদৌ?

আমরা সবাই জানি নেই,আর নেই বলেই সে নানান ছলে সতীত্বের মহিমা কীর্তন করে চলে আবহমান কাল ধরে। শুধু সতীত্বের ফাঁক গলেও যদি তার যুক্তি জাল দূ্র্বল হয়ে পড়ে,তাই সে সতীত্বের সাথে মাতৃত্বের মহিমাকেও সমান তালে,ক্ষেত্র বিশেষে বেশি করে প্রচার করে থাকে। আর এই প্রচারের সংস্কৃতির মধ্যেই সাংসারিক মগজ ধোলাইয়ের ঘেরাটোপে কৈশোর পেড়িয়ে যৌবনে পদার্পণ করতে থাকে নারীর ভুবন। তার দেহ মন যৌনতা। ফলে স্বভাবতঃই সেও এই সতীত্ব ও মাতৃত্বের মোহে পড়ে যায় যৌবনের উন্মেষলগ্নেই। এখানেই পিতৃতন্ত্রের বিপুল সাফল্য। ঠিক যেমন গ্লোবালাইজেশনের মোহে আবিশ্ব মানুষকে বেঁধে ফেলেছে ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ। আমরা যেমন সেই মোহেই আচ্ছন্ন হয়ে বিশ্বকবির ‘রক্তকরবী’ নাটকের রাজার এঁঠোদের মতো ৬৯ফ ৪৯ঙ হয়ে যাই কখন বুঝতেও পারি না। চাইও না। ঠিক সেই মতোই একটি মেয়েও বুঝতে পারে না এই সতীত্ব আর মাতৃত্বের যাঁতাকল কিভাবে তার নিজস্ব নারীর ভুবনকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে পিষে মারছে। ফলে সেও বিশ্বাস করতে শুরু করে পিতৃতন্ত্রই সমাজ সংসার সুস্থ রাখার একমাত্র বন্দোবস্ত। সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। সতীত্ব আর মাতৃত্বই নারী জীবনের মূল আদর্শ। ঠিক যেমন আমরা ধরেই নিয়েছি ধনতন্ত্রের বিশ্বায়নই সম্পদের উপর অধিকার অর্জনের একমাত্র বিকল্প!  এই ভাবেই অন্ধবিশ্বাসে একটি অন্যায় ব্যবস্থা বা রীতিকে মেনে নেওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। করা হয় কি ভাবে? যেকোন বিষয়ে একটি তীব্র মোহ বিস্তার করে তোলা ও সেই মতো সেই মোহজালে মানুষের মগজ ধোলাই করেই এই ধরণের প্রথাগুলিকে টিকিয়ে রাখা হয়। সে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই হোক,অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হোক,কিংবা আমাদের প্রতিদিনের সমাজ সংসারের দাম্পত্যের ঘেরাটোপেই হোক। এইটাই মূল পদ্ধতি। আর সেই প্রথার বিরুদ্ধেই যখন কোন নারী তাঁর একক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে প্রশ্ন করতে শুরু করে,তখনই সর্ব যুগেই তার বিরুদ্ধে সমাজ রে-রে করে ওঠে সমাজকে রসাতলে যাওয়া থেকে রক্ষার অজুহাতে,ঠিক যেমন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে আবিশ্ব সকল দেশকে রক্ষার অজুহাতে একমেরু বিশ্বে মার্কীণ সাম্রাজ্যবাদ প্রায় সকল দেশকেই তার ক্ষমতার আওতায় ধরে রাখার জন্যে বিভিন্ন দেশে অস্ত্রসস্ত্র দিয়ে তার সৈন্যসামন্ত বসিয়ে রাখে।  এও সেই রকমই এক অমোঘ অস্ত্র এই পিতৃতন্ত্রের। যাকে আমারা সতীত্ব আর নারীত্ব বলে বুঝে থাকি,প্রচার করে থাকি।

কিন্তু একটি নারী জীবনে,এই সতীত্ব আর মাতৃত্ব কতটা প্রাসঙ্গিক,কতদূর প্রাসঙ্গিক,এবং সেই প্রাসঙ্গিকতার উপর তার নিজের ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার স্বাধীনতাই বা কতখানি,এই মূল্যবান প্রাথমিক প্রশ্নগুলি আমরা কজন করি? বা করতে দিই কোন নারীকে? দিই কি আদৌ? কিন্তু আমরাই তো আবার আমাদের আধুনিক মানসিকতা নিয়ে কতই না গর্ব করে থাকি! ধরা যাক একজন ভদ্রলোক অফিস থেকে বাড়ি ফেরার শেষ ট্রেনটি মিস করে ফেলেছেন। বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিলেন রাতটুকু অফিসের কোন এক কলিগের বাড়িতে কাটিয়ে পরদিন অফিস করে বাড়ি ফিরবেন। খবর শুনে ভদ্রলোকের গৃহিনী নিশ্চিন্তে থাকলেন যাক রাতটা পথেঘাটে কাটাতে হল না তাঁর স্বামীকে। কিন্তু ধরুন এই একই ঘটনা যদি একটু উল্টো ভাবে ঘটে? ভদ্রলোক খবর পেলেন তার স্ত্রীকেই অফিস কলিগের গৃহে আশ্রয় নিতে হল একটি রাতের জন্যে? ভদ্রলোক কতটা নিশ্চিন্ত হতেন খবরটি শুনে? সে কি এই কারণে যে তাঁর দাম্পত্য প্রেম স্ত্রীর থেকে বেশি? না কি নিজ স্ত্রীর চরিত্রের উপর তাঁর নিজেরই ততটা বিশ্বাস নেই আসলে? অর্থাৎ একজন পুরুষ যখন হঠাৎ বাড়ির বাইরে রাত কাটাতে বাধ্য হন তখন তাঁকে নিয়ে,তিনি রাতটুকু কার পাশে শুলেন,সেই কথা ভেবে ততটা উতলা হন না তাঁর স্ত্রী,ঠিক যতটা উতলা হবেন ভদ্রলোক সেই একই কথা ভেবে। ধরেই নেওয়া যায় বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে রাত্রি যাপনের আনুপার্বিক সকল বিবরণ দিয়ে তবেই তাঁর সতীত্ব রক্ষা করতে হবে। লঙ্কায় বন্দিনী সীতাকে অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয় স্বতীত্বের প্রশ্নে। কিন্তু সেই একই সময় আপন স্ত্রী’র সাহচর্য হারিয়ে রামচন্দ্রের নিশিজীবন কি রকম কাটতো,সে নিয়ে প্রশ্ন তোলে না সমাজ কোনদিন। মহাকবিও সেই বিষয়ে পাশকাটিয়ে গিয়েছেন। এটাই পিতৃতন্ত্রে সতীত্বের মহিমা। পঞ্চ স্বামী নিয়ে দ্রৌপদীর সতীত্ব কতটুকু রক্ষা হয়েছিল,কিংবা আমাদের তিন চার পুরুষ আগের বাপ ঠাকুরদাদের আমলে সতীন নিয়ে ঘর করা নারী জীবনে নারীর সতীত্বের রূপ কি রকম ছিল সে কথাও আমরা সকলেই জানি। এটাই পিতৃতন্ত্রে সতীত্বের মহিমা।

এই যে নারীরমূল্য আসলেই পুরুষের যৌনদাসত্বে,সেই কথাটাই প্রকারন্তরে নারীর অস্থিমজ্জায় চেতনার সর্বস্তরে জায়মান করে তোলাই সতীত্বের মহিমা প্রচারের আসল উদ্দেশ্য। মূল লক্ষ্য। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সেটাই উত্তরাধিকার। যে উত্তারাধিকারকে বহন করতে না চাইলেই আপনি ব্রাত্য। যে উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই আপনি অসামাজিক। আর প্রতিটি সিস্টেমের সাফল্য সুরক্ষিত রাখার জন্যে যেমন একটি ব্যাক-আপ মেকানিজম থাকে,এই পিতৃতন্ত্রের সাফল্য সুরক্ষিত রাখার জন্যে সতীত্বের পেছনে ঠিক তেমনই মাতৃত্বের মহিমা কীর্তন। এই সেই ব্যাক আপ মেকানিজম যা নারীকে পুরুষের যৌনদাসত্বে আবিষ্ট করে রাখে। শুধু সতীত্ব দিয়ে যে কাজ এমন অমোঘ ভাবে সম্পন্ন করা সহজ ছিল না আদৌ। আর সেই মাতৃত্বের মোহেই নারী তার গর্ভের উত্তরাধিকারও তুলে দিতে বাধ্য হলো পুরুষের বংশরক্ষায় বংশপরিচয়ের সংস্কৃতিতেই। মাতৃত্ব যা নারীর একান্তই সহজাত প্রকৃতি,যে বিষয়ে পুরুষের ভুমিকা মূলত গৌন,নারীর ভুমিকাই প্রধানতম,সেইখানে নারীর সন্তান তার মাতৃপরিচয়ে পরিচিত হলেই সেটাই হতো সত্য। আর তখন কোন নারীকেই তার সন্তানের পিতৃপরিচয়ের জন্যে কারুর যৌনদাসত্বে বাঁধা দিতে হতো না আপন শরীর ও তার যৌন আবেগকে। নারী পুরুষের পারস্পরিক ভালোবাসার ক্ষেত্রটিও স্পষ্ট থাকত পারস্পরিক মৌলিক অধিকারের গণ্ডীতে। কিন্তু তাতে পুষ্ট হয়ে উঠত না আবহমান পিতৃতন্ত্র। বরং এই যে মাতৃত্বের মহিমা প্রচার করে নারীর সতীত্বের উপর পুরুষের জবর দখল;এই যাঁতাকল থেকে নারীজীবনকে পরিত্রাণ দিতে নারাজ পিতৃতন্ত্র।

এইভাবেই নারী জীবনের ভুবনকে পুরুষের ভোগে উৎসর্গ করে তুলেছে সমাজ সংসার পিতৃতন্ত্রের মাধ্যমে। আর সেইখানেই বহুগামি গৃহবধু পুরুষতন্ত্রের কাছে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে হয় নি আজও সমাজকে। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জকে এড়িয়ে চলতেই সমাজে নারীর বহুগামিতাকে ব্যাভিচার বলে ধরা হয়। বহুগামি নারীর পরিচয় হয় স্বৈরণী বলে। কিন্তু কেন এমনটাই মেনে নিতে হবে,যদি প্রশ্ন করে ওঠে কেউ? বিশেষ করে তিনি যদি নারী হন,হন গৃহলক্ষ্মী? নিত্যনৈমিত্তিক দাম্পত্যের শৃঙ্খলে হাঁফিয়ে উঠে নিজের যৌনতাকে নতুন ভাবে অনুভব করতে চায় যদি কোন নারীর নিজস্ব শরীর? তখন! না সেই উত্তর আমাদের কারুরই জানা নেই হয়তো। কারণ আমারা এমন বেয়াড়া প্রশ্নকে নৈতিকতার তলায় চাপা দিয়ে রাখতেই অভ্যস্ত। কিন্তু তাতেই কি মুখ রক্ষা হয় আমাদের? সত্যি করে? হয় না। হতে পারে না। প্রশ্নটা নারী বা পুরুষের নয়,প্রশ্নটা মানুষের। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত শিক্ষা দীক্ষা রুচি সংস্কৃতি অনুযায়ী তার কামনা বাসনার গতি প্রকৃতি ঠিক হয়। সেই অনুযায়ী তার যৌন আবেগও হয় নিয়ন্ত্রীত। সেই যৌন আবেগের পরিপূ্র্ণ বিকাশ হওয়াটাই প্রকৃতির প্রধানতম দাবি। সমাজকেও সেই মতো চলতে হবে যদি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত করতে হয়। আমাদের মূল সমস্যই হচ্ছে,আমরা ধরেই নিই,দাম্পত্য মানেই চিরস্থায়ী একটি বন্দোবস্ত। ধরে নিই কারণ,তাতেই পিতৃতন্ত্র নিশ্চিন্তে থাকে তাই। কিন্তু একবারও ভেবে দেখি না যে,এই বিশ্বজগতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। নয় বলেই এই বিশ্বচরাচর চির সজীব। সেখানে দাম্পত্যকে বংশরক্ষার সুবিধার্থে সমাজ সংসারের সুস্থতা রক্ষার কথা ভেবেও চির স্থায়ীত্বের বন্ধনে বেঁধে ফেলার মধ্যেই যে দাম্পত্যের সজীবতার মৃত্যু;ভেবে দেখি না সেটাই। কিন্তু সমাজে সেই সুখহীন দাম্পত্য বয়ে নিয়ে বেড়ানো পুরুষের জন্যে স্বাদ পাল্টানোর উন্মুক্ত পথ থাকলেও নারীর জন্যে সেই পথ আজও রুদ্ধই। আর সেই সময়েই যদি দাম্পত্যের যৌনসুখ বঞ্চিত কোন নারী অন্য কোন পুরুষের সাহচর্যে তার জেগে ওঠা যৌন আবেগকে তৃপ্ত করতে পারেন এবং সেই পারার মধ্যেই যদি তার রোজকার সংসারকে সুস্থ সুন্দর রাখার নিত্যদিনের কাজে তিনি প্রেরণা পেতে থাকেন তবে তাতেই বা ক্ষতি কি? এই মৌলিক প্রশ্নটিওর সম্মুখীন হতে হবে সমাজকেই। আমাদের চিরকালীন ধারণাগুলিকেই স্বতঃসিদ্ধ মেনে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে এক যান্ত্রিকতা। যার পৌনঃপৌনিক ব্যবহার আমাদের এগিয়ে যেতে দেয় না কোথাও। আমরা ঘুরপাক খেতে থাকি অসাড় কোন না কোন ধ্যানধারণার চারপাশেই। আমাদের সমাজ সংসারে দাম্পত্যও ঠিক সেই রকম একটি ধারণা,যাকে আমরা স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়েই পুষ্ট করে চলেছি পিতৃতন্ত্রকে। আমাদের মনে রাখা দরকার দাম্পত্যের এই চিরকালীন ধারণাই পিতৃতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ। তাই সময় এসেছে এই ধারণাটিকে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য করে তোলা।

নিত্যনৈমিত্তিক দাম্পত্যের একঘেয়েমি কাটিয়ে তুলতে পুরুষের মতোই নারীও যদি তার যৌন সুখের বিকাশে,কারুর শারীরীক সঙ্গসুখে তৃপ্ত করে নিতে পারে তার না মেটা যৌন আবেগকে,এবং সেই তৃপ্তির রেশ নিয়ে নিত্যনৈমিত্তিক দাম্পত্যকেই সুসহ করে নিতে পারে,তবে তো লাভ সংসারেরই। লাভ পরিবার পরিজনেরই। আমরা কেন এই কথাটি এই ভাবেও ভেবে দেখতে পারি না,আমাদের মনেরও যেমন বন্ধুর দরকার পরে জীবনের পরতে পরতে,ঠিক তেমনই সমান ভাবেই শরীরেরও প্রয়োজন আছে শারীরীক বন্ধুত্বের। যৌন সুখ বঞ্চিত দাম্পত্যে নারী বা পুরুষ যে কেউই যদি সেই বন্ধুত্বের অমলিন তৃপ্তি পেতে খুঁজে নিতে চান বিপরীত লিঙ্গকে,তবে তা সমাজগ্রাহ্য বিষয়ই বা হবে না কেন? পিতৃতন্ত্রের ভিতটা টলে যাবে বলে তো? যাক না। তাতে যদি কালক্রমে এই অন্যায় ব্যবস্থা ধ্বংসই হয়ে যায়,তবে সভ্যতার জন্যে সে সুখের দিনই হবে নিসঃন্দেহে বলা যায়।  নারীবাদকে সত্য ও সার্থক হয়ে উঠতে হবে এই দিক দিয়েও।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত