এবারে সরাসরি হিন্দুরাষ্ট্র
প্রতিষ্টার দাবি নিয়ে ময়দানে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। এমনকি স্কুলের ছাত্রদেরকে দিয়েও
শপথ নেওয়ানো হচ্ছে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করার, মরার ও মারার! সেই ছবি
গোটা দেশে ভাইরাল করাও হয়েছে। দিকে দিকে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আওয়াজ ওঠানোর পরিকল্পনায়।
সামনেই উত্তরপ্রদেশ উত্তরাখণ্ড সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। উত্তরাখণ্ডের হিন্দু
সম্মেলন থেকেই সরাসরি হিন্দু মুসলিম সংঘাতের পরিবেশ তৈরীর প্রয়াস দেখা গিয়েছে। এবং
তারই সূত্র ধরে দিকে দিকে ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়ের ভিতরে একটা যুদ্ধং দেহী মানসিকতার
বীজ বপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে তলায় তলায়। তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল স্কুল পড়ুয়াদের
দিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শপথ নেওয়ানোর ভিডিওতে। অর্থাৎ এবারের সংঘাত একেবারে
সরাসরি হিন্দুত্ববাদীদের সাথে বাকি ভারতবাসীর। যদিও সঙ্ঘ পরিবার সেই সংঘাতকে হিন্দু
মুসলিম সংঘাতের দিকেই পরিচালিত করতে চেষ্টা করবে। এবং করে ছাড়বেও। আর পাঁচ রাজ্যের
বিধানসভার নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করতে এটাই হিন্দুত্ববাদী শিবিরসহ পদ্মশিবিরের
মূল স্ট্র্যাটেজি।
এই স্ট্র্যাটেজির প্রথম
আঁচ পাওয়া গিয়েছিল ১৯শে নভেম্বর। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ সকাল সকাল দেশবাসীর কাছে ক্ষমাভিক্ষা
চেয়ে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণায়। কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সংযুক্ত কিষাণ
মোর্চার অন্যতম স্ট্র্যাটেজিই ছিল পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে নো ভোট টু
বিজেপি অভিযানকে সার্থক করে তোলা। পশ্চিমবঙ্গের একুশের বিধানসভা নির্বাচনে নো ভোট টু
বিজেপি অভিযানের সাফল্যে উৎসাহিত হয়েই সংযুক্ত কিষান মোর্চা এই নো ভোট টু বিজেপি অভিযানকে
সার্থক করতেই মিশন ইউপি’র ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল আগেই। ফলে পদ্ম শিবিরের কাছে এটা পরিষ্কার
হয়ে গিয়েছিল, দিল্লীর সীমান্তে কৃষকদের বসিয়ে রেখে উত্তরপ্রদেশ সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা
নির্বাচনে জয়লাভ সম্ভবই নয়। একেবারেই অসম্ভব। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে ভরাডুবি হলে দিল্লীর
মসনদ নিয়েই টানাটানি শুরু হয়ে যেতে পারে। ফলে পদ্মশিবিরের সমস্ত সাহসই দিল্লীর সীমান্তে
এক বছর ধরে বসে থাকা কৃষকরা চুপসে দিয়েছিল। সাথে তাদের মিশন ইউপি’র ঘোষণা। এবং একের
পর এক লক্ষাধিক জমায়েত সহ মহাপঞ্চায়েত সংঘটিত করাও পদ্ম শিবিরের পায়ের তলার মাটি কাঁপিয়ে
দিয়েছিল। পদ্ম শিবিরের মূল নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি হলো। নির্বাচনী ইস্যু তারাই ঠিক
করে দেবে এবং নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার বছরব্যাপী কৃষি আইন বিরোধী
আন্দোলনের ধাক্কায় সেই নির্বাচনী ইস্যু কৃষকরাই ঠিক করে দেওয়ার মতো জায়গায় চলে আসায়,
নড়ে চড়ে বসতে বাধ্য হয় পদ্ম শিবির। এবং এমন নিদারুণ ভাবেই বাধ্য হয়। যার ফলে তাদের
কর্পোরেট মনিবদের কাছে থেকেও তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের সম্মতি আদায় করে নিতে হয়। কর্পোরেট
মনিবরাও টের পেয়ে গিয়েছিল, উত্তরপ্রদেশ থেকেই পদ্মশিবির হাওয়া হয়ে গেলে দিল্লী খুব
বেশি দূরে নয়। ফলে আমও যাবে বস্তাও যাবে। এই কারণেই ১৯শে নভেম্বরের তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের
ঘোষণা।
ফলে সেইদিনই বোঝা গিয়েছিল।
সামনে আবার হিন্দু মুসলিম ইস্যু বেশ বড়ো আকারের রূপ নিয়ে উঠে আসবে। কৃষকরা বাড়ি ফিরে
গিয়েছে। সংযুক্ত কৃষক মোর্চার আন্দোলন আপাতত স্থগিত। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার সংগঠন শেষমেশ
আরও কতদিন মজবুত থাকে, সেও নিশ্চিত নয়। ফলে আবার নির্বাচনী ইস্যুর নিয়ন্ত্রণ পদ্ম শিবিরের
হাতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতেই হরিদ্বারের হিন্দুসম্মেলনের আয়োজন। এবং সেখান থেকেই হিন্দুরাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠার শপথ নেওয়া। এখন এই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদে দেশজুড়ে যত বেশি মানুষ জড়ো
হতে থাকবে। ততই হিন্দু মুসলিম সংঘাতের পরিসর বিস্তৃত হতে থাকবে। এবং পরিবেশ গরম হতে
থাকবে। ফলে পদ্ম শিবিরের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে যাবে নির্বাচনের ইস্যু। হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
হোক আর নাই হোক। হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ইস্যু দিয়েই উত্তরপ্রদেশ
উত্তরাখণ্ড সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের বৈতরণী পার করে দেবে পদ্ম শিবির। কৃষকদের
‘এম এস পি’, যুবসম্প্রদায়ের বেকারত্ব, নাগরিকের জীবনযাপনের যাবতীয় সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের
লাগাম ছাড়া বৃদ্ধি। পেট্রল ডিজেল রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, একের পর এক সরকারি প্রতিষ্ঠান
জলের দরে গুজরাটি ধনকুবেরদের হাতে তুলে দেওয়া, রাফায়েল কেলেংকারি সহ অন্যান্য যাবতীয়
দুর্নীতি, পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যু, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা জনতার নাগালের বাইরে নিয়ে
যাওয়া সহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকেই এক হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক ইস্যু দিয়ে
ধামাচাপা দেওয়া যাবে মাখনের ভিতরে ছুরি চালানের মতোন, সহজেই। জনতা লড়তে থাকবে হিন্দুরাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠার পক্ষে ও বিপক্ষে। ফলে হিন্দু ভোটকে পদ্মশিবিরের বেড়াজালে বন্দী করে রাখা
সম্ভব হবে। যে ভোট আন্দোলনরত কৃষকরা প্রায় পদ্মশিবিরের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া করে ফেলেছিল।
১৯শে নভেম্বরের ঘোষণা ও হরিদ্বারের হিন্দুসম্মলনের ঘোষণা তাই একসূত্রে গ্রথিত। একটি
দিক সামলিয়ে অন্য দিক দিয়ে নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়া। এটাই পদ্মশিবিরের পরিকল্পনা। আর তারই
সার্থক রূপায়নে স্কুলের ছাত্রদেরকেও শপথ নিতে দেখা যাচ্ছে। হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার
লড়াইয়ে জীবন দেওয়া ও জীবন নেওয়ার শপথ গ্রহণে।
এই ছবি কতটা ভাইরাল হলো।
হবে। আর এই প্রবণতা কতটা সংক্রমক হয়ে রয়েছে। ও আরও কতটা সংক্রমক করে তুলতে পদ্মশিবির
সর্বদিক দিয়ে ঝাঁপাবে। সেটা অনুমান করতে কষ্ট করতে হয় না। বিগত সাত বছরের পদ্মসংস্কৃতিই
তার প্রমাণ। পদ্মশিবির ও তার মেনটর সঙ্ঘ পরিবার এবং তাদের মনিব কর্পোরেট শক্তি’ এই
ত্র্যাহস্পর্শ থেকে ভারতবাসীর আপাতত মুক্তি নাই। তার প্রধান কারণ এই নয়। দেশে
বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর শক্তিশালী নয়। প্রধান কারণ, দেশবাসীকে লড়তে হচ্ছে এই ত্রিবেণী
সঙ্গমের তৈরী করে দেওয়া ইস্যুগুলির বিরুদ্ধে। ফলে আসল বিষয়গুলি নিয়ে দেশবাসী জোট বাঁধতে
পারছে না কোনভাবেই। লক ডাউনে ভেস্তে গেলেও, সিএএ এবং এনআরসি বিরোধী আন্দোলনেই দেশজুড়ে
প্রথম দেশবাসীর তোলা ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে যাচ্ছিল। এরপর শাহিনবাগ
থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে কৃষক আন্দোলন পদ্মশিবিরের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল কিভাবে, সেই আলোচনা
পূর্বেই করা হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে সবটাই পদ্ম শিবিরের তৈরী করে দেওয়া ইস্যুর ভিতরেই
ঘুরপাক খাচ্ছে সমস্ত দেশ। এইখানেই কপাল পুড়ছে গোটা দেশের। এইখানে এসেই ঠেকে যাচ্ছে
জনতার যাবতীয় প্রতিরোধ। আর পদ্মশিবিরের সেটাই জীয়নকাঠি। যার উপরে নির্ভর করছে সংঘ পরিবারের
অস্তিত্ব ও প্রধানত গুজরাটি শিল্পপতিদের কর্পোরেট স্বার্থ।
আর ঠিক এইখান থেকেই দেশকে
টেনে বার করার একটা পথ দেখাতে শুরু করেছিল সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতৃত্বে চলা কৃষক
আন্দোলন। সেই আন্দোলনকে আপাতত বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েই পদ্মশিবির আবার তাদের অস্ত্র প্রদর্শন
শুরু করে দিয়েছে। গোটা দেশকে আবার তাদের তৈরী করে দেওয়া ইস্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে
দিয়ে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের রণকৌশল সাজিয়ে নিচ্ছে। কাশি থেকে মথুরা। হরিদ্বার থেকে
বৃন্দাবন পদ্মশিবিরের ছড়ানো কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জনতার যাবতীয় প্রতিরোধ। জনতা হিন্দু
মুসলিমে বিভাজিত হয়ে হিন্দুরাষ্ট্র আর হিন্দুত্বের পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নিতে শুরু
করে দিচ্ছে। গোটা দেশের জনতাকে নিজেদের গোয়ালে জাবর কাটতে বসিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে।
সত্তর বছরের সব অর্জনগুলির লুন্ঠন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে মসৃণ গতিতে। সংবিধানকে কাঁচকলা
দেখিয়ে সাংবিধানিক ক্ষমতায় দেশবিরোধী কাজকর্মগুলি চলতে থাকবে অবাধে। আর দেশদ্রোহীরাই
দেশপ্রেমীদেরকে ইউএপিএ আইনে বন্দি করে চালান করে দিতে থাকবে গারদের পিছনে। বাকি জনতা
ভয়ে ভক্তির আরাধনা করে পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করবে। ভক্তকুল সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই
দাপিয়ে বেড়াবে দেশপ্রেমের ধ্বজা উড়িয়ে। যে ধ্বজার একটাই রং হিন্দুত্ব। যে ধ্বজার একটাই
স্লোগান জয়শ্রীরাম। যে ধ্বজার একটাই কাজ, ভারতবর্ষের লুন্ঠন। ১৯৪৭ অব্দি যে কাজের অধিকারী
ছিল শুধুমাত্র সাগর পারের ব্রিটিশ। ২০১৪’র পর থেকে যে কাজের অধিকার শুধু হিন্দুত্ববাদীদের।
যাদের হাতে পড়ে আজ কি হিন্দু কি মুসলিম, কি শিখ কি খৃষ্টান, কি উচ্চবর্ণ কি নিম্নবর্ণ।
সকল ভারতীয়ের জীবনই বিপন্ন। এই বিপন্নতার বিরুদ্ধে যারাই একজোট হতে চেষ্টা করবে বা
মুখর হওয়ার প্রয়াস করবে। তারাই দেশবিরোধী আইনের কব্জায় আটকা পড়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট
করতে থাকবে্। এটাই বর্তমান ভারতের মূল ছবি।
৩০শে ডিসেম্বর’ ২০২১
কপিরাইট সংরক্ষিত