চ্যাট জিপিটি আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চ্যাট জিপিটি আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

চ্যাট জিপিটি আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ

 


চ্যাট জিপিটি আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ


বেশ একটা গালভরা নাম। এ আই। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স। বাংলা করলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা! এখন প্রায় হাতের মুঠোয়। প্রায় সারাদিন যাঁদের কেটে যায় নেট দুনিয়ায়। নেটে ঢুকলেই হাতছানি দিতে থাকে। চ্যাটজিপিটি। গুগুল গ্রাড। এক একটি সংস্থার এক একটি এ আই। মানুষের চিন্তা ভাবনার কাজগুলি নাকি এখন থেকে এরাই করে দিতে পারবে। আরও বড়ো কথা। আজকের তারিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে সক্ষমতা আগামী বছর সেই সক্ষমতা কিন্তু সেখানেই থেমে থাকবে না। বৃদ্ধি পাবে আরও কয়েকগুণ। ফলে প্রকৃতিগত ভাবে যাঁরা যত অলস। তাঁদের মুখের হাসি তত চওড়া হয়ে উঠতেই পারে। চিন্তা ভাবনার ঝামেলা নাই। চ্যাট জিপিটিকে নির্দেশ দিলেই হলো। নিমিষেই কাজ সম্পন্ন। হ্যাঁ, ঠিক এই মুহুর্তে আমরা অনেকেই জানি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে, আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের কতটা সুরাহা হবে। কি ভাবে হবে। অনেকটাই ঝাপসা এখনো। তবে এইটুকু অনুমান করাই যায়, এই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে মানুষের কর্মসংস্থানের পরিসর অত্যন্ত দ্রুতহারে সংকীর্ণ হতে থাকবে।


অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা। মাত্র চার দশক পূর্বে, আশির দশকের শুরুতে। রাজ্যজুড়ে, অফিসে কারখানায় কম্পিউটার চালু করার বিরুদ্ধে তৎকালীন শাসকদলের পরিচালনায় সংগঠিত আন্দোলনের কথা। কিন্তু কালের নিয়মে। সেই আন্দোলন অঙ্কুরেই বিফলে যায়। সেই একই শাসকদলের আমলেই রাজ্যজুড়ে কম্পিউটার সুনামি আছড়ে পড়েছিল নব্বই দশকের গোড়াতেই। তারপরের তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব তো একটা ইতিহাস। ফলে অনেকেই মনে করতে পারেন বইকি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও তেমন দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ থাকার কথা নয়। বরং প্রযুক্তির এই অভুতপূর্ব উন্নতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও উন্নততর করে তুলবে। সন্দেহ নাই। তেমনটাই আশা অধিকাংশের।


কিন্তু কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা? তাঁদের অধিকাংশই সিঁদুরে-মেঘ দেখছেন। কৃত্রিম এই বুদ্ধিমত্তাকে ব্যাপক ভাবে কাজে লাগানো শুরু হয়ে গেলেই। বহু মানুষ কাজ হারাবেন। শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থানের সুযোগগুলি একে একে কমে যেতে থাকবে। ফলে দেশে দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। যদিও এখনো স্পষ্ট নয়। ঠিক কোন ধরণের কাজগুলিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে এক নিমেষেই করে ফেলা সম্ভব হবে। তবে এটা পরিস্কার। এই সম্ভাবনা ব্যাপক। দিনে দিনে বিভিন্ন ধরণের কাজ এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব সহজেই করে ফেলতে পারবে। কেননা বর্তমানে এই প্রযুক্তি এক অনন্ত সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে গতে বাঁধা দপ্তরিক কাজগুলি তো খুব সহজেই মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে করে ফেলা সম্ভব। শোনা যাচ্ছে ভাষান্তরের কাজগুলি অর্থাৎ এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের কাজ। এই প্রযুক্তিতে অত্যন্ত সহজেই করে ফেলা যাচ্ছে। নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকা অনেকেই অবশ্য ইতিমধ্যেই এর নমুনা দেখে থাকবেন। চলতি কথায় ব্যাক অফিসের যাবতীয় কাজের জন্য অদূর ভবিষ্যতেই আর কোন মানুষের প্রয়োজন হবে না। এবং শিক্ষাক্ষেত্র। এমনিতেই অনলাইন ক্লাসের সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীরা। দিনে দিনে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকবে। স্কুল কলেজে গিয়ে লেখাপড়ার চল একদিন হয়তো উঠেই যাবে। কিন্তু তাতে প্রথমেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন যাঁরা। তাঁরা হলেন শিক্ষককুল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই ক্লাস পরিচালনা। শিক্ষা দেওয়া। নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া। এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির মূল্যায়ণ করার কাজগুলি নিমেষের ভিতরেই সম্পন্ন করে ফেলতে সক্ষম হবে। এবং অনলাইনে। তার জন্য আলাদা করে দালান কোঠা তৈরীর কোন বিপুল ব্যায়ভার বহন করার দরকার নেই। দরকার নেই শিক্ষক থেকে শিক্ষাকর্মীদের বেতন দিয়ে পোষারও। ফলে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে শিক্ষাকর্মীদেরও আর চাকরিতে প্রয়োজন পড়বে না। মোবাইলে ল্যাপটপে বিভিন্ন কোর্সের অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নিলেই হবে। মোটা টাকায় তাতে রেজিস্ট্রশন করে নিয়ে শুরু করতে হবে শিক্ষাদীক্ষা। একেবারে প্রাথমিক থেকে ধরে বেঁধে। স্কুল কলেজের দালানকোঠায় গিয়ে লেখাপড়ার দিন শেষ হতে চলেছে।


ঠিক সেই রকমই। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন নামিয়ে। নাম রেজিস্ট্রেশন করে নিতে হবে। শরীরে সমস্যা হলে। সেই অ্যাপেই জানাতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই তখন চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে। প্রেসকিপশন থেকে শুরু করে কি কি পরীক্ষা করাতে হবে। সব জানা যাবে বাড়িতে বসেই। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে নাম লিখিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষার দরকার নেই। এমনকি, রক্ত পরীক্ষা থেকে যাবতীয় পরীক্ষাই হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হয়ে যাবে। সেখানেও প্যাথোলজিস্ট রেডিয়োলজিস্টদের দরকার হবে না আর। শুধু নমুনা সংগ্রহের জন্য যে কয়জনের দরকার। এবং বিভিন্ন যন্ত্র চালানোর মতো টেকনেশিয়ান। চিকিৎসকের প্রয়োজন পড়বে অত্যন্ত জটিল রোগের ক্ষেত্রে। অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির ক্ষেত্রে। কে বলতে পারে। শল্যচিকিৎসাও হয়ত একদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিচালনায় সম্পন্ন হতে শুরু করে দেবে। প্রতিষ্ঠানগুলি অধিকতর মোটা প্যাকেজের দর হাঁকবে। মানুষের হাতে রুগীর মৃত্যু হতেই পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সেই ভুলের আশংকা এবং সম্ভবাবনা নাই প্রচার করে।


এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের তো কথাই নেই। দেখা যাবে অধিকাংশ নকশা তৈরীর কাজ। কলকব্জা উদ্ভাবনের কাজও অনায়াসে করে দিতে পারবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই। হ্যাঁ অবশ্যই কিছু সুদক্ষ টেকনেশিয়ানের দরকার থাকবেই। সঠিক তথ্যগুলি শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আপলোড করার জন্য। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কোন বড়ো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়রের দরকার আর নাই পড়তে পারে। সময় খারাপ হতে চলেছে। ম্যানেজমেন্টের কাজে দক্ষতা অর্জনকারীদের। ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত যাবতীয় কাজই নিমেষের ভিতরে সুসম্পন্ন হয়ে যাবে। উন্নত মানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। ফলে একটি সংস্থায় আর গণ্ডায় গণ্ডায় ম্যানেজার পোষার দরকার থাকবে না। একেবারে উচ্চপদে কর্মরত দুই তিনজন দিয়েই সমগ্র প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজেরিয়াল কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে। শুধু এখনো বোঝা যাচ্ছে না। উকিল ব্যারিস্টরদের উপরে এর প্রভাব কতটা এবং কিভাবে পড়তে চলেছে। কিন্তু আদালতের দপ্তরিক সকল কাজই যে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। সেটি বলাই বাহুল্য। আর হ্যাঁ। যে দুইটি ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি প্রয়োজন আরও দীর্ঘদিন বজায় থাকবে। সেটি প্রধানত পুলিশ। এবং মিলিটারি। যদিও আজকের মতো এমন বিপুল সংক্ষক কর্মীর দরকার থাকবে না। বিশেষ করে নজরদারী করার কাজে মানুষের ভুমিকা অনেক গৌণ হয়ে যাবে। ওদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও দ্রোন প্রযুক্তির হাত ধরে। আরও একটি বিপ্লবের সামনে আমরা। তবুও পুলিশ এবং মিলিটারিতে যথার্থ্য মানুষের প্রয়োজন কমতে থাকলেও। অনেকটাই থাকবে। বিশেষ করে কম উন্ননত আধা উন্নত দেশগুলিতে।


তবে যাঁরা সেকসপীয়রের মতো নাটক লিখতে চান। কিংবা শরৎ সুনীল হুমায়ুন আহমেদের মতো উপন্যাস। কিংবা রবি ঠাকুর কি জীবনানন্দের মতো কবি হয়ে উঠতে চান। তাঁরা বসে বসে গোঁফে তা দিতেই পারেন। শুধু নিজের মর্জি মাফিক নির্দেশ দিলেই হলো। আপনার নিজস্ব ম্যাকবেথ থেকে গীতাঞ্জলী সব কিছুই লিখে দিতে পারবে আপনার জন্য। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর সেই সুখেই যাঁরা আশায় আশায় রয়েছেন। তাঁদেরও কিন্তু মনে রাখা দরকার। একদিন এমন দিনও আসতে চলেছে। যেদিন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই আপনার সমস্ত ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে দেবে। অন্তত, বিশেষজ্ঞদের সেইরকমই আশংকা। আমরা অবশ্য আজকে সুখনিদ্রা দিতেই পারি। হাতের কাছে এমন আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ নাগালের ভিতরে এসে যাওয়াতে। বিশ্বাস করতে শুরুও করে দিতে পারি। দিন আসছে। নো চিন্তা ডু ফুর্তি’র। তবে দিনে দিনে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রযুক্তির কোন চড়ায় গিয়ে ঠেকবে। সেটা একমাত্র টের পাওয়া যাবে অদূর ভবিষ্যতেই। শুধু এখনো বলা যাচ্ছে না। পাড়ার কাউন্সিলর থেকে দেশের প্রধান। চ্যাটজিপিটি দিয়েই এঁদের কাজগুলি করিয়ে নেওয়া যাবে কিনা। গেলে, শিল্পপতিদের আর পায় কে। অনেক অনেক কম খরচেই দেশ চালানোর মেকানিজম তাদের হাতের মুঠোয় তখন। বছর ভর পার্টি ফাণ্ডে কোটি কোটি টাকা ঢেলে নিজেদের বশংবদ নেতামন্ত্রী তৈরীর চাষ করতে হবে না আর। সমস্যা শুধু একটিই। গণতন্ত্রের এই গালভরা হোর্ডিংটা তখন কোন জাদুবলে জনতার চোখের সামনে নাচানো যাবে? না, সে উত্তর বিশেষজ্ঞদেরও আয়ত্তে নেই এখনো। একমাত্র সময়ই বলতে পারবে সময়ের কথা।

৩রা মে ২০২৩

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত