প্রবন্ধ ও বাঙালিত্ব
অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষিত এবং কোন
না কোন পেশাদারী অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ব্যক্তিমানুষকেও দেখা যায়, যে কোন বিষয় নিয়েই
হোক না কেন, প্রামান্য প্রবন্ধ লেখার বিষয় একান্ত অনীহা। এমনকি যে বিষয়ে তাঁর গভীর
বুৎপত্তি ও বিস্তৃত জ্ঞান রয়েছে, সেই বিষয়েও প্রবন্ধ লেখার কথা উঠলে তাকেও ক্লাস
পালানো শিক্ষার্থীর মতো আচরণ করতে দেখা যায়! বিষয়টি খুবই বিস্ময়ের। কেন এই অনীহা?
কেন এইরকম এড়িয়ে চলার মনোবৃত্তি? অথচ বাঙালি মাত্রেই সৎজ্ঞান দেওয়ার বিষয়ে আমরা
সকলেই তো এক পায়ে খাড়া। কিন্তু সৎ লেখার বিষয়ে কেন আমাদের এমন চুড়ান্ত উদাসীনতা। এখানে
খুব সাধারণ ভাবে এক কথায় অনুমান করা যায়, বাঙালির অলস প্রকৃতিই হয়তো এর মূল কারণ।
সে কথা নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, একথা অস্বীকার করার উপায় নাই, বাঙালির
স্বভাব ধর্ম আলস্যচর্চা। যার ফলস্বরূপই গড়ে উঠেছে পরনিন্দা পরচর্চার সংস্কৃতি। এই
বিষয়ে আমাদের আগ্রহ উদ্দীপনা যত, একটি প্রবন্ধ লেখার বিষয়ে অনীহা তার থেকে বহুগুন
বেশি।
যদি
ধরেই নেওয়া যায় আলস্যচর্চাই এই অনীহার মূল কারণ, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, তার ধরণ
নিয়েও। আলস্য কি শুধুই হাতে কলমে লিখতে কিংবা কীবর্ডে অঙ্গুলীসঞ্চালনা করে টাইপ
করতে, না কি কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করতেই? শঙ্খ ঘোষ তাঁর
একটি লেখায় লিখেছিলেন, “….. আমরা অধিকাংশ মানুষ কেবল
উপরিতলের ভাসমান একটা জীবনকে ছুঁয়ে থাকি শুধু, কায়ক্লেশে প্রত্যহিক জীবনযাপনকেই
বেঁচে থাকার চুড়ান্ত অবস্থান ভেবে নিশ্চিন্তে থাকি”। শঙ্খ যেটা বলেন নি, সেটি হলো
এইভাবে উপরিতলে কচুরিপানার মতো ভেসে থাকার মানসিকতা আসলেই আমাদের চুড়ান্ত আলস্যচর্চার
প্রকৃতসঞ্জাত। আমরা কোন কিছুরই গভীরে গিয়ে তথ্যানুসন্ধান, কার্যকারণ বিশ্লেষণ,
আত্মসমীক্ষার বিষয়ে কোন রকম আগ্রহ রাখি না। আমরা ছুটছি কী’-র পেছনে। আমরা ছুটি না
কেন’-র পেছনে। এখানেই বাঙালির মাহাত্ম্য। আমরা তাই মুখস্থ করতে যত পারদর্শী, নকল
করতে যত সুদক্ষ, মৌলিক জ্ঞানার্জনে ততটাই অক্ষম। নতুন কিছু সৃষ্টি করতে ততটাই
ব্যর্থ। এখানেই আমাদের বাঙালির মূল প্রকৃতির নোঙর। আর তারই প্রভাব পড়েছে আমাদের
চিন্তাভাবনার উপর। ঠিক শঙ্খ যেটি বলেছেন তাঁর নিজস্ব ভাষায়। এবং এইভাবে প্রতিদিনের
আলস্যচর্চার মধ্যে দিয়ে যে বেঁচে থাকা, মুখস্ত করে নকল করে শর্টকাট পথে জীবনের
সাফল্য অর্জনের যে তাগিদ ও ধান্দা, তাকেই জীবনবাস্তবতার চুড়ান্ত অবস্থান ভেবে
নিশ্চিন্তে থাকাই এক অর্থে প্রকৃত বাঙালিত্ব। বা বাঙালিয়ানা। হয়তো কবি সেই কারণেই
আক্ষেপ করেছিলেন, ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ কর নি’।
অনেকেই
ভাবতে পারেন, সামান্য প্রবন্ধ লেখা কি এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যে তাই নিয়ে একেবারে
বাঙালির নাড়ি ধরে টান দিতে হবে? ঠিক কথা। কোন দেশেই কোন কালেই দেশশুদ্ধ লোক
প্রবন্ধ লেখে না। প্রবন্ধ লেখা বিশেষ একটি ক্ষমতা, অধিকাংশ নয়, মুষ্টিমেয় মানুষই
প্রাবন্ধিক হয়। এই নিয়ে হয়তো কোন বিতর্ক উঠবে না। কারণ এটাই সত্য। আর সেই কারণেই
আমরা লেখার একেবারে শুরুতেই সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের প্রসঙ্গই তুলিনি কিন্তু।
বলা হয়েছে শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী শ্রেণীর মধ্যেই প্রবন্ধ লেখার বিষয়ে
চুড়ান্ত অনীহার কথা। আর এই কারণেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলায়
প্রাবন্ধিকের এত অভাব। বাংলায় প্রবন্ধ সাহিত্য আজও সেই ভাবে জনপ্রিয়তা পায় নি। আর
শুধু সাহিত্যই বা কেন, প্রবন্ধ বিষয়টি জগৎ জীবনের সকল বিষয় কেন্দ্রিক। শুধুই
সাহিত্য সংস্কৃতির বিষয় নয় এইটি। জ্ঞান বিজ্ঞান, সমাজ সংস্কৃতি, শিল্পবাণিজ্য
রাজনীতি, ধর্ম সভ্যতা, ইতিহাস দর্শন, ভুগোল নৃতত্ব, যাবতীয় সকল বিষয়ই প্রবন্ধের
অন্তর্গত হতে পারে। এবং ঠিক তাই। আর ঠিক এইখানেই আমাদের মূল প্রশ্ন। পেশাদারী
জীবনে এই সকল বিষয়েই বহু সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত মানুষ আমাদের সমাজে বাস করেন। যারা
তাদের কর্মসূত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তৎসত্তেও কেন তাঁরাই প্রবন্ধ লেখার কথা
উঠলে পালানোর পথ খোঁজেন?
তখনই
বাঙালির প্রকৃতিগত মৌলিক বিশেষ ধরণগুলি স্বভাবতঃই প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন হবে।
হতেই হবে। সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের সেই মৌলিক প্রকৃতিগুলি, আমাদের জীবধর্মের বিশেষ
প্রবৃত্তিগুলি একটু নিবিষ্টভাবে পর্যালোচনা করে দেখলেই তখন একে একে উঠে আসে এই সব
দূর্ভাগ্যজনিত এক একটি সত্য। আমরা প্রকৃতিগত ভাবেই অলস। সুযোগসন্ধানী। ধান্দাবাজ।
আমরা কোন কিছুর গভীরে ঢুকতে রাজি নই। আমরা ভাবনা চিন্তার বিষয়েও চুড়ান্ত অলস। তাই
আমরা নকল করতে অভস্থ। আমরা অনুকরণে পারদর্শী। আমরা মুখস্থবিদ্যায় পণ্ডিত। এই তিন
তিনটি অভিশাপে, চিন্তাভাবনার গভীরে হাঁটাহাঁটি করার বিষয়ে প্রায় সম্পূর্ণতঃই
বিকলাঙ্গ আমরা। সত্যিই আমাদের এগোনোর ক্ষমতা কম। আমরা বিদেশী বই পড়ে দুকলম লিখতে
পারবো। দু দশ মিনিট বক্তৃতা দিতে পারবো। এন্তার উপদেশ দেবো। কিন্তু কোন বিষয়ে একটি
মৌলিক প্রবন্ধ লেখার ডাক এলেও আমাদের কলম নড়ে না। চিন্তা খেলে না। তখন আমরা ভেবে
পাই না, কোথা থেকে শুরু করবো। কিভাবে অগ্রসর হবো। তবুও কি আমরা বুঝতে পারি, আমাদের
এই অক্ষমতার মূলে আমদের মুখস্থবিদ্যা নির্ভরতা ক্রিয়াশীল। আমরা কি অনুধাবন করতে
পারি, আমাদের অনুকরণ প্রিয়তা আমাদের খর্ব করে রাখে? আমরা কি টের পাই, আমাদের নকল
করার দক্ষতা আমদের সৃষ্টি করার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে?
দুর্ভাগ্যজনক
হলেও সত্য, ঠিক এটিই ঘটে গিয়েছে বাঙালি সমাজজীবনের পরিসরে। তাই উচ্চশিক্ষিত হয়েও
পেশাদারী অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েও আমাদের মৌলিক চিন্তা করার শক্তি গড়ে ওঠে নি। ওঠে
না। কোন বিষয়ের গভীরে ঢোকার মতো সক্ষমতা আমাদের নাই। আমরা ‘কী’ এর উত্তর জানি
শুধুই। ‘কেন’ এর উত্তর আমাদের জানা হয় না। যদি না বিদেশীরা সেই উত্তর জুগিয়ে দেয়। এখানেই
আমাদের অসম্পূর্ণতা। এখানেই বাঙালির দুর্বলতা।
শুধু
কি প্রবন্ধ লিখতেই আমাদের কলম নড়ে না? না তাও নয়। প্রবন্ধ পড়ার বিষয়েই কি আমরা আদৌ
আগ্রহী? বাঙালি প্রবন্ধ পাঠে উদগ্রীব, এমন অপবাদ নিশ্চয় কেউ দেবে না! যে কোন সাময়িক
পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের পাতা উল্টিয়ে কত স্বচ্ছন্দে পরবর্তী পৃষ্ঠায় চলে যাই
আমরা। বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখিয়ে ঠিক কোন বিষয়ের প্রবন্ধ, সেই বিষয়টি আমাদের কোন
আগ্রহের বিষয় কিনা, না সেসব জানার মতো ধৈর্য্যও আমাদের উচ্চশিক্ষিত মেধায় ধরা দেয়
না। যদি স্বীকারও করে নিই, প্রবন্ধ লেখা মোটেও সহজ কথা নয়। বিশেষ সক্ষমতা অর্জন
সাপেক্ষ বিষয় এইটি, তাহলে কি এও স্বীকার করতে হবে, প্রবন্ধ পাঠ করার জন্যও বিশেষ
পারদর্শীতা প্রয়োজন? নিশ্চয় তা নয়। একটি প্রবন্ধ পাঠ করার জন্য সাধারণ শিক্ষাই কি
যথেষ্ট নয়? হ্যাঁ বিশেষ বিশেষ জ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ পাঠের জন্য বিশেষ শিক্ষা ও
জ্ঞান প্রয়োজন। সেকথা ঠিক। কিন্তু তাই বলে, প্রাত্যহিক জীবনসম্পৃক্ত বিষয়সমূহের
উপরে লেখা প্রবন্ধ পাঠেও সাধারণত আমাদের এমন ঘোরতর অনীহা কেন?
অনীহার
মূল কারণ কিন্তু সেই একই আলস্যচর্চার। যে আলস্যচর্চা জন্যই আমরা কোন বিষয়েই গভীর
ভাবে চিন্তাশীল নই, চিন্তাভাবনা করার আগ্রহ রাখি না, সেই একই আলস্যচর্চা আমাদেরকে
প্রবন্ধ পাঠেও অনাগ্রহী করে তোলে। এবং ঠিক এই কারণেই সামন্য প্রবন্ধ লেখার বা
পাঠের অনীহার কারণ অনুসন্ধানে বাঙালির নাড়ি ধরে টান দেওয়ার প্রয়োজন এত বেশি। যতদিন
না আমাদের এই প্রকৃতিগত প্রবৃত্তির বদল ঘটাতে সক্ষম হবো আমরা, ততদিন ঐ
মুখস্তবিদ্যায় পারদর্শীতা, অনুকরণে আগ্রহ এবং নকল করায় দক্ষতা অর্জনেই আমাদের সকল
অধ্যবসায় জারি থাকবে।
জানি
না কজন এই অত্যন্ত স্বল্পদৈর্ঘ্যের লেখাটিও শেষ অব্দি পড়বেন। যদি পড়েন, তাহলেও কম
আশ্চর্যের কথা নয়। কারণ লেখার শিরোনামই আমাদের অধিকাংশ বাঙালিকেই লেখাটির ভিতরে
প্রবেশ করার বিষয়ে অনাগ্রহী করে তুলবে সন্দেহ নাই। তবু যদি গুটিকয়েক মানুষও শেষ
অব্দি পড়েন, আমাদের একটিই অনুরোধ থাকবে, না এই লেখাটি মুখস্থ করা নয়, বা প্রশ্নহীন
ভাবে এই লেখার প্রতিবাদ্য বিষয়কে সমর্থন করাও নয়। আমাদের অনুরোধ, স্বয়ং ঋত্বিক
কুমার ঘটকের সেই অবিস্মরনীয় পরামর্শটি শুধু স্মরণে রাখা: ‘ভাবো ভাবা প্র্যকটিস
করো’।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

