বাঙালির বড়দিন বড়দিনের
বাঙালি
আজ কিন্তু বড়দিন। বেশ, কিন্তু তাতে কি?
কেন আজ তো দেদার ফূর্তি আর মস্তির দিন। সারাদিন হই আর হুল্লোর। পিকনিক আর ঘুরে বেড়ানো।
পার্টি আর ড্রিংক্স। আর হ্যাঁ অবশ্যই কলকাতাবাসীদের মক্কা, আজ পার্কস্ট্রীট। না আজ
বাঙালিকে কেউ সাম্প্রদায়িক বলে দুষতে পারবে না। কি হিন্দু কি মুসলিম। আজ সকলের উৎসব।
আজ সকলেই এক একজন সান্তাক্লজ। না, তার পেছনের ক্লজ কি কি। সেই বিষয়ে চিন্তা করা চলবে
না। কোন জাদুতে হিন্দু মুসলিম বাঙালি মাত্রেই আজ খুশির পরব। সেই বিষয়ে ময়নাতদন্তে আমরা
রাজি নই। আমরা জানি আজ মেরী ক্রিসমাস বলতে হয়। না বললেই গেঁয়ো ভুত। ‘রেখেছো বাঙালি
করে মানুষ করো নি’। শুনিয়ে দেবে প্রগতিশীলরা। ফলে আমাদের সকলেরই মুখে আজ মেরী ক্রিসমাস।
তা সে আমাদের আল্লা আর ভগবান যাই ভাবুন না কেন।
সারা বছর আমাদেরকে কেউ সাম্প্রদায়িক
বললেও আমরা গায়ে মাখি না। কিন্তু আজ আমাদের সাম্প্রদায়িক বলার পথ বন্ধ। কেমন হিন্দু
মুসলিম মিলে আজ আমরা সকলকেই কলোনিয়াল লিগ্যাসীর উত্তরাধিকার বহন করে অসাম্প্রদায়িক
হয়ে উঠেছি। বছরে অন্তত এই একটি দিন। সত্যি কি এটা একটা বড়ো খবর নয়? তাই আজ সত্যিই বাঙালি
মাত্রেরই বড়দিন। আজ আমাদের মনটাও দিল
দরিয়ার মতো বড়ো হয়ে ওঠে। আজ আমরা নিজেদেরকে আন্তর্জাতিক মানের মানুষ বলে অনুভব করতে
পারি। আজ কিন্তু আমরা বিশ্ব নাগরিক। তা সে বিশ্ব নাগরিকত্বের কোন পরিচয়পত্র আবিষ্কার
হোক আর নাই হোক। বছরে অন্তত এই একটি দিন বাঙালি বিশ্ব নাগরিক। বিশেষ করে এ বি সি ডি
জানা বাঙালি মাত্রেই।
এই এ বি সি ডি না জানলে বাঙালির
যে কি দুর্দশা হতো। সে আর বলার অপেক্ষাও রাখে না। তাই তো বাঙালি অভিভাবক মাত্রেই স্বপ্ন
দেখে গর্ভজাত সন্তান ভুমিষ্ঠ হয়েই এ বি সি ডি’র সাথে পরিচিত হয়ে উঠবে দ্রুত থেকে অতিদ্রুত।
আর হচ্ছেও তাই। বাঙালির ঘরে ঘরে এখন এ বি সি ডি’র চর্চা। আর সেই চর্চার সূত্রেও আজ
সত্যিই আমাদের বড়দিন। আমরা বাংলার মতো আঞ্চলিক
একটি ভাষার গারদ থেকে মুক্ত হয়ে এ বি সি ডি’ জানার শক্তিতে আজ বিশ্ববাসীর সাথে বড়োদিনের
উৎসবে সামিল হতে সক্ষম। যে কোন বাঙালির কাছেই এ কম বড়ো কথা নয়। কে বলে বড়দিন শুধুই সাহেব মেমদের উৎসব।
আমরাও কম সাহেব মেম নই। ফরফর করে ইংরেজি বলতে না পারলে আর কিসের শিক্ষিত হয়ে ওঠা। তাই
বাঙালির পক্ষে ইংরেজি না জানার থেকে বড়ো লজ্জা আর নাই। হতেও পারে না। সেই ইংরেজি জানা
বাঙালির কাছে আজ সত্যিই বড়দিন। কিন্তু তাই বলে ইংরেজি না জানা বাঙালিও পিছিয়ে নাই আজ। আজ তাদেরও হই
হুল্লোর করার দিন। কেক কেটে উৎসব পালনের দিন। ডিজে বাজিয়ে নৃত্য করার দিন। ইংরেজি না
জানলে বড়দিন
পালন করা
যাবে না, সে হতে পারে না। হ্যাঁ ইংরেজি জানা বাঙালি আর না জানা বাঙালির ক্লাস নিশ্চয়ই
আলাদা। একদল পার্কস্ট্রীট কালচারে দীক্ষিত। তাদের জন্য বড়ো বড়ো ক্লাব হোটেল বার রেঁস্তোরা
রয়েছে। অন্যদলের মস্তি’র জন্য মাঠঘাঠ রাস্তাঘাট পড়ে রয়েছে। মস্তিতে দুই দলই সমান। কেউ
কাউকে এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দিতে রাজি নয়। কেক কাটা থেকে পানাহার। ক্লাসের তফাৎ থাকতে
পারে। কিন্তু তাতে কি? দুই পক্ষই তাদের নিজেদের মতো করে বড়দিন পালনে অভ্যস্থ।
সত্যিই বড়োদিনের মহিমা কম নয়। এই
একটি দিন বাঙালি ধর্মের বাইরে পা রাখার সুযোগ পায়। এবং সেই সুযোগটাকে পুরোপুরি কাজে
লাগিয়ে নেয় মস্তি করতে। তাই বলে বাঙালিকে আজ কেউ খেষ্টান বলে গাল পারে না। কিন্তু ঈদের
দিনে গরু খেলে বাঙালি হিন্দুর জাত যায়। অষ্টমিতে অঞ্জলি দিলে বাঙালি মুসলিমের যাত যায়।
কিন্তু আজ খেষ্টানী গীর্জায় গিয়ে বড়দিন পালনে হিন্দু মুসলিমের জাত যাওয়ার ভয় থাকে না। সাগর পারের
ক্রিসমাসের কি অপার মহিমা। একটু পয়সাকড়িয়ালা বাঙালির ঘরে ঘরেই প্রায় আজকাল সান্তাক্লজ
আসে। কচিকাঁচাদের জন্য বিশেষ উপহার টুপহার রেখে যেতে রাতের অন্ধকারে। না, ভাগ্য ভালো
তাতে হিঁদুয়ানী বা মুসোলমানি কোন কিছুতেই বাঙালির জাত যায় না। সান্তাক্লজ সত্যিই দেবদূত।
দুই বাঙালিকে অন্তত এই একটি দিন কেমন এক ঘাটের জল খাইয়ে ছেড়েছে। না, তাতে বাঙালিরই
মহিমা বৃদ্ধি পেয়েছে বই কি। বাঙালি আর যাই হোক কূপমণ্ডুক নয়। সে বছরে একটি দিন অসাম্প্রদায়িক
চেতনার উত্তরাধিকার বহন করতে সক্ষম। এটা কম বড়ো কথা নয়। বাঙালির তাই আজ সত্য অর্থেই
বড়দিন।
নিন্দুকেরা যতই অকথা কুকথা বলুক
না কেন। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে বাঙালির পর ধন লোভে মত্ততা ও ভিক্ষাবৃত্তির আচরণের ঐতিহ্যে
যতই আলোকপাতের চেষ্টা করুন না কেন, আমরা জানি বাঙালির হৃদয় কত প্রশস্ত। তাই তো সাগরপারের
ভাষা সংস্কৃতিকে কেমন নিজের করে নিতে পেরেছি আমরা। তাতে প্রয়োজনে নিজের ভাষা সংস্কৃতি
বিসর্জন দিতেও পিছপা নই আমরা। এমন প্রশস্ত হৃদয় আমাদের ছাড়া অন্য কোন জাতির রয়েছে?
তাই আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য নিয়ে কটাক্ষও আমল দিচ্ছি না আমরা।
জানি অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন।
বড়দিন যে মানুষটির স্মরণে।
তাঁর চরিত্রের কোন গুণাবলী আমাদের মধ্যে রয়েছে? ক্রুশে বিদ্ধ হয়েও যে মানুষটি তাঁর
হত্যাকারীদের কোন অভিশাপ দিয়ে যান নি। মৃত্যুর অন্তিম লগ্নেও যিনি ক্ষমার অবতার। প্রেমের
বাণীকে নিজের জীবন দিয়ে সার্থক করে গিয়েছেন। সেই বড়ো মাপের মানুষটির কোন গুণাবলী বাঙালি
গ্রহণ করেছে? যে এমন ঘটা করে তাঁরই জন্মদিনে উৎসব পালন? আজকের বড়দিন কি তখনই সার্থক নয়, যখন
এমন একজন বড়ো মাপের মানুষের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে উঠবো আমরা? সত্যই তো। এও একটা চিন্তা
করার মতো কথাই বটে।
না, না। সেকথা বাঙালিকে শোনানোর
মানে হয় না। বড়োমাপের মানুষটির মতো আমরা বাঙালিরাও কি ক্ষমার অবতার নই? এই তো খুব বেশিদিন
আগের কথাও নয়। শ্রীচৈতন্যের মতো মানুষকে যাঁদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল। সমাজের সেই
উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদের ক্ষমতাকে কি আপামর বাঙালি ক্ষমা করে দেয় নি? না দিলে তো
বাংলায় একটা সমাজবিপ্লবই হয়ে যেত। আজও আমাদের সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের অস্তিত্বকে বেশ
নেক নজরেই কি দেখা হয় না? তারপর সেই বর্গী এলো দেশে। সোনার বাংলাকে ছাড়খাড় করে দিয়ে
চলে গেল। বর্গী’র অত্যাচারে লক্ষলক্ষ মানুষের প্রাণ গেল। আর লক্ষলক্ষ মানুষ ভিটে মাটি
ছেড়ে পারি দিল নদী পার হয়ে। কই তাই বলে তো সেই বর্গীদের বংশধর আজকের মারাঠাদের উপরে
বাঙালির কোন ক্ষোভ বিক্ষোভ নাই। আমরা তো সেই বর্গীদে’র অত্যাচারকেও ভুলতে পরেছি বেমালুম।
ক্ষমা করে দিয়েছি মারাঠাদের। বরং আজ আমরা মারাঠাদের গনেশ উৎসবকেও আমাদের ঘরের উৎসব
করে নিয়ে নতুন করে বর্গী বরণ করছি আবার। হ্যাঁ পশ্চিম বাংলার রাজনীতির কথাই এই বিষয়ে
স্মরণ করা যেতে পারে। আমরা যে পরম ক্ষমাশীল। আড়াইশো বছর ধরে বাংলার অর্থনীতি শোষণ করে
যে ব্রিটিশ ইংল্যাণ্ডকে আধুনিক করে তুলল। আমাদেরকে পরাধীন করে রেখে, আমাদেরই সম্পদ
লুঠ করে যে ব্রিটিশ তাদের লণ্ডনকে সর্বাধুনিক করে তুলল, আমরাই তো সেই লণ্ডন ভ্রমণ করে
ফিরে এসে নিজ সমাজে জাতে উঠি আজও। এত বড়ো ক্ষমাশীল জাতি বিশ্বে আর আছে না কি? আজও এ
বি সি ডি জানা বাঙালির স্বপ্নের দেশ সেই বিলেত। একবার বিলেত না গেলে সমাজের চুড়ায় ওঠা
মুশকিল নয় কি? আমরা যদি ক্ষমাশীল না হতাম, তবে আড়াইশো বছর ধরে আমাদের রক্ত শোষণ করা
ব্রিটিশেরই এমন ভক্ত হয়ে উঠতে পারতাম কি আদৌ? তাই বাঙালি ক্ষমা করতেও জানে। প্রেমে
পড়তেও জানে। এমন কি চরম শত্রুকেও খাল কেটে ঘরে ঢুকিয়ে আনতে আমাদের জুড়ি নাই কোন।
এই যে আজকের পশ্চিমবঙ্গ একটি মিনি
ভারতবর্ষ হয়ে উঠেছে। এই কি হতে পারতো। যদি না আমরা সকলকে আপনার বলে জড়িয়ে ধরতে পারতাম।
আমরা কত সহজে অবাঙালিদের সাথে তাদের ভাষায় আলাপ করি বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়েই। যে বাংলার
মাটির মালিকানার একটা প্রধানতম অংশই অবাঙালিদের দখলে চলে গিয়েছে আজ। কই তাই বলে তো
আমরা আমদের জমি ফেরৎ চাইছি না? এই যে চৌদ্দ পুরুষের বাঙালির মাটির একটা বড়ো অংশই আজকের
উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও আসামে ঢুকে বসে রয়েছে ব্রিটিশের বদান্যতায়। কই আমরা তো তাই
নিয়ে কোনদিন একটা কথাও বলি নি। বলবোও না। যা গেছে তা গেছে। আমাদের থেকে অধিক প্রেম
আর কোন জাতির রয়েছে? আজ পশ্চিমবাংলার বাঙালি মাত্রেই আগে ভারতীয়। তারপর মনে পড়লে তবে
বাঙালি। এই যে নিজের আত্মপরিচয়টুকুও আমরা এমন ভাবে বিলিয়ে দিতে পেরেছি। এও কি কম ত্যাগ?
স্বয়ং যীশুর আত্মত্যাগের থেকে কোন অংশে কম? কাঁটাতারের পূ্র্ব পারের বাঙালির আত্মপরিচয়ও
আজ আর বাঙালি নয়। বাংলাদেশী। এবং মুসলিম। বাংলার আত্মার একটা অংশ যে কাঁটাতারের পশ্চিম
পারে পড়ে রয়েছে, তাতে আজকের বাংলাদেশীদের কিছু এসে যায় কি? আর আসবেই বা কি করে। কাঁটাতারের
এপারে বসে আমরাই তো তাদের বিদেশী বাংলাদেশী বলে মনে করি। বাঙালি বলে মনেও করি না। নিজেদেরও
বাঙালি মনে করি না। বাংলাদেশীদেরও বাঙালি মনে করি না। বাংলাদেশীরাও ঊনিশবিশ তদ্রুপ।
সেখানেও বাঙালির মূল পরিচয় আগে মুসলিম তারপর বাংলাদেশী। ফলে আমরা বাঙালিরা কাঁটাতারের
যে পারেই থাকি না কেন। আমরা আমাদের নিজের জাতীয় পরিচয়টুকু সকলের আগেই বিসর্জন দিতে
পেরেছি। এবং অন্য জাতি ধর্মের পরিচয়কে বুকে টেনে নিতে পেরেছি। এও কি কম বড়ো কথা? আমরা
সত্যই অনেক বড়ো হৃদয়ের অধিকারী। অন্তত ব্রিটিশ জার্মান রুশ ইহুদী ফরাসীদের মতো ছোট
মনের অধিকারী নই মোটে। তাই স্বয়ং যীশুর স্মরণে বড়দিন পালনের আমরাই প্রকৃত অধিকারী। আমরা
ত্যাগ করতেও পিছিয়ে নেই। আমরা ক্ষমা করতেও অপারগ নই। বরং যে যে জাতি বাঙালির ক্ষতি
সাধন করেছে, করছে। আমরা তাদেরকেই বুকে জড়িয়ে ধরার বাসনায়, তাদের পায়ে পড়ে থাকতে চাই।
বাঙালির চরমতম শত্রুকেও বাঙালি যেভাবে ক্ষমা করতে পারে। না, বিশ্বে অন্য কোন জাতির
সেই ক্ষমতা নাই। তাই বাঙালির আজ সত্যিই বড়দিন। বড়দিন আজ বাঙালির। ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মতোই কাঁটাতারে ক্ষতবিক্ষত
বাঙালি কেমন অম্লানবদনে জাতির চরম শত্রুদেরকেও আপনার জ্ঞান করে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে
আপন করে নিয়ে ক্ষমাই পরম ধর্ম পালনে দিকপাল হয়ে উঠেছে। বড়দিনের বাঙালির তাই আজ সত্যিই
বড়দিন।
২৫শে ডিসেম্বর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

