শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনায়, রাজ্যের
সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। মনে হয় না রাজ্যবাসীর
মনে সেই বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ রয়েছে। বুথে বুথে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে যে যাকেই ভোট
দিন না কেন। অনুমান, অন্তত এই একটি বিষয়ে রাজ্যবাসীর মনের গহনে কোন বিতর্ক নাই। মুখে
আমরা যে যাই বলি না কেন।
এদিকে এই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ভিতরে
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যেমন, অশিক্ষিত এবং অযোগ্য প্রার্থীরা লক্ষ লক্ষ
টাকার বিনিময়ে শিক্ষাদানের মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। তার
ফলাফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সেটি অনুমান করতে খুব বেশি বিদ্যা শিক্ষার দরকার হয় না।
রাজ্যের সব শ্রেণীর মানুষই সেইটুকু অনুমান করতে পারেন। এবং তার গুরুত্বও কম বেশি অনুধাবন
করতে সক্ষম।
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির আরও একটি বড় দিক
রয়েছে। সরকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার উপরে মানুষের আশা ভরসার শেষটুকুও অন্তর্হিত
হয়ে যাওয়া। তাতে কিন্তু একটি মস্ত বড়ো লাভ রয়েছে। লাভ এইটুকুই, পাড়ায় পাড়ায় বেসরকারী
স্কুলের রমরমে ব্যাবসা আরও বেশি করে, আরও সর্বাত্মক ভাবে জাঁকিয়ে বসার অনন্ত সম্ভাবনার
দরজা খুলে যাওয়া। সেখানে কারা শিক্ষা দেবেন। তাদেরই বা শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শিক্ষাদানের
সক্ষমতা কতটুকু। আমরা কিন্তু সেইসব দেখতেও যাবো না। আমরা জলে কুমীর দেখেই ডাঙায় উঠে
পড়ে নিশ্চিন্ত! এইসব বেসরকারী স্কুল কলেজগুলিতে যারা লগ্নী করেন। তাদের কিন্তু আরো
পৌষমাস।
অন্যদিকে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির আরও
একটি বড়ো দিক, সরকারী বিদ্যালয়গুলিতে অসংখ্য শিক্ষক পদ খালি পড়ে থাকা। ছাত্র শিক্ষক
অনুপাত দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার ফলে শিক্ষার মান যে দ্রুতহারে
নীচের দিকে নামতে থাকবে। সেকথা বলাই বাহুল্য। প্রথমে স্কুল আছে ছাত্রও আছে। কিন্তু
শিক্ষক কম। পড়াশুনো নামে মাত্র। দিনে দিনে ছাত্র সংখ্যা কমতে থাকা। এবং নতুন শিক্ষক
নিয়োগ বন্ধের হাত ধরে। একদিন দেখা যাবে স্কুল আছে ছাত্রও নেই শিক্ষকও নেই। ফলে দিনে
দিনে একের পর এক সরকারী স্কুল উঠে যাওয়ার ঘটনাকে মানুষও স্বাভাবিক বলে হজম করে নেবে।
অনেকেই তলিয়ে দেখতে যাবে না। সরকারী স্তরে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সরকারের হাত গুটিয়ে নেওয়ার
প্রয়াসে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির একটি বড়ো প্রভাব রয়ে যাবে।
অন্যদিকে বেসরকারী স্কুল কলেজে পঠন পাঠনের
খরচের ক্রমবর্ধমান উর্ধগতিতে সমাজের একটা বড়ো শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ হারাতে
বাধ্য হবে। এবং যে সামান্য অংশের ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠবে। তাদের শিক্ষার মান নিয়েও
সংশয় থেকে যাবে। এমনিতেই বেসরকারী স্কুল কলেজগুলিতে শিক্ষক শিক্ষিকাদের যোগ্যতার বিষয়ে
নিশ্চিন্তে ভরসা রাখা দায়। তার প্রধান কারণ, প্রায় নামমাত্র বেতনে প্রধানত অস্থায়ী
ভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে, এই সকল স্কুল কলেজগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। পুঁজির ধর্মই
হলো মুনাফার সর্বোচ্চ বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ। ফলে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই বেসরকারী স্কুল
কলেজের অর্থ লগ্নীকারীরা যথাসম্ভব কম বেতনে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ভাবেই শিক্ষক নিয়োগ
করে মুনাফার নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধি ঘটাতে থাকবে। এই ব্যবস্থার আরও একটি দিক রয়েছে। প্রকৃত
যোগ্য শিক্ষকরা নিশ্চিত ভাবেই এইরকম কম বেতনের অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পিছনে
ছুটবেন না। তাঁরা তাদের যোগ্যতা অনুসারে দেশ বিদেশের সেইসব স্কুল কলেজে পড়াতে ছুটবেন।
যেখানে প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকের প্রকৃত কদর রয়েছে। ফলে বেসরকারী স্কুল কলেজে লক্ষ লক্ষ
টাকা খরচ করে পড়লেই যে শিক্ষার্থীরা তাদের বিষয়গুলিতে দক্ষ এবং উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠবে।
তার কোন নিশ্চয়তা নাই।
অর্থাৎ এইটি বেশ পরিস্কার। সমাজ দুইটি
শ্রেণীতে ভাগ হয়ে থাকবে। শিক্ষা লাভে সমর্থ্য। আর শিক্ষা লাভে অক্ষম। রাজ্যের শিক্ষা
ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বেসরকারীকরণে শিক্ষার মানও একটি সাধারণ স্তরে আটকা পড়ে থাকবে।
প্রকৃত শিক্ষিত এবং সুদক্ষ কর্মপ্রার্থীর অভাব দিনে দিনে দ্রুতগতিতে দ্রুতহারে বৃদ্ধি
পেতে থাকবে। যে যে বিষয়েই পড়াশুনা করুক না কেন। কোন বিষয়েই তারা যথেষ্ঠ এবং সঠিক জ্ঞান
অর্জন করতে পারবে না। এটি কিন্তু এক ভয়াবহ সম্ভাবনা। যদি সত্যিই এই পরিণতি ঘটে। তবে
এই রাজ্যের ভবিষ্যত সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি সাম্প্রতিক
কোন ঘটনা নয়। প্রায় এক দশকের উপরে এই দূর্নীতি চলে আসছে। ফলে এর কু-প্রভাবগুলি দীর্ঘস্থায়ী
ছাপ রাখতে শুরু করে দিয়েছে। একদিকে একশ্রেণীর মানুষের কাছে এটি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
যাদের হাতে অর্থ রয়েছে। কিন্তু বিদ্যাশিক্ষা নাই। তারা রাতারাতি সমাজে শিক্ষক অবতারে
আবির্ভুত হয়ে মাসে মাসে সরকারী বেতনের এমন সুযোগ ছাড়তে রাজি নন। তার জন্য লক্ষ লক্ষ
টাকা বাজি রাখতেও পিছপা নন তারা। কিন্তু এঁদের সংখ্যা তো খুব বেশি নয়। একটা রাজ্যের
অধিকাংশ অধিবাসীই যদি সরকারী চাকরির মাস মাহিনার লোভে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে সক্ষম
হতো। তবে তো কথাই ছিল না। আসলে এই যারা লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে একটি সমাজে শিক্ষক
হয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে। সোজা পথে বাঁকা পথে তাদের আয়ের উৎস একাধিক। একেবারে
ঘটিবাটি বেচে দিয়ে। গাছতলায় পৌঁছিয়ে কেউ নিশ্চয় দশ কুড়ি লক্ষ টাকায় বাঁকা পথে চাকরি
জোগার করছে না। ফলে, যাঁদের একাধিক পথে আয়ের উৎস রয়েছে। মোটামুটি অর্থের অভাব নাই।
কিন্তু বিদ্যের অভাব রয়েছে ষোলআনা। তারাই চলমান শিক্ষক দুর্নীতির মূল সহায়ক। এই শ্রেণীর
মানুষের সংখ্যা কম হলেও। একেবারে হাতেগোণাও নয়। সেরকম হলে। এক দশকের বেশি সময় ধরে এমন
রমরমিয়ে শিক্ষক দুর্নীতির কারবার চলতে পারতো না কিছুতেই।
এবং বাকিদের ভিতরে অনেকেরই চেষ্টা কিভাবে
এই দুর্নীতির সুযোগে একটি সরকারী চাকরি বাগিয়ে নেওয়া যায়। অর্থাৎ দশ কুড়ি লক্ষ টাকায়
বাঁকা পথে চাকরি কেনার সামর্থ্য না থাকা মনেই কিন্তু এমনও নয় যে, সামগ্রিক এই প্রক্রিয়ার
বিরোধী হয়ে ওঠা। সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলেই বাঁকা পথের সুবিধে নেওয়ার মানুষ, এই রাজ্যে
কমও নেই। অর্থাৎ একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে। রাজ্যবাসীর একটি বড়ো অংশই দুর্নীতির
প্রশ্রয়দাতা। কেউ সরাসরি। কেউ প্রচ্ছন্ন ভাবে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির এইরকম রমরমা
কারবারের পেছনে এটাই আসল চালিকা শক্তি। নয়তো, টিভির স্ক্রিনে সরাসরি নেতা থেকে মন্ত্রীদের
লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতে দেখার পরেও, একটি রাজ্যের মানুষ সেই সকল দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা
মন্ত্রীদেরকেই বুথে বুথে বিপুল ভোটে জয়ী করে কি করে? এবং একবার দুইবার নয়। একাধিকবার।
নির্বাচনের পর নির্বাচনে। না, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির শিকড় শুধুমাত্র কয়েকজন হাজতবাসী
নেতা মন্ত্রী আমলাদের ভিতরেই সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড় শুধুই শাসকদলের মধ্যেও সীমাবদ্ধ
নয়। এর শিকড় বাঁকাপথের প্রশ্রয়দাতা সকলের ভিতরে ছড়িয়ে রয়েছে।
এখন প্রশ্ন। তাহলে ধর্মের কল বাতাসে নড়লো
কিভাবে? ধর্মের কল কোনদিনই বাতাসে নড়ে না। মানুষকেই বহু সংগ্রামে, সেই কলকে নাড়াতে
হয়। আবার নাড়ালেই যে ধর্ম প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। বিষয়টি আদৌ তেমন একরৈখিকও নয়। বলতে গেলে
প্রায় যে কয়কজন কর্মপ্রার্থী পরীক্ষায় যোগ্যতার মান পার করেও, অন্যায় ভাবে চাকরি থেকে
বঞ্চিত হয়েছে। তাদেরই সম্মিলিত সংগ্রামে আপাতত হাজতবাসী হতে হয়েছে সেই সব হোমড়া এবং
চোমড়াদের। যাদের সরাসরি হাত ছিল এই দুর্নীতিতে। কিন্তু মনে রাখতে হবে। তদন্ত কিন্তু
এখনো শেষ হয়নি। সকলে এখনো ধরাও পড়েনি। মাত্র যে কয়েকজন ধরা পড়েছেন। তাদেরও বিচার প্রক্রিয়া
এখনো শুরুই হয়নি। আর ভারতবর্ষের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রীতার কথা স্মরণে রাখলে,
ধর্মের কলের এইটুকু নড়াচড়া আদৌ কোনদিন ফলবতী হবে কিনা। সত্যিই বলা মুশকিল। ততদিনে গঙ্গা
দিয়ে বহু ঘাটের জল গড়িয়ে যাবে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। এই সাথে একথাও মনে রাখতে হবে।
বঞ্চিত প্রার্থীরা অধিকাংশই আজও চাকরির নিয়োগপত্র পাননি। এবং বাঁকা পথে চাকরি পাওয়া
প্রতিটি অযোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকারও এখনো চাকরি চলে যায়নি। লড়াই চলছে। লড়ছে দুই পক্ষই।
বঞ্চিত যোগ্য প্রার্থীরা। আর শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মূল কারবারীরা। সেই অসম যুদ্ধে
শেষমেশ কোন পক্ষ জেতে। কোন পথে জেতে। ধর্মের কলের নড়নচড়ন নির্ধারিত হবে সেই পথেই।
২৭শে জুন ২০২৩
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
