বিরোধীশূন্য নির্বাচনবিধি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিরোধীশূন্য নির্বাচনবিধি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বিরোধীশূন্য নির্বাচনবিধি



বিরোধীশূন্য নির্বাচনবিধি

সারাদিন টিভি চ্যানেলে চোখ ফুটিয়ে বসে আছি। এই চ্যানেল থেকে ঐ চ্যানেল। এই শহর থেকে ঐ শহর। সর্বত্রই একই ছবি। মার মার কাট কাট। লাঠিপেটা চড় থাপ্পড়। কিল ঘুঁষি। মহিলা প্রার্থীর চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ফেলে মার। বিডিও অফিসের ভিতর থেকে টেনে হিঁচড়ে ঠেলে ঠুলে প্রার্থীদের গলাধাক্কা দিয়ে বেড়ে করে দেওয়া। রাস্তায় রাস্তায় বোমা বন্দুক গুলির মিছিল। কোথাও বা দোকানপাট বাড়িঘরদোরে অগ্নিসংযোগ। হ্যাঁ পুলিশও আছে। হাতে বন্দুক নিধিরাম বরকণ্দাজ সেজে শাসক দলের হুকুম মতোই। সেই শৈশবের গো এণ্ড স্ট্যাচু খেলার মতো। হুকুম হলো তো পুলিশ দৌড়ালো। না হলো তো ঠুঁটো জগন্নাথ। এটাই পশ্চিমবঙ্গ। এটাই ২০১৮। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের মনোনয়ন পর্ব।  না ছবি তো এইখানেই শেষ নয়। আরও আছে বইকি! একদিকে নির্বাচন কমিশন। একদিকে আদালতের চৌকাঠে বিরোধী দলগুলির মাথাঠোকা। যুক্তি আর কুযুক্তির ধস্তাধস্তি। আর সংবাদমাধ্যেমের ক্যামেরার ফোকাসে বিপক্ষ দলগুলির মুণ্ডপাত। এবং তারই মধ্যে একটি পেশার বাড়বাড়ন্ত! হ্যাঁ পেশার নাম দুর্বৃত্তায়ন দুষ্কর্ম রাজনৈতিক সন্ত্রাস। হাতে লাঠি বোমা বন্দুক। মাথায় নেতানেত্রীদের আশীর্বাদক হস্ত। সাথে দলদাস নিস্ক্রিয় পুলিশের বরাভয়। কোন ভয় নাই। এগিয়ে যাও। যে কাজ পুলিশের পক্ষে বেমানান। দেখতে খারাপ লাগবে। বিপক্ষ দল নয়তো আবার চটিপুলিশ বলে বিদ্রুপ করতে পারে। ফলে তোমরা মুখে রুমাল বেঁধে নাও। আর তেড়ে যাও। একটা মাছিও যেন বিডিও অফিসে গলে ঢুকতে না পারে। তোমরাই পরে ইতিহাসে উন্নয়নের বীর সেনানী রূপে বন্দিত হবে। পুজিত হবে। সার্থক বীরপুরুষ! তোমরা ছিলে বলেই না মনোনয়ন পর্বেই ৩০% আসনে উন্নয়ন জয়লাভ করেছে। এই জয় রাজ্যবাসীর জন্যে তোমাদেরই ঘামে ঝরানো উপহার।

দেখছি তো দেখছি। সারাদিন, নেই কাজ তো টিভি দেখ। এই চ্যানেল থেকে সেই চ্যানেল। আহত সাংবাদিকের ভাঙা ক্যামেরার ছবিও। সান্ধ্যটিভির আসরে  পরিবর্তনপন্থী অধ্যাপকমণ্ডলীর যুক্তিতে যা রাজ্যে গণতন্ত্র ঠিকঠাক চলারই অভ্রান্ত দৃষ্টান্ত। ঠিকই তো নয়তো আহত সাংবাদিকের ভাঙা ক্যামেরার ছবি দেখাতে দেওয়া হতো নাকি! গণতন্ত্র চলছে বলেই না এত তর্ক এত বিতর্ক গণতন্ত্রের অবস্থান ও অবস্থা নিয়েই। এতো আর হিটলার মুসোলিনীর রাজত্ব নয়। একদম। কিন্তু গোয়েবলসদের রামরাজত্ব এখানে। আপনি টিভির পর্দায় পরিস্কার দেখতে পাচ্ছেন বিরোধী প্রার্থীদের যে’কজন মাছি না গলতে দেওয়ার দেওয়াল টপকিয়েও বিডিও অফিসের ভিতরে ঢুকে পড়েছে, তাদেরকেই ধরে ধরে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দেওয়া হচ্ছে মনোনয়নপত্র কেড়ে নিয়ে বা ছিঁড়ে দিয়ে। চলছে কিল ঘুঁষি চড় চাপড়ের অবিরাম বর্ষণ। কিন্তু নেতানেত্রীরা সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কেমন অম্লানবদনে বলে দিচ্ছেন, ওদের প্রার্থী দেওয়ার মতো লোকই নেই, তো মনোনয়ন পত্র জমা দিতে আসবে কে? ঠিকই তো, শাসক দলের কর্মীদের বরং ভাড়া করে নিয়ে প্রার্থী খাড়া করতে পারতো বিরোধীরা। তারপর নির্বাচনে জিতে নিয়ে কাক কাকের বাসায় ফিরে যেত নাহয় বরং। অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনও হতো। আবার বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত রাজত্ব কায়েম করাও যেত। সাপও মরতো লাঠিও ভাঙতো না।

তো এই হলো বর্তমান চিত্র। আমরা যারা সাতেও নাই, পাঁচেও থাকি না বরং টিভি দেখি আর কাগজ পড়ি আর দেশের নাড়ীর স্পন্দন টের পাই বলে মনে করি এবং রাত্তিরে নিশ্চিন্তে ঘুম দিই তাদের আর কি? মরছে আর মারছে তো সাধারণ জনসমাজ। আমাদের মতো নাগরিক সমাজের থেকে অনেক দূরবর্তী তাদের অবস্থান। মাঝে কিন্তু রয়ে গিয়েছে একটা সুস্পষ্ট শ্রেণীবিভাজন। বাংলা ও বাঙালির আবহমান ঐতিহ্যের অন্যতম এই শ্রেণীবিভাজনে পুরু হয়ে আছে আমাদের অভিজাত চামড়া। তাই আমাদের কোন ভাষ্য নাই। প্রতিবাদ নাই প্রতিরোধ নাই। প্রতিকারের পরিকল্পনা নাই। আমরাও দিন আনি দিন খাই। তবে সেটা মজুরী নয়। পাওনাগণ্ডা। ব্যাংকব্যালেন্স থেকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে আমাদের সুরক্ষার বলয় তৈরী করতেই আমাদের দিন চলে যায়। তবু টিভি দেখি। কাগজ পড়ি, যে যাকে ভোট দিই তার হয়ে যুক্তিমালা সাজাই। আর চলতে ফিরতে সেই ভাঙা রেকর্ড বাজাই। সেখানেই আমাদের যাবতীয় সমাজসেচতনতার দায় দায়িত্ব সারা হয়। তাই রাত্তিতে নিশ্চিন্তে ঘুম হয় এখনো। এবং তক্কে তক্কে থাকি, রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের সাথে কোন ভাবে যদি একটু সখ্যতা গোড়ে তোলা যায়। যদি কোন সোর্সে তাদের কোন একজনের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। না রাজনীতি করার জন্যে নয়। কাজে অকাজে কোন সুযোগসুবিধা যদি পাওয়া যায়। কখনো সখনো দরকারে অদরকারে!

তাই আমরা ধরেই নিই, এটাই রাজনীতি। এইভাবেই চলতে থাকবে ভোটপর্ব থেকে শাসন পরিচালনা সবকিছুই। কোন কিছুই নির্ভর করছে না আমার ওপর। কোনই ক্ষমতা নাই আমার আপনার। ফলে সবকিছুই দেখে যাও। সবকিছুই সয়ে যাও। আর এইভাবেই দেখে যেতে যেতে কবে যে আমাদের দৃষ্টিশক্তিই দখল করে নেয় সংবাদ মাধ্যম থেকে রাজনৈতিক শক্তিগুলি, আমরা টেরও পাই না কিন্তু। তখন চলতে থাকি দম দেওয়া পুতুলের মতোই। বলতে থাকি খবরে শোনা কাগজে পড়া কথাগুলিই। সেগুলি যে আসলেই অন্যের প্রতিধ্বনি, খেয়াল থাকে না আর সে কথা। ফলে সমাজিক পরিসরে আমাদের ভুমিকাটাই শূন্য ওঠে। কারণ ততক্ষণে আমাদের আর কোন নিজস্ব অবস্থানই অবশিষ্ট থাকে না। ঠিক এই শূন্যতাটুকুই দরকার সকল ক্ষমতাসীন শক্তিগুলির। তবেই তাদের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে রাতে। এবং সেই কারণেই আমাদের মতো মানুষদের রাতের নিশ্চিন্ত ঘুমগুলির উপরেই তাদের মূল ভরসা। আর তারা সেটা জানেই বলেই অম্লানবদনে টিভি ক্যামেরার সামনেই সাংবাদিকদের উত্তরে অস্বীকার করতে পারে যা ঘটছে, তাকেই। প্রতিষ্ঠিত করতে পারে যা ঘটেনি সেই মিথ্যাকেই। আমাদের নিস্ক্রিয়তাই তাদের শক্তির মূল উৎস।

পশ্চিমবঙ্গের আজকের রাজনৈতিক অবস্থানকে ঠিকমতো বুঝতে গেলে বুঝতে হবে এই সত্য থেকেই। আর এইখান থেকেই উঠে আসছে বিরোধীশূন্য নির্বাচনের তত্ব ও সত্য। একটা ঘুমন্ত সমাজকে ক্রমাগত ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে যাও। উন্নয়ন চলছে। সত্যই তো যে দিকে তাকাবেন চোখ ধাঁধিয়ে যাবে নীলে আর সাদাতে। বড়ো মোহময় এই দুইটি রঙ। বড়ো সার্থক নির্বাচন। চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্যে সাদার কোন জুড়ি নাই! আর নীল! রাত যত গভীর হয়, তত তার রঙ যেন ফুটে ওঠে! সাথে একটা মৌতাত। ঘুম ঘুম ভাব! আপনিও সুখ স্বপ্নে ডুবে যেতে নিশ্চিন্ত হয়ে উঠবেন। দিনে দিনে। সত্যই তো উন্নয়নের জয়রথ চলছে এখন। বাস্তব অবস্থা নিয়ে ভাবনা চিন্তার সময় নয় এখন। এখন একটাই চিন্তা উন্নয়ন। আর বিরোধীরা সেই উন্নয়নেই বাধা দিতে উঠে পরে লেগেছে। উন্নয়ন নিয়ে সমালচনা করা চলবে না। সমীক্ষা করা চলবে নয়। কোন রকম বিরেধীতা বরদাস্ত করা হবে না। কারণ আমরা উন্নয়ন করছি। আর এর বিরোধীতা করলেই জনগণের শত্রু। রাজ্যের স্বার্থের বিরোধী। অতএব বিরোধীদেরকেই শূন্য করে দাও। অপ্রাসঙ্গিক করে দাও। প্রান্তিক করে দাও। হ্যাঁ অবশ্যই উন্নয়নেরই স্বার্থে। সবার উপরে উন্নয়ন সত্য তার উপর নাই।

না এই পরিস্থিতি একদিনেই তৈরী হয় নি। হতে পারে না। এই পরিস্থিতির ঠিকাদার কেবলমাত্র বর্তমান শাসকগোষ্ঠীও নয়। এই ব্যবস্থাই আমাদের ১৯৪৭ এর স্বাধীনতার প্রকৃত উত্তরাধিকার। না না, ভয় নেই সেই বিষয় নিয়ে গবেষণা সন্দর্ভ লিখতে বসি নি আদৌ। সে কাজ পরবর্তীতে আগামীদিনের ঐতিহাসিকদের। আমার আপনার কাজ নয়। আমাদের কাজ শুধু দেখা গড্ডালিকায় প্রবাহে কিভাবে ভেসে থাকলে সন্তানসন্ততিদের একটু দুধে ভাতে রেখে দিয়ে যাওয়া যায় সেইটুকুই মাত্র। আর এর বাইরে বেরিয়ে নেহাৎ মুর্খের মতন বডি দিতে কে যায় বলুন। কথায় বলে ক্ষুদিরাম হওয়ার দিন গিয়েছে চলে। তাই দেওয়াল টিভিতেই আমাদের দেওয়াললিখন স্পষ্ট!

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত