কবিতা পড়া আর না পড়া
না, খুব সত্যি করে বললে, বেশ কিছুদিন কেন
অনেকদিনই হয়ে গেল, আমি
বা আপনি কিনিনি কোন কবিতার নতুন বই। তা সে বিখ্যাত কোন কবিরই হোক, বা নতুন কোন কবির
কবিতার বই। একটু খুঁজে দেখলে আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকটি কবিতার বই যে পাওয়া যাবে না, তা নয়। কিন্তু সেগুলির
মলাট হয়তো কেন,
নিশ্চয়ই
খোলা হয় নি হয়তো বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। সারাদিনের ব্যস্তাতা, জীবনযুদ্ধের
সমাজবাস্তবতার ভিতর নিয়মিত কবিতার বই কেনা, বা পড়া কোনটাই সম্ভব নয় হয়তো আর
আমাদের সকলের পক্ষে। সংসার ও পেশাগত দায়বদ্ধতার বাইরে যেটুকু সময় পাওয়া যায়, তারপর কবিতার বই খুলে
বসা, আসলেই অবাস্তব কল্পনা
একেবারেই। এমনই আমাদের রোজকার জীবন। এমনই এই যুগ। জানি আমরা। সে কথা আমি বা আপনি
স্বীকার করি আর না করি।
জানি
অনেকেই বলবেন,
তাহলে
সকাল সন্ধ্যায় এত যে কবিতা আছড়ে পড়ছে ফেসবুকের ওয়াল থেকে হরেক রকমের ওয়েবপত্রের
পাতায়,
গণ্ডায়
গণ্ডায় লাইক আর কমেন্টের মিছিল; সেগুলি তবে লেখাই বা হচ্ছে কি করে? আর পড়াই বা হচ্ছে কখন? সত্যই এই ইনটারনেট
বিপ্লবের হাত ধরে, না
শুধু বাংলাতেই নয়, সারা
বিশ্বেই কবিতা লেখা ও পোস্ট করার বা মেল করার এক হিড়িক পড়ে গিয়েছে যেন। সোশ্যালসাইটের
পাতায় লগইন করলেই শতশত কবিতার মুখ। আর ততধিক লাইক আর কমেন্ট। বেশ, কিন্তু আসুন তো দেখি
একবার,
মনে করার
চেষ্টা করি,
গত সাত
দিনে কয়টি কবিতা পড়েছি আমরা সেখানে ঠিকমত? না, লাইক বা কমেন্ট করে বন্ধুকৃত্য
সমাপন করার দায় থেকে কবিতায় চোখ বুলানো নয়। ওটা কবিতা পড়া নয়। জানি, অনেকেই আমরা আবার
সেটুকুও করি না। বন্ধুর সাথে খাতির ভালো থাকলেই ঝপাঝপ লাইক আর কমেন্ট করে দিয়ে
স্ক্রল করতে শুরু করে দিই। হ্যাঁ এটাই ঘটনা। কবিতা না পড়েই আমাদের যাবতীয় লাইক আর
কমেন্টের স্তুপ জমে ওঠে অন্তর্জালের চৌহদ্দীতে। তাহলে দেখুন তো মনে করে গত সাতদিনে
কয়টি কবিতা পড়েছেন ঠিকমতো?
তারপর
ধরুন, এই যে এত কবিতা লেখা
হচ্ছে সারাদিন,
লিখছেন
কারা? তাঁদের কি খেয়েদেয়ে আর
কোন কাজ নাই?
সংসার
ধর্ম পেশাগত দায়িত্ব সামলিয়েও কি করে পারছেন এমন গণ্ডায় গণ্ডায় কবিতা প্রসব করতে
রাতদিন?
কবিতা
লেখা তাহলে তো মনে হয় বেশ সহজই একটা বিষয়। সারাদিনের পরিশ্রমের পর ব্যালকোনিতে
হাওয়া খাওয়ার মতো আরামের বিষয়ই হবে। নাহলে এত অজস্র কবিতা লেখা হচ্ছে কোন জাদুতে? আচ্ছা আরও একটা প্রশ্ন।
এই যে সারাদিন এত কিছুর পরেও কবিতা লেখা, নিজের কবিতা বাদে অন্যের কবিতা পড়ার ধৈর্য্য থাকে কি
তারপর?
নাকি, নিজের কবিতায় কয়টি লাইক
বা কমেন্ট পড়লো সেই হিসাব নিতে নিতে আর রিপ্লাই দিতে দিতে আর পাঁচজনের কবিতা পড়ার
সময় থাকে না আর হাতে? মধ্যরাতের
ডাক এসে যাওয়ার আগে!
সত্যই
কি কবিতা পড়ি আমরা আর? প্রতিদিন
না হোক কখনো সখনো? যেমন
করে পড়তে পারলে একটি কবিতার ভিতরে প্রবেশ করা যায়? একটি কবিতার আবহাওয়ায় বসবাস করা
যায় কিছুটা সময়। বা কয়কেটি দিন। অনেকেই বলবেন, তেমন কবিতা আর লেখা হচ্ছে কয়টি? যত কমই হোক না কেন, আমাদের কি আছে ততটা সময়
আর ধৈর্য্য,
ততটা আবেগ
আর তাগিদ?
কবিতার
সাথে সহবাসের। কবিতাকে নিয়ে সময়ের রেলিং ধরে জীবনের মুখোমুখি হওয়ার অদম্য ইচ্ছা বা
একান্ত প্রয়োজন অনুভব করি কি আমরা আজ? কবিতা তো নয় শব্দের জাগলিং। শব্দ নিয়ে কসরতের সার্কাসএর
রিং। কবিতা তো জীবনকে অনেক গভীর থেকে ও অনেক ব্যাপক ভাবে উপলব্ধি করারই একটা
শক্তিশালী ও ঐকান্তিক হাতিয়ার। সে কবিতা লেখাই হোক আর পড়া। নিজের কবিতার সৃষ্টিই
হোক বা অন্যের কবিতার কাছে পৌঁছানোই হোক না কেন। আরও একটি কথা এই প্রসঙ্গে মনে
হওয়া উচিত। আমরা কি সত্যই চাই কবিতার কাছে গিয়ে পৌঁছাতে?
না
কি কবিতাও,
নিজেকে
পাঁচজনের কাছে তুলে ধরারই একটি মাধ্যম শুধু। আর সেই জন্যেই কি আমরা অন্যের
কবিতাপাঠে ততটা সময় পাই না, যতটা সময় করে নিই নিজের কবিতার প্রচারে? অর্থাৎ আজকে কবিতা কি
তবে আত্মপ্রচারের সৎ ও শোভন সামাজিক একটি উপায় মাত্র হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে? নয়তো পকেটের পয়সায়
হাজার হাজার টাকা খরচ করে নিজের কাব্যসংকলন প্রকাশের এই মিছিল শুরু হতো না হয়তো।
একুশ শতকের যুগধর্ম স্বরূপ। তাই হয়তো কবিতার লেখকের সংখ্যার তুলনায় কবিতার পাঠক এত
কম। নিজের পোস্ট করা কবিতা বা নিজের প্রকাশ করা কবিতাসংকলন অন্যের হাতে তুলে
দেওয়ার জন্যেই আমদের ব্যগ্রতা বেশি। কারণ সেই পথে নিজের সামাজিক পরিচয়ের
বিন্যাসটুকু নিজের বাসনার রঙে রাঙিয়ে নেওয়ার মৌতাতটুকু বিদ্যমান। কবিতার সাথে
বসবাসের বা কবিতার ভিতর দিয়ে জীবনের সারাৎসারকে সুস্পষ্ট ভাবে অনুভব করার এবং জীবন
ও সময়কে সুন্দর ও সামগ্রিক করে তোলার বিষয়ে আমাদের ব্যগ্রতা কই?
১৪ই
চৈত্র'১৪২৫
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

