বিদ্যাসাগরের সহজ পাঠ
এক
বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষ
জন্মবার্ষিকীতে তাঁর সম্মন্ধে বেশ চমকপ্রদ নতুন নতুন কয়েকটি তথ্য জানা গেল।
সৌজন্যে রাজ্যের রাজনৈতিক নেতানেত্রী্। সর্বভারতীয় একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয়
মন্ত্রী মহাশয় যেমন জানিয়ে দিলেন, বিদ্যাসাগর সতীদাহ প্রথা রদ করেছিলেন। যদিও আমরা বুঝতে
পারিনি,
পূর্বেই
রদ হয়ে যাওয়া একটি প্রথা কিভাবে নতুন করে আবারও রদ করা যায়। অবশ্য, একবিংশ শতকের
রাজনীতিতে সবই সম্ভব। আমরা যেমন ইদানীং দেখতে পাচ্ছি, উদ্বোধন হয়ে যাওয়া সার্কিট হাউস
থেকে শুরু করে রাস্তা সেতু আবারও নতুন করে উদ্বোধিত হচ্ছে সাড়ম্বরে। এবং সরকারী
খরচে। জনগণও উদ্বাহু নৃত্যে তাল দিয়ে সঙ্গত করছে সঙ্গত কারণেই। এখানেই রাজনীতি। আর
যেখানেই রাজনীতি, সেখানেই; কে না জানে নীতির কোন বালাই নাই। বালাই ষাট, নীতির বালাই নাই বলে কোন
আহাম্মক। না নীতি তো একটি আছেই। আর সেটিই হলো রাজনীতি। যেভাবেই হোক ক্ষমতার
চাবিকাঠিঠি হাতাতে হবে। এবং সেটি হাতছাড়া করলে হবে না। নীতি একটিই। দলমত
নির্বিশেষে। আর সেই নীতির ধ্বজাটি আড়ালে রেখে জনগণের জন্য জনহিতের মুখোশ নৃত্যে, যে কোন কথাই লাখ
কথার এক কথা।
সেইরকমই
কথা শোনা গেল সম্প্রতি। সতীদাহ প্রথা রদে বিদ্যাসাগরের অবিস্মরনীয় ভুমিকার কথা।
পুলকিত জনগণ। নেতার বচনই যে নেতার পরিচয়, সেকথা বলাই বাহুল্য। তারপর মন্ত্রী বলে কথা। কে
বলে রাজা তোর কাপড় কই? তাই মুহূর্মুহ হাততালি। জয়ধ্বনিতে প্রকম্পিত রাজ্য।
সর্বভারতীয়
একটি রাজনৈতিক দলের প্রদেশ সভাপতি যখন বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষের জন্মবার্ষিকীতে
জানিয়ে দেন সহজপাঠ প্রণেতা বিদ্যাসাগর, না তখনো আমাদের কোন চমক জাগে না। রাজনৈতিক
নেতানেত্রীদের বিদ্যার বহর নিয়ে জনগণের ভিতর যে কোন সংশয় আছে, না বিষয়টি আদৌ তেমন
নয়। ফলে আমরাও একথা জেনে পুলকিত হই, সহজপাঠের প্রণেতাও বিদ্যাসাগরই ছিলেন। আবার সেই পুনরায়
উদ্বোধন সংস্কৃতির মতোই হয়তো একই গ্রন্থ একাধিক ব্যক্তির হাতে পুনরায় লিখিত হওয়ার
সংস্কৃতি চালুও হয়ে যেতে পারে। কে বলতে পারে ভবিষ্যতে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়
গীতাঞ্জলিও পুনরায় লিখিত হবে কিনা? তবে একই গ্রন্থের পুনর্লিখনে শতবর্ষ ব্যাবধানে সুইডিশ
আকাদেমীতে নোবেল দেওয়ার সংস্থান আছে কিনা সে কথা বলতে পারি না!
রাজনীতি
বড় বালাই,
সকলেই
চলেছেন সকলের আগে। কেউই পিছিয়ে থাকতে পারেন না। তাই সেই বিদ্যাসাগরের দুইশতবর্ষের
জন্মবার্ষিকীতেই রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বও জানিয়ে দেন বিরসিংহ
বিদ্যাসাগরের মাইল আবিষ্কারের কথা। বাংলা স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণের আবিষ্কারের
কৃতিত্বের কথা। এইগুলি জনগণ না জানলে বিদ্যাসাগরের মতো মহাপুরুষের প্রতি যথাযথ
শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হবেই বা কি প্রকারে? মহাপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পনের গুরুদায়িত্ব যখন
রাজনৈতিক দাদাদিদিদের হাতেই ন্যাস্ত। জনগণের দায়িত্ব শুধু হাতহালি দেওয়া।
তাই আসুন
সমবেত হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠুক রাজ্যের সাংস্কৃতিক দিগন্ত। জন্মের দুইশতবর্ষের
পরে বিদ্যাসাগরের ঐতিহাসিক অবদানে মুখাগ্নির এহেন চমৎকার ব্যবস্থায় স্বয়ং
বিদ্যাসগর নিশ্চয় মনে মনে বলছেন, কি জানি বাপু কস্মিনকালেও বাঙালি জাতির কোন উপকার
করেছিলাম বলে মনে তো পড়ছে না~~~~
দুই
একটি
জাতির মুখ হিসাবেই সেই জাতির রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মুখগুলিই ভেসে ওঠে সকলের আগে।
কারণ তাঁদের লার্জার দ্যান লাইফের কাটআউটগুলিই জনগণের সামনে বিশ্বের সামনে ক্রমাগত
ঝুলিয়ে রাখা হয়। এবং, জাতির মুখপাত্র হিসাবেই নেতানেত্রীদের বচন ধ্বনিত হয় দিক দিগন্তে।
এটাই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ। সোভিয়েত ইউনিয়ন বলতেই লেলিন স্ট্যালিনের মুখই
ভেসে ওঠে সকলের আগে। আমেরিকা বলতেই কেনেডি নিক্সন রুজভেল্ট রেগন। হাল আমলের বুশ
ক্লিন্টন ট্রাম্প। জার্মান বলতেই হিটলার। চীন বলতেই মাওসেতুং। ভিয়েতনাম বলতেই হো
চো মিন। কিউবা বলতেই চে গুয়েভারা ফিদেল কাস্ত্রো। বাংলাদেশ বলতেই বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিব। ভারত বলতেই গান্ধী নেহেরু। না নেতাজীর নাম বাঙালি বাদে কারুর মনে ভেসে ওঠে
না। সেটাই বাস্তব। তেমনই আজকের পশ্চিমবঙ্গ বলতে যাদের নাম প্রতিটি রাজ্যবাসীর মনে
ভেসে ওঠে,
তাদের
প্রচারিত বাণীর ভুমিকা কোন ভাবেই অস্বীকার করার উপায় নাই। এবং যে কোন সময়ের পরিসরে
একটি জাতির রাজনৈতিক নেতানেত্রীরাই সেই সময় পরিসরের সেই জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন।
এখানে মনে রাখা দরকার, নেতা নেত্রীরা জাতির জন্ম দেন না। জাতি নেতা নেত্রীর জন্ম দেয়।
অর্থাৎ এই সময়ের নেতা নেত্রীরাই এই সময়ের জাতির সঠিক মুখ ও বাণী।
জানি
অনেকেই বলবেন,
বিষয়টি
এতই সরল ও একরৈখিক নয়। ঠিক কথা। কয়েকজন নেতা নেত্রীই যে সমগ্র জাতির মুখ ও
প্রতিধ্বনি তাও নয়। সেই পরিসরের বাইরেও জাতির অনেকটা রয়ে যায়। সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, যে বিপুল ভোটে এই নেতা নেত্রীরা গণতান্ত্রিক ক্ষমতা অর্জন করেন, সেই ভোট প্রদনকারী
জনগণেরই মুখ ও প্রতিধ্বনি তাঁরা। নাহলে বিপুল পরিমাণে ভোট তাদের নামে ব্যালট বক্সে
জমা পড়তো না। এই কথা বলার উদ্দেশ্য একটিই, জনগণ সেই নেতা নেত্রীই পায়, যে নেতা নেত্রী তারা
ডিজার্ভ করে। নয়তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিকল্প যে একেবারেই থাকে না, তা কিন্তু নয়।
তাই
বিদ্যাসগরের দুইশতবর্ষের জন্মবার্ষিকী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা কোন পর্যায়ের
নেতানেত্রী ডিজার্ভ করি। বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে এতসব অজানা তথ্য, শুধু যে এই কয়জন
নেতানেত্রীরাই জানতেন তা নয় আদৌ। এর থেকেও হয়তো অনেক বেশি চমকপ্রদ তথ্য জানি আমি
আপনি আমরা,
যাঁদের
অভিহিত করা হয় আমজনতা বলে। তাই এমন সব তথ্য জানার পরেও একজন জন নেতা কিংবা নেত্রীর
জনপ্রিয়তায় এতটুকুও ভাটা পড়ে না। পড়বে না। তার কারণ, তাঁরা যে আমাদেরই স্বগোত্র। এবং
তাঁদের হাতে আরও একটি বড়ো জাদুদণ্ড আছে। সেটি হলো পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ও অধিকার।
সংবিধান স্বীকৃতই হোক আর অস্বীকৃতই হোক। তাই আমাদের ভিড়টা সবসময় তাঁদের পিছন পিছনই
চলতে থাকবে। মুখ বদলিয়ে যেতে পারে। ধারাটি অক্ষুন্ন থেকে যায়।
ঠিক
এইখানেই সমাজ বাস্তবতার চালচিত্রে ধরা পড়ে যায় বর্তমান বাঙালির আসল মুখ ও অভিমুখের
ধারা। যে বাঙালির পূর্বপুরুষ রামমোহন বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ নজরুল বিবেকানন্দ
অরবিন্দ সূর্য সেন নেতাজী সুভাষ; সেই বাঙালিই যে আজ তাদেরই উত্তরসূরী একথা ভাবতে বা
বিশ্বাস করতে স্বয়ং বিধাতাও বোধকরি ভিমড়ি খাবেন। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, আমরা খাই না। আমাদের
চেতনা এমন ভাবেই পোক্ত হয়ে গিয়েছে যে, আমরা আর কোন কিছুতেই আশ্চর্য্য হই না। আমাদের
জীবন অভিজ্ঞতায় আমরা বাস্তবতার একটি একরৈখিক ধারণা করে নিয়েছি। আর এক কথায় তাকে
বলা যায়,
‘আপনি
বাঁচলে বাপের নাম’। আমাদের সকল চিন্তাধারা এই একটি একরৈখিক অভিজ্ঞতার নিরিখে চালিত
হয়ে চলেছে। তাই কে বিদ্যাসাগর কে রামমোহন। কি তাদের অবদান ও প্রাসঙ্গিকতা। আজকে
দুশ একশো বছর পর তার আর কোন প্রাসঙ্গিকতাই নাই আমাদের সমাজে। হ্যাঁ যিনি কলেজে
পড়াবেন বা গবেষণা করবেন, বা যে ছাত্রছাত্রী পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার
প্রতিযোগিতায় দৌড়াতে নামবে, তাদের দরকার থাকতে পারে। আমাদের দরকার নাই, ইতিহাসে পড়ে থাকা।
আর তাই
ইতিহাসে মুখথুবড়ে পড়ে না থেকে বাঙালি আজ নিজেই ইতিহাস সৃষ্টির প্রক্রিয়া সংযুক্ত।
একটি জাতির অবনমনের সকল ধারাগুলিকে কি কি করলে অত্যন্ত দ্রুত ও সাফল্যের সাথে
ফলদায়ক করে তোলা যায়, আমরা বাঙালি আজ সকলে মিলেই সেই মহান কর্মে ব্রতী হয়েছি। যে যাঁর নিজ
নিজ পরিসরে ও সীমিত সামর্থ্যে। কিন্তু এইরুপ কোটি কোটি সীমিত সামর্থ্যের ঐক্যবদ্ধ
ঐকতানে একটি যুগান্তকারী বিপ্লবের সম্মুখীন আজ আমরা। আমাদের আজ আর কোন ভাবেই
ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। তাতে মহাপুরুষদের বিদেহী আত্মার সদ্গতি হোক আর নাই হোক, আমরা আমাদের লক্ষ্যে
অবিচল ও নিবেদিত প্রাণ। সেই সব নিবেদিত প্রাণের সম্মিলিত কলধ্বনিতে মুখরিত এই
বাংলা। ও তার রাজ্যরাজনীতি। এই বাংলা ও তার সংস্কৃতি। এই বাংলা ও তার বাঙালি। তাই
আরও নানান রকম চমকপ্রদ ঐতিহাসিক তথ্যভণ্ডার নিত্য নতুন তৈরী হতে থাকবে রাজ্যবাসীর
হাতেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
৩০শে
সেপটেম্বর’ ২০১৯
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

