জাল জালিয়াত
জোচ্চুরি
জাল জালিয়াত জোচ্চুরি।
এই নিয়েই ভারতীয় সমাজ। রাজনীতি শিল্প বাণিজ্য সংস্কৃতি। বুথ জ্যাম করে ছাপ্পা ভোট দেওয়া।
ইভিএম হ্যাক করে নির্বাচন জেতা। জাতীয়তাবাদের আবেগ উস্কে দিয়ে রাজনৈতিক ফয়দা তোলা।
সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আইন প্রণয়ন করা। ঘোড়া কেনাবেচা করে সরকার ফেলে দেওয়া। নির্বাচনে
হেরে গিয়েও বিধায়ক কিনে সরকার গড়ে ফেলা। দেশবাসীকে ধোঁকা দিয়ে রাজকোষ লুঠ করা। এসবের
কোন কিছুই আইনসিদ্ধ নয়। কিন্তু এইগুলি নিয়েই ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতি। খাদ্যে ভোজাল।
ওষুধে ভেজাল। ওজনে ঠকানো। এইগুলিও আইনসিদ্ধ নয়। কিন্তু চলে আসছে। চলছে চলবে। জাল সার্টিফিকেট
তৈরী করে নেতামন্ত্রীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধি করা। সেও আইনসিদ্ধ জালিয়াতি নয়। কর
ফাঁকি দেওয়া। তোলা আদায় করা। কমিশন খাওয়া। সাংসদ বিধায়ক কোটার টাকা নয়ছয় করে ব্যক্তিগত
কিংবা পারিবারিক ধনসম্পদ বাড়িয়ে নেওয়াও আইনসিদ্ধ নয়। সুইস ব্যাঙ্কে কালোটাকা পাচার
করাও আইনসিদ্ধ নয়। এই সবগুলিই জাল জালিয়াত জোচ্চরদের কর্মকাণ্ড। তারাই সমাজের মাথা।
রাজনীতির নেতা। ব্যাবসা বাণিজ্যের মালিক। তাদের ভিতর থেকেই একটা বড়ো অংশ সংসদীয় নির্বাচনী
প্রক্রিয়ায় ভোটে জিতে আইনসভার সদস্য। বর্তমান লোকসভায় তাদের ভিতর চল্লিশ শতাংশের বিরুদ্ধে
আবার নানবিধ ফৌজদারী মামলা ঝুলছে বছরের পর বছর। তাতে অসুবিধে নেই। জনতার দিকে হাত নাড়তে
নাড়তে ফুলের মালা গলায় দুলিয়ে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গায়ের জোরে নির্বাচনে জেতা এদের
কাছে বাঁহতের খেলা। এসবই ভারতীয় সমাজ সভ্যতায় জলভাত। মানুষ এসবেতেই অভ্যস্থ। মানুষও
সুযোগ সুবিধে পেলে জাল জালিয়াতি জোচ্চুরিতে সিদ্ধহস্ত। বিশেষ করে যে মানুষের রাজনৈতিক
কানেকশন যত বেশি। আর শাসক দলের স্নেহধন্য হলে তো কথাই নেই। জাল জালিয়াতি জোচ্চুরিকে
শিল্পের পর্যায় নিয়ে যাওয়া যায় হেসেখেলে। ভারতবাসী স্বাধীনতা উত্তর আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক
পরিবেশে এভাবেই অভ্যস্ত। তাই ঘুষ খাওয়া আর ঘুষ দেওয়ার মতোই এই জাল জালিয়াতি জোচ্চুরিও
একটি সমাজিক রীতি। আইনে যে ধারাই লেখা থাক না কেন।
ফলে দেশজুড়ে ভ্যাকসিন
প্রদান কর্মযজ্ঞেও জাল জালিয়াত জোচ্চোররা হাতের কাজ দেখাবে না তেমনটাও নয়। মুম্বাইতে
কয়েক হাজার মানুষকে ইতিমধ্যেই জাল ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ে গিয়েছে। কলকাতা তো সকলের থেকে
এগিয়ে থাকে অনেক বিষয়েই। জাল অধিকারিক। জাল লেটার হেড। জাল নথী। জাল ব্যাংক একাউন্ট।
জাল শীলমোহর। জাল হলোগ্রাম। এবং জালি ভ্যাকসিন ক্যাম্প। শহর সরগরম। যারা এই জাল ভ্যাকসিনেশনের
শিকার হয়েছেন। তাদের এখন রাতের ঘুম উধাও। শহরজুড়ে নরকগুলজার। নেতা থেকে মন্ত্রী। বিধায়ক
থেকে সাংসদ। পুলিশ থেকে ডাক্তার। কে নিয়ে এই জাল আধিকারিকের সাথে ছবিতে। মঞ্চজুড়ে সরকারী
বেসরকারী নানান প্রকল্পে সামাজিক অনুষ্ঠানে জাল আধিকারিকের অবাধ উপস্থিতি। এমনকি রবীন্দ্র
আবক্ষ মূর্তিও এই জালিয়াতির চক্র থেকে মুক্তি পায় নি। সেখানেও শহরের মেয়রে নামের নীচেই
জাল আধিকারিকের নাম জ্বলজ্বল করছে। জালিয়াতির এই চক্রের পাণ্ডা আপাতত পুলিশের হাতে।
কিন্তু পাণ্ডা হিসেবে যাঁকে সমানে দেখা যাচ্ছে। তার পিছনে কারা রয়েছেন। সেটাই আসল প্রশ্ন।
কলকাতা কর্পোরেশনের নামে ব্যাংক একাউন্ট খুলে দিনের পর দিন লেনদেন করা কোন সহজ বিষয়
না। কলকাতা কর্পোরেশনের নামে একাধিক ব্যক্তিকে চাকরিতে নিয়োগ করাও সোজা বিষয় নয়। বিশেষ
করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার ভিতর দিয়ে। শহরের বুকে সেই কলকাতা কর্পোরেশনের নামে
রীতিমত জাঁকিয়ে অফিস চালানো প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কিন্তু সেটিও চলছে দিনের পর
দিন। মাসের পর মাস। পুলিশ এবং প্রশাসন কেউ টের পেলো না। কর্পোরেশনের আধিকারিকরা কেউ
জানতে পারলো না। আবার সেই কর্পোরেশনের আধিকারিকদের সাথে, কখনো পুলিশের সাথে একই মঞ্চে
উপবিষ্ট এই জাল আধিকারিক। এক আধ দিন নয়। এক আধটি অনুষ্ঠানেও নয়। বিষয়টি একজন ব্যক্তির
হলে বলতে হবে। আমরা নিশ্চয় জাদুকর ম্যানড্রেকের ম্যাজিক দেখছি। খবর দেখছি না।
প্রশ্ন তো অনেক। বহু
উত্তরও জানা। রাজনৈতিক নেতামন্ত্রীদের সাথে জানাশোনা না থাকলে একা একজন মানুষের পক্ষে
এইরকম জালিয়াতির কারবার ফাঁদাও সম্ভব নয়। দিনের পর দিন চালানোও সম্ভব নয়। প্রশ্ন সেখানে
নয়। প্রশ্ন নিখরচায় ভ্যাকসিন দেওয়ার নামে জাল ভ্যাকসিন দেওয়ার প্রয়োজন হলোই বা কেন।
মানুষের কাছ থেকে নগদ অর্থ নিয়ে ভ্যাকসিন দিলেও না হয় জালিয়াতির কারণ বোঝা যেত। কিন্তু
নিখরচায় জাল ভ্যাকসিন দেওয়ার বিপুল খরচের অর্থের যোগানদার কারা ছিল? আসল প্রশ্ন সেখানে।
এবং তাদের এই অর্থ যোগানোর আসল উদ্দেশ্যই বা কি ছিল? সারদার জালিয়াতির বিষয়টির উদ্দেশ্য
পরিস্কার। সেই বিষয়ে কারুর মনেই সেদিনও কোন প্রশ্ন ছিল না। আজও নেই। কেন সেদিন বিশেষ
একটি রাজনৈতিক দলের হেভিওয়েট নেতামন্ত্রীরা সারদার ব্যাবসা প্রমোটে অক্লান্ত ছিলেন।
সেই বিষয়টিও পরিস্কার মানুষের কাছে। সারদার অর্থ কাদের কাজে লেগেছে। সেকথাও রাজ্যবাসীর
অজানা নয়। কিন্তু তাই বলে মানুষকে ডেকে নিয়ে এসে একজন জাল আধিকারিকের পক্ষে কলকাতা
কর্পোরেশনের নামে প্রকাশ্য দিবালোকে দিনের পর দিন নিখরচায় জাল ভ্যাকসিন দেওয়ার আসল
উদ্দেশ্যই বা কি হতে পারে? না, সেই উদ্দেশ্য এখনো রাজ্যবাসীর কাছে পরিস্কার নয়। একমাত্র
উদ্দেশ্য হতে পারে সরকার ও তার প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের
রাজনৈতিক সুবিধে করে দেওয়া। জনমানসে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত সরকারের প্রতি
বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা। এটা তো হতেই পারে। কিন্তু আরও বড়ো একটি প্রশ্নও তখন
উঠে আসে। জাল আধিকারিকের পাশে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কাউকে দেখা যায়নি তো এখনো কোন
ছবিতে। আরও বড়ো কথা, ক্ষমতাসীন সরকার ও তার প্রশাসন এবং সরকারী আধিকারিকদের এক অংশের
প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া কলকাতা কর্পোরেশনের নামে এত বড়ো জালিয়াতির কারবার চলতে পারে না
দিনের পর দিন। সেখানে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের নেতানেত্রী কুশীলবদের কোন ভুমিকা তো
থাকতে পারে না। এখন সরকারী দলের নেতামন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা
এই জালিয়াতির মদত দিয়ে নির্বাচিত সরকারের মুখ পোড়াবে। এমনটা ভেবে নেওয়াও তো সম্ভব নয়
চট করে। আর তখনই প্রবল ভাবে যে সন্দেহটি উঁকি দিতে শুরু করে, সেটি হলো। তবে কি সর্ষের
মধ্যেই ভুত। সদ্য নির্বাচিত সরকারকে বেকায়দায় ফেলে একমাত্র বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের
সুবিধে করে দিতেই সরকার ও তার প্রশাসনের এক অংশ তৎপর হয়ে উঠেছে? সন্দেহ কিন্তু দানা
বাঁধারই কথা।
নিখরচায় ভ্যাকসিন প্রদানের
এই জালিয়াতির সবচেয়ে বড়ো ফাঁক ছিল, ভ্যাকসিন গ্রহণের সর্টিফিকেট না দিতে পারা। যিনি
জালিয়াতির কারবার ফেঁদেছেন। তিনি জানতেন না? সময় মত ভ্যাকসিন গ্রহণের সার্টিফিকেট না
পেলে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধবে? এবং তাসের ঘরের মতো তার এতো বড়ো
জালিয়াতির কারবার হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়বে? দঁড়ি পড়বে নিজের কোমরেই। না, কাউকেই এতটা
মূর্খ ভাবা ঠিক নয়। এবং আরও বড়ো কথা। যিনি কলকাতা কর্পোরেশনের নামে এতবড়ো জাল কারবার
ফেঁদেছিলেন। চাকুরী প্রার্থীদের পরীক্ষা ও ইনটারভিউয়ের মাধ্যমে কর্পোরেশনের নামে চাকুরি
দিয়ে মাসের পর মাস বেতন দিতে পারছিলেন। ব্যাংকে কর্পোরেশনের নামে জাল একাউন্ট খুলে
অর্থ লেনদেন করছিলেন দিনের পর দিন। সেই তিনি জাল ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের মোবাইল নম্বরে
ভ্যাকসিন প্রদানের জাল সার্টিফিকেটের মেসেজ পাঠাতে পারতেন না? এটা বিশ্বাস্য?
না’কি এই জাল মেসেজ না
পাঠানোর একটাই মেসেজ ছিল। ‘আমাকে ধরুন’। তিনি নিশ্চয় অপেক্ষায় ছিলেন। কখন তার জালিয়াতি
ধরা পড়ে। কখন পুলিশের টনক নড়ে। কখন কোমরে দঁড়ি পড়ে। কারণ তাঁর নিজের কোমরে দঁড়ি না
পড়লে তো এত এত লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে কলকাতা কর্পোরেশনের নামে এই জাল ভ্যাকসিন প্রদানের
জালিয়াতি ফাঁস হতো না। ফলে তাঁর কোমরে দঁড়ি পড়ার খুব দরকার ছিল। নিশ্চয় তাড়াও ছিল খুব।
তাই এখন দেখার শুধু একটাই। তাঁর আড়ালে কারা কারা এই খেলাটার ছক কষে ছিলেন। তাঁদের এই
খেলার রাজনৈতিক অভিমুখ কোন দিকে রয়েছে। কারণ খেলাটা তাঁরা আপাতত খুব সাফল্যের সাথে
খেলে দিয়েছেন। এখন সামাল দেওয়ার দায়িত্ব শাসক দলের। একজন দেবাঞ্জন দেবের পক্ষে এমন
চমৎকার একটা খেলা, খেলা সম্ভব ছিল না কখনোই। পিছনের কুশীলবদের মুখ কি মুখোশের আড়াল
থেকে প্রকাশ হবে আদৌ। জালিয়াতির সেই গল্পটাও কি আমরা জানতে পারবো কোনদিন? এইটাই জাল ভ্যাকসিন কাণ্ডের শেষ প্রশ্ন।
২৫শে জুন’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত

