মুখ ঢেকে যাক বিজ্ঞাপনে
একলা হয়ে দাঁড়িয়ে
আছি
তোমার জন্য গলির
কোণে
ভাবি আমার মুখ
দেখাব
মুখ ঢেকে যায়
বিজ্ঞাপনে।
~~কবি শঙ্খ ঘোষ
নিজের মুখ নিজে দেখানোর যুগে দাঁড়িয়ে
আমরা। ফেসবুক সেই মুখ দেখানোরই আন্তর্জাতিক এক জনপ্রিয় মাধ্যম। এ এক আলাদিনের আশ্চর্য্য
প্রদীপ। সেই প্রদীপ হাতে নিয়ে নিজের মুখ নিজে আলোকিত করতে সকলেই আমরা সকলের মাঝে উপস্থিত।
এখানে প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া খারাপ হবে না যে, সকলেই আমরা সকলের হাত ধরতে আসিনি
এখানে। আমাদের আসা, নিজেকেই সকলের মাঝে পৌঁছিয়ে দেওয়ার প্রত্যাশায়। কিন্তু সকলের হাত
না ধরে, কি করে সম্ভব সকলের মাঝে নিজেকে পৌঁছিয়ে দেওয়া? সম্ভব যদি আমরা আলোকিত করতে
পারি নিজের মুখটুকুকেই। যত বেশিক্ষণ নিজের সেই শ্রীমুখ আলোকিত করে রাখতে পারবো, ততক্ষণই
সকলের মাঝে আমাদের অস্তিত্ব। ফেসবুক সেই অস্তিত্বকে প্রতিদিন সজীব রাখার প্ল্যাটফর্ম।
অত্যন্ত শক্তিশালী এক প্ল্যাটফর্ম। বস্তুত এতটা শক্তিশালী কোন প্ল্যাটফর্ম সাধারণ ভাবে
সাধারণ মানুষের হাতে কোনদিনই ছিল না। সেই মানুষ যে বিশ্বেরই বাসিন্দা হন না কেন। প্রথম
বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্ব।
ফেসবুক তাই
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে এমনই এক আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ। এই ভাবে সকলের
মাঝে নিজেকে তুলে ধরতেই তাই আমাদের প্রায় নিত্যদিনের আয়োজন। যার যেটুকু সম্বল, আমরা
প্রত্যেকে প্রায় সেইটুকু নিয়েই দৌড়োচ্ছি, লগইন করতে। আর লগইন করেই সেদিনের আয়োজনে নিজেকে
উজার করে দিচ্ছি। যত লাইক। যত রিঅ্যাকশান। যত কমেন্ট। তত আলোর ঝলকানি আমাদের শ্রীমুখের
উপরে। যত আলো পড়ছে, বা যতটুকু পড়ছে, ততটুকই সেদিনের সঞ্চয় আমাদের নিজের নিজের একাউন্টে।
মন খারাপের
বিকেলগুলো আজ বোধহয় তাই হারিয়ে গিয়েছে আমাদের জীবন থেকে। মন ভালো রাখার সন্ধ্যার চাবিকাঠি
এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। এই যে মন ভালো রাখার একটা উপায়, আমাদের সামাজিক জীবনে এর নিশ্চয়
একটা সদর্থক প্রভাব পড়তে শুরু করছে, বা করবে শীঘ্রই। অন্তত আমরা তো আশাবাদী নিশ্চয়।
নিজের মুখকে আলোকিত করার এই সংস্কৃতি এখন আমাদের যেভাবে বেঁধে ফেলেছে, তাতে আমরা সকলেই
ভারি আনন্দিত। সব বন্ধনই তো আর খারাপ নয় জীবনে। এও তেমনি এক মোহময় বন্ধন। যার মোহে
বিশ্বজুড়ে এমন অভাবিত সাড়া পড়ে গিয়েছে। বিশ্বজুড়ে সামাজিক সংস্কৃতিকে এক নতুন দিগন্তে
পৌঁছিয়ে দিতে পেরেছে ফেসবুক। নিজেকে সকলের মাঝে আলোকিত করে তোলাই সেই সামাজিক সংস্কৃতির
প্রধান অভিমুখ।
কিন্তু কিভাবে
আলোকিত করবো নিজের মুখকে? কবির কথা মতো নিজের মুখ দেখিয়েই নিশ্চয়। বেশ, ভালো কথা। কিন্তু
কিভাবেই বা দেখাবো নিজের মুখ? কেন যেভাবে রোজ দেখাচ্ছি। সেভাবেই। যার যা সম্বল। তাই
নিয়ে। নতুন গাড়ি কিনেছি। গাড়ির ড্রাইভিং সীটে আমি। স্ত্রী’র ক্যামেরায় ওয়াল পোস্ট।
বেড়াতে চলেছি। ভিডিও আপলোড আজকের ওয়ালে। হাসি হাসি মুখে সপরিবারে। ফেসবুক ওয়ালে। কৃতী
সন্তানের সাফল্যের আনন্দসংবাদ ওয়ালে ওয়ালে। শপিংমলে বন্ধুদের সাথে আউটিং। নন্দনে ফটোশুটাউট।
ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। আমার ওয়াল। আমার মুখ। এই যে কবিতা লিখে ফেলেছি একটা। কিংবা
নতুন বাঁধা গান। বাংলা একাডেমিতে সদ্য সংবর্ধিত হওয়ার ফ্ল্যাশব্যাক। কিংকা আজকের এই
সন্দর্ভটুকুই। এইতো আজই প্রকাশিত হলো যে লেখাটি
ওয়েব ম্যাগাজিনে। তার ছবিসহ লিংক। কিংবা স্বরচিত কাব্যপাঠের ভিডিও সন্ধ্যা। নয়তো মিউজিক
বাজিয়ে গান কিংবা নাচ। আমার ওয়াল জুড়ে আমি। সারাদিনের আমি। নিত্যদিনের আমি। আমরা সবাই
এক একটি আমি। নিজের আলোকিত মুখ দিয়ে ঘেরা এক একটি আমি।
নিজের আলোর
বৃত্তে এই যে আমার এক একটি মুখ। যে মুখের ছবিতে ভরে উঠেছে আমার ওয়াল। সেই মুখের আমি,
আর আমার আমি কি হুবহু এক? তা নিশ্চয় নয়। ওয়ালের আমি আর ঘরের আমি নিশ্চয় হুবহু এক নই।
ওয়ালের আমি সামাজিক আমি। যে মুখটিকে আলোকিত করেই না আমি পৌঁছিয়ে যাচ্ছি সকলের মাঝে।
কিন্তু ঘরের আমি’র মুখটি একান্ত আমার। সেটি নিয়ে নিশ্চয় পৌঁছাতে চাইবো না আমরা কেউই।
অন্তত সুস্থ স্বাভাবিক সামাজিক কোন মানুষই তা নিশ্চয় চাইবেন না। অর্থাৎ সকলের মাঝে
যখন পৌঁছাতে চাইছি, তখন আমার যে আমি’র মুখটিকে আমি তুলে ধরছি, সেটি সযতনে সাধা আমি।
সুচারু ভাবে শোভনসুন্দর করে সাজানো এক আমির মুখচ্ছবি। এই শোভনসুন্দর করে সাজানো যে
আমির মুখ, তাকে সঠিক পরিভাষা ব্যবহার করলে বলতে হয়, বিজ্ঞাপিত আমি’র মুখচ্ছবি। অর্থাৎ
কবি’র ভাষায় বিজ্ঞাপনে ঢাকা এক মুখ। সেই মুখই আমার ওয়ালের নিত্যদিনের মুখ। আমার লেখায়,
আমার স্ট্যাটাসে, আমার লাইকে, আমার কমেন্টে, আমার যে কোন ধরণের ওয়াল পোস্টেই। সেই বিজ্ঞাপনেই
আমার আলোকিত হয়ে ওঠা। আমার সেই আলোকিত মুখ নিয়েই আমি সকলের মাঝে পৌঁছাতে প্রত্যাশী।
আর সেইটুকুই আমার সামাজিকতা। আমার সামাজিক মুখ।
একদিন কবি
আক্ষেপ করেছিলেন। বিজ্ঞাপনের আড়ালে পড়ে থাকা মুখটুকুর জন্যেই। যে মুখ আর সামাজিক ভাবে
দেখানো হলো না বলেই ছিল তাঁর এই আক্ষেপ। আর আজ আমরা সকলে, সেই বিজ্ঞাপনে ঢাকা মুখগুলি
দেখাতেই এক সামাজিক সাধনায় মেতে উঠেছি। আমার নিজেরই বিজ্ঞাপনে ঢেকে ফেলেছি আমার নিজের
মুখ। তাতে আজ আর নাই কোন আক্ষেপ। বরং সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান যুগের আসল সাধনা।
এবং এই সাধনায় আমরা যে যত দক্ষ, তার সামাজিক জনপ্রিয়তা আজ তত বেশি। সেই জনপ্রিয়তার
মাপকাঠিতেই আমার সাফল্য। আমার একান্ত আনন্দ। তাই আজ আমাদের স্লোগান, ‘মুখ ঢেকে যাক
বিজ্ঞাপনে’।
দিন কিভাবে
পাল্টিয়ে যায়! মানুষের সামাজিক ইতিহাস হয়তো এইভাবেই যুগ পরিবর্তনের হাত ধরে মহাকালের
পথে এগোতে থাকে। না, এর কোন শেষ নাই। যে সময়ের যে সমাজ। সেই সময়ের সেই ধরণ। আর সেই
ধরণের সাথেই নিজেকে মানানসই করে তোলার সাধনা আমাদের। নয়তো ছিটকে যেতে হবে চলমান সামাজিক
ট্র্যাক থেকে। না আমরা সকলেই সময়ের সাথে আমার আপনার সামাজিক ট্র্যাকে থাকতেই চাই। কে
আর সাধ করে চায় স্রোতের উল্টমুখে দাঁড় টানতে। ফলে সময়ের পরিবর্তন নিয়ে সমালোচনা করেও
আসলে বিশেষ লাভ নাই। তুলনামূলক আলোচনা সবসময়েই করা যেতে পারে। কিন্তু এটাও তো অত্যন্ত
সত্য। আমাদের চলন সবসময়ে সামনের দিকে। সময়ের অভিমুখেই। সমাজ সংসার ব্যক্তি জীবন, কোনটির
পক্ষেই সম্ভব নয় পিছনের দিকে এগোনো।
তাই আজ যদি
কেউ কবি’র মতোই তাঁর কথা টেনে নিয়ে আক্ষেপ করেন, মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে বলে, তাঁকে
হয়ত আমাদের আজ আর পছন্দ নাও হতে পারে। কেননা আমরা পেরিয়ে এসেছি সেই সময় ও তার মূল্যবোধের
দিগন্ত। যখন বিজ্ঞাপনে ঢাকা মুখ নিয়ে পৌঁছানো যেত না কোথাও। সামাজিক ভাবে সকলের মাঝে
পৌঁছাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতো মুখ ঢাকা সেই বিজ্ঞাপনই। আজ দিন পরিবর্তনের সাথে, আমরা টের
পেয়েছি, বিজ্ঞাপনের অমেয় শক্তিই পারে আমাদেরকে সামাজিক পরিসরে তুলে ধরতে। পৌঁছিয়ে দিতে
পারে সকলের মাঝে। ঠিক যেভাবে আমরা পৌঁছাতে চাই সকলের মাঝে।
এইটিই বড়ো
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঠিক কিভাবে পৌঁছাতে চাই আমরা সকলের মাঝে। কবি যে ভাবে চেয়েছিলেন।
সেইভাবে নিশ্চয় নয়। আমাদের এই পৌঁছাতে চাওয়া আসলে আমারই বানিয়ে তোলা এক আমিকে নিয়ে।
এক সুসজ্জিত শোভনসুন্দর কৃত্রিম আমির মুখ আবরণ নিয়ে। পৌঁছাতে চাই আমরা সকলের মাঝে।
কিন্তু আমার ঘরের যে আমি। সেই মুখটিকে নিয়ে কখনোই নয়। যে মুখটিকে আমি আজ সযতন সাধনায়
আপাদমস্তক মুড়ে ফেলেছি। অন্যতর এক বানিয়ে তোলা ছবিতে। সেই ছবিকেই আমরা সান্ধ্য আসরে
নিত্যদিন হাজির করতে চাইছি। প্রতিদিনের সাধনায়। সেই ছবির জনপ্রিয়তাই আজ আমাদের ভালোবাসার
সামগ্রী। আমাদের নিত্যদিনের তৃপ্তির ধন। সকলের মাঝে সেই আলোকিত বিজ্ঞাপিত মুখের ছবিকেই
আজ আমি আপনি প্রত্যেকে স্ব স্ব পরিসরে ভালোবেসে ফেলেছি। সেই ছবির আমিকেই আজ আমার সামাজিক
পরিচয় হিসাবে গড়ে তুলেছি।
এই যে ছবির
আমি। এবং সেই ছবির আমিকেই আলোকিত করতে রোজকার এত আয়োজন। সেই আমিকেই তো আমরা সকলের ভিতরে
প্রত্যক্ষ করছি নিত্যদিন। পরস্পর পরস্পরের ভিতরে্
সকলেই সকলের আমির গল্পটা জানি আমরা সকলেই। এই এক আশ্চর্য্য পরিস্থিতি। ফলে কেউই
কিন্তু আমরা আর বিশ্বাস করতে পারি না কাউকেই। নির্ভর করতে পারি না এই ছবির এক একটি
আমিকে। ঠিক যে কারণে আমাদের পরস্পর বিচ্ছিন্ন সামাজিক হাত নিয়ে আসলেই হয়তো আমরা প্রত্যেকেই
এক একজন ঠুঁটো জগন্নাথ। আর ঠুটো জগন্নাথ হয়েই, নিজের নিজের ওয়াল মন্দিরে প্রতিদিন সাক্ষার্থীদের
অপেক্ষায় আমাদের নিজস্ব সান্ধ্য আসর। ফলে আমাদের একান্ত সাধনার বিজ্ঞাপনের আড়ালে আমরা
কিন্তু আসলেই এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতোই। না, আমাদের তেমন কোন সমাজ নাই। যে সমাজে
আমরা ধরতে পারি পরস্পরের হাত পারস্পরিক প্রেম ভালোবাসা শ্রদ্ধা বিশ্বাস নির্ভরতায়।
আমরা আর চাইও না সেই ভাবে সকলের হাত ধরতে। কবির কথা মতো আমরাও কিন্তু আজ ‘একলা হয়ে
দাঁড়িয়ে আছি’। কিন্তু তফাৎ একটাই আমরা কারুর জন্য দাঁড়িয়ে নেই। আমরা দাঁড়িয়ে শুধু নিজের
সাজিয়ে তোলা বানিয়ে তোলা মুখটিকে ভিড়ের মাঝে তুলে ধরতে। সকলের মাঝে পৌঁছাতেও নয়। আমরা
আজ আর কারুর মাঝে পৌঁছাতে প্রত্যাশীও নই। আমরা প্রত্যাশী জনপ্রিয়তার। আমরা প্রত্যাশী
খ্যাতির। আমরা প্রত্যাশী লাইক রিঅ্যাকশান কমেন্টের। আমরা প্রত্যাশী ভিড়ের।
একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
নিজের জন্যে ঘরের কোণে
আমি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যাক বিজ্ঞাপনে।
৩০শে আষাড়’ ১৪২৭
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

