অশ্লীলতার দিগন্তে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অশ্লীলতার দিগন্তে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

অশ্লীলতার দিগন্তে




অশ্লীলতার দিগন্তে

আসুন আজ একটু অশ্লীলতা নিয়েই চর্চা করি বরং। জানি। আপনি আমি। আমাদের মতো শিক্ষায় দীক্ষায় উন্নত মানুষদের অশ্লীল কথা শোনাও পাপ। তাই আমরা কোন অশ্লীল কথা বলতেও রাজি নই। শুনতেও রাজি নই। লিখতেও রাজি নই। সর্বসমক্ষে পড়তেও রাজি নই। ফলে আমরা কোন অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করবো না নিশ্চয়। কিন্তু কিছু কিছু শব্দ কেন অশ্লীল। কিভাবে অশ্লীল। সেটি নিয়ে আলোচনা নিশ্চয় করা যেতে পারে। আলোচনা অশ্লীল না হয়ে উঠলেই হলো। সাধারণত আমরা সাহিত্যক্ষেত্রে অশ্লীলতা নিয়েই একটু বেশি স্পর্শকাতর। কারণ আমরা লিখতে পড়তে শিখেছি। ভালো উপার্জন করি। সুশোভন আবাসনে থাকি। আমাদের সংসারিক ও সামাজিক জীবনের একটা সুউচ্চ মান রয়েছে। সেই মান ধরে রাখার বিষয়ে আমাদের সদা তৎপর থাকতে হয়। থাকতে হবে। হয়েছে। ফলে সাহিত্যক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক দিগন্তে আমাদের একটু বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হয়। কোনটা শ্লীল। কোনটা অশ্লীল। আমরা জানি। আমরা বিশ্বাস করি। এটা আমাদের সামাজিক দায় ও দায়িত্বের ভিতরেই পড়ে। এবং আমরা যথেষ্ট দক্ষতার সাথেই সেই দায়িত্ব পালনের কর্তব্য বিষয়ে সচেতন। আমি আপনি সকলেই। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত জনসাধারণ।

শুধু সাহিত্যক্ষেত্রেই বা কেন। জীবনের সকলে ক্ষেত্রেই এই সচেতনতা জারি রাখা জরুরী নিশ্চয়। একমত হবেন সকলেই। আজও তাই প্রকাশ্য রাজপথে ছেলেমেয়ে প্রেমিক প্রেমিকা স্বামী স্ত্রী’দের চুম্বনরত অবস্থায় দেখা যায় না। এটা বিদেশ নয়। আমাদের সমাজের একটা আভিজাত্য রয়েছে। এই তো বেশ কিছুদিন আগেও কলকাতার পথে প্রকাশ্য দিবালকে সস্ত্রীক ঘোড়ায় চড়ে হাওয়া খেতে বেরোনোও সমাজের দৃষ্টিতে অশ্লীল বলেই ধরা হতো। স্বয়ং সত্যন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমাদের প্রিয় বিশ্বকবির মেজদাদা যে কাজ করে তাঁর সময়ে নিন্দিত হয়ে ছিলেন। নেহাৎ প্রথম ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট তাই আমাদের বাপঠাকুর্দারা হাতের সুখে পিটিয়ে মারতে পারেননি। মুখের সুখে সেই যাতনা ভুলাতে হয়েছিল। কিন্তু সেই একই কাজ একই দিনে আমার আপনার মত সাধারণ একজন কেউ করলে, তাকে হয়তো আজকের গোরক্ষদের হাতে মার খেয়ে মরার মতো মরতে হতো সস্ত্রীক। সমাজরক্ষার দায় বলে কথা!

সমাজে কোনটা শ্লীল কোনটা অশ্লীল সেটা কারা ঠিক করে থাকে? না, সমাজপতি বা সমাজের মাথারাই। আজকের দিনে বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে পাড়ার দাদাদিদিরা। রাজনৈতিক দলের হেভিওয়েট নেতা থেকে চুনোপুঁটি নেতা অব্দি। যার ক্ষমতার হাত যত ভারি। সেই ক্ষমতার ধার ও ভার অনুযায়ী ঠিক করে দেবে কোনটা শ্লীল কোনটা অশ্লীল। তা দিক। আমরা যারা নেহাৎই সাধারণ মানুষ। নিরীহ গোবেচারা প্রজাতির জীব। সাতেও নাই পাঁচেও নাই। বরং আসুন একটু দেখে নেওয়া যাক ‌ভিন্ন একটু দৃষ্টিকোণ থেকে এই অশ্লীলতার বিষয়গুলি।

একবার খেয়াল করে দেখলেই দেখব, অশ্লীলতার যাবতীয় সচেতনতা, আমাদের এই প্রাকৃতিক শরীরকে ঘিরেই গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে আমাদের শৈশবের শেষ থেকেই। শৈশবের শেষ হয় সেইদিন, যেদিন আমরা আমাদের শরীর নিয়ে লজ্জিত হতে শিখি। কেন শিখি? না এটা কি মানুষ হিসাবে আমাদের প্রকৃতিগত শিক্ষা? না মনে হয়। অনেক বিতর্ক থাকতে পারে এই নিয়ে। তবে সর্বজন গ্রাহ্য ভাবে একথা বললে ভুল বলা হবে না, এই লজ্জা আমদের সমাজসংসারের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা জাত মূলত। সেই শরীরকে ঘিরেই দিনে দিনে আমাদের কাছে অশ্লীলতার বোধ জায়মান হয়ে উঠতে থাকে। আমরা শিখে নি, কোন পোশাকটা কতখানি অশ্লীল। কোন ভঙ্গিটা কতটা অশ্লীল। কোন কথাটি কিভাবে অশ্লীল। এবং, হ্যাঁ কোন চাহনীটা কেন অশ্লীল। দৈনন্দিন জীবনের বেড়ে ওঠার সাথেই এই চর্চাটা চলতে থাকে আমাদের চেতনায়। আর এই চর্চার ধারাটা নির্ধারিত করে দেয় সমাজ। সংসারে সেই ধারাটিকে অন্ধভক্তিতে স্বীকার করে নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় ব্যক্তির মন বিশ্বাস, শিক্ষাদীক্ষা ও নৈতিকতার উপরে। সেইভাবেই তো বেড়ে ওঠা আমাদের। ফলে এই চাপিয়ে দেওয়া অন্ধভক্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। আমাদের দেখা শোনা বোঝা। আমাদের আচার আচরণ। আমাদের কথা। আমাদের লেখা। সবকিছুই নিয়ন্ত্রীত হতে থাকে। নিয়ন্ত্রীত হতে থাকে আমাদের চলা ভাবা ও কাজের দিগন্তও। রুচি ও সংস্কৃতির দিগন্তও। এইভাবে আমাদের সমাজ আমাদেরকে নিজের কব্জায় রেখে দেয়। তারপর, না আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা, চেতনা কোন কিছুতেই আর মৌলিকতা বজায় থাকে না। থাকা সম্ভব নয়। আমরা সমাজ নিয়ন্ত্রীত গড্ডালিকা প্রবাহে পুকুরের কচুরীপানার মতো ভাসতে থাকি। আমাদের নিজস্ব কোন স্বাধীন অভিমুখ থাকে না আর।

তাই নিজের আপন শরীরটা নিয়েই আমরা বিব্রত থাকি অধিকাংশ সময়ে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে। অবশ্যই এটা এক ভয়ানক সত্য যে, সমাজে শ্লীলতা রক্ষায় দায় নারীর যতটা, পুরুষের ততটা তো নয়ই। বরং অনেক পরিমাণেই কম। পুরুষের সাতখুন মাপ। কিন্তুর নারীর পান থেকে চুল খসলেই মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে কুলটা অপবাদ জুটতে দেরী হবে না মোটেও। ফলে সমাজিকতার এই স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ নারীকেই সামলাতে হয় মারাত্মক ভাবে। এতটাই মারাত্মক ভাবে যে, জীবনভোর পুরুষের ছায়ায় নিজেকে ঢেকে রাখাই সতীত্ব বলে ধরা হয়ে থাকে।

অনেক কথা হলো। এবার আমাদের শ্লীল সমাজের শ্লীলতার কিছু মাপকাঠি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এখানে আমরা উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের ভিতরেই আমাদের আলোচনার পরিসর সীমাবদ্ধ রাখবো। কারণ এর বাইরের সমাজ সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতা বড়োই সীমাবদ্ধ। এখানে আরও একটি কথা স্মরণে রাখা দরকার। আমরা আবার বৈদেশিক ইংরাজীর দাসত্বকে শিক্ষা ও অধুনিকতার মাপকাঠি বলে গণ্য করে থাকি। তাই আমাদের ঘর সংসারে বৌ ঝি রা আজ আর পোয়াতি হন না। তাঁরা কনসিভ করেন। তাঁদের প্রসববেদনা ওঠার বদলে ডেলিভারি পেইন হয়। ও ডেলিভারী রুমে নিয়ে যেতে হয়। কোন হাসপাতালে বা সেবাকেন্দ্রে বা আরোগ্য নিকেতনে পোয়াতি ঘর কিংবা আঁতুর ঘর খুঁজতে গেলে লোক হাসানোর বিষয় হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আজ আর পায়খানা পায় না পটি পায়। আমাদের বাড়ি বা ফ্ল্যাটে তাই কোথাও পায়খানা নাই। কিন্তু টয়লেট আছে। শুধু বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেন। যে কোন প্রতিষ্ঠানেই একই চিত্র। আমরা চান করি বাথরুমে। এই সব কিছুর ভিতরেই একটি সাধারণ বিষয় লুকিয়ে আছে। সেটি হলো একটি বৈদেশিক ভাষার দাসত্ব। নিজের ভাষায় যে শব্দগুলি উচ্চারণ করতে আমাদের অশ্লীল ঠেকে, রুচিতে বাঁধে। সেই শব্দগুলির ইংরেজি প্রতিশব্দ আউড়াতে আমাদের আত্মমর্যাদায় কোন আঘাত লাগে না। বরং নিজেকে বেশ শিক্ষিত রুচিশলী একজন মানুষ বলেই মনে হয়। উল্টে যদি কারুর মুখে একই কথার বাংলা প্রতিশব্দ উচ্চারিত হতে শুনি। আমরা বুঝে যাই তার শিক্ষার বহর।

মজার বিষয় এটাই। আমাদের নিজেদের শিক্ষার বহরে, আমাদের দৈনন্দিন কাজে নিজের ভাষার বদলে একটি বৈদেশিক ভাষার ব্যবহার আমাদের আত্মমর্য্যাদায় আঘাত দেয় না। আমরা এক মুহুর্তের জন্য হলেও টের পাই না। নিজ মাতৃভাষার প্রতিশব্দে অশ্লীলতার গন্ধ পাওয়াটাই একান্ত অশ্লীলতা। বিদেশী শব্দ উচ্চারণে নিজেকে শিক্ষিত প্রমাণ করার দায় ও মনোবৃত্তিটুকুই চুড়ান্ত অশ্লীল। না আমাদের উচ্চশিক্ষার সনদে সেই প্রাথমিক শিক্ষাটুকু আমাদের জোটে না। তাই বাংলার ঘরে ঘরে পোয়াতিরা আজকাল কনসিভ করতে বাধ্য হয়। প্রতিদিন আমাদের টয়লেটে গিয়ে নিজেদের মুখরক্ষা করতে হয়। ভাগ্যিস আমরা দুশো বছর পরাধীন ছিলাম। সুসভ্য ইংরেজদের চাবুকের কাছে। ওদের বন্দুকের নল আমাদের শিক্ষিত না করে তুললে, আজও বাঙালিকে অশ্লীলতার দায় কালাতিপাত করতে হতো না’কি?

তা কেন। কই আমরা তো অন্ধের মতো ইংরেজদের অনুসরণ করি না। আমরা ওদের ভাষা নিয়েছি। সাহিত্য নিয়েছি। কই ওদের সব কিছু’তো নিই নি। আমাদের ঘরের মেয়েরা তো কই বিকিনি পড়ে সমুদ্রে নামে না। ওদের মতো। ঠিক কথা। অনেকেই সহমত হবেন। যথার্থ্য কথা বলে। আমাদের ঘরের মেয়েরা সমুদ্রস্নানে যায় মেকআপ করে শাড়ী গহনা সালোয়ার কামিজ পড়ে। কোন সভ্য দেশের মেয়েরা যা কল্পনাও করতে পারে না। সমুদ্রের জলে আপাদমস্তক কাপড়ে মুড়ে নামা শুধুই যে অবৈজ্ঞানিক তাই নয়। বিষটা আসলেই অশ্লীল। কিন্তু আমাদের মগজে সমাজ নির্ধরিত মাপকাঠিগুলি এমন ভাবেই শিকড় গড়ে বসে পড়েছে যে, আমাদের পক্ষে সেকথা বোঝাও অসাধ্য। সমুদ্র হোক। নদী নালা হোক। কিংবা খাল বিল পুকুরই হোক। বেশি জামাকাপড় পড়ে জলে নামাটা জীবনের জন্যেই বিপদজনক একটা ঝুঁকি। ফলে আমাদের দেশের মেয়েরা সমুদ্রস্নানের আনন্দ থেকে বঞ্চিতই থাকে আজীবন। সেজে গুজে বড়ো জোর দেড়ফুট জলে পা ভিজিয়ে ফটো শেসন হয় ঠিকই। কিন্তু কোমর ভিজিয়ে ঢেউয়ে মাথা ভিজিয়ে নিলেও সমুদ্রস্নান হয় না। পাছে কোন পুরুষ বা জনসমাগম আমার শরীর দেখে ফেলে। কোন মেয়ের পক্ষেই তাই আর দীঘা বা পুরী। কক্সবাজার কি চট্টগ্রাম। বিকিনি পড়ে সমুদ্রের সাথে সর্বাঙ্গ দিয়ে কোলাকুলির সৌভাগ্য ঘটে না। কিন্তু কোন মেয়ের পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়, এই যে পুরুষের চোখকে আশ্লীল ধরে নেওয়া। এটাও আসলে একধরণের অশ্লীলতাই। আবার সেই সাথে এটাও বাস্তব। আমাদের দেশে প্রকাশ্যে বিকিনি পড়ে স্নান করার মতো অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়ও একজন নারীর পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকির বিষয়। আদৌ নিরাপদ নয়। কেন নয়? যদি ঠিক সেই প্রশ্নটাই আঙুল তুলে করা যায়? একটিই উত্তর আসে। সমাজটাই আসলে অশ্লীল। না হলে কোন মেয়ের কাছেই একটি সমাজ এমন বিপদজনক হতে পারতে না। পারে না।

যে সমাজ মানুষকে নিজের শরীর সম্বন্ধেই পদে পদে বিড়ম্বিত ও লজ্জিত করে রাখে, সেই রাখার ভিতর দিয়েই একটি সমাজে অশ্লীলতার চর্চা জারি থাকে। যে অশ্লীলতার ব্যাধি শরীর ছাড়িয়ে মন চিন্তা ও কর্মকেও রোগগ্রস্ত করে ফেলে। আমাদের সমাজে প্রকাশ্যে চুম্বন তাই আজও অশ্লীল বলে ধরা হয়। আমাদের সমাজে এইভাবে অশ্লীলতার একটা লিস্ট করতে শুরু করলে তার শেষ পাওয়া মুশকিল। অথচ আমাদের অভ্যস্থ জীবনে অনেক গভীর ও ব্যপক ভাবে অশ্লীলতার চর্চা চলতে থাকে। সেদিকে আমরা খেয়ালও করিনা। সেই বিষয়ে আমরা সচেতনও নই। ভাষাগত পরিভাষা জনিত অশ্লীলতার চর্চার বিষয় পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এবার একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক শিক্ষার দিকে।

ভালো নোট জোগার করে আপন সন্তানকে সেই নোট মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর তোলানোর জন্য যে অভিভাবকত্ব। সেটি অশ্লীল নয়? কোন উন্নত দেশের কোন উন্নত শিক্ষিত জাতির অভিভাবক এইভাবে আপন সন্তানকে জড়ভরত করে গড়ে তোলার কথা কল্পনা করতে পারে? কচিকাঁচাদের মনে সহপাঠীর প্রতি ঈর্ষা বাবা মায়েরাই গেঁথে দিয়ে থাকেন। সেটি অশ্লীলতা নয়? সরকারী স্কুলে ক্লাস কামাই করে বাড়িতে ছাত্র পড়িয়ে উপরি উপার্জন করা কোন ধরণের রুচি শ্লীলতা? সার্বিক ভাবে শিক্ষার্থীকে শিক্ষিত করে গোড়ে তোলার বদলে, তাকে কেবল ফার্স্ট সেকেণ্ড থার্ড করার যে প্রক্রিয়া। সেটি কি অশ্লীল নয়? একটি দেশ ও জাতির পক্ষে তো সেটি আত্মহত্যার সামিল। কোন বাইরের শত্রু লাগবে না। বোমা বন্দুক মিসাইল ট্যাঙ্ক কিছুই লাগবে না। এই একটি পথেই একটি জাতি চিরকাল বাইরের শত্রুর দাসত্ব করে যাবে। না আমার ছেলে মাধ্যমিকে স্ট্যাণ্ড করেছে। মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ফার্স্ট হয়েছে। আমার তো এতসব চিন্তা করার দরকার নাই। আসলে ওসব কথা তারাই বলে। যারা ঈর্ষার আগুনে জ্বলতে থাকে। আরে নিজের ছেলেমেয়েকে স্ট্যাণ্ড করিয়ে দেখান না কেন? এই যে মানসিকতা। নিজের সন্তান স্ট্যাণ্ড করে গেলেই হো‌ল। দেশ গোল্লায় যাক। জাতি উচ্ছন্নে যাক। এই মানসিক ক্লীবতা আসলেই যে কতটা অশ্লীল সেটি বোঝার বা উপলব্ধি করার মতো ক্ষমতাই আজ আর আমাদের অবশিষ্ট নাই। আমরা তাই বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার গলদগুলি আর চোখেই দেখি না। সমাজ এখানে সরকারের রূপ ধরে একটা চুড়ান্ত অশ্লীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালিয়ে দিয়ে চলেছে। দশকের পর দশক ধরে। আমাদের চেতনায় সেই বোধই নাই। শিক্ষার উদ্দেশ্য দেশের সকলকে সমান শিক্ষার সুযোগ ও অধিকার দেওয়া। প্রতিটি শিক্ষার্থীর যথার্থ মূল্যান করে তার জন্য উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ তৈরী করে দিয়ে তাকে দেশ ও জাতির জন্যে গড়ে নেওয়া। এটাই একটি উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দাঁড়িয়েই আছে ছেঁটে ফেলার নীতির উপরে। তাই এমন একটা পরীক্ষা ব্যবস্থা। যা শুধু ছেঁটে ফেলার কাজে লাগে। কে কত নম্বর পেয়ে সেই ছেঁটে ফেলার পরীক্ষায় পাশ করে আত্মরক্ষা করতে পারবে। তারই এক অশ্লীলতম প্রতিযোগিতা। শিক্ষা আর ক্রিকেট খেলা এক বিষয় নয়। যে বোলারের মত ব্যটসম্যানকে আউট করার উদ্দেশ্যেই বল করার মতো প্রশ্নপত্র তৈরী করতে হবে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কয়েকজনকে স্ট্যাণ্ড করানোও নয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সকলকে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার মতো করে শিক্ষিত করে তোলা। যে শিক্ষা ব্যবস্থা সেই কাজে যত ব্যর্থ। সেই শিক্ষা ব্যবস্থা ততটাই অশ্লীল। আরও বেশি অশ্লীলতা, সেইটি স্বীকার না করার মানসিকতাই।

শিক্ষার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে ধর্মের দিকে ফেললে দেখতে পাবো, এই ধর্মের থেকে অশ্লীল বিষয় খুব কমই আছে। না না। হারে রেরে করে তেড়ে ওঠার দরকার নাই্ এমন কোন ধর্ম আছে, যে ধর্ম বলে, সব মানুষই সমান। কোন জাত ছোট নয় বড়ো নয়। সব ধর্মই সমান। কোন ধর্মই কোন ধর্মের থেকে শ্রেষ্ঠ নয় নিকৃষ্টও নয় কোনভাবেই। অন্য ধর্মের মানুষদেরকে পরম বন্ধু বলে নিজ বুকে জড়িয়ে ধরতে হবে। সেটাই আসলে ধর্ম্। ধর্মের পরিচয় বড়ো পরিচয় নয়। ধর্মের পরিচয়ে কোন মানুষকে আলাদা করা যায় না। উচিৎ নয়। কোন ধর্ম বলে এসব কথা? বলেছে কোনদিন? না। বরং বলেছে ঠিক এর উল্টোকথাই। ধর্মই মানুষে মানুষ বিভেদ ঘটিয়েছে সকলের আগে। ধর্মই এক ধর্মের এক শ্রেণীর মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষকে বিধর্মী বলে তার প্রতি মনের ভিতর ঘৃণার চাষ করিয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। ধর্মই মানুষে মানুষে হানাহানির সদর দরজাটা খুলে দিয়েছিল সর্বপ্রথম। প্রতিটি ধর্মই বলে আমার ধর্মগ্রন্থই শ্রেষ্ঠ। আমার ধর্মগ্রন্থের বাইরে আর সব কিছুই মিথ্যা। এত বড়ে মিথ্যার প্রচার অশ্লীলতা নয়?
অন্য ধর্মের মানুষকে সংহার করা অশ্লীল নয়? অন্য ধর্মের প্রতি মানুষের মনে ঘৃণার চাষ করানো অশ্লীল নয়? কোন ধর্ম এই অপকর্মগুলি করতে বাদ রেখছে?

ধর্মের পরে এলো সাম্রাজ্যবদ। আরও ভয়ঙ্কর। আরও অশ্লীল এক সর্বগ্রাসী শক্তি। সব কিছুর উপরে নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার উদগ্র বাসনা নিয়ে। মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাস এই সর্বগ্রাসী দৈত্যেরই ইতিহাস। এক দৈত্যের বিনাশে জন্ম নেয় আরও এক বেশি শক্তিধর দৈত্য। বিগত প্রায় শ চারেক বছর ধরে, এক অ্যাংলোস্যাকশান দৈত্যের করাল গ্রাসে বর্তমান পৃথিবী। প্রথমে বৃটিশ দানো রূপে। আর এখন মার্কিন দানো রূপে। বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। যে কোন সাম্রজ্যবাদের স্তাবকতা করা, অন্ধভক্তি করা অশ্লীলতা নয়? যে জাতি হিরোশিমা নাগাসাকিতে কোটি কোটি প্রাণ সংহার করে। ভিয়েতনামে ন্যাপাম বোমা মেরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মের ব্যবস্থা করে। চোখের সামনে গোটা মধ্য প্রাচ্য জ্বলিয়ে দিয়ে তেল লুঠ করে। সেই সাম্রাজ্যবাদী মানবতা বিরোধী নৃশংস শক্তির স্তাবকতা করা। সেই শক্তিকে অন্ধের মতো ভক্তি করা অশ্লীলতা নয়? আবার সেই শক্তিই এখন বলে দিচ্ছে করোনা কোন ল্যাবটারিতে তৈরী হয়েছে। এই শক্তির কথায় অন্ধ বিশ্বাস করা অশ্লীলতা নয়? এই শক্তির অঙ্গুলি নির্দেশে শত্রু মিত্র বাছা অশ্লীলতা নয়?

আসলে অশ্লীলতা একটা মানসিক অবস্থা। সত্য থেকে যা দূরবর্তী থাকে। বাস্তবকে অস্বীকার করে। মনুষত্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে। অন্ধকারের চর্চা করতে করতে অন্ধ হয়ে যাওয়াই আসলে অশ্লীলতা। পোশাকের মাপে অশ্লীলতা থাকে না। শারীরিক অঙ্গে অশ্লীলতা থাকে না। কোন ভাষার পরিভাষাই অশ্লীল নয়। অশ্লীল ভাষা ব্যবহারের ধরণ হতে পারে। অশ্লীল আমাদের কর্ম হতে পারে। অশ্লীল হতে পারে আমাদের লক্ষ্য। দশজনের অন্নের উপরে একজনের নিয়ন্ত্রণের অর্থনীতি অশ্লীল। বিশ্বজড়ে যুদ্ধাস্ত্রের বাজার তৈরী করা অশ্লীল। মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখার প্রক্রিয়া অশ্লীল। যখন কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিক হাজার হাজার মাইল পথ হাঁটছে, তখন বাস ট্রেন বন্ধ করে হেলিকপ্টার থেকে দেশজুড়ে পুষ্পবৃষ্টি করা অশ্লীলতা। আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে তাক লাগানো সেই দৃশ্য দেখে হাততালি দেওয়া অশ্লীলতা। পাঁচজনের অন্ন কেড়ে নিয়ে নিজে খাওয়াও অশ্লীলতা। অশ্লীলতা বাকিদের কষ্টে রেখে আত্নসুখে থাকার মানসিকতাও। তাই অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে। ঢুকতে হবে অনেক গভীরে। বিশেষ বিশেষ শব্দবন্ধ বিশেষ বিশেষ পোশাকের দিকে না তাকিয়ে।

২রা শ্রাবণ’ ১৪২৭

কপিরাইট  শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত