রূপঙ্কর দর্পণে বেআব্রু বাঙালি
চিত্রকল্প এক: ধরা যাক কথায় কথায় হঠাৎ করে আপনার মুখে
নিয়ে আপনি প্রায় নাস্তানাবুদ। অবাক বিস্ময় নিয়ে আপনি বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন। যিনি
এমন হঠাৎ করে আপনার চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়েছেন। তাঁর মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কেই
আপনার মনে ঘোর সন্দেহ দানা বাঁধছে। সত্যিই তো। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে কারুর চোখে
মুখে এক জগ ঠাণ্ডা জল ছিটিয়ে দেওয়া বা ঢেলে দেওয়া রীতিমত অসভ্যতা এবং অভদ্রতা। সাধারণত
মস্তিষ্কের নাটবল্টু ঢিলে না হলে কেউ তেমনটা করবেও না। মানুষ স্বভাবতঃই এমন অভদ্র নয়।
অপ্রকৃতস্থ হলে ভিন্ন কথা।
চিত্রকল্প দুই: চলার পথে হঠাৎই আপনি দেখলেন কেউ জ্ঞান
হারিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। একদম প্রথমেই কি করবেন আপনি? আমার মতো অমানবিক হয়ে পাশ
কাটিয়ে চলে যাবেন? নিশ্চয় নয়। তেমন ভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার মত অমানবিক মানুষ নন আপনি। প্রথমেই আপনি অন্তত ঠাণ্ডা
জলের একটা বোতলের সন্ধান করবেন। যত দ্রুত সম্ভব জ্ঞান হারানো মানুষটির চোখে মুখে এক
আঁজলা জলের ছিটে দিয়ে তাঁর জ্ঞান ফেরানোর প্রয়াসই হবে সেই মুহুর্তে আপনার প্রাথমিক
কর্তব্য। কে বলতে পারে। আপনার সেই মানবিক প্রয়াসেই হয়তো মানুষটির জ্ঞান ফিরে আসতে পারে।
না, সেই মুহুর্তে উপস্থিত কোন সুস্থ মানুষই আপনার ভদ্রতা বোধ, শিষ্টাচার, এবং মানবিকতা
নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলবে না। এমনকি, জলের ঝাপটাতেও যদি কাজ না হয়। জ্ঞান হারানো মানুষটির
মৃগী রোগ থাকতে পারে সন্দেহে আপনি যদি তার পর মুর্তেই তাঁর নাকের সমানে জুতো বা চটির
সুকতলা তুলে ধরেন। তাহলেও উপস্থিত কেউই আপনার সেই কর্মকে অসভ্যতা অভদ্রতা কিংবা অমানবিকতা
বলে দাগিয়ে দেবে না। কারণ ধরেই নেওয়া যায়। পরিস্থিতির বিচার এবং বিশ্লেষণ করে একজন
মানুষের কৃতকর্মের উদ্দেশ্য অনুধাবনের মতো ক্ষমতা উপস্থিত বাকি মানুষদের থাকবে। অন্তত
থাকারই কথা। বরং সেই মুহুর্তে জ্ঞান হারানো একটি মানুষের জ্ঞান ফেরানোর জন্য চোখে মুখে
জলের ঝাপটা দেওয়া কিংবা নাকের কাছে চটি বা জুতোর সুকতলা তুলে ধরার মতো টোটকা প্রয়োগ
না করাটাই চুড়ান্ত অমানবিকতা। ফলত অসভ্যতাও বটে। সভ্য মানুষের মতো কোন আচরণ নয় বলেই।
জ্ঞান হারানো রুগীর চিকিৎসার বন্দোবস্ত তার পরের বিষয়।
তাহলে দেখা যাচ্ছে। জ্ঞান হারানো ব্যক্তির
সম্বিত ফেরানোর জন্য সেই কাজও অশোভন অশালীন নয়। যে কাজ সুস্থ কারুর উপরে প্রয়োগ অমার্জনীয়
অপরাধ। ঠিক তেমনই একজন মানুষের মতোই একটি জাতিও যদি জ্ঞান হারানোর উপক্রম করে। বা হারিয়ে
ফেলে। কিংবা মৃগী রুগীর মতো ক্রনিক রোগের শিকারে যখন তখন যেখানে সেখানে জ্ঞান হারানোর
মতো যেকোন বিষয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন একজন সৎ এবং বিচক্ষণ মানুষের মতোই স্বজাতির
সম্বিত ফেরাতে দরকারে রূপঙ্করের মতোই বলে উঠতে হয় হু ইজ কে কে? বলে উঠতে হয় আপনাদের
এত উত্তেজনা কেন বম্বে নিয়ে? কিসের এত উত্তেজনা? বলে উঠতে হয় আর কতদিন ধরে বোম্বের
পিছনে ঘুরবেন এইভাবে! বলে উঠতে হয়, দাদা দিদি মেশো মাসি কাকামী কাকু মামীমা মামা জেঠিমা
জেঠু পিসিমা ঠাকুমা দিদিমা ভাই বোনেরা বাঙালি হোন বাঙালি হোন বাঙালি হোন।
রূপঙ্করের বহু আগে আরও একজন, বাঙালির সম্বিত
ফেরাতে গান বেঁধে ছিলেন। বাংলার ঘরে যত ভাইবোন এক হউক এক হউক এক হউক হে ভগবান। না সম্বিত
হারা বাঙালি সেই কথায় এক তো হয়ইনি। বরং কয়েক দশকের ভিতরে ধর্ম আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের
চর্চা করতে করতে দুই ভাগে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে বাংলাকেই টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। এই হলো
জাতি হিসাবে বাঙালির সুস্থতার ঐতিহাসিক নমুনা। তারপর পদ্মা যমুনা গঙ্গা দিয়ে অনেক জল
গড়িয়ে গিয়েছে। বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের পর অঞ্চল জুড়ে বাংলা মাধ্যমের শত শত স্কুল কলেজ
হয় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নয়তো অন্য ভাষাকেই বিদ্যাশিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছে। একটুকরো
পশ্চিমবঙ্গের জমির মালিকানায় অবাঙালিদের মালিকানার অধিকার বছরে বছরে দশকে দশকে হু হু
করে বেড়ে চলেছে। আসাম জুড়ে দশকের পর দশক বাঙালি খেদানো আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছে। ঝাড়খণ্ড
বিহারের চৌদ্দো পুরুষের বাঙালি অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ অঞ্চলগুলিতে বাঙালির জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে
কমে এসেছে। বাংলা মাধ্যমের স্কুল কলেজ পাঠাগার বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিংবা হিন্দী মাধ্যমে
বদলিয়ে ফেলা হয়েছে। যাঁরা রয়ে গিয়েছেন। তাঁদেরকে সেই রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতিকেই আপন
করে নিতে হয়েছে। অধিকাংশ বাঙালিরই জানা নেই ব্রিটিশ আমলে ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার
বিস্তীর্ণ ভুখণ্ডকে আত্মস্মাৎ করেই আজকের বিহার ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পূর্বসীমা গড়ে উঠেছিল।
অনেকেরই জানা নেই ১৮৭৪ সালে পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ ভুখণ্ড আজকের আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া
হয়েছিল। বংশ পরম্পরায় নিজভুমে বাস করা বাঙালি ব্রিটিশ শাসকের কলমের এক খোঁচায় আজ থেকে
১৪৮ বছর আগে দিনে দুপুরে আসামের বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের বংশধরদেরকেই স্বাধীন
ভারতে বাঙালি খেদাও আন্দোলনে ভিটেমাটি ছাড়া হতে হয়েছিল। আজকে যাঁদের ভিতরে ১৯ লক্ষ
বাঙালির ভারতীয় নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। না এত সবেও জাতি হিসাবে বাঙালির সম্বিত
ফেরেনি।
বাংলার ভুখণ্ড কবে কখন বিদেশী শাসকের খেয়ালে
পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে ঢুকে গেল। কবে থেকে কোন কোন অঞ্চলের বাঙালি নিজভুমেই অন্য
রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে গেল। তাতে বাঙালির কিই বা এসে যায়? না, এমনটা মনে করার কোন দরকার
নেই। কেবল মাত্র আজকের বাঙালিরই তাতে কিছু এসে যায় না। কোন কালের বাঙালিরই তাতে কিছু
এসে যায়নি। ১৮৭৪ আর ১৯১২। দুইবার বাংলা ও বাঙালি তার নিজের ভুখণ্ড হারিয়েছিল। সেই আমলের
বাঙালির তাতে কোন অসুবিধে বোধ হয়ে ছিল না। সেই আমলের বাঙালি এমন অনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে
গর্জে উঠেছিল বলে শোনা যায়নি। বাংলার ইতিহাসে তেমন গর্জনের আওয়াজও নেই। নাহ, আজকের
বাঙালির আর এসব ইতিহাস জেনেই বা কি হবে। অধৈর্য্য পাঠক ধান ভানতে এই শীবের গীত শুনে
যথেষ্ঠ বিরক্ত সন্দেহ নাই। কিন্তু আজকে বিহার থেকে একটুকরো ভুখণ্ড। ঝাড়খণ্ড থেকে একটুকরো
ভুখণ্ড। আসাম থেকে এক টুকরো ভুখণ্ড বাংলার সাথে জুড়ে দিলে বিহারী আর আসামীরা কি করবে?
বাঙালির মতো মুখে আঙুল দিয়ে কলা চুষবে? সব বাঙালিই জানে। ফলাফল কি হবে। আজকে পশ্চিমবঙ্গ
জুড়ে বিহার দিবস পালন করা শুরু হয়ে গিয়েছে। সাড়ম্বরে। হাজার হাজার বিহারী মানুষ জয়
বিহার জয় বিহার স্লোগান তুলে কলকাতা সহ বাংলার রাজপথে মিছিল বার করে বিহার দিবস পালন
করছে। এই সেই বিহার দিবস। যেদিন বাংলার পশ্চিম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভুখণ্ড কেটে নিয়ে
বিহার রাজ্য গঠন করা হয়েছিল। বিহারীরা সেই দিনকে আজ বিজয় উৎসব হিসাবে পালন করা শুরু
করেছে। বাঙালির তাতে কিই বা এসে যায়? এখানেই জাতি হিসাবে বাঙালির যে ক্রনিক রোগ। সেই
রোগটি বোঝা যায়।
না বাংলার রাজনীতি নিয়ে এই আলোচনা নয়।
আলোচনার শুরু দুইটি চিত্রকল্প দিয়ে। তার একটিই কারণ। বহু বাঙলিরই অভিযোগ। গায়ক রূপঙ্কর
অত্যন্ত অশোভণ ভাবে তাঁর ফেসবুক ভিডিয়োটি করেছেন। তাঁর কথা বলার ভঙ্গীর ভিতরে স্বাজতি
বাঙালির অধিকাংশ পণ্ডিতপ্রবরই অশোভন ঔদ্ধত্বের ছবি দেখেছেন। তাঁদের অভিযোগ রূপঙ্করের
এই অশোভন ঔদ্ধত্য নিয়েই। যদি ধরেই নেওয়া যায়। বাঙালি পণ্ডিতপ্রবরদের সেই অভিযোগটি যথাযথ।
তবে বলতেই হয়। বেশ করেছেন রূপঙ্কর। ঠিক করেছেন। এই আঘাতটার অত্যন্ত দরকার ছিল। একটা
আত্মপ্রত্যয়হীন আত্মসম্নানবোধহীন এবং মেরুদণ্ডহীন সম্বিতহারা জাতির সম্বিত ফেরানোর
চেষ্টায় এমন ভিডিয়ো আরও হাজার হাজার হওয়ার দরকার। জরুরী ভিত্তিতে দরকার। কিন্তু না,
গায়ক রূপঙ্কর আদৌ কোন ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটান নি। তাঁর বক্ত্যের ভিতরে কোন হিংস্রতাও
ছিল না। তিনি কোন রকম অসাংবিধানিক কথাও বলেননি। বলেনি এমন কোন কথাও। যা সামাজিক বিচারে
অশোভন বা অশ্লীল। এমনকি বহু পণ্ডিতপ্রবরদের অভিযোগ মতো তাঁর কথায় কারুর প্রতি কোনরূপ
পরশ্রীকাতরতার গন্ধও ছিল না। এই সব অভিযোগই কোন এক বিশেষ উদ্দেশে মনুষকে পাখি পড়া করে
বোঝানো হচ্ছে। ভিডিয়ো বক্তব্যের শুরুতেই তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ‘ওয়াণ্ডারফুল,
হি ইজ আ ওয়াণ্ডারফুল সিঙ্গার’। যাঁদের বিশ্বাস হবে না। ইউটিউব থেকে ভিডিয়োটি দেখেও নিতে পারেন। হ্যাঁ তিনি অবশ্যই বলেছেন। “উই
আর বেটার দ্যান এনি কে কে”। এই আত্মপ্রত্যয়টুকু না থাকলে আপনি কিসের শিল্পী? এই আত্মপ্রত্যয়
এবং আত্মশক্তি না থাকলে একটি জাতিকে চিরকাল অন্য জাতির বুটের উচ্চতায় আটকিয়ে থাকতে
হবে। থাকতেই হবে। দুঃখের বিষয় পণ্ডিতপ্রবর বাঙালিদের, বাঙালি জাতির এই ভবিতব্য নিয়ে
কোন মাথাব্যথা নেই।
রূপঙ্কর অত্যন্ত যথার্থ্য ভাবেই বলেছেন,
“আপনাদের এত উত্তেজনা কেন বম্বে নিয়ে? কতদিন ধরে বোম্বের পিছনে ঘুরবেন এইভাবে”? এই
সত্য উচ্চারণের মূল্য অনুধাবন করার সামর্থ্য আজ আর বাঙালির নেই। হায় বাঙালি হায়। একটা
জাতি’র অন্তর্জলি যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে সেই জাতির কাছে রূপঙ্করদের মতো সত্য
উচ্চারণকারীদের হেনস্থার শিকার যে হতেই হবে। এ আর বড়ো কথা কি? বাঙালির এই ক্রনিক রোগ
আজকের নয়। বিধবা বিধবা আইন প্রণয়নের প্রয়াসে ব্যস্ত স্বয়ং বিদ্যাসগরের বিরুদ্ধেও বাঙালি
ঠিক আজকের মতোই ক্ষেপে উঠেছিল একদিন। কলকাতার পথে পথে বিদ্যাসগরকে নিয়ে তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ
করে নিয়মিত সঙ বেড়োত সেই সময়। নাহ, কোন শোস্যাল সাইটের দরকার হয়নি। সেই সময়ে আজকের
শোভাবাজার রাজবাড়ির নেতৃত্বে বিধবা বিবাহ আইনের বিরুদ্ধে ষাঠ হাজারের বেশি সই সংগৃহীত
হয়েছিল। আজ আর বিধবা বিবাহ আইনের বিরোধীতা করা সেই হাজার হাজার বাঙালি পণ্ডিতপ্রবরদেরকে
আমরা কেউ মনে রাখিনি। কিন্তু বিদ্যাসাগর আজও বেঁচে রয়েছেন। ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশের
মতামতই কিন্তু শেষ কথা নয়। আজ বাংলা জুড়ে যাঁরা রূপঙ্করের মুণ্ডুপাতে ব্যস্ত দুই বেলা।
একদিন তাদের টিকিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু গায়ক রূপঙ্কের গান বেঁচে না থাকলেও।
রূপঙ্কর বাংলার ইতিহাসে রয়ে যাবেন। আত্মপ্রত্যয়হীন আত্মসম্মানহীন হীনমন্যতায় ভুগতে
থাকা শুধু মাত্র নকলনবিশিতে পারদর্শী দিশাহারা অচেতন একটি জাতির সম্বিত ফেরানোর প্রয়াসের
জন্যেই তিনি বাঙালির ইতিহাসে রয়ে যাবেন। কালের কুলোয় কিন্তু আজকের রূপঙ্কর বিদ্বেষীদের
আগামী শতকে হাজার খুঁজেও পাওয়া যাবে না।
এই যে শুধুমাত্র বোম্বেকে নিয়ে বাঙালির
এত উত্তেজনা। দশকের পর দশক তো বোম্বের বোম্বাই সংস্কৃতির পিছনে জাতি হিসাবে বাঙালি
কম ঘুর ঘুর করলো না। কি লাভ হয়েছে তাতে আমাদের? বঙালির শিল্প সংস্কৃতির কোন উৎকর্ষতা
বৃদ্ধি পেয়েছে তার জন্যে? বোম্বের নকল করতে থাকা বাঙালিদেরকে নিয়ে ভারতের অন্যান্য
জাতির কিছু মাত্র আগ্রহ রয়েছে নাকি? না’কি অল্প যে পরিসরে যেটুকু আগ্রহ অবশিষ্ট রয়েছে
এখনো। সে, বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির গভীরতায়। বোম্বাই সংস্কৃতির অক্ষম অনুসরণ হোক আর
সক্ষম অনুসরণ। ভারতের অন্যান্য জাতি কেন সেই অনুকরণকারী বঙ্গসংস্কৃতির বিষয়ে আগ্রহী
হবে? তাই হয় না’কি কখনো? সকলেই অরিজিন্যালের পিছনে ছুটবে। এই কারণেই গায়ক রূপঙ্কর বাঙালিকে
তামিলদের দিকে তাকাতে অনুরোধ করেছেন। উড়িষ্যার দিকে তাকাতে অনুরোধ করেছেন। পঞ্জাবের
দিকে তাকাতে অনুরোধ করেছেন। যে যে জাতি সর্বক্ষণ বোম্বের পেছনে ঘুর ঘুর না করে নিজস্ব
সংস্কৃতির পিছনে অনেক বেশি করে ঘুর ঘুর করেছে। করেছে বলেই। আজ তামিলদের এত উন্নতি।
পাঞ্জাবীদের উন্নতি এত বেশি। এমনকি, যে উড়িষ্যাবাসীদেরকে আমরা উড়ে বলে তাচ্ছিল্য করতাম
কয়েক দশক পূর্বে পর্য্যন্ত। সেই উড়িষ্যাও জাতি হিসাবে নিজেদেরকে খুঁজে পেয়েছে এতদিনে।
এই যে জাতি হিসাবে নিজেদের খুঁজে পাওয়া। এটি যদি না পেত। তবে ভারত সরকারের আনা কৃষক
আইনকে বাতিল করতে ভারত সরকারকেই বাধ্য করতে পারতো না মূলত পাঞ্জাবীদের নেতৃত্বে শুরু
হওয়া দিল্লীর কৃষক আন্দোলন।
হ্যাঁ সংস্কৃতি আর রাজনীতি পরতে পরতে জড়িয়ে
থাকে। একটি জাতির রাজনৈতিক শক্তি ততটাই বলশালী। সেই জাতির সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতা যত বেশি।
আর অন্য জাতির সংস্কৃতির নকলনবিশি করে কোন জাতির সাংস্কৃতিক উন্নতি সম্ভব হয় না। হয়
না বলেই, যে বাঙালি সম্বন্ধে একদিন বলা হতো। বাঙালি আজ যা ভাবে। ভারতবর্ষ কাল তা ভাবে।
আজকে সারা ভারত খুঁজেও এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না। যিনি এই কথায় হেসে উঠবেন না। অন্য
জাতির ভাষা অন্য জাতির সংস্কৃতির দাসত্ব করার মানসিকতা পরিহার করতে না পারলে। বাঙালির
অবস্থার কোন উন্নতি সম্ভব নয়। একদম চোখ বুঁজে বলে দেওয়া যায়। এই কে কে যদি বাঙালি হতেন।
যদি বাংলায় গান গাইতেন। তাহলে তিনি যে মাপের গায়ক। সেই মাপের থেকে আরও অনেক বেশি বড়োমাপের
গায়ক হলেও। বাংলায় বিশেষ কল্কে পেতেন না। যতক্ষণ না কেদারনাথ ভট্টাচার্যের মতো বোম্বে
গিয়ে কুমার শানু হয়ে উঠতে পারতেন। কে কে বাঙালি হলে এই গান গেয়েও গোটা বাঙালি জাতির
ভিতরে এই উত্তেজনা এবং উন্মত্ত উন্মাদনার সৃষ্টি করতে পারতেন না। আর এটাই বাঙালির,
জাতি হিসাবে ক্রনিক রোগ। নোবেলটুকু ভাগ্যে না থাকলে রবীন্দ্রনাথও রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতে
পারতেন না। এই ক্রনিক রোগ বাঙালির আজকের নতুন নয়। বাঙালির অস্থিতে মজ্জায় ডিএনএর ভিতরেই
এই রোগের বীজ রয়ে গিয়েছে। গিয়েছে বলেই কয়েক হাজার বছর ধরে এই জাতিকে একের পর এক বিদেশী
জাতির কাছে পরাধীন থাকতে হয়েছিল। শতকের পর শতক ধরে। জাতির এক অংশ একদিন পাকিস্তানী
হয়ে ওঠার সাধনায় মগ্ন ছিল। যে ভুল ভাঙ্গতে তাদের কয়েক দশক লেগে গিয়েছিল। আর এক অংশ
আজও ভারতীয় হয়ে ওঠার সাধনায় এমনই মগ্ন যে। নিজেদের বাঙালি পরিচয়টুকু নিয়েই সবচেয়ে বেশি
লজ্জিত। শংকিত। তাদের সদা আশংকা। পাছে কেউ তাঁদের বাঙালি বলে চিনে ফেলে। তাই প্রাণপণে
ভারতীয় হয়ে ওঠার জন্য তাঁরা দিল্লী বোম্বের নকলনবিশিতে পারদর্শী হয়ে ওঠার তীব্র তাড়নায়
দিশাহীন উত্তেজনায় এবং উন্মত্ত উন্মাদনায় ২৪ ঘন্টা একটা ঘোরের ভিতরে থাকেন।
হ্যাঁ। সেই ঘোরের মাথায় বজ্রপাত করেই গায়ক
রূপঙ্কর এই উন্মত্ত বাঙালির কাছে আজ খলনায়ক। রূপঙ্কর বিদ্বেষী না হলে আজ আর বাঙালির
ভারতীয় হয়ে ওঠা যাবে না। এমনটাই রূপঙ্কর বিদ্বেষীদের দৃঢ় বিশ্বাস। ফলে তাঁরাই যে আজ
‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নি’। আউরাতে থাকবেন। এবং নিজেদের জীবনযাপন আচারাচরণ এবং
কর্ম ও সাধনার ভিতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই প্রফেটিক বাণীকে প্রতিদিন সত্য করতে থাকবেন।
এ আর বিচিত্র কথা কি। রূপঙ্কর বিদ্বেষীদের কথা থাক। তাঁরা বোম্বের পিছনে বংশ পরম্পরায়
ঘুর ঘুর করতে থাকুন। নিজের জাতির অন্তর্জলি যাত্রায় বিশিষ্ট ভুমিকা রাখুন। যে জাতির
যা ভবিতব্য। তাই হবে। খণ্ডাবে কে? কিন্তু রূপঙ্করের সেই বহুনিন্দিত ভিডিয়োবার্তায় গায়ক
কি শুধুই নিজের কথা বলেছিলেন? একবারও বলে ছিলেন কি? তিনি রূপঙ্কর, তিনি মহাগায়ক কে
কে’র থেকেও অনেক বড়োমাপের শিল্পী? না’কি তিনি কলকাতা শহরের তাঁর সতীর্থ শিল্পী গায়কদের
সম্বন্ধেই সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, কলকাতার বাঙালির শিল্পীরা কে কে’র থেকে ফার ফার
বেটার শিল্পী? কোনটা ঠিক? তিনি কখনোই বলেন নি। “আমি কে কে’র থেকে ভালো গান গাই”। বরং
তিনি বলেছেন, “আমি তো গান শুনে বুঝলাম। কে কে’র থেকে আপরা অনেক ভালো গান গাই’।
এই যে আমি আর আমরা’র পার্থক্য। জাতি হিসাবে
বাঙালির কতটা অধঃপতন হয়েছে যে, এই মোটা দাগের পার্থক্যও বাঙালির অসাড় চেতনায় কোন রকম
রেখাপাত করতে অপারগ। কিন্তু রূপঙ্করের সেই বিখ্যাত্য সতীর্থরা? যাঁদের তুলে ধরতে রূপঙ্কর
সোজা বাংলায় তাঁর মত ব্যক্ত করেছেন। কি করলেন তাঁরা? তাঁদের ভিতর থেকে একজনেরও কি হিম্মত
হলো না রূপঙ্কের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর? অন্তত রূপঙ্কর বিদ্বেষীদের হাতে হেনস্থা হতে থাকা
সতীর্থ শিল্পীর পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো বিবেক জাগ্রত হলো না তাঁদের? তাঁদের উদ্দেশে
‘ছি ছি’ বলতেও ছি মনে হচ্ছে। তথাকথিত ফ্যানদের হারানোর আশঙ্কা এতই অমোঘ? যে, সত্যের
পক্ষে দাঁড়ানোর মতো ন্যূনতম বিবেকের অস্তিত্বও তাঁদের ভিতরে আজ আর অবশিষ্ট নেই। ভাবা
যায়? ঠিক একই ঘটনা যদি ঘটতো বোম্বাইয়ের কোন শিল্পীকে নিয়ে? পাঞ্জাবের কোন শিল্পীকে
নিয়ে। তামিল কিংবা মালায়লাম কোন শিল্পীকে নিয়ে? এমনকি বিহারের কোন শিল্পীকে নিয়ে হলেও?
শুধুই সতীর্থ শিল্পীরাই যে পাশে এসে দাঁড়াতেন। তেমনটাও নয়। স্বাজাতির বৃহত্তর অংশই
তাদের শিল্পীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে যেতো।
কিন্তু হায়। রূপঙ্কর যে নিজেই বাঙালি।
তাই তাঁকে প্রেস ক্লাবে এসে বলতে হলো। ‘এতো আক্রোশ! এতো ঘৃণা?” না, তারপরেও তাঁর সতীর্থ
কোন বাঙালি শিল্পীকে কিংবা কলকাতার শিল্পীকে গায়কের পাশে এসে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। ঠিক
এইটাই এই জাতির অন্যতম আর একটি রোগ। সেদিন বিদ্যাসাগরের পাশে গিয়েও খুব বেশি মানুষ
দাঁড়ান নি। বরং বেশিরভাগই গিয়ে জড়ো হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর বিদ্বেষীদের পাশে। মৌনতাই সম্মতির
লক্ষ্মণ। তাই আজকের মুখে কুলুপ এঁটে থাকা কলকাতার মেরুদণ্ডহীন সেইসব শিল্পী। রূপঙ্কর
যাঁদেরকে, কে কে’র থেকেও বড়ো মাপের শিল্পী বলে মনে করেন। এবং বহুনিন্দিত সেই ভিডিয়োবার্তায়
দ্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে ছিলেন। সেই অমেরুদণ্ডী প্রজাতির শিল্পীকুল নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থেই
মুখে কুলুপ এঁটে রূপঙ্করের হেনস্তা উপভোগ করছেন। অথচ এঁদের প্রত্যেকের শৈশবেই এঁদেরকে
পড়ানো হয়েছিল। ‘একতাই বল’। ‘সবে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’। এই তো বাঙালির শিক্ষার
দৌড়। শিক্ষার ফলফল। শিক্ষাদীক্ষার বহর। শুধুমাত্র নিজেদের নড়বড়ে জনপ্রিয়তা আর ফ্যান
ফলোয়ার হারানোর ভয়ে এঁরা আজ রূপঙ্করের থেকে শত হস্ত দূরে অবস্থান নিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে
নিলডাউনে বসে রয়েছেন। যে যাঁর গর্তে। কিন্তু এঁদের যদি সত্যই নিজস্ব শিরদাঁড়া থাকতো।
যদি বিবেকের ভিতে ঘুণ না ধরে যেতো। যদি ব্যক্তিস্বার্থের উপরে জাতির স্বার্থ দেখার
মতো দেশপ্রেম এবং জাতিপ্রেম থাকতো। তবে এঁরা প্রত্যেকে রূপঙ্করের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন।
আর সম্পূর্ণ অচেতন। প্রায় মৃগী রুগীর মতো গোঁ গোঁ করতে থাকা একটি জাতির নাকের কাছে
জুতোর সুকতলা তুলে ধরার মতো কাজের কাজ করতে পারতেন। দিশাহীন একটি জাতিকে সম্বিত ফেরানো
এক আধজন রামমোহন কিংবা বিদ্যাসাগরের এমনকি রবীন্দ্রনাথের পক্ষেই সম্ভব হয় নি। তো সেখানে
রূপঙ্কর কে? কিন্তু সম্মিলিত ভাবে, রূপঙ্কর যাঁদেরকে বড়ো শিল্পী বলে তাঁর নিজের অভিমত
ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা যদি প্রথমেই রূপঙ্করের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর হিম্মত রাখতেন। তবে
মৃগী রুগীর মতো দিশাহীন ভাবে বোম্বের পিছনে ঘুরতে থাকা রূপঙ্কর বিদ্বেষী এই জাতির সম্বিত
ফেরানোর মতো শক্ত কাজটাও হয়তো কিছুটা সহজ হতে পারতো। সম্বিত ফিরুক না ফিরুক। অন্তত
হঠাৎ চোখেমুখে জলের ঝাপটা লাগলে। যে ঝাঁকুনিটা লাগে। সেই অত্যন্ত জরুরী ঝাঁকুনিটা জাতির
চেতনায় লাগতো। কিন্তু সেই সৌভাগ্য এই জাতির নিয়তিতে নাই। ফলে রূপঙ্কর বিদ্বেষের সুনামিতে
মুখ পুড়লো গোটা বাঙালিরই। এর পরেও ভারতের অন্যান্য জাতির মানুষ এই বাঙালি জাতি সম্বন্ধে
আর কোন শ্রদ্ধা অনুভব করবেন? যদি উপহাস করতে শুরু নাও করেন।
না রূপঙ্কর। বাঙালি কোনদিন বাঙালি হয়ে ওঠার সাধনা করবেও না। কারণ বাঙালিকে কোনভাবেই আর মানুষ করে তোলা যাবে না। এই জাতি ভারতীয় হয়ে উঠবে। পাকিস্তানী হয়ে উঠেছিল কিছুদিনের জন্য। সে হিন্দু হয়ে উঠবে। সে মুসলিম হয়ে উঠবে। সে সাহেব মেম হয়ে ওঠার চেষ্টায় প্রাণান্তকর চেষ্টা করবে। সে অন্যের নকলনবিশিতে পারদর্শী হয়ে উঠবে। কিন্তু ভুলেও সে মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে না। তামিলদের মতো। উড়িয়াদের মতো। পাঞ্জাবীদের মতো্। মারাঠীদের মতো্ এমন কি ঘরের পাশে আসামী কিংবা বিহারীদের মতোও। যে বিহারীরা আজ বাংলার মাটিতে সদর্পে বিহারদিবস পালন করতে রাজপথ জুড়ে হাজার হাজার মানুষের মিছিল শুরু করে দিয়েছে। ভারতের সব জাতি তাই মানুষ হয়ে ওঠার সাধনায় মগ্ন। আর বাঙালি কেবলই নকলনবিশিতে ব্যস্ত। পরজাতির ভাষা ও সংস্কৃতির দাসত্ব করতে ব্যস্ত। এবং সময় ও সুযোগ পেলেই নিজ জাতির কাউকে খাটো করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যাবে। তা সে বিদ্যাসাগরের আমলই হোক আর রূপঙ্ককরদের আমলেই হোক।
৫ই জুন’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

