মহাকালের
পাদপীঠে
সৃষ্টির চলেছে খেলা
চারি দিক হতে শত ধারে
কালের অসীম শূন্য পূর্ণ করিবারে।
সম্মুখে যা কিছু ঢালে পিছনে তলায় বারে বারে;
নিরন্তর লাভ আর ক্ষতি,
তাহাতেই দেয় তারে গতি।
কবির ছন্দের খেলা সেও থাকি থাকি
নিশ্চিহ্ন কালের গায়ে ছবি আঁকা-আঁকি।
কাল যায়, শূন্য থাকে বাকি।
এই আঁকা-মোছা নিয়ে কাব্যের সচল মরীচিকা
ছেড়ে দেয় স্থান,
পরিবর্তমান
জীবনযাত্রার করে চলমান টীকা।
মানুষ আপন-আঁকা কালের সীমায়
সান্ত্বনা রচনা করে অসীমের মিথ্যা মহিমায়,
ভুলে যায় কত-না যুগের বাণীরূপ
ভূমিগর্ভে বহিতেছে নিঃশব্দের নিষ্ঠুর বিদ্রূপ।
উদয়ন, ৩০ নভেম্বর-প্রাতে, ১৯৪০
অনিত্য এই জীবনের পাদপীঠে জীবনের
অন্তিম শ্বাসে পৌঁছিয়ে এই কি তবে বিশ্বকবির লাস্ট কনফেশন? এই কি আমাদের পরিচিত সেই
রবীন্দ্রনাথ, যিনি গেয়ে উঠেছিলেন এই বলে যে, “আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান” । কোথায় হারিয়ে গেল
সেই বিস্ময়ে জেগে ওঠার গান? যিনি নিশ্চিত ছিলেন, বিশ্বভরা প্রাণের মাঝেই তাঁর স্থান
নিশ্চিত জেনে। সেই তিনি জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে বুঝতে পারছেন বিস্ময় জেগে ওঠা সেই
গান আসলেই ‘নিশ্চিহ্ন কালের গায়ে ছবি আঁকা-আঁকি মাত্র? যার নাই কোন স্থায়ী সত্য মূল্য?
অসীম কালের পটে সে’ আসলেই কি তবে মরীচিকা স্বরূপ? ঠিক যেমন বলছেন রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যুর
ঠিক নয় মাস আগে।
অসীম কালের যে হিল্লোলে জোয়ার-ভাঁটার ভুবন দোলে, কবির নাড়ীতে
তো তাঁর রক্তধারায় লেগেছিল সেই টান, তাহলে আজ কি হলো আমাদের কবির? কেনই বা তাঁকে আজ
বলতে হচ্ছে, মানুষ তার নিজের তৈরী কালের সীমায় অসীমের মিথ্যা মহীমার সান্ত্বনা রচনা
করতে চায় শুধু? তবে কি কবি জীবনের অন্তিম সময়ে এসে সত্যিই এক মহা দোটানায় পড়ে গিয়েছিলেন?
সারা জীবনের বিশ্বাসের ভরকেন্দ্রে আর ভরসা রাখতে পারছিলেন না কবি? এই লেখার প্রায় পঞ্চাশ
বছর আগে ফাল্গুন ১২৯৮, শিলাইদহের বোটে বসে
আমাদের রবীন্দ্রনাথই না লিখেছিলেন, ‘ঠাঁই নাই ঠৃাঁই নাই ছোট সে তরী। আমারি সোনার ধানে
গিয়েছে ভরি’ । সেদিনের সেই বিশ্বাস কি তবে মরীচিকাসম ছিল? কবি তো বরাবরই বিশ্বাস করতেন,
কবি নয় মহাকালের বেদীতে রয়ে যায় শুধু কবিতা। একদিন রবীন্দ্রনাথের নাম মুছে গেলেও মুছে
যাবে না কবির কাব্য। কবির সৃষ্টি। এমনটাই না বিশ্বাস ছিল সোনরতরীর কবির! কিন্তু সোনারতরীর
কবি পঞ্চাশ বছর পরে এসে বুঝতে পারছেন সে সবই আসলে অসীমের মিথ্যা মহীমায় সান্ত্বনা রচনা
করা শুধু। একদিন যিনি মনে করেছিলেন, কালের গতিতে সোনারতরীতে কবির নয়, ঠাঁই হতে পারে
শুধু কবির সৃষ্টির; সেই কবিই কি তবে আজ উপলব্ধি করতে পারছেন, মহাকালের অসীমে ঠাঁই নাই
ঠাঁই নাই সেই সোনারতরীরও?
একজন কবির কাছে এর থেকে বড়ো হাহাকার বড়ো ট্র্যাজেডী আর কি
হতে পারে? তার থেকে অনেক বেশির সান্ত্বনা বরং সেই পাগলের, যিনি রবীন্দ্রনাথের তলোয়ার
দিয়ে দাঁড়ি চাঁছার উত্তর দিয়ে গিয়েছিলন এই বলে যে, বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের
নই ‘নবী’। বলেছিলেন ‘অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু যাহারা আছো সুখে’ । না, কোন তুলনা
প্রতিতুলনার প্রসঙ্গ এ নয়। একজন কবি কিভাবে তবে সান্ত্বনা খুঁজে নেবেন এই অবস্থায়।
প্রশ্ন সেখানেই। প্রশ্ন এইটিও, সেই সান্ত্বনা কি তবে পেয়েছিলেন আমাদের কবি। মৃত্যুর
অন্তিম দরজায় দাঁড়িয়ে?
রবীন্দ্রনাথের মতো একজন কবি, যিনি মহাকালের বেদীতে শাশ্বত
বাণী খোদাই করে গিয়েছেন বলেই আমাদের অন্তিম বিশ্বাস, সেই কবি নিজেই নস্যাৎ করে দিয়ে
যাচ্ছেন আমাদের সেই অন্তিম বিশ্বাসকে। এই কবিতায়। কবির সৃষ্টিকে আমরা যেখানে শাশ্বত
বাণী বলে ধরেই নিয়েছি, কবি সেখানেই আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন এই বলে যে,
“কত-না যুগের বাণীরূপ ভূমিগর্ভে বহিতেছে নিঃশব্দের নিষ্ঠুর বিদ্রূপ” । মহাকালের
সমাধিতে সব কথা সব সত্যই কি তবে বিলীন হয়ে যাবে এইভাবে? কোন চিহ্নই থাকবে না তবে অবশিষ্ট
আর? কবির সারাজীবনের সৃষ্টি, তার আত্মদর্শন, জগৎবীক্ষার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারও হয়ে
যাবে নিঃশ্চিহ্ন একেবারে? এও কি বিশ্বাস করতে হবে আমাদের? কিন্তু ঠিক তেমনটিই তো বলছেন
আমাদের প্রিয় কবি। প্রাণের কবি। এখানে আরও একটি শব্দেবন্ধের উপর পাঠককে নজর দিতে বলবো।
‘নিঃশব্দের নিষ্ঠুর বিদ্রূপ’। আমাদের রবীন্দ্রনাথ। যাঁর মূল পরিচয় রোমান্টিক কবি হিসাবেই।
সেই কবি এ কী কথা বলছেন? মানুষের ইতিহাসের যা কিছু সত্যমূল্য, যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন,
যা কিছু মাহাত্ম্য, সে সব কিছুই কি তবে মহাকালের দরবারে নিষ্ঠুর বিদ্রূপসম?
রোমান্টিক ভাববিলাসের ভিতর জন্ম হলেও আমাদের রবীন্দ্রনাথ
জীবনের পরতে পরতে সত্যের বিভিন্ন বেশের সাথে পরিচিত হতে হতে সত্যের এক রাজপথে পৌঁছিয়ে
ছিলেন। পৌঁছিয়ে ছিলেন বলেই রবীন্দ্রনাথ কখনো কোন বিন্দুতে এসে থেমে যাননি। রুদ্ধ হয়
নি তাঁর চলার গতিও। স্তব্ধ হয়ে যায় নি তাঁর কলমের গতি। বরং নিজের জীবনের অলিন্দেই কবি
আবিস্কার করে গিয়েছে, এক একজন অনন্য রবীন্দ্রনাথকে। ক্রমসঞ্চরণশীল এক ব্যক্তিসত্ত্বা।
যিনি পেড়িয়ে যাচ্ছেন একের পর এক সীমানা। পৌঁছিয়ে যাচ্ছেন এক একটি নতুন দিগন্তে। যতই
পেড়িয়ে যাচ্ছেন নিজের সীমাবদ্ধতাকে, ততই যেন চোখ খুলে যাচ্ছে কবির। আর চোখ খুলে যাচ্ছে
যত, ততই সম্পূর্ণ হচ্ছে তাঁর বিশ্ববীক্ষা। ততই কেটে যাচ্ছে এক একটি মোহ। খসে পড়া পাপড়ীর
মতো ক্রমাগত একের পর এক মোহ খসিয়ে খসিয়ে আমাদের কবি এক নির্মোহ সত্ত্বায় উপনীত হতে
পেরেছিলেন। এবং পেরেছিলেন বলেই, ‘নানা রবীন্দ্রনাথের একখানি মালা’, বলে গিয়েছিলেন সেই
কথাও। জীবনের কোন পর্বে কোন অবস্থাতেই কোন একটি বিশ্বাসের অন্ধ মায়ায় আটকিয়ে পড়তে হয়
নি তাঁকে অন্য অনেকেরই মতো। এখানেই তাঁর অনন্যতা। সেখানেই ছিল তাঁর আত্মশক্তির নোঙর।
না হলে একজন রোমান্টিক কবির পক্ষে এই উত্তরণ সম্ভব ছিল না কোনমতেই।
অসীম কালের হিল্লোলে জীবনের উদ্বোধন প্রত্যক্ষ করা রোমান্টিক
কবি, মহাকালের সমাধিতে মানুষের সব কীর্তি সব অহংকারের পরিসমাপ্তি দেখে গেলেন সেই মহাকালেরই
নিষ্ঠুর বিদ্রূপের ভিতর। এখানেই একজন কবির দ্রষ্টা হয়ে ওঠা। আমাদের রবীন্দ্রনাথ সেই
সমদর্শী কবি। যিনি মহাকালের প্রেক্ষাপটে জীবনের সমগ্র রূপ প্রত্যক্ষ করে যেতে পেরেছিলেন।
পেরেছিলেন নির্মোহ শক্তিতেই। এই নির্মোহ শক্তিই ছিল কবির রক্ষাকবচ। না হলে কবির অপমৃত্যু
ছিল অবধারিত। কবির আগে পড়ে আরও অনেকের ক্ষেত্রেই যে ঘটনা ঘটেছে। পরেও ঘটবে আবারও।
সৃষ্টির খেলার প্রকৃতিই ঠিক এমনই। সমুদ্রসৈকতে বালির সৌধ
তৈরীর মতোই এই খেলা। শুধু ক্ষণিকেরই নয়। আসলেই শাশ্বতমূল্যহীন। কোন চিরসত্যকেই স্থায়ীমূল্যে
ধরার উপায় নাই সৃষ্টির এই খেলায়। এটাই মহাকালের নিয়ম। সেই মহাকালের বেদীতে স্থায়ীমূল্যের
সহ অহংকারই আসলে অসীমের মিথ্যা মহীমার সান্ত্বনা রচনার প্রয়াস মাত্র। যার একমাত্র পরিণতি
নিষ্ঠুর বিদ্রূপের নিঃস্তব্ধতায়।
১লা পৌষ’ ১৪২৬
কপিরাইট
শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

