বিধবা বিবাহ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিধবা বিবাহ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বিধবা বিবাহ



বিধবা বিবাহ

একটা সময় ছিল, সমাজে যখন বিধবা বিবাহ খুব গর্হিত একটি ঘটনা বলেই বিবেচিত হতো। সেটা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অকুতভয় চারিত্রশক্তির বলে বিধবা বিবাহ প্রচলনের পরেও বিদ্যমান ছিল। তার আগে তো বিধবা বিবাহ সমাজচ্যুত হওয়ার মতো ভয়ানক অপরাধ বলেই গণ্য করা হতো। সেকালে বাল্যবিধবাদের দুর্দশা বাংলার সমাজে নারীজীবনে একটি ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করে রেখেছিল। যে কোন সমাজের অগ্রগতি নির্ভর করে মূলত সেই সমাজে নারীর অবস্থান ও সমাজের সার্বিক শিক্ষার উপরেই। এই দুইটি বিষয়ে যে যে জাতি উন্নত, তারাই আজ বিশ্বে যাবতীয় উন্নতির সুযোগ সুবিধার অধিকারী। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর সকলের আগে এই বিষয়টি ধরতে পেরেছিলেন। তাই এই দুইজনের হাত ধরেই পাশবিক সমাজের অন্ধকারে প্রথম আলোর রেখা পড়েছিল। প্রথমে সহমরণের মতো হত্যাকে সমাজের বুক থেকে চিরকালের জন্য লোপ করা। তারপর বিধবা বিবাহ প্রচলন ও নারী শিক্ষার উপরে জোর দেওয়ার ভিতর দিয়ে সম্পূর্ণ বিপথগামী ও অন্ধকারে পতিত একটি সমাজ ও জাতির জীবনে সর্বপ্রথম প্রাণসঞ্চার করেছিলেন এই দুই মহাপুরুষ। যতদিন বাঙালি জাতির অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন এঁরা প্রাতস্মরণীয়। বস্তুত শুধু একজন নারীর কাছেই নয়, সমগ্র বাঙালির কাছেই এঁদের অবদান অশেষ।

আমরা এমন একটি পতিত সমাজের উত্তরাধিকারী, যে সত্যিই বিশ্বে মুখ দেখাবার মতো বিশেষ কোন সম্বল আমাদের নাই। যাঁরা মহাপুরুষদের জীবনীর পাতা খুলে ধরে একথার প্রতিবাদে সোচ্চার হবেন, তাঁরা সত্যই খেয়াল করেন না যে, একটি জাতির সম্বল, তার মহাপুরুষদের সংখ্যায় নয়। একটি জাতির সম্বল তার জনশক্তির চারিত্রশক্তি, সার্বিক শিক্ষাস্তর, স্বাজাত্যবোধ, সমাজে নারীর অবস্থান, এবং কর্মদ্যোগ। এর কেন বিষয়েই আমাদের বাঙালি জাতির অবস্থান আদৌ সম্মানজনক নয়। বাংলাদেশের ভাষাআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর্বটুকু বাদ দিয়ে হাতে আর কিছুই পড়ে থাকে না। দুঃখের বিষয় এই পর্বটুকুও আমাদের বাকি অন্ধকারগুলিতে কোনরকম আলো ফেলতেও পারেনি। অবস্থার উন্নতিও ঘটাতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের ভাষাআন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনও বাংলার সমাজজীবনকে একচুল নড়াতে পারেনি।

নারীকে সমাজব্যবস্থার প্রান্তিক অবস্থানে ফেলে রেখে কোন সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ সবসময়ে নারীকে পুরুষের উপর নির্ভরশীল পরজীবী গোত্রের মানুষ বানিয়ে রাখতে তৎপর। নারী জীবনে বৈধব্যও সেইরকম একটি কার্যক্রম। আমাদের সমাজে ধরেই নেওয়া হয়, নারীর অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের ভার পুরুষের। প্রতিটি নারীর মননে চেতনায়, ও জীনবোধের গভীরে এই ধারণাকে বদ্ধমূল করে তোলা হয়। অনেকেই বলতে পারেন, তা কেন। দিন এখন পাল্টেছে। সে যুগ আর নাই। প্রায় এমন কোন পেশা নাই, যেখানে নারী অংশ নিচ্ছে না। সেকথা সত্য হলেও প্রতিটি সংসারে উঁকি দিয়ে দেখলে দেখা যাবে সংসারের কর্তৃত্বের ভরকেন্দ্র এখনো সেই পুরুষের হাতেই। শুধু তাই নয়, আজও সমাজে নারীর নিজস্ব কোন পরিচয়ের ভিত তৈরী হয়নি। কন্যা হিসাবে নারীর পরিচয়, পিতার পরিচয়ে। স্ত্রী হিসাবে নারীর পরিচয় স্বামীর পরিচয়ে। এমনকি শেষ জীবনে নারীর পরিচয় পুত্রের পরিচয়ে। কি আশ্চর্য্য এক পরিচিতির শৃঙ্খল! এর বাইরে পা দিতে গেলেই নারী স্বৈরিণী? আমরা স্বৈরাচারী শাসকেরও বুকের ছাতির মাপ নিয়ে গর্বে আস্ফালন করবো, কিন্তু আত্মপরিচয়ে দৃপ্ত নারীকে সহ্য করবো না। তাকে স্বৈরিণী বলে দেগে দেবো।

বৈধব্যও তেমনই একটি পরিচয়। নারীর জীবনে। অর্থাৎ সমাজের দেগে দেওয়া পরিচয়ে এই মানুষটি আজ থেকে বিধবা। স্বামীর মৃত্যু যতই শোকাবহ হোক না কেন, একজন নারীর জীবনে তার থেকে বড়ো বিপর্যয় বোধহয় কল্পনাতীত। কিন্তু উল্টো দিকে তাকিয়ে দেখুন, কথায় বলে ভাগ্যবানের বৌ মরে। কথাটা এমনি এমনি জন্ম নেয় নি কিন্তু। নেহাৎ রসিকতারও বিষয় নয়। কেন নয়, সেটি বুঝতে গেলে আমাদের স্মরণ করতে হবে রবীন্দ্রনাথের সেই দেনাপাওনা গল্পটিকেই। যে মানুষটির প্রতিদিনের সুখ দুঃখের জীবনসাথী চলে গেলেন চিরদিনের জন্য, যদি অকালমৃত্যু হয় তবে তো কথাই নাই। সেই মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার শোকের থেকেও বড়ো হয়ে ওঠে অর্থচিন্তা। অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের নিশ্চয়তা থাকা না থাকার দুশ্চিন্তা। এবং সমাজের চোখে সেই বৈধব্যের গ্লানি। সদ্য স্বামীহারা রমনীই জানে কি দুর্বিষহ সেই যাতনা।

বিদ্যাসাগর নারীকে এই যাতনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যেই প্রচলন করেছিলেন বিধবা বিবাহ। অর্থাৎ স্বামীহারা রমনীও যেন নতুন করে আবার ঘর বাঁধতে পারে। তাঁর খাওয়াপড়া রোজকার জীবনযাপন যেন একটি সুস্থ সমৃদ্ধ অবস্থানে অতিবাহিত হতে পারে। সেই সময়ের বাংলার জনজীবনে সমাজে নারীর অবস্থানের জন্য এটিই ছিল একমাত্র পথ। বিদ্যাসাগর ঠিক সেই পথটিই খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একটু খেয়াল করে গভীরে গিয়ে তলিয়ে দেখি যদি? বিধবা বিবাহ আর যাই হোক নারীর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার কোন পথ নয়। বিদ্যাসাগর সেটিও জানতেন। কিন্তু যে সমাজ নারীকে শিক্ষার অঙ্গন থেকে চিরনির্বাসিত করে রেখেছিল, সেই সমাজে বিদ্যাসাগরের পক্ষে আর কোন পথই খোলা ছিল না। সেটি বুঝতে পেরেছিলেন বলেই, তিনি বিধবা বিবাহ প্রচলন করেই ক্ষান্ত হন নি। নারীশিক্ষার সূত্রপাতও করে গিয়েছিলেন। জানতেন একদিন সমাজে ঘরে ঘরে, নারী শিক্ষার সুযোগ ও অধিকার পাবে। স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথ খুঁজে পাবে। সেদিন হয়তো নারীকে জীবনধারণ করার জন্য বিধবা বিবাহের পথে নাও এগোতে হতে পারে।

পাঠক হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন, সেকি, এতো দেখছি বিধবা বিবাহের বিপক্ষেই ওকালতি শুরু করে দিল! বিধবা বিবাহের একসময় সমাজ স্বীকৃতি ছিল না কোন। বিদ্যাসাগরের একক প্রয়াসে সমগ্র সমাজের বিরুদ্ধতা সত্বেও এটি আইনি স্বীকৃতি পায় আজ থেকে অনেক যুগ আগেই। তারপর বহ যুগ লেগেছে সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলিত হতে। বহু যুগ চলে গিয়েছে, বিষয়টির সাথে সমাজের অভ্যস্ত হতে। এমনকি এখনো বহু মানুষের মন এতে সায়ও দেয় না হয়তো। কিন্তু আমদের দেখতে হবে, আজকের সমাজ বিদ্যাসাগরের সময়েই পড়ে আছে কিনা? নিশ্চয়ই নাই। সমাজে নারীর শিক্ষার অধিকার আজ সম্পূর্ণ স্বীকৃত। বহ নারীই স্বাবলম্বী। ঘরে ঘরে না হলেও অনেক নারীই অবস্থার বিপাকে পড়ে একাই সন্তান মানুষ করছেন একার হাতে। আবার এরই পাশাপাশি আজও কোটি কোটি নারী সম্পূর্ণ ভাবে স্বামীর আয়ের উপরেই নির্ভরশীল। দুঃখজনক হলেও, তাঁদের স্বামীর অকালমৃত্যু হলে বিধবা বিবাহ ছাড়া তাদের সামনে কোন পথ খোলা নাই আজও।

অর্থাৎ আজও সমাজে নারীর অবস্থান পুরুষের আর্থিক সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল ও সম্পর্কিত। ফলে বিধবা বিবাহ সেক্ষেত্রে নারীর লাইফলাইন। কিন্তু যিনি আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী? যাঁকে আর একজন নতুন স্বামীর আর্থিক কাঁধের খোঁজ না করলেও চলবে? বিধবা বিবাহ তাঁর ক্ষেত্রে কতটা জরুরী? এই সময়, আমদের মনে একটা গভীরতর প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। নারীর জীবনে পুরুষের অর্থের উপর নির্ভর করে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের নিশ্চয়তা অর্জন করাই কি সব? অর্থাৎ নারীর জীবনে পুরুষ কি কেবলই একটি এটিম মাত্র? তা তো নয়! আমাদের পিছিয়ে পড়া সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান জনিত কারণে সেটাই প্রাথমিক ও মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু নারী জীবনে পুরুষের প্রয়োজন তো কেবলই অর্থের পরিমাপে নয়।

ঠিক সেখানেই, একজন নারী তাঁর অকালপ্রয়াত স্বামীর স্মৃতি সত্তা নিয়েই যদি কাটিয়ে দিতে চান বাকি জীবনটা? সেই অধিকার তাঁর নিশ্চয়ই আছে। বাইরে থেকে মনে হতেই পারে, এতো অতীত নিয়ে ঘর করা। জীবনের প্রতিটি দিন এক একটি উৎসবের নতুনতর উদ্বোধন। যাঁরা অতীতের স্মৃতি আঁকড়িয়ে পড়ে থাকেন তাঁরা বঞ্চিত হন জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক সেই উদ্বোধন থেকেই। এমনটা মনে করাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিতর থেকে দেখলে, এমনও তো হতে পারে, হারনো জীবনসাথীর স্মৃতিই কারুর জীবনে প্রতিদিনের উৎসবের উদ্বোধন হয়ে উঠছে? প্রতিটি দিন সেই স্মৃতির স্বর্ণভাণ্ডার থেকেই তিনি হয়তো নিঃসঙ্গ জীবনকে ভরিয়ে তুলছেন নিত্য দিনের আনন্দে? বাইরে থেকে নিঃসঙ্গ মনে হলেও অন্তরে হয়তো একজন আছেন আরেকজনকে জড়িযেই? জানি অনেকেই বলবেন, এতো একধরণের আত্মপ্রবঞ্চনাই। বাইরে থেকে দেখলে তেমনটা ভাবা অস্বাভাবিক নয় হয়ত। কিন্তু একজন নারীর অন্তরের খবর কে রাখতে পারে?

এরপরেই আসে সেই অমোঘ প্রশ্ন। নিজের মনকে ভোলানো হয়তো সহজ। কিন্তু শরীরকে? স্মৃতি দিয়ে মনকে ভোলাতে পারলেও নিজের শরীরকেও কি ভোলানো যায় স্মৃতি দিয়ে। এর উত্তর দিতে পারেন তিনিই যিনি মগ্ন সেই সাধনাতে। বাইরে থেকে সত্যি করে এর উত্তর দেওয়া কঠিন। ভালোবাসাকে আমরা আমাদের সামজিক শিক্ষায় ও পারিবারিক ঐতিহ্যের আলোতে মূলত মনের বিষয় বলেই ধরে নিই। কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। ভালোবাসা শরীর মন আত্মাকে অবলম্বন করেই। সেখানে একটি দ্বার রুদ্ধ হয়ে গেলে ভালোবাসায় কষ্টের পাথর জমতে শুরু করে। আমাদের সামাজিক শিক্ষা পারিবারিক ঐতিহ্য ইত্যাদির বলয় সেই পাথরের ভারকে টের পেতে নাও দিতে পারে প্রথমদিকে। কিন্তু পেটে পাথর জমার মতোই একদিন না একদিন সেই ভার ঠিকই জানান দেবে। দেবে এই কারণেই যে, আমাদের এই জীবনের অস্তিত্বের ভরকেন্দ্র আমাদের মন নয়। আমাদের শরীর। সেই অমোঘ সত্য আমরা কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ধরি না।

সত্যি, এই অনন্ত জগতে আমাদের ব্যক্তিজীবনের অস্তিত্বের কালসীমা আসলেই কয়েকটি মাত্র বছর বই তো নয়? সেই স্বল্পায়ু সময় ইতিহাস ও মহাকালের বেদীতে কয়েক মুহুর্তের বেশি কি? এই যে ক্ষণস্থায়িত্ব, এখানেই আমাদের শরীরের মূল্য এত বেশি। এরপরেও রয়েছে গোটা জীবনের সময়সীমার প্রেক্ষিতে আরও স্বল্পস্থায়ী যৌবন। এই কারণেই যৌবন এমনই মহার্ঘ্য। সেই মহার্ঘ্য দিনগুলি, না একা একা স্মৃতিরোমন্থনের নয়। তার জন্য পড়ে থাকুক না বার্দ্ধক্যের কাল। এই স্বল্পস্থায়ী যৌবন শোকবহনের জন্যেও নয়। নয় বিলাপ করার জন্যও। যৌবন ও জীবন প্রতিটি দিনের নব নব উদ্বোধনের বিষয়। যে উদ্বোধন নারীপুরুষের পারস্পরিক সংসর্গ ছাড়া সম্ভব নয়। সেই সংসর্গের ভিতরে পূর্বজ সাথীর স্মৃতি ধুয়ে ফেলতেই হবে এমনটাও তো নয়। সেই স্মৃতি নিয়েই নতুন ভাবে প্রতিটি দিনের উদ্বোধন ঘটানোর পথই হতে পারে বিধবা বিবাহ। একথা মনে করার কোন কারণ নাই, বিদ্যাসাগর এই কথা জানতেন না। হয়তো জানতেন বলেই এমন নিবিড় ভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন নারীর মর্মবেদনা! খুলে দিয়েছিলেন সমাজের রুদ্ধ দ্বার। আজ থেকে ১৬৪ বছর আগে। পাশ হয়েছিল বিধবা বিবাহ আইন ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দের ২৬শে জুলাই।

২৪শে জুন’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত