সেল্ফি ও কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সেল্ফি ও কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সেল্ফি ও কবিতা



সেল্ফি ও কবিতা

সেল্ফি ও কবিতা এক অসাধারণ যুগলবন্দি। ফেসবুকের ওয়াল থেকে ওয়ালে এক নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিদিন। সাহিত্যের ইতিহাস যখন আবার নতুন করে লেখা শুরু হবে তখন এই নিয়েই একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় লিখতে হবে ভাবী কালের ঐতিহাসিকদের। কালি কলম কাগজ আবিস্কারের হাত ধরে আধুনিক সাহিত্যচর্চার বেশ কয়েক শতাব্দী ব্যাপি বহমান ইতিহাসে কবিতাই ছিল কবির সেল্ফি। কবিতার পরতে পরতে কবির আত্মপরিচয় ফুটে উঠতো সুস্পষ্ট ভাবেই। কবিকে নিজের কবিতার বাইরে আত্মপরিচয় সংযুক্ত করার কথা ভাবতে হতো না কখনো। দরকার হতো না কবিতার সাথে সল্ফি জুড়ে দেওয়ার। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস তাতে কোন অংশেই কম সমৃদ্ধ হয়নি। হয়নি বলেই আজও আমরা সাহিত্যের সাথে যেটুকু সংলগ্ন রয়েছি, সেটি সম্ভব হয়েছে। কবিতার পাঠক, কবিতার অন্দরমহলে পা রেখেই কবির সাথে আলাপ সেরে নিতে পারতো। দরকার পড়তো না কবির আত্মপ্রতিকৃতির দিকে চেয়ে বসে থাকার। পাঠকের মন মনন চেতনার অন্তরাত্মা জুড়েই বিচরণ করতে পারতো কবির কবিতা। পাঠক সেই কবিতায় অবগাহন করে আপন সাহিত্যবোধের দিগন্তকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে তুলতে পারতো। অসুবিধা হতো না কোন। এবং এইভাবেই সাহিত্যরসের আনন্দে নিমজ্জিত পাঠকও নিজের সাহিত্যবোধের শক্তিতো অবতীর্ণ হতে পারতো কাব্যসমালোচনার পরিসরেও। না পাঠক মাত্রেই সকলের পক্ষে সেটি সম্ভব ছিল না কোন কালেই। কিন্তু অল্প শতাংশ হলেও অনেক পাঠকও সত্যি অর্থে সাহিত্য সমালোচকও বটে। আর সাহিত্য সমালোচনার এই পরিসরে কবির কবিতাই ছিল স্বয়ংসিদ্ধ। দরকার পড়তো না কবির আত্মপ্রতিকৃতির। কবিতাই কবির হয়ে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে ধরে রাখতে যথেষ্ট সক্ষম ছিল।

কিন্তু দিন বদলায়। সময় থেমে থাকে না। নতুন নতুন কাল এসে নিত্য নতুন দিগন্তের উন্মোমচন করে দিতে থাকে। আর এই বিষয়ে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অবদানই মুখ্য ভুমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনী শক্তি ও ক্ষমতা মানুষের জীবনবোধের উপরেও প্রভাব বিস্তার করে। এবং বেশ দ্রুতগতিতেই। এটি অবশ্যাম্ভাবি। এই পথেই এগিয়ে চলতে থাকে সভ্যতার জয়রথ। এইভাবেই একদিন শ্রুতির গণ্ডী থেকে মুক্তি হয়েছিল কাব্য সাহিত্যের। এই পথেই কবির কবিতা বিশ্বব্যাপি পরিভ্রমণের রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল ছাপাখানা আবিস্কারের ভিতর দিয়েই। ফলে সাহিত্যচর্চার দিগন্তে প্রযুক্তির উদ্ভাবনী শক্তির অবদান অত্যন্ত সদর্থক। এবিষয়ে তর্ক হতেই পারে না।

কিন্তু একবিংশ শতকের সেল্ফি যুগে এসে আমাদের সাহিত্যচর্চা তার আবহমান ধারা থেকে যেন একটি আনকোরা নতুন বাঁকের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে আজ। এর ভালো মন্দ বিচার বিশ্লেষণের সময় এখনো আসে নি। কারণ এটি এতই সদ্যজাত ঘটনা, যে তার ফলাফল সাহিত্যচর্চার সার্বিক পরিসরে কেমন ভাবে পড়বে বা পড়তে পারে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। হ্যাঁ কিছুটা হলেও অনুমান করা যেতে পারে বই কি। তাই কিছুটা অনুমানজনিত ধারণার উপরেই আমদের নির্ভর করতে হচ্ছে এইসময়ে।

ফেসবুকের ওয়াল-কবিতার পরিসরে একটু হাঁটাহাঁটি করলেই দেখা যাবে, কবিতা ও সেল্ফির অনবদ্য যুগলবন্দী। আর তার নীচেই লাইক ও কমেন্টের ঠাসাঠাসি ভিড়। এই বিষয়ে আরও সত্য নিষ্ঠ হলে এও দেখা যাবে, অধিকাংশ সেল্ফি-কবিতাই কিন্তু আবার মহিলা কবিদের পোস্ট করা। না, আমি এই বিষয়ে লিঙ্গভেদের পক্ষপাতি নই আদৌ। তবু সত্যের খাতিরেই একথা অস্বীকারের কোন জায়গা নেই। এখন প্রশ্ন একটাই সেল্ফি-কবিতায় দেওয়া লাইক ও পোস্ট করা কমেন্টের লক্ষ্য কতটা কবিতা আর কতটা কবির আত্মপ্রতিকৃতি?

এবার একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাই বলা যাক। একজন সাহিত্যের পাঠক হলেও যেহেতু মন মনন চেতনায় পুরুষের সত্ত্বা একেবারেই সম্পূর্ণ পরিব্যাপ্ত; তাই কবিতার সাথে সুন্দরী ললনাদের আত্মপ্রতিকৃতি দেখলে প্রথমেই সুন্দর মুখশ্রী জাদুতে অমনিই হাত চলে যায় ফেসবুক প্রদত্ত লাইক বাটনে। মুখশ্রীর সৌন্দর্য্যে বেশি বিহ্বল হয়ে পড়লে অমনি লাভ বাটনে আঙুল ছোঁয়াতে দেরি হয় না মোটেই। কিন্তু তাই বলে কি সব কবিতাই পড়তে ইচ্ছে হয়? না সময় থাকে হাতে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু মুখশ্রীতে লাইক দিয়ে চলে যাওয়া। এরপর যদি পরিচিত মুখ হয় তো কথাই নাই। বিশেষ করে সৌন্দর্য্যের জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হলে লাভ বাটনে আঙুল না ছুঁয়িয়ে আর উপায়ই বা কি? ফলে ঐখানেই আমাদের পঠক সত্ত্বার অপমৃত্যু ঘটে যায়। যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

কিন্তু কেন করি আমরা এমন? কবিতাটি না পড়ে তো লাইক কমেন্ট করার কথা ছিল না। ছিল কি? এখানেই মন বলে, শুধু তো কবিতাই নয়। সাথে দোসর যেখানে কবিরই সেল্ফি, সেখানে সেই কবিপ্রতিকৃতিই যদি লাইক ও কমেন্টের বিষয় হয় তবে ক্ষতি কি? না ক্ষতি কিছু নয়। ক্ষতি শুধু আমারই পাঠক সত্ত্বার। কবির মুখশ্রীতে মজে, আমিই যেন নির্বাসিত থাকলাম কবির কবিকৃতী থেকে। একটা ভালো কবিতার রসাস্বাদন থেকে বঞ্চিত করলাম নিজেকেই। আর ঠিক সেটিই আমরা করে চলেছি নিরন্তর। অথচ যাঁর সেল্ফিতে আটকিয়ে থামিয়ে দিলাম নিজেরই পাঠকসত্ত্বাকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, তিনি আমারই অতি পরিচিত মানুষ। যাঁর সৌন্দর্য আমার কাছে অতি পরিচিতই। কিন্তু তাঁর নতুন যে কবিতাটি আমার পড়া নাই, সেটি না পড়াটি একজন পাঠক হিসাবে নিজেকেই লজ্জিত করা আসলেই। কবির মুখশ্রীতে মজে ঠিক সেই কথাটিই খেয়াল থাকে না আর।

কিন্তু কবি, তিনি কি জানেন একথা? তিনিই বা কেন নতুন কবিতার সাথে নিত্যনতুন পোশাকের সেল্ফি যোগ করে চলেছেন নিজের ওয়ালে? প্রতিদিন।  অবশ্যই কে কার ওয়ালে কি পোস্ট করবে, কিভাবে করবে, কেনই বা করবে, সেটি একান্তই তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়। ঠিক কথা। কিন্তু কবি কি নিজের কবিতার উপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে পারছেন না আর? তাই কি তাঁকে রূপে ভোলাতে হচ্ছে, পাঠক টানতে? বিশ্বকবি যদিও, বলে গিয়েছিলেন, রূপে তোমায় ভোলাবো না। একজন কবি, তিনি তো তাঁরা পাঠককে তাঁর কবিতা দিয়েই ভোলাতে পারেন। কারণ কবিতার কাজই তাই। আবহমান কাল ধরে কবিতার যত ধরনের পরিবর্তনই হোক না কেন, কবিতার মূল উদ্দেশ্য চিরকালই এক এবং অনন্য। কবিতার সেই শাশ্বত লক্ষ্য একটিই। সেটি হলো পাঠককে ভোলানো। যে কবিতা যত দ্রুত পাঠক ভোলানোর ক্ষমতা ধরে, সেই কবিতাই তত দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আর যে কবিতা যত বেশি দিন বা কাল ধরে পাঠককে ভুলিয়ে রাখতে পারে, সেই কবিতাই তত বেশি কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। এটাই কাবিতার আবহমান ধর্ম।

তবে কি আজকের এই ফেসবুকীয় কাব্যচর্চার দিগন্তে কবি তাঁর নিজের কবিতার পাঠক ভোলানোর ক্ষমতার বিষয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ছেন? নাকি চটজলদি জনপ্রিয়তা অর্জনই আজকের কবির লক্ষ্য? আর সেই লক্ষ্যে কবিতার থেকেও মহার্ঘ্য কবির সেল্ফি? কারণ কবিই কি নিজে মনে করছেন, তাঁর কবিতা নয়, তাঁর মুখশ্রীই পাঠক ভোলানোর বিষয়ে বেশি কার্যকরি? নয়তো কবিতার সাথে সেল্ফির এই যুগলবন্দিই বা কেন?

না, আমার অত্যন্ত প্রিয় কবিবন্ধু বান্ধবীদের প্রতি কোন রকম কটাক্ষ নয়, বিশেষ করে যাঁরা প্রতিদিন নিয়ম করে কবিতা ও সেল্ফির যুগলবন্দীর আসরে আমাদের আমন্ত্রণ জানান। দুইবেলা তাঁদের মুখশ্রীর সৌন্দর্য্যে মজে বন্ধু হিসাবেও আমাদের পরিতৃপ্তির সীমা নাই। তাই তাঁদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েও বলতে বাধ্য হচ্ছি, সাহিত্যের একজন পাঠক হিসাবেই এই প্রশ্নগুলির সম্মুখীন হওয়ার সময় এসেছে আমাদের সকলেরই। এবং একইসাথে নিজের মুখ আয়নায় নিজেকে দেখেও অবাক হতে হচ্ছে নিত্যদিন। এ কোথায় এগিয়ে চলেছি আমরা? সাহিত্যকে পাশ কাটিয়ে সাময়িক আনন্দের মোহ গ্রাস করছে না কি আমাদের সাহিত্যচর্চার খোলা দিগন্তকেই? ধীরে ধীরে একটি বদ্ধ আবর্তের ভিতরই যদি এইভাবে ঘুরপাক খেতে থাকে আমাদের সাহিত্যবোধ ও চর্চার পরিসর, তবে এর ভবিষ্যৎ কতটা আলোর অভিমুখে, সন্দেহ কিন্তু উঁকি দিতে থাকেই। থাকবেই।


৫ই অগ্রহায়ন’ ১৪২৬

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত