আজ নববর্ষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আজ নববর্ষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

আজ নববর্ষ



আজ নববর্ষ

সর্বত্রই সকলের মুখে সহাস্য শুভ নববর্ষ! সকলেই সকলকে আন্তরিক শুভ নববর্ষ জানাতে ব্যাস্ত। দেখে শুনে মনে হয় প্রায় সব পেয়েছির দেশ। কারুর মনে আর কোন বিদ্বেষ নাই। মতের বিরোধ নাই। স্বার্থের সংঘাত নাই। কেড়ে খাওয়ার লড়াই নাই। মনে হবে এসব কিছুই যেন শেষ হয়ে গিয়েছে গতকালের বর্ষশেষের সাথে সাথেই। এখন সকলেই আমরা সকলের তরে। এখন উৎসব। যে উৎসবে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভাষাভাষীর মানুষই স্বাগত। ঠিক এমন একটা পরিবেশ পরিস্থিতিই তো চাই আমরা অনেকেই মনে মনে। তাই না কি? তবে তো বলতেই হয় সার্থক ২০১৯ এর আগমন। ঠিক যেমনটি মনে হয়েছিল ৩৬৫ দিন আগেও। ২০১৮’র প্রথম দিনেই। বা তারও আগে প্রতি বছরের প্রথম দিনে। একেবারেই যে রিপিট টেলিকাস্ট। শুভ নববর্ষের মেগা সিরিয়ালের।

আচ্ছা সত্যিই আগামী কালও যদি ঠিক এইভাবেই নববর্ষের উৎসব উদযাপন করতো সকলে? তারপর পরশু। তারপর তারও পরের দিন। প্রতিট দিনই একই ভাবে। বড্ড একঘেয়ে হয়ে যেত না কি? হতো বইকি। তাই উৎসব প্রতিদিনের বিষয় নয় কোন। কিন্তু সেও না হোক, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় আন্তরিক ভালাবাসা থেকে পরস্পর! সেটি কি হতে পারে না প্রতিদিন? প্রতিদিনই কি আমরা চাইতে পারি না, পাশের জনের শুভ হোক। ভালো হোক? সেও সুখে থাকুক আমারই মতো। কিংবা তার দুঃখেও কষ্ট হোক না কিছুটা আমার অন্তরে। যে কষ্টের আন্তরিকতায় আমিও তার দুঃখের পাশে সংবেদনশীলতার মনোবৃত্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারবো। অন্যের বিপদ আপদকে নিজেরই আত্মীয়ের বিপদ আপদ মনে করে বিপদগ্রস্ত মানুষটির পিঠে রাখতে পারবো একটি প্রশস্ত হাত। বরাভয়ের। ভয় নাই বন্ধু। আমি তো আছি। যে হাতটি আমারই প্রতিদিনের নিজস্ব লড়াইয়ের হাত। যার পরিসর আমরাই চেতানার রঙে হয়ে উঠবে মানবিক হয়ে? কেমন হতো তাহলে? সত্যিই কি কিছু কম পড়ে যেত আমার ভাঁড়ারে? নাকি সমাজ সংসারে প্রতিপন্ন হতে হতো রাম বেকুব বলেই? নাকি পাশের লোকটিও উদ্বুদ্ধ হতো একই বেকুবি করতে? ঠিক একই ভাবে।

না এ কোন রাম রাজত্বের গালগল্প কিংবা গুলবাজি নয়। কথায় বলে ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। না হলে উড়ো জাহাজ থেকে ডুব জাহাজ কোনটাই সত্য হতো না। হতো কি আদৌ? তাই প্রথমে যতই কাঁঠালের আমসত্বের গন্ধ পাওয়া যাক না কেন, একটু ভেবে দেখলে ক্ষতিই বা কি। নাহয় একটু সময় নষ্টই হলো। তবু যদি প্রতিবেশীর জন্য সহযাত্রীর জন্য সহপাঠীর জন্য সহকর্মীর জন্য একটু শুভ ইচ্ছা পোষন করা যায় একেবারে মনের ভিতর থেকেই ক্ষতি কি।

না তাহলে তো হয়েই যেত। সে কি করে সম্ভব? মহামতী ডারুইন কি বলে যান নি? সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। শাশ্বত সত্য। কেই বা অস্বীকার করতে পারবে? ট্রেনে বাসে সর্বত্রই এই সত্য। কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে পাশের জনকে ছিটকে দিতে না পারলে দুই ঘন্টার পথই হোক আর পাঁচ মিনিটের পথ জানলার ধারে আর বসে যাওয়া যাবে না। হাতল ধরে কেবলই ভাবতে হবে সামনের সিটের মানুষটি নামবার জন্য কখন সিটটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে। পা টনটন কোমর টনটন এত বেশি করতে শুরু করে দেবে যে কার মুখ দেখে সকালে উঠেছিলাম ভাবতে হতে পারে সে কথাও। ফলে কনুইয়ের গুঁতোর মত ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের বদলে যদি শুভেচ্ছা বিনিময় করে পাশের জনকে সিট ছেড়ে দেওয়ার সাধ হয় কারুর তবে সকলের মাঝে বেআব্রুর মতো বেকুব প্রতিপন্ন হতে হবে বইকি। কে আর সে লজ্জায় পড়তে চায়? যদি চব্বিশ ঘন্টার দৈনিক কার্যক্রমের কথাই ধরা যায়, এমনই সব ছোট বড়ো দৃষ্টান্তে মহাভারত রচনা হয়ে যেতে পারে।

তাই মহাভারত অশুদ্ধ হোক বা না হোক, প্রতিটি দিনই আন্তরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের  সংস্কৃতি চালু হয়ে গেলে আমরাও হয়তো ডাইনোসোরের মতো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারি অচিরেই। না কেউই আমরা সেই দলের সদস্য নই। হতেও চাই না। তাই প্রতিটি মুহূর্তই লড়াইয়ের মুহূর্ত। প্রতিটি সময়ই অন্যকে টপকে যাওয়ার সময়। অন্যকে টপকে যাওয়াও হয়তো অশোভন নয়। কিন্তু টপকাতে হলে না ঠকিয়ে উপায় কি? তাই ঠিকমত ঠিক সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠকাতে না পারলে কেল্লাফতে করা যায় না। যেতে পারে না। আর তাই ক্রমাগত এই টপকে যাওয়ার হার্ডলরেসের একটাই চাবিকাঠি প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠকিয়ে যাওয়া। নয়তো ঠকে যেতে হবে নিজেই।

তাই নববর্ষের রাত পোহালেই আবার আমরা ব্যাক টু স্কোয়্যার ওয়ান। একেবারে বিগত বছরেরই রিপিট টেলিকাস্ট। সেই পরনিন্দা পরচর্চা। পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া। বিদ্বেষ বিভেদ আর বিচ্ছেদের সংস্কৃতি। সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী অন্যের সুখ কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত। বুদ্ধির প্রাচুর্য্যের সাপেক্ষে লোক ঠকানোর বুৎপত্তি। সবকিছুই ঠিক ভুতপূর্ব বছরের মতো। যেখানে যেমন একেবারে অপরিবর্তনীয়।

অনেকেই বলতে পারেন, এসবই নিন্দুকের কথা। কাজ নাই তো খই ভাজ গোত্রের বলেও বিদ্রুপ করতে পারেন কেউ। দোষে গুনে মানুষ। পরিস্থিতি পরিবেশ অনুযায়ী মানুষের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রীত হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফরের মতো বিদেশী শত্রুর হাতে দেশকে তুলে দেওয়ার ভিতর আর যাই হোক মানবিক মূল্যবোধ থাকতে পারে না। ফলে কামানের গোলাবর্ষনের প্রয়োজনের সময় গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে শত্রুকেও মিত্র করার বুদ্ধি নিশ্চয় কেউ দেবে না। তাই পুরোপুরি সাদাকালো হয় না কিছুই। ঠিক তেমনই আপনি বাঁচলে বাপের নাম। টিকে থাকার সার্বিক লড়াইয়ের ভিতরেই আমাদের পারস্পরিক সহাবস্তানের পথ খুঁজে নিতে হবে। সাধ ও সাধ্যের সাথে সামঞ্জস্য সাধন করে। বাস্তব ও শ্রেয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই। তাই দেখতে হবে এই সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যটুকু যেন ঠিকমত বজায় থাকে। তাহলেই হয়তো অনেক দরকারি একটা কাজ বেশ কিছুটা সহজ সাধ্য হয়ে যেতে পারে।

পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর্ব শেষ হয়ে গেলে আমরা অন্তত যদি একটু এই ভাবে ভাববার চেষ্টাও করি, তাহলেও হয়তো নববর্ষে নতুন কোন বার্তা দেওয়া যেতেও পারে। সেটাই হোক না কেন আজ এই নববর্ষের প্রথম দিনের অভিমুখ।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত