কবিতার মৃত্যু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিতার মৃত্যু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কবিতার মৃত্যু



কবিতার মৃত্যু

কখন মৃত্যু হয় কবিতার? ঠিক যদি এই প্রশ্নটাই করা যায়। শুধু তো একটা উত্তরই নয়। ভিড় করে অসংখ্য উত্তর। বিশেষ করে কবিতার নিবিড় পাঠে অভ্যস্থ যাঁরা। কবিতাকেই ভালোবেসে। এখানে একটা মস্ত বড়ো ফাঁক রয়ে যায় সাধারণত আমাদের অভ্যস্থ জীবনে। আমরা যতটা না কবিতাকে ভালোবেসে কবিতা পড়ি, তার থেকে অনেক বেশি কবিতা পড়ে থাকি, কোন না কোন কবিকে ভালোবেসে। আমাদের চেনা পরিচিত কবি। অটোগ্রাফ সংগ্রহ করে রাখা কবি। মঞ্চ আলো করা কবি। সাহিত্য পুরস্কার লাভ করা কবি। জনপ্রিয়তার তালিকায় শীর্ষে থাকা কবি। এই সময়ের সবচেয়ে বেশি আলোচিত বা বিতর্কিত কবি। সাধারণত এঁরাই আমাদের ভালোবাসার কবি হয়ে থাকেন। সেই ভালোবাসার কবির কবিতাই আমরা যখন পড়ি। তখন আমাদের সেই কাব্যপাঠ কবিতাকে ভালোবেসে যতটা নয়। কবিকে ভালোবেসে তার থেকে অনেক অনেক বেশি। ফলে সেই ভালোবাসার প্রিয় কবির কবিতা পাঠে আমরা অনেক অকবিতাকেও কবিতা বলে অন্তরে গ্রহণ করে ফেলি।

এই যে অকবিতাকেও কবিতা বলে গ্রহণ করে ফেলা। একজন পাঠকের কাছে পাঠকের অজান্তেই কবিতার মৃত্যু হওয়ার মতোই ঘটনা সন্দেহ নাই। কারণ কবিতা যে শুধু কবির কলম থেকেই সৃষ্টি হয়ে ওঠে, তাই নয়। কবিতা পূর্ণ হয়ে ওঠে একমাত্র পাঠকের চেতনার ভিতর দিয়েই। যত বড়ো শ্রেষ্ঠ কবিতাই হোক না কেন, যতক্ষণ না সেই কবিতা পাঠকের চৈতন্যে সত্য হয়ে উঠতে পারছে, ততক্ষণ তার অস্তিত্বও সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না। এখানেই কবিতার বিশেষত্ব। বা শুধু কবিতাই বা কেন। সাহিত্যের সকল শাখা সম্বন্ধেই এই কথা শাশ্বত সত্য। বলা যেতেই পারে।

অর্থাৎ এই সূত্র ধরে, আমরাও কি বলতে পারি না, যে কবিতা কোন পাঠকের চৈতন্যেই সত্য হয়ে ওঠার অবকাশ পেল না, কবির সেই সৃষ্টি যত মহৎ সৃষ্টিই হোক না কেন। সেই কবিতার মৃত্যু অনিবার্য? তাহলে এও এক ধরণের কবিতার মৃত্যু। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় মানুষের বিশ্বাস ছিল। মৃত আত্মার পুনর্জাগরণের। সেখানের রাজা মহারাজারা তাই দেহান্তের পর রাজাদের দেহকে মমি করে রেখে দিত পিরামিডের অভ্যন্তরে। পরে কোনদিন রাজা আবার জেগে উঠবেন এই বিশ্বাসে। কোন কবিই চান না, তাঁর কবিতাকে সেই রকম মমি করে রেখে যেতে। কিন্তু আজকে যে কবির যে কবিতা পৌঁছাতে পারলো না কোন পাঠকের কাছেই। কালের নিয়মে তা যে পরবর্তী কালের পাঠকের কাছে আবিষ্কৃত হবে না, কে বলতে পারে। তখন পিরামিডের মমি জেগে না উঠলেও আজকের মৃতবৎ স্থবির কবিতা ভাবী কালকের পাঠকের চেতনায় সজীব প্রাণবন্ত হয়ে জেগে উঠতেই পারে। যদি পারে তবে তো কথাই নাই। কিন্তু আগামী প্রজন্মের অনাগত কোন কালেও যদি আজকের অনাবিষ্কৃত কোন কবিতার নবজাগরণ না ঘটে, তবে তো সেই কবিতার চির সমাধি সুনিশ্চিত।

এও যেমন সত্য। ঠিক তেমনই সত্য, আজকের তুমুল জনপ্রিয় কবিতাও কালের নিয়মে আগামী প্রজন্মের পাঠকের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়তেই পারে। তখন অনাগত সেই কালে, আজকের সজীব প্রাণবন্ত কবিতারও মৃত্যু নিশ্চিত। যে কোন দেশের সাহিত্যের ইতিহাসই সেই সাক্ষ্য দেয়। দিয়ে থাকে। এই মৃত্যুকে চিহ্নিত করা যেতে পারে কাল জনিত মৃত্যু বলে। অনেকটা ওষুধের ভ্যালিডিটি এক্সপায়ার করার মতই প্রায়। সব কবিতার ভ্যালিডিটিই বেশি থাকে না। বিশেষত তুমুল জনপ্রিয় কবিতার ক্ষেত্রে এ কথা যেন আরও বেশি পরিমাণে সত্য।

কালের পরিবর্তনের সাথে, কবিতার এই নবজাগরণ বা ভ্যালিডিটি এক্সপায়ার জনিত মৃত্যুর সংযোগ ছাড়াও কি কবিতার মৃত্যু হতে পারে না? পারে বই কি। আলোচনার শুরুতেই বলা হয়েছে সেকথা। জনপ্রিয় বিখ্যত কবির সব কবিতাই যে কবিতা হয়ে ওঠে তাও নয়। কবি ব্যক্তিত্বের তুমুল জনপ্রিয়তার ছটায় অনেক ভুষিমালও কবিতার বেশ ধরে উৎরে যায় ভক্ত পাঠককুলের কাছে। খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার মহিমা এমনই অপার। কবিতার নিবিড় পাঠকের কাছেই শুধু ধরা পড়ে কোনটা কবিতা আর কোনটি অকবিতা। এমন নয় যে, কবি সেই অকবিতাগুলিকে কবিতায় উত্তীর্ণ করে তুলতে পারতেন না। নিশ্চয় পারতেন। সেই ক্ষমতা না থাকলে, কারুর পক্ষেই হয়তো বেশিদিন ধরে রাখা সম্ভব নয় জনপ্রিয়তা বা কবিখ্যাতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কবি যখন সেই প্রয়াসের অভিমুখ ত্যাগ করেন, তখনই অপমৃত্যু ঘটে সম্ভাবনাময় অনেক কবিতারই। মহাকাশে তারকার মৃত্যু হলে, পদার্থবিদ্যার কিছু কিছু নিয়মে অনেক তারকাই বামনাকৃত হয়ে মৃতবৎ ভাসমান থাকে। খ্যাতিমান জনপ্রিয় কবিদের এই সব অকবিতাগুলিও অনেকটা সেই রকম বামন জাতীয় মৃত কবিতার ন্যায়, কবির সাহিত্যকীর্তির পরিমণ্ডলে ভাসতে থাকে। পরবর্তী সময়ে কালের ছাঁকনিতে যা বাতিল হয়ে যায় অনাগত কালের সাহিত্যে।

অনেক সময়েই দেখা যায়। খুব সচেতন ভাবেই বিশেষ কোন মতবাদ সম্প্রচার করতেই কোন কবি কবিতাকেই হাতিয়ার করেন। সমকালে সেই সময়ের দাবিকে যথার্থ ভাবে ধরতে পারলে, সেই মতবাদমূলক কবিতাও পেতে পারে বিপুল জনপ্রিয়তা। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে তলিয়ে দেখার অবকাশ পেলেই উপলব্ধি করা যায়, সেই রকম বিশেষ বিশেষ মতবাদপন্থী কবিতায় মৃত্যু হয় কবিতারই। ভাসতে থাকে জরুরী কোন মতবাদের সারসত্যটুকু। সেই মতবাদের জনপ্রিয়তার নিরিখেই টিকে থাকে কবিতার খোলসটুকু। কবিতাটি নয়। অনেক অনেক সম্ভাবনাময় কবিতারই অপমৃত্যু ঘটে এই পথে।

আবার অনেক কবির হাতেই কবিতা প্রায় গিনিপিগ হয়ে ওঠে। এনারা বিভিন্ন ভাবে কবিতার উপরে চলাতে চান নানাবিধ একস্পেরিমেন্ট। সেই এক্সপেরিমেন্টের অত্যাচারে প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে কবিতার। পাঠকের চেতনায় পড়ে থাকে শুধু সেই এক্সপেরিমেন্ট গুলির একটা ইতিহাস। কবিতার মৃত্যু হয়ে যায় তার অনেক আগেই। প্রতিটি কালেই প্রধানত আধুনিকতার মোহে ও দর্পে, এই ভাবেই কবিতার মৃত্যু প্রায় মহামারীর রূপ নিয়ে নিতে পারে। নিয়েও থাকে কোন কোন কালে। কাল পরিবর্তেনের পথরেখায়, হারিয়ে যায় সেসব কবিতা। সাহিত্যের ইতিহাসে পড়ে থাকে এক্সপেরিমেন্টের খোলসগুলি।

অনেক সময় আবার দেখা যায়, কবির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার উপরে কবিই ভরসা করেন সবেচেয়ে বেশি। অনেকটা ঘোড়সওয়ারের মতোই কো‌ন কবি যদি আপন জনপ্রিয়তার উপরেই সওয়ারী হয়ে উঠে বসেন, তখন তাঁর হাতে কবিতার মৃত্যুর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বস্তুত অধিকাংশ কালেই তুমুল জনপ্রিয় কবিদের রচনায় এই ভাবে মৃত্যু হতে থাকে কবিতার পর কবিতা।

সমকালের পাঠকের রুচি, কাব্যবোধের পরিধির বাইরে, পাঠকের কাব্য চেতনার অভ্যস্থ পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে যখন কবিতার জন্ম হতে থাকে। তখন সেই কবিতার অন্তর্দেশে প্রবেশের চাবিকাঠি থাকে না অধিকাংশ পাঠকের কাছেই। ফলে প্রায় মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সেইসব কবিতা পাঠকের চেতনায় মড়া কাঠের ন্যায় নিস্প্রাণ বলেই প্রতিভাত হতে পারে। সেই সেই পাঠকের কাছেও তখন সেই কবিতা মৃত কবিতার মতোই। আপাত মৃত সেই কবিতা অপেক্ষা করে আধুনিক পাঠকের।

মতবদের সম্প্রচারের মতোই কবি যখন তাঁর কবিতাকেই রানিং কমেন্ট্রি করার হাতিয়ার করে ফেলেন। কবিতার মৃত্যু ঘটে তখনই। সময়ের দাবিকে মেনে কবিতাকে নিছক প্রতিবাদের হাতিয়ার করতে চাইলেও তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় কবিতার। কিংবা কবি যদি কবিতাকে পাঁচালী করে বলতে অগ্রসর হন কোন আবেগঘন কাহিনী। সেই কাহিনী পাঠকের আবেগে নাড়া দিয়ে গেলেও সেখানে জয়ী হয় কাহিনীটুকুই। মৃত্যু ঘটে কবিতার। দেবতার গ্রাস, দুই বিঘা জমি, বীর পুরুষ। কাহিনী হিসাবে আজও পাঠককে স্পর্শ করতে সক্ষম হলেও। কবিতা হিসাবে তাদের মূল্য কতটুকু?

এরপরেও যত মহৎ কবিতাই হোক না কেন। সেও একদিন কালের অতলে চাপা পড়ে যেতে পারে। হরপ্পা মহেঞ্জদরোর মতোই। কবিতা’তো আর ইঁট কাঠ পাথরের ইমারত নয়। তাই প্রত্নতাত্বিক আবিষ্কারে সভ্যতার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া গেলেও, কবিতাকে কি আর সত্যইই খুঁজে পাওয়া সম্ভব? আজ থেকে দশ হাজার বছর পর। কোথায় হারিয়ে যাবে আজকের সব মহৎ কবিতা। অনাগত সেসব দিন, নতুন করে রচনা করে নেবে সেদিনের কবি ও কবিতাকে। আজকের কবির কোন ছবি বা আবক্ষ মূর্তি সেদিন কালের ধ্বংসাবশেষ থেকে আবিষ্কার করা গেলেও, আজকের কোন মহৎ কবিতারই আর কোন প্রাসঙ্গিকতা রইবে কি আজ থেকে ধরা যাক দশ হাজার বছর পর? তাই কোন কবিতাই দাবি করতে পারে কি অমরত্বের?

৫ই শ্রাবণ’ ১৪২৭

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত