প্রকৃত কবিতার গোড়ার
কথা
কবিতা নিয়ে নানা মুনির নানা মত।
সাহিত্যের পক্ষে সেটি স্বাস্থ্যপ্রদ। রামকৃষ্ণের কথায় যত মত তত পথ। মানুষের কবিতাও
সেই রকমই নানা পথ ধরে এগিয়ে এসেছে। এগিয়ে চলেছে। বিচিত্র রূপে বৈচিত্রের সম্ভারে সমৃদ্ধ
হয়ে। আর পথ পরিক্রমণের সেই নানান পথরেখায় গড়ে উঠেছে নানান ধরণের ঘরানা। এক একটি ঘরানা
সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ অবদানও রেখেছে। কালের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ঘরানাগুলিরও
বদল ঘটেছে নানা ভাবে। অর্থাৎ, কবিতা কোন কালেই কোন পর্বেই কোথাও স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে
যায়নি। কবিতা চলছে। আমাদের জীবনের মতন কবিতাও চলমান এক প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ঘরানার রূপ
রস রকমকে সাথে নিয়েই সে ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলায় বিশ্বাসী। আর ঠিক এই কারণেই
কবিতাকে কোন ধরণের একটি নির্দিষ্ট তত্বে বা ফর্মূলায় ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়।
কবিতার বিষয়ে
তাত্বিক বা ঐতিহাসিক আলোচনার অবতারণা করতে বসি নি আমরা। কবিতা সম্বন্ধে এত বিভিন্ন
ধরণের বিচিত্র ধারা উপধারা তত্ব ঘরনা ইত্যাদি সত্বেও এতসব ধরণের বৈচিত্রের ভিতরেও একটি
জায়গায় এসে সব কবিতাই একটি বিষয়ে মিলে যায় বোধহয়। অন্তত যাকে আমরা কবিতা বলে চিহ্নিত
করতে পারি। যে কবিতা কালের দ্রাঘিমা অক্ষরেখায় বাঁধা পড়ে আটকিয়ে থাকে না। সেটিই হলো,
সময়ের যন্ত্রণাকে ধারণ করার ক্ষমতা। একটি কবিতার সবচেয়ে বড়ো গুণই হলো সময়ের যন্ত্রণাকে
ধারণ করা। এমন ভাবেই ধারণ করা, যাতে আবহমান সময় সরণীতে তার যে আপন বিশেষত্ব, তাকে অক্ষুন্ন
রেখেই সে চিরকালীন সত্যকে খুঁজে পায়। যে কবিতা চিরকালীন সত্যে গিয়ে উপনীত হতে অক্ষম,
সে কবিতা শব্দের কঙ্কাল। আবার যে কবিতা সময়ের যন্ত্রণাকে ধারণ করতেও অক্ষম, সেও সেই
শব্দেরই কঙ্কাল শুধু। তার বেশি কিছু নয়।
অর্থাৎ কবিতাকে
কবিতা হয়ে উঠতে গেলে। একদিক দিয়ে তার সময়ের যন্ত্রণাকে ধারণ করতে হবে। আর এক দিক দিয়ে
তাকে শাশ্বত সত্যে উপনীত হতে হবে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতেই পারে, তা কি করে সম্ভব? সময়ের
যন্ত্রণাকে ধারণ করা মানেই তো, সময়ের দ্রাঘিমা আর অক্ষরেখায় আটকিয়ে যাওয়া। আর শাশ্বত
সত্যে পৌঁছিয়ে গেলে আর সময়ের যন্ত্রণাকে ধারণ করা সম্ভব হয় নাকি। সময় তো আর সবসময় এক
জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না, থাকবে না। যে কোন প্রকৃত কবির পক্ষেই কবিতাচর্চার বিষয়ে এটাই
সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। কিভাবে মেলাবেন তিনি আপাত বিপ্রতীপ এই দুই অবস্থানকে? কিভাবে
সামঞ্জস্য বিধান করবেন সময়ের সাথে শাশ্বতকে। কিভাবে মেলাবেন যন্ত্রণা আর অভিজ্ঞতাকে
সত্য আর মহাকালের সাথে? যেকোন কবির কাছেই এটাই কাব্যচর্চার সবচাইতে কঠিন পরীক্ষা।
সকলেই যে
সেই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হবেন, তেমন নয়। উত্তীর্ণ না হতে পারলেও কোন অসুবিধা
নাই। নাই কবি হিসাবে লজ্জা। কিন্তু সেই পরীক্ষায় বসতেই যাঁদের অনীহা। বা যাঁরা হাজার
হাজার কবিতা লিখে ফেলেও সেই পরীক্ষার বিষয়ে কোন খোঁজই রাখেন না। লজ্জা তাঁদেরই শুধু।
প্রত্যেক কালেই অধিকাংশ জনপ্রিয় কবিই হয় এই পরীক্ষায় বসতে রাজি থাকেন না। কিংবা পরীক্ষারই
কোন খোঁজ রাখেন না। কিন্তু তাতে তাঁদের জীবৎকালে জনপ্রিয়তায় কোন ঘাটতি থাকে না। তাঁরা
ও তাঁদের সাহিত্য ফুরিয়ে যায়, তাঁদের আয়ুর ফুরিয়ে যাওয়ার সাথেই। এটাই তাঁদের ভবিতব্য।
বস্তুত, মূলত এঁদের কথা স্মরণ করে কবির সেই অমোঘ বাণী। ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’।
এখন অনেকেরই
মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে। সময়ের যন্ত্রণা, যাকে আমরা কালের অসুখও বলতে পারি, তার সাথে
শাশ্বত সত্যকে মেলানোর কোন সাধারণ সূত্র রয়েছে কি আদৌ? না, কবি মাত্রেই জানেন। তা নাই।
তাই প্রত্যেক কবিকেই তাঁর নিজের মতোন করেই সেই মেলানোর সাধনায় অগ্রসর হতে হয়। এই যে
এক একজন কবি তাঁর একান্ত আপন সাধনার পথেই এই পথে অগ্রসর হন। এখানেই তাঁদের বিশেষ বৈশিষ্ট।
এবং প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে স্বতন্ত্র। সেই স্বাতন্ত্রেই তাঁদের পরিচয়। নয়তো তাঁদের
সাধনা কিন্তু একটাই। সময়ের যন্ত্রণাকে চিরকালীন অস্তিত্বের পটে সত্য করে তোলা। শাশ্বত
সত্যে উপনীত হয়ে সময়ের যন্ত্রণার উত্তর অন্বেষণ।
অর্থাৎ এখন
আমরা এটা বুঝতে পারছি। কবিতার পথে অগ্রসর হতে গেলে। নানা মুনির নানা পথ থাকলেও, সময়ের
যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করতে হবে। সেটি উপলব্ধি করতে না পারলে, সেই যন্ত্রণাকে একজন কবির
পক্ষে তাঁর সাহিত্যে ধারণ করা সম্ভব নয় কিছুতেই। অনেকেই ভাবতে পারেন। কবির ব্যক্তিজীবনের
অভিজ্ঞতাজাত স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশের ভিতর দিয়েই সম্ভব তাঁর সময়ের যন্ত্রণাকে
কাব্যে ধারণ করা। বিষয়টি যে এতটাই সহজ সরল। তা নয়। ব্যক্তিগত আবেগের ভিতরে আমাদের ব্যক্তিত্বের
সীমাবদ্ধতা বর্তমান। পাঠকের পক্ষে সেটি তত বড়ো কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না। একজন
কবির পক্ষে যতটা করে। একজন কবির, কবি হয়ে ওঠার প্রাথমিক শর্তই হলো, ব্যক্তিত্বের সেই
সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে ওঠা। অর্থাৎ ব্যক্তিগত আবেগের বহিঃপ্রকাশ সময়ের যন্ত্রণাকে
ধারণ করতে অপারগ। এই সত্যটুকু অনুধাবন করতে না পারলে হবে না। কবিতা লেখা। যে কোন কবির
পক্ষেই ব্যক্তিগত আবেগের আবর্ত একটি মৃত্যুফাঁদ। সেই মৃত্যুফাঁদে আটকে পড়েও যদিও অনেকে
জনপ্রিয় কবি হয়ে উঠতে পারেন। সেটি সম্ভব হয়, এক একটি সময়ে জনমানসের উৎকর্ষতার অবনমনের
হাত ধরে। সব যুগেই জনমানসের উৎকর্ষতা সমান থাকবে। এমনটা হওয়ার কথা নয়। হয়ও না। ফলে
এমনও অনেক যুগ সামনে এসে দাঁড়াতে পারে, যখন মাকাল ফলই শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা অর্জন করে।
করে তার বাহ্যিক রূপের কদরে। কারণ বাহ্যিক আড়ম্বরে মজে ওঠার ভিড়ই তখন সর্বব্যাপী ও
সর্বাত্মক হয়ে ওঠে। সেটি বিশেষ কালের দুর্ভাগ্য।
তাহলে, কিভাবে
সময়ের যন্ত্রণাকে তাঁর কাব্যে ধরবেন একজন কবি? এর কোন সর্বজনীন ফর্মুলা হয় না। হওয়াও
উচিত নয়। কবিকে আগে তাঁর সমাজ সমকাল ও সংস্কৃতির অসুখের সাথে পরিচিত হতে হবে সম্যক
রূপে। এই পরিচয় যত গভীর হতে থাকবে। কবির অন্তর্দৃষ্টি ও দিব্যদৃষ্টি দুই তত খুলতে থাকবে।
আর তখনই তাঁর শব্দের আত্মায় তিনি তাঁর সময়ের যন্ত্রণাকে ধারণ করতে সক্ষম হবেন। হবেন
একান্ত নিজের মতো করে। পূর্ববর্তী কোন কবির পদাঙ্ক অনুসরণ করে নয়। বা সমসাময়িক কোন
জনপ্রিয় কবির হাত ধরেও নয়। আর তখনই কবির শব্দের কঙ্কালে তাঁর সময়ের যন্ত্রণা ভাষা খুঁজে
পাবে। সেই ভাষাই শব্দের কঙ্কালের অস্থি মজ্জা হয়ে উঠে কবির কাব্যের আত্মাকে অস্তিত্ববান
করে তুলবে। কবির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জারিত হয়েও সময়ের যন্ত্রণা তাঁর কাব্য শৈলীতে
অনন্য সত্তায় প্রকাশের পথ খুঁজে পাবে। সময়ের যন্ত্রণাকে আপন কাব্যসত্তায় ধারণের এই
হতে পারে প্রশস্ত এক রাজপথ। কিন্তু মনে রাখতে হবে। সেই রাজপথ এক একজনের নিজস্ব পরিক্রমণের
জন্যেই। প্রত্যেক কবির নিজস্ব রাজপথের রূপ রস রকম তাঁর আপন ব্যক্তিত্বের প্রভায় এক
এক রকম হবে। সেখানেই প্রত্যেক কবির স্বাতন্ত্র্য।
কিন্তু কবি
ঠিক কখন তাঁর যুগ যন্ত্রণার সংবেদনকে আপন শব্দের অস্থিতে মজ্জায় ধারণ করতে পারেন? যখন
কবিসত্তার বিস্তৃত ক্যানভাস জুড়ে অনাদী অতীত কথা বলে ওঠে, তখনই। তার আগে নয়। ফলে সময়ের
যন্ত্রণাকে সম্যক উপলব্ধির সাথেই জড়িয়ে থাকে শাশ্বত সময়ের পটে সেই যন্ত্রনার অস্তিত্বকে
খুঁজে পাওয়া। শাশ্বত জীবন সত্যে উপনীত হওয়ার এই এক পথ। না একমাত্র পথ নাও হতে পারে।
কিন্তু অন্যতম এক পথ। সেই পথেই যদি কবি এগোতে থাকেন। তাহলে তাঁর পক্ষেই সম্ভব। নিজ
সময়ের যন্ত্রণাকে সর্বজনীন ভাষ্যে রূপ দেওয়া সাথে সাথেই সর্বকালীন জীবনসত্যের বেদীতে
প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে যাওয়া। তখন আর সেই কবিকে আপন জনপ্রিয়তার জল মাপতে হয় না। গুণতে
হয় না, কবে কোথায় কয়টি পুরস্কার হাতে তুলতে পেরে ছিলেন। গড়ে নিতে হয় না, নিজের একটি
তোষামদকারী গোষ্ঠী। নাম লেখাতে হয় না, কোন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় শিবিরে। মাথা মুড়াতে
হয় না, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বা কোন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সংস্কৃতিতে। এই সমস্ত কিছুর
বাইরে থেকেও একজন প্রকৃত কবির পক্ষেই সম্ভব তাঁর সমযের যন্ত্রণাকে তাঁর সাহিত্যে ধারণ
করে শাশ্বত সত্যে উপনীত হওয়া। এমন নাও হতে পারে। তাঁর সমসাময়িক পাঠক গোষ্ঠী তাঁর কাব্যের
রসাস্বাদন করতে পারছে। এমন নাও হতে পারে। তিনি তাঁর সময়েই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের নগদ পুরস্কার
হাতে তুলে নিতে পারছেন। এমন নাই হতে পারে। তাঁর সামনে অটোগ্রাফ শিকারীর লাইন ক্রমেই
দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। কিন্তু এমন হতেই পারে। সেই কবির কবিতা যুগের পর যুগে মানুষ
নতুন করে তাঁদের সময়ের অসুখকে বুঝতে নতুন করে আবিষ্কার করে চলেছে। যদি তাই হয়। তবে
বুঝতে হবে। সেই কবিই পেরেছেন। এমন কোন শাশ্বত সত্যে উপনীত হতে, যে সত্য বহুদূরবর্তী
সময়কে আলো দেখানোর ক্ষমতা ধরে। আর সেটি সম্ভব হয়েছে। কবি তাঁর সাধনায় সময়ের যন্ত্রণাকে
শাশ্বত সত্যের সাথে মেলাতে পেরেছিলেন ঠিক মতো সামঞ্জস্য করে। সেই সামঞ্জস্যেই জন্ম
নিতে থাকে সার্থক কবিতা। যার জন্য প্রকৃত পাঠকেরা অপেক্ষা করে বসে থাকে। যুগের পর যুগ।
৩১শে শ্রাবণ’
১৪২৭
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

