সময়ের
দর্পণে এসময়ের সাহিত্যচর্চা
“মানুষের ভাষা তবু অনুভূতিদেশ থেকে আলো
না পেলে নিছক ক্রিয়া; বিশেষণ; এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল
জ্ঞানের নিকট থেকে ঢের দূরে থাকে”
--জীবনানন্দ দাশ
অনেক কাল আগেই এই
কথা বলে গিয়েছিলেন কবি। যেসময়ে বলেছিলেন, সেও খুব অদ্ভুত সময় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
দাবানলে পোড়া গন্ধের নির্যাসে মনুষ্যত্বের চরমতম অধঃপতনের সাক্ষী হতে হয়েছিল
সেই মানুষকেই। সে যেন এক মহাকালের সন্ধিক্ষণে পটপরিবর্তনের আয়োজন। তারপর ইতিহাসের পথ
পরিক্রমায় আরও কিছুদূর এগিয়েছে মানবসমাজ। মানুষের সেই ভাষা যে ভাষার কথা বলতে
চেয়েছিলেন
কবি,
সেই ভাষা অনুভূতিদেশ থেকে আলো পাওয়ার সাধনায় অনেক চড়াই
উৎড়াই পেড়িয়ে কিছু না কিছু অর্জন যে করেছে, সেকথা
নিঃসন্দেহেই বলা যায়। তবু আজকের এই একবিংশ শতকের মানবসমাজ আবারও যেন
অনুভূতিদেশ থেকে আলো পাওয়ার বিষয়ে অনেকটাই উদাসীন হয়ে পড়েছে। সমাজের মূল অবিমুখ ঘুরে
গিয়েছে বিশ্বায়ন নামক খুড়োর কলের দিকে। এই সময় জীবনানন্দের ভাবনা চিন্তার দিগন্ত থেকে যে
বহুদূরবর্তী সেকথা বলাই যায়। তাই কবি যাকে বলেছেন এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল, সেই
কঙ্কালই এযুগের ভাষায় বাণী জোগাচ্ছে বলে মনে হয়।
আমাদের বর্তমান সাহিত্য সংস্কৃতি
কাব্যচর্চাও তাই জ্ঞানের নিকট থেকে ঢের দূরে থেকে নিছক ক্রিয়া বিশেষণ
বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার কৌশল আয়ত্ত করার আয়োজনেই বেশি ব্যস্ত। অর্থাৎ কে কতো পণ্ডিত তারই যেন
এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। যেখানে সংবেদনশীলতা আবেগ সজ্ঞানে জ্ঞানের গভীরে ডুব দিয়ে তার
ব্যপ্তি বাড়িয়ে তোলার প্রয়াস ক্রমেই কমতে কমতে বিলীয়মান হয়ে যেতে বসেছে। আমাদের চেতনাও এক
অসাড় জড়পদার্থের মতো বস্তুতে পরিণত হয়ে পড়ছে। যেখানে ঠাসা তথ্যের ভাণ্ডারে কে কত
বলীয়ান, সেই
মাপেই সমাজে মানুষের সামাজিক প্রতিপত্তি ও অবস্থান।
অনুভূতিদেশে থেকে যে আলোর কথা বলেছিলেন কবি, সেই আলোর
জায়গা নিয়ে নিয়েছে তথ্য জমিয়ে রাখার প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনীয়তা।
তাই কার হাতে কত পরিমাণ তথ্য রয়েছে, সেটাই মূল বিচার্য বিষয় এখন। সেই পরিমাপেই
তার ক্ষমতা ও শক্তির মানদণ্ড। এই সহজ কথাটি মানুষ বুঝে গিয়েছে। আর তারপরই মানুষের
অভিমুখ স্থির হয়ে গিয়েছে দৃঢ় ভাবেই। ঠিক এইকারণেই এসময়ের মানুষের ভাষা অনুভূতিদেশ থেকে আলোর
সন্ধানী নয় আর। এসময়ের মানুষের ভাষা তথ্যের সমুদ্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার সন্ধানেই
অধিকতর ব্যস্ত। এবং এটাই বর্তমানে সমাজের চালিকা শক্তি।
ফলত এক অসাড় চেতনার দিগন্তে মানুষ যেন
দিনে দিনে পূর্ব নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম করে রাখা রোবেটের মতোই
একমাত্রিক হয়ে পড়ছে। যার নানবিধ বিষয়ে দক্ষতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু চেতনার উদবোধনে মৌলিক
জ্ঞানের প্রসার অনেকটাই অবরুদ্ধ আজ। এই যে একমাত্রিকতা একদিকে তথ্যের ভাণ্ডার আর
অন্যদিকে সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে সাফল্যের সিঁড়িতে পা রাখার তীব্র প্রতিযোগিতা, এই
একমাত্রিকতাই এই সময়ে মানুষের মূল স্বরূপ। ফলে তারই প্রতিফলন ঘটছে সমাজে। সাহিত্য সংস্কৃতিতে।
আমাদের আচার আচরণে। বিশ্বাসে তর্কে বিতর্কে। সময়ের আয়নায়।
এইসময়ের সাহিত্যচর্চাই হোক আর কাব্যচর্চাই
হোক তাকে বুঝতে গেলে এই সাধারণ প্রেক্ষাপটটিকে মাথায় রাখতে
হবে। চারপাশে আমাদের সাহিত্যবাজারের দিকে ঘুরে তাকালেই দেখা যায়, বই পড়ার
থেকে বই
প্রকাশের ধুম অনেক বেশি। কবিতা নিয়ে আলোচনা সমালোচনার থেকে কবিতাপাঠেই কবিরা
ব্যস্ত। লেখার
থেকেও লেখকের বেশি মনোযোগ সংবর্ধনা সভার প্রতি। কয়টি বই বিক্রী হলো, তার থেকেও অনেক
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লেখকের ঝুলিতে কয়টি পুরস্কার ঢুকলো। লেখকের কতগুলি গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণ
হচ্ছে, সেই
হিসাবের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লেখকের নাম কতবেশি
বার হেডলাইনে স্থান পাচ্ছে। তা সে লেখা বাদ দিয়েও অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন। এতো
গেল লেখকের অবস্থান। পাঠকের অবস্থানও বিশেষ অন্যরকম নয়। সাড়া বছর কয়টি বই পাঠ করলাম, সেটি
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। বছরে কতজন লেখকের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করে লেখকের সাথে তোলা
সেল্ফি সোশাল সাইটে কত বেশি বার পোস্ট করতে পারলাম, সেই তথ্যটুকুই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ও প্রাসঙ্গিক।
এই যে তথ্য ও তার হিসাব, এই দুইয়ের
মধ্যেই পেণ্ডুলামের মতো দুলছি আমরা, এটাই এই একবিংশ শতকের যুগলক্ষ্মণ।
সেই যুগলক্ষ্মণের মূল অভিমুখ কিন্তু মনে রাখতে হবে “আমাকে দেখুন”- এই দিকে। নিজের
দিকে যে যত বেশি ফোকাস টেনে রাখতে পারবে সমাজে তার অবস্থান তত বেশি পোক্ত হয়ে উঠবে। সেই
ফোকাস টানার মাধ্যম নিয়েই যত গণ্ডগোল। রবীন্দ্রনাথ নজরুল জীবনানন্দও নিজের দিকে
ফোকাস টেনে রেখেছেন আজও। কিন্তু তাঁদের মাধ্যমই ছিল অন্য। তাঁদের ভাষা সেই
অনুভূতিদেশ
থেকে আলো পেয়েছিল বলেই কিন্তু তাঁরা আজও তাঁদের দিকে ফোকাস
ধরে রেখেছেন। আরও বহুকাল রাখবেন। কিন্তু আমরা, আমরা যে মাধ্যমে এই ফোকাস নিজের
দিকে টেনে রাখার ইঁদুর দৌড়ে সামিল হয়েছি, সেই মাধ্যম
কিন্তু অত্যন্ত পলকা। অসাড়। এবং ক্ষণস্থায়ী। কেননা তা নিতান্তই কবির কথা মতোই
সেই, নিছক
ক্রিয়া; বিশেষণ; এলোমেলো
নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কালের মতোই নিছক তথ্যসর্বস্ব হিসাবনিকাশ
মাত্র। যার ব্যালেন্সশীট ক্ষণে ক্ষণে অপ্রাসঙ্গিক হতে থাকে সময়ের সাথে সাথেই।
এই কারণেই আমাদের ভাবতে হবে নতুন করে। আমাদের
চলার পথটিই ঠিক, না
কি নতুন করে পথ কাটা শুরু করার সময় এসে গিয়েছে। জ্ঞানের নিকট থেকে
ঢের দূরে অবস্থান করলে বাসি কাগজের মতোই ঠোঙা হয়ে যাওয়ার
মতো দিন গুনতে হতে পারে। তা আমরা লেখকই হই আর পাঠকই হই। আমাদের সাহিত্যচর্চা কাব্যচর্চার
মূল অভিমুখ নিয়ে এই প্রশ্নগুলি যদি আজও আমরা না তুলতে পারি, তবে সে
আমাদের নিজেদেরই
লজ্জা। লজ্জা আরও এই কারণে যে, আমরা সময় থাকতে আমাদের বরেণ্য মনীষীদের বাণী ও কর্মের
দিকে মনোযোগ দিই নি। তাঁরা অনেক আগেই সাবধান বাণী উচ্চারণ করো গেলেও, কান দিই নি
আমরা। এবং আমাদের আরও দুর্ভাগ্য এইখানেই যে, কান দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও বোধ করি নি। চেতনা
আমাদের এতটাই অসাড় হয়ে পড়ে রয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই আএই অসাড় চেতনায় সাড় আসবেই বা
কি করে, কোন
পথে। আনবেই বা কে?
১৩ই কার্তিক’ ১৪২৬
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

