পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী নরমেধ যজ্ঞ ২০১৮ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী নরমেধ যজ্ঞ ২০১৮ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী নরমেধ যজ্ঞ ২০১৮



পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী নরমেধ যজ্ঞ ২০১৮

সহিংস মনোনয়ন পর্বের ১৯টি লাশের রক্তে ভেজা ৩৪ শতাংশ আসনে শাসক দলের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়ের পর ১৪ই মে ২০১৮’র পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিন বেলা ২টো অব্দি সময় সীমায় ভোট গ্রহণের প্রথম সাত ঘন্টার বলি নয় জন রাজ্যবাসী। প্রাচীন কালে ধর্মীয় উৎসবে নরবলি প্রথার প্রচলন ছিল। ব্রিটিশের কাছে পরাধীনতার পর্বে সেই সব বর্বর প্রথার অবসান হলেও, ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পর তাদেরই চাপিয়ে দিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক নির্বাচনের উৎসবে এই রাজ্যে নতুন করে ফিরে এসেছে সেই নরবলি প্রথাই নরমেধ যজ্ঞরূপে প্রচলিত ভাষায় ভোটেরবলি হয়ে। নতুন রূপে নতুন আঙ্গিকে। অনেকেই বলবেন এ আর নতুন কথা কি? ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষের মৃত্যুর ইতিহাস প্রায় সাত দশকের ইতিহাস। অনেকেই বলবেন, সুদীর্ঘ বাম জামানায় প্রতিটি নির্বাচন মিলিয়ে মোট কত মানুষ খুন হয়েছিলেন, সেই হিসাব সম্পূর্ণ পেলে সকলেরই চোখ কপালে উঠে যাবে। তৃণমূলপন্থী অধ্যাপকেরা টিভি চ্যানেলগুলি আলো করে ৩৪ বছরের মৃত্যুর খতিয়ান মেলে ধরবেন। কিন্তু সেই যুক্তিতেই, এই মুহূর্তের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে চলা নরবলির ঘটনার যথার্থ্যতা প্রমাণ করা সম্ভব হয় কিভাবে? এই যদি বুদ্ধিজীবীদের একাংশের যুক্তিবুদ্ধির অবস্থা হয়, তবে গামছা মুখে হাতে বন্দুক নিয়ে সন্ত্রাস করে বেড়ানো গুণ্ডাবাহিনীর যুক্তি কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সারা রাজ্যের বহু বুথেই সকাল থেকে চলেছে অবাধে ছাপ্পা ভোটের গণতান্ত্রিক কার্যক্রম। টিভি ক্যামেরার সামনেই অবাধে শাসক দলের কর্মীদেরকে ব্যালট বক্সের দখল নিয়ে নিতে দেখা গেল দিনভর। কোথাও বা দেখা গেল প্রার্থীকেই বাকিদের হয়ে নিজের নামে ভোটে দিয়ে যেতে একের পর এক। সাংবাদিকের জেরায় তিনি নিজেকে শাসক দলের প্রার্থী বলেই জানালেন অম্লানবদনে। কোথাও হেভিওয়েট নেতার তর্জনগর্জনে বিপক্ষ দলগুলির পোলিং এজেন্টদেরকে বুথের ভিতর থেকে তাড়া করে ভাগিয়ে দেওয়া হলো নির্বাচন কেন্দ্র থেকেই। কোথাও আবার শাসকদলের মন্ত্রীকেই বুথের সীমানার মধ্যে ঢুকে বিপক্ষ দলের কর্মীকে চড় মেরে ভাগিয়ে দিতে দেখা গেল। অন ক্যামেরা বুথের মধ্যে মুখে রুমালবাঁধা গুণ্ডাবাহিনীর বন্দুক উঁচিয়ে তাণ্ডবও দেখতে হলো রাজ্যবাসীকে। শাসকদলের পতাকা শোভিত সেই বাহিনীর সামনে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন বন্দুকধারী নিধিরাম পুলিশকর্মী হাতের বন্দুক কাঁধে ঝুলিয়েই। অনেক বুথেই ভোটারদেরকে বোমাবাজি করে ভয় দেখিয়ে ছত্রাখান করে তাড়িয়ে দিতে দেখা গেল। কোথাও আবার শাসকদলের নেতাকে মুখে রুমাল বাঁধা লাঠিধারীদের নিয়ে শান্তি রক্ষা করতে দেখা গেল। যাতে একটি মাছিও গলে বুথে ঢুকতে না পারে। এক এক জায়গায় আবার ভোটগ্রহণের দুই তিন ঘন্টার মধ্যেই পড়ে গেল একশো শতাংশ ভোট। বেশিও হতে পারে, কিছুই বলা যায় না। বাকি ভোটারদের ভোট দিতে চাওয়ার দাবিতে প্রিসাইডিং অফিসারকে অসহায় হয়ে জানাতে হলো, ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কোথাও প্রাণভয়ে ভোটকর্মীরাই ব্যালট বক্স সহ এম্বুলেন্স ডেকে ভোটকেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করলেন।

না এটাই সর্বিক চিত্র নয়। অনেক জায়গাতেই এমন একতরফা ভোট যে হয়েছে তাও নয়। অনেক জায়গাতেই মানুষের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে ভোট লুঠেরাদের। কোথাও ভোট লুঠ করতে আসা বাইকবাহিনীকে তাড়া করে একাধিক বাইকে অগ্নি সংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় অধিবাসীরাই। গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যুসহ আহত হয়েছে বাইকবাহিনীর দুইজন সদস্যও। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে ব্যালটপেপার সহ সবকিছু ফেলে দেওয়া হয়েছে পুকুরের জলে। কোথাও আবার বুথের ভিতর ঢুকেই কোন রাজনৈতিক কর্মী সমর্থক জল ঢেলে দিয়ে গেলেন একাধিক ব্যালট বাক্সে। কোথাও কোথাও ব্যালট বাক্সই ছিনিয়ে নিয়ে তাতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো।

তবুও এর মধ্যেই একাধিক দলের কর্মী সমর্থক সহ সাধারণ ভোটাদেরও প্রাণ গেল বোমা গুলি বন্দুকের আস্ফালনে। যে যে জায়গায় সন্ত্রাসের ভয়ে মানুষ গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে, সেখানে এর মধ্যেও শান্তিতে ভোটপর্ব চলেছে তবু কিছুটা। কিন্তু যেখানেই মানুষ জোর করে তার গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে নিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াতে গিয়েছে, সেখানেই অবাধে ছুটেছে গুলি বোমা। ঝরেছে তাজা রক্ত। আর মরেছে মানুষ। মানুষের এই মৃত্যুর ভিতর দিয়েই এক সময় শেষ হবে পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮। তারপর জয়ী প্রার্থীদের আবীরখেলা দেখতে হবে রাজ্যবাসীকে। জয়ী দলের নেতানেত্রীরা মানুষের রায় তাদের পক্ষে যাওয়াকে গণতন্ত্রেরই জয় বলে মুখের চওড়া হাসিকে আরও প্রসারিত করবেন। শুরু হয়ে যাবে পরবর্তী নির্বাচন জয়ের ব্লপ্রিন্ট তৈরী করার প্রস্তুতি। এবং মানুষ ভুলে যাবে এতগুলি মানুষের ভোটের বলি হওয়ার বিষয়টিও। পরবর্তী রাজনৈতিক কাজিয়ায় যেখানে পড়ে থাকবে শুধুমাত্র কয়েকটি সংখ্যা। কোন জামানার কোন ভোটে কোন সালে খুন হয়েছিল কতজন। মানুষের পরিচয়ের জায়গা নিয়ে নেবে কতগুলি সংখ্যা মাত্র। পরিসংখ্যানের হিসাবে হারিয়ে যাবে আস্ত আস্ত মানুষগুলির আস্ত অস্তিত্বের ইতিহাস।

এটাই এদেশের গণতন্ত্রের আসল চেহারা। যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোটাই আসল কথা। কে সেই গণতন্ত্রকে কতটা ও কিভাবে বাঁকিয়ে চুরিয়ে পৌঁছিয়ে গেল ক্ষমতার আসনে, সেটা বড়ো কথা নয় আদৌ। পৌঁছিয়ে গেলেই সাতখুন মাফ। কেউ আর কোন কৈফিয়ত দাবি করতে পারবে না। দেখা হবে না নৈতিকতার প্রশ্নও। ভারতীয় সংবিধানও খোঁজ নেবে না কতগুলি মানুষখুনের সিঁড়ি দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এলো একটি দল। নির্বাচনে জয়টাই থাকবে রেকর্ড হয়ে। জয়ের সেই পরিসংখ্যানের উপর আর কোন সত্যই সংবিধান স্বীকৃত নয়। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্র। সমস্ত রাজনৈতিক দলই একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গেলে আর সেই স্বাদের ভাগ দিতে রাজি নয় অন্য কাউকেই।

রাজনৈতিক দলগুলির শ্রেণীচরিত্র মূলত একই। ক্ষমতার পিছনে ছোটার উদ্দেশ্যও সকলেরই এক। রাজকোষের ভাগের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সেই ক্ষমতা একবার পেয়ে গেলে, তাকে ধরে রাখার জন্যেই বাকি সকল কার্যক্রম। এখন প্রশ্ন হলো ভালো কথা, রাজনৈতিক দল তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ীই ঠিক করে নেবে তার রাজনৈতিক কর্মসূচী। ঠিক করে নেবে তার রাজনৈতিক অবস্থানের মাপকাঠিতেই। যে কারণে বিরোধী পক্ষে থাকার সময় আর শাসন ক্ষমতায় থাকার সময় একই রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মসূচী আলাদা হয়ে যায় অনেকটাই। কিন্তু সেটা রাজনীতির বিষয়। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত রাখার মূল দায়িত্ব তো ভারতীয় সংবিধানের। যে সংবিধানের উপরেই গড়ে উঠেছে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় কাঠামো। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলির অভিসন্ধি যাই হোক না কেন, নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার মূল দায় যে রাষ্ট্রের, সেই রাষ্ট্রের ভুমিকাই বা কি? সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্র কি তার কর্তব্যগুলি সঠিক ভাবে করতে পারছে আদৌ? যদি পারে বা পারতো তবে তো এক একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন নরমেধ যজ্ঞ দেখতে হতো না মানুষকে বারবার। এখানেই ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল দুর্বলতা। রাষ্ট্র আর শাসকদলের মধ্যে বস্তুত কোন ফারাক থাকে না বাস্তবের জমিতে। সংবিধানের পাতায় যাই থাকুক না কেন, বাস্তবিক পক্ষে এই যে রাষ্ট্র আর শাসকদলের একাকার হয়ে যাওয়া, এটাই ভারতবর্ষের সংবিধানের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতার জায়গাও বটে। অনেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাতা খুলে, সাংবিধানিক ধারা উপধারা মিলিয়ে অস্বীকার করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু কেন্দ্রে সরকার ও শাসকদল আর রাজ্যে সরকার ও শাসকদল দুইক্ষেত্রেই দল আর রাষ্ট্র একাকার হয়ে গিয়েই বিপত্তি হয় মানুষের। অনেকেই বলবেন তার জন্যেই তো আইন আদালত রয়েছে। প্রয়োজনে সরকারের বিরুদ্ধেও মানুষ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে। ভারতীয় সংবিধানেই আছে সেই সুযোগ। কিন্তু আইন আদালতের শরণাপন্ন হওয়া এক বিষয়, আর গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনে অকাতরে নরবলি হওয়া আর এক বিষয়। যে নির্বাচন এই রকম নরবলি আটকাতে পারে না, প্রশ্ন হলো সেই নির্বাচনের বৈধতা নিয়েই। যে সংবিধান এইসব নির্বাচনকেই বৈধতা দিয়ে থাকে, প্রশ্ন হলো সেই সংবিধানের সম্পূর্ণতা নিয়েই। সংবিধান থাকতে, সাংবিধানিক বিধি বিধান থাকতেও, আইনের কোন ফাঁক গলে এইভাবে নির্বাচনের পর নির্বাচনে নরমেধ যজ্ঞের মধ্যে দিয়ে এক একটি দল নির্বাচনের ফলাফলে জয়ী হওয়ার স্বীকৃতি পেয়ে যায়? বোমাবাজি করে, গুলি করে মানুষ খুন করে, বুথের পর বুথে দখল করে ছাপ্পা ভোট দিয়ে, মানুষকে ভয় দেখিয়ে জোর করে ভোটের লাইন থেকে সরিয়ে দিয়ে, কিংবা ভয়ের আতঙ্কে মানুষকে সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকেই দূরে ঠেকিয়ে রেখে এই যে জয়লাভ, সংবিধানের কোন ফাঁক গলে সেই জয় সংবিধান মোতাবেকই আইনী স্বীকৃতি পেয়ে যায়? ভেবে দেখার সময় এসেছে সেইটিও। শুধু মাত্র কোন একটি দলের উপর সব দোষ চাপিয়ে দিলেই থামানো যাবে না, নির্বাচনী নরমেধ যজ্ঞের এই ধারাবাহিকতার ইতিহাস। এই লজ্জা, ভারতীয় সংবিধানের লজ্জা। এই লজ্জা ভারতীয় গণতন্ত্রেরও লজ্জা।

১৪ই মে ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত