সমস্যা সমাধানে বিকল্প পথের সন্ধান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমস্যা সমাধানে বিকল্প পথের সন্ধান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সমস্যা সমাধানে বিকল্প পথের সন্ধান

 

সমস্যা সমাধানে বিকল্প পথের সন্ধান

লকডাউনের ভারতে নতুন করে ১৫ জন শিল্পপতি বিলিয়োনিয়র হয়ে গিয়েছেন। ঠিক যে সময়ে কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিক কাজ হারিয়ে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় হাজার মাইল পায়ে হেঁটে ঘরে ফিরছিল। সেই একই সময়ে আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়ে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে গেল। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল বছরে দুই কোটি বেকারের চাকরীর সংস্থান করা হবে। ২০১৪ থেকে ২০২০’র সময় সীমায় সেই প্রতিশ্রুতি রাখা তো দূরের কথা, প্রতি বছরে লক্ষ লক্ষ চাকুরিজীবীর চাকরী চলে গিয়েছে। এবং এই একই সময়সীমায় অগ্নিমূল্য হয়ে উঠেছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী। ফলে ২০১৪ থেকে ২০২০তে এসে জীবনধারণের ব্যায় বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ। পক্ষান্তরে আয়ের সংস্থান কমে গিয়েছে পাল্লা দিয়ে। বিগত ছয় বছরে সংক্ষেপে এটাই ভারতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র। দেশে ধনীর সংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা। এবং মনে রাখতে হবে ঠিক একই সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের গুডবুকে থাকা এক একজন শিল্পপতি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে সরকারের নাকের ডগা দিয়ে। ফলে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ভিতই গিয়েছে নড়বড়ে হয়ে। এখন সাধারণ মানুষকে তার মাশুল দিতে হচ্ছে নানাভাবে। স্থায়ী আমানতের উপরে প্রাপ্য সুদের হার কমে গিয়েছে। ব্যাংকে টাকা রাখা ও তোলার উপরে ব্যাংক চার্জ দিতে হচ্ছে। আরও নানার ফন্দি ফিকির করে গুডবুকে থাকা বন্ধুদের ব্যাংক লুঠের মাশুল সরকার আদায় করে নিচ্ছে সাধারণ জনতার কান মুচড়িয়ে। এরই পাশাপাশি চলছে লাভজনক সরকারী সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের গুডবুকে থাকা বেসরকারী শিল্পপতিদের হাতে তুলে দিয়ে দেশকে বিক্রী করে দেওয়ার কার্যক্রম। হ্যাঁ এটাই রামরাজত্ব।


ফলে দেশের ৯৮% সম্পদের মালিকানা থাকছে মাত্র ২% ধনীর হাতে। আর বাকি ৯৮% মানুষের ভিতর জীবনমরণ প্রতিযোগিতার লড়াই চলছে মাত্র ২% সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা অধিকার নিয়ে। ভারতীয় ধনতন্ত্রের এটাই আসল অবস্থান। একশো আটত্রিশ কোটি মানুষের দেশে এর প্রভাব কিরকম সেটি বুঝতে খুব বেশি অর্থনীতির জ্ঞান না থাকলেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এবং এই সবই সম্ভব হয়েছে ধনতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থার সহায়তা নিয়েই। পুরোপুরি সরকারী মদতে। মুষ্টিমেয় লুন্ঠনকারীর হাতে গোটা দেশের সম্পদের আটানব্বই শতাংশই মজুত হয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতির ভিতরেই হঠাৎ লকডাউন করে দিয়ে ঐ ১৫ জন শিল্পপতি। যারা এইরকম অনুকুল পরিস্থিতিতেও বিলিয়োনিয়র হয়ে উঠতে পারছিল না। তাদেরকেও বিলিয়োনিয়র করে দেওয়া হলো। আর আগে থেকেই যারা বিলিয়োনির শিল্পপতি হিসাবে বিখ্যাত ছিল তাদের সম্পত্তির পরিমান এই লকডাউনের সুযোগে প্রায় দেড় থেকে দুইগুন বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছে। যখন কলকারখানা বন্ধ। ব্যাবসা বাণিজ্যে মন্দা। না ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির কোন ম্যাজিকে এটা সম্ভব, সেকথা অর্থনীতির জ্ঞান ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু অর্থনীতির অ আ ক খ না জানলেও এটা বো‌ঝা অসম্ভব নয়, সরকারী মদত ছাড়া এমন ম্যাজিক দেখানো অসম্ভব। ফলে সরকার কাদের বিকাশ করতে ক্ষমতায় এসে পৌঁছিয়েছে। সেটি কিন্তু আজ জলের মতোই পরিস্কার। এবং সরকারের এই ১০০% সাফল্যের পিছনে চৌকিদারের ভুমিকা কতখানি, গবেষণা হতে পারে বরং সেই বিষয়টি নিয়েই। ভুমিকা যাই হোক না কেন। এমন চমৎকার ম্যাজিক কিন্তু একা হাতে হয় না। এর পিছনে অনেক হাতের সম্মিলিত কারসাজি রয়েছে।


জনগণ এই সম্মিলিত কারসাজির যাঁতাকলে পড়ে গিয়ে আজ দিশাহারা। আর তখনই তাদের দিশা ঠিক করে দিতেই রামমন্দির নির্মাণ। গোরক্ষা। গোমূ‌ত্র পানে করোনা দূরীকরণ দিল্লীর দাঙ্গা। সিএএ এনআরপি এনআরসি ইত্যাদি। এবং বহিঃশত্রু হিসাবে পাকিস্তানের পাশাপাশি দ্রুত চীনের উত্থান অত্যন্ত কার্যকারি রেসিপি। ফলে জনগণের দিশা কোন দিশায় বাঁধা থাকবে সেটিও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত হিসাব নিকাশ করে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে বিভক্ত আর দেশপ্রেমের মদে মাতাল জনতাকে যে কোন প্রয়োজনে যখন তখন সাইজ করে রাখা অত্যন্ত সহজ। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর দেশপ্রেমের মদ বিনামূল্যে বিতরণ করা চলছে বিগত ছয় বছর ধরেই। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে। এবং এখানেও যে সম্মিলিত হাতের কারসাজি। সেটি চোখবুঁজেই বলে দেওয়া যায়। ভারতবর্ষকে এই সম্মিলিত হাতের কারসাজি থেকে উদ্ধার করার মতো কোন শক্তিই অবশিষ্ট নাই। সরকারী সকল প্রতিষ্ঠানগুলির মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং সেই সব প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শিবিরের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। বস্তুত স্বাধীনতার পরবর্তী আট দশকে এমন সর্বাত্মক সাফল্য সম্পূর্ণ অভুতপূর্ব।


ফলত এই সময়ের ভারতবর্ষ একেবারেই সেই ডারুইনের মতবাদের অবস্থানে অবস্থিত। সারভাইভাল অপ দ্য ফিটেস্ট। সরকার ২% ধনীর পাশে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আর ৯৮% জনতাকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর দেশপ্রেমের মদে চুর করে রাখছে। যাতে জনতার ঘরে সিঁদ কাটা সহজ হয়ে যায়। এই অবস্থায় সাধারণ জনতা পারস্পরিক হানাহানি লড়াই প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে এইরকম অসহনীয় এক অর্থনীতির বাজারে টিকে থাকার লড়াইতে সামিল হতে বাধ্য হয়েছে। ইতিহাসবিদরা হয়তো মনে করতে পারেন। এই অবস্থা সমাজ পরিবর্তনের প্রাথমিক ও অন্যতম শর্ত। ফলে এই অবস্থা যত সর্বাত্মক ও যত বেশি অসহনীয় হয়ে উঠবে। সমাজ বদলের দিন তত বেশি করে এগিয়ে আসবে। তাদের এই ধারণা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য হলেও। এবং তত্বগত দিক থেকে এই ধারণা সাম্ভব্য পরিণতি বলে মনে হলেও, ভারতবর্ষের মতো একাধিক জাতি ও ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের দেশে এই তত্বের বাস্তব প্রয়োগ কতটা সম্ভব হতে পারে। সন্দেহ রয়েছে সেখানেই। অন্তত ভারতবর্ষের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসেও এর কোন প্রমাণ বা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত নাই। একমাত্র ব্যতিক্রম শশাঙ্ক পরবর্তী বাংলার রাজনীতিতে গোপালের নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা দখল। কিন্তু হাজার বছরেরও বেশি সময়ের আগের অবস্থার সাথে আজকের গোটা ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনীতির পরিস্থিতি এক করে দেখা সমীচীন হবে না বলেই মনে হয়। অনেক জটিল সমীকরণের যোগফলে আজকের এই অবস্থা। সেই অবস্থার বদল কোন একটি একরৈখিক সমীকরণে সম্ভব নয়।


এই অবস্থায় ভারতের বিভিন্ন জাতিগুলি তাদের নিজের মতো করে অবস্থার সাথে মোকাবিলা করার কথা ভাবতে পারে। এক একটি জাতির ভাবনা প্রকরণ জাতিগত ঐতিহ্য স্বভাবতঃই এক এক রকম। এবং জাতির সাধারণ জনগণের শিক্ষাদীক্ষার মানও ভিন্ন জাতির ক্ষেত্রে ভিন্ন রকমের। ফলে একই সমস্যা এক একটি জাতি এক এক রকম ভাবে সমাধানের প্রয়াস করতেই পারে। এটি একটি পথ। সমগ্র ভারত একই রকম ভাবনা ও সমাধানের পথে এগোনোর থেকে এই পথের কার্যকারিতা অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। জাতিগত ভাবে এক একটি অঞ্চলের মানুষ তাদের জাতিগত সংহতির ঐক্যে জাতির সমস্যার সাথে অনেক সহজে মোকাবিলা করতে সক্ষম। কিন্তু সেই মানুষগুলিই সমগ্র ভারতে প্রেক্ষিতে সেই জাতিগত সংহতি অনুভব করবে কি করে? সেটি আকাশ কুসুম কল্পনা। নব্বইয়ের দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মিখাইল গোর্বাচভের সরকার এই সার সত্যটি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়ে ছিল বলেই সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি ঘটেছিল। আজকের ভারতবর্ষ কয়েক জনের লুঠের মৃগয়া ক্ষেত্র। সেটি সম্ভব হয়েছে। ভারতবর্ষ একটি দেশ নয় বলেই। ভারতবর্ষ আসলেই একটি উপমহাদেশীয় রাষ্ট্র। উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ধনতন্ত্রের অবাধ লুঠতরাজের বিরুদ্ধে যুথবদ্ধ জাতীয় সংহতিতে মোকাবিলা করা সম্ভবই নয়। এই সার সত্যটি অনুধাবনের সময় এসেছে আজ। একাধিক ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির জাতিসমূহ নিয়ে এক দেশ এক জাতি গড়ে তোলার প্রয়াস একটি ঐতিহাসিক ভুল। এবং অসম্ভব প্রক্রিয়া। ব্রিটিশের হাতে গড়ে দিয়ে যাওয়া আজকের ভারতবর্ষ সেই ভুলেরই মাশুল গুনছে প্রতিদিন।


এবং ধনতন্ত্র এই ভুলের সুযোগ নিয়েই অবাধে লুঠপাট চালিয়ে যেতে পারছে। প্রতিপক্ষ হিসাবে কেউ সামনে দাঁড়াতে পারছে না। ধনতন্ত্রের প্রতিপক্ষ হিসাবে জাতিগত সংহতির ঐক্য গড়ে তোলা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। কিন্তু ভারতবর্ষের মতো একটি দেশে সেই সংহতি আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। একটি উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামো আর যাই হোক কোন নির্দিষ্ট দেশ জাতি ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে না। ধনতন্ত্রের এই লুঠতরাজের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে নামতে হলে স্বদেশ ও স্বজাতির সংহতির ঐক্যই একমাত্র পথ। আর কোন বিকল্প পথের সন্ধান আমাদের জানা নাই।


৩রা নভেম্বর; ২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত