কবি ও কবিতা এবং পাঠক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবি ও কবিতা এবং পাঠক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কবি ও কবিতা এবং পাঠক



কবি ও কবিতা এবং পাঠক


কাব্য কবিতার কথকতা

মুখের ভাষা আর মননের ভাষা নিয়েই মানুষের ভাষা! মুখের ভাষা হল কাজের ভাষা! প্রয়োজনের ভাষা! বেঁচে থাকবার ভাষা! আর মননের ভাষা হল সৃষ্টির ভাষা! আয়োজনের ভাষা! বাঁচিয়ে রাখবার ভাষা! মুখের ভাষায় ব্যক্ত করি চিন্তার সূত্রকে! আর তার প্রকৃতিকে! প্রচার করি নিজেকে! আর মননের ভাষায় নির্মাণ করি চিন্তার বোধকে! তার গভীর সৌন্দর্য্যকে! এবং আবিষ্কার করি নিজেকে! অর্থাৎ মুখের ভাষায় আত্মপ্রচার আর মননের ভাষায় আত্মপ্রকাশ! প্রয়োজনের সীমায়িত বলয়ে মুখের ভাষার চলাচল! আর জীবনবোধের অসীম বিস্তারে মননের ভাষার কলকল্লোল! মুখের ভাষায় প্রকাশ পায় রোজকার জীবনের চাওয়া-পাওয়া, দেনা-পাওনা, সুখ-দুঃখের গল্প! চেতনার গর্ভে বোধের যে দীপ্তি থাকে প্রচ্ছন্ন, মননের ভাষায় তারই প্রকাশ ঘটে শিল্প- সাহিত্য- সঙ্গীতে! তাই তো কবিতায় কাব্য সাহিত্যে কবিমনের অন্তর্গূঢ় বেদনা সঞ্জাত তাঁর অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির প্রকাশ ঘটে ব্যক্তিগত ঘরানা থেকে নৈর্ব্যাক্তিক বিস্তারে!

এই যে ব্যক্তিগত ঘরানা থেকে নৈর্ব্যাক্তিক বিস্তারে কবির কাব্য চেতনার মুক্তি, এই মুক্তিই সার্থক কবিতা বা  কাব্য সাহিত্যের প্রধানতম শর্ত! অর্থাৎ কবির সৃষ্টি, প্রকাশের পর শুধুমাত্র তাঁর একান্ত আপন থাকে না আর! তাঁর সৃষ্টি তখন  বহুজনের আপন হয়ে উঠল! উঠতে থাকল! এইখানেই কাব্যের মুক্তি!

তাই কাব্যালোচনার মূল বিষয়টিই হল এই মুক্তিকে কেন্দ্র করে! কবির কাব্য কি তাঁরই নিজস্ব সামগ্রী হয়ে থাকল নাকি তা আরো অনেকের ভালোবাসাকেও প্রতিফলিত করতে পারল! অর্থাৎ কাব্যের মধ্যে পাঠক কি শুধুই কবিকে দেখতে পাচ্ছে, নাকি নিজেকেও আবিষ্কার করতে পারছে নতুন করে! কবির ব্যাক্তিত্বের ছায়া থেকে বেড়িয়ে এসে তাঁর কবিতা যখন নিজস্ব কাব্যশক্তির আলোতে দীপ্যমান হয়ে উঠতে পারে তখনই আপামরের হয়ে ওঠে কবিতা! কারণ শেষ পর্যন্ত কবিতা কখনোই কবির আত্মকথা নয়! কবিতার আবেদন সর্বজনীন! সংবেদনশীল পাঠকের চেতনার আলোয় আলোকিত! ঠিক সেই কারণেই বিখ্যাত ফরাসী কবি পল ভ্যলরী বলেছিলেন, "I write half the poem; the reader writes the other half"

কিন্তু কখন সম্ভব হয় এই সাধনা? এই সাধনা তখনই সম্ভব হয় কবি যখন তার নিজস্ব অভিজ্ঞতাগুলিকে দর্শকাসনে বসে একজন নিরপেক্ষ দর্শকের দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করতে পারেন! তখনই তাঁর ব্যক্তিগত নিজস্ব অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যাথা বেদনা বোধের প্রকাশ ঘটে সর্বজনের মধ্যে! সর্বজনীন ভাষায়! আর পাঠক তখনই তার আপন ভালোবাসায় নিজের নিজের জীবন বোধের আলোতে আপন শক্তিতে নতুন করে রচনা করে নিতে পারে কবির কবিতাকে! পল ভ্যালরি তাঁর কথায় এইটাই বলতে চেয়েছিলেন! আর কবি ও তার পাঠকের এই যৌথ উদ্যোগেই একটি কবিতা হয়ে ওঠে স্বয়ং সম্পূর্ণ! এই যে আপন সৃষ্টিকে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে পারা এই শক্তি একজন কবি তখনই অর্জন করেন যখন তিনি তাঁর নিজস্ব অনুভুতির অনুভবে অভিভুত হয়ে বাঁধা পড়ে থাকেন না! সেই বাঁধন কাটিয়ে উঠে নিরাসক্ত চেতনায় বাইরে থেকে যখন নিজেকে Objectively অনুভব করতে পারেন তখনই কবি মুক্তি লাভ করেন ব্যক্তিগত তদাত্মতা থেকে! আর তখনই সার্থক হয় তাঁর সৃষ্টি! রবীন্দ্রনাথের কথায়, "আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া/ বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া!" নিজের মাঝে সেই বিশ্বলোকের সাড়া না পেলে কবির কবিতা তাঁর নিজস্ব দিনলিপি হয়ে আটকা পড়ে থাকে! কবিতা হয়ে ওঠে না. তাই নিজের ব্যাক্তিত্ব থেকে নিজের কবিসত্তাকে মুক্ত করতে হবেই! যেমন ভাবেই হোক!

আর তাই তো বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি টমাস স্টার্ন এলিয়েট বলেছিলেন, "The more perfect the artist; the more completely separate in him will be the man who suffers and the mind which creates."

যদিও কবির জীবন থেকেই তার কাব্যের উদ্ভব, তবুও তাঁর যন্ত্রণার অনুভব এবং সৃষ্টির অনুভবের মধ্যে এই দূরত্ব একান্ত জরুরি, সার্থক কাব্য সৃষ্টিতে!

এইভাবেই একজন সমাজ সচেতন শিল্পী তার চারপাশের বহতা সময়ের দ্বিধা দ্বন্দ্ব দহনকে উপলব্ধি করবেন এবং তার প্রকাশমাধ্যমে আভাষিত করে তুলবেন এটাই প্রত্যাশিত! সেই দ্বিধা দ্বন্দ্ব  দহন, মানব মনের ভাব ভাবনা ভালোবাসাকে কীভাবে ভাঙ্গে গড়ে, কী ভাবে সেই ভাঙ্গাগড়ার খেলায় সাতপাকে বাঁধা পড়ে ঐতিহ্য আর আধুনিকতা, সেই অভিজ্ঞতা আর অভিজ্ঞতালব্ধ প্রত্যয়গুলিই কবি-মানসের শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করে তোলে! আবার শিল্পীর হৃদয়ে সাত সমুদ্র কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে এক জীবন অভিজ্ঞতা এবং নিরবধি কালচেতনায় সুস্পষ্ট চিন্তার সারবত্তা থাকলে তবেই একজন কবির জন্ম হয়! এই চিন্তাধারারই প্রসূন কবি জীবনানন্দের সেই অমোঘ মন্ত্র; "সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি!"

কবিতার বিভঙ্গে শব্দ নির্বাচনে, বাক্যবিন্যাসে, ছন্দের মাত্রার তারতম্যে কবিতার অভ্যন্তরীণ স্বরে সুরারোপ করেই পৌঁছে যেতে চান কবি পাঠকের চেতন অবচেতন মনের গহন গভীরে! যে কোনো কবির পক্ষেই এই প্রয়াস বহু দিনের বহু সময়ের সচেতন সাধনায় ফলপ্রসূ হয়!

এই ভাবেই সময়েরই হাতে হাত রেখে অভিজ্ঞতার পর অভিজ্ঞতার গাঁথনিতে গড়ে উঠতে থাকেন কবি নিজে, তার কাব্য সৃষ্টির সমান্তরালে! এবং এই ভাবেই কবি আমাদেরকে মহাকাল আর মহাজীবনের সঙ্গে সংলগ্ন করে রাখেন তাঁর কাব্যধারার মধ্যে দিয়ে! বর্তমানের অনুভবে অতীতের স্মৃতি-বিধুর অভিজ্ঞতা আর ভবিষ্যতের স্বপ্নিল কল্পনা –

এই দুইয়ের মেলবন্ধনে আমাদের চেতন অবচেতন মননের আঙিনায় কবির কবিতাই আমাদেরকে উদ্বোধিত করে জীবনের রামধনুতে! কবিতাই পারে জীবনবোধের গভীরতায় সুস্পষ্ট জীবন প্রশ্নের অভিমুখী করে গড়ে তুলতে আমাদেরকে! আর তখনই আমাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকা, জীবনের প্রতিটি ছোটোবড় ঘাতপ্রতিঘাত, আমাদের আমিত্বগুলি অর্থবহ হয়ে ওঠে!

তাই কবিতা শুধুমাত্র ছন্দের নুপুরনিক্কন নয়! কবিতা নয় কেবলমাত্র কাব্যতত্বের বিস্তার! কিংবা ভাষাশৈলীর সুরবিহার! কবিতা আসলে আমাদের প্রতিদিনের জীবন যাপনেরই গভীরতম সংঘটন! তাই কবিতাই আমাদের বেঁচে থাকার আশ্বাস! পূর্ণতার ভরসা! ভালোবাসার দৃপ্ত প্রত্যয়! সৌন্দর্য্যের সোপান! বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক OCTAVIO PAZ কবিতা প্রসঙ্গে তাই বলেছেন;

"I think the mission of poetry is to create among people the possibility of wonder; admiration; enthusiasm; mystery; the sense that life is marvelous. When you say life is marvelous; you are saying a banality. But to make life a marvel -- that is the role of poetry."


কবিতার মুহূর্ত

কখন আসে কবিতার মুহূর্ত? কি ভাবে আসে? সব কবিতাই কি কোন না কোন কবিতার মুহূর্তের অনুপম উদ্ভাসন? ফরমায়েশি কবিতার জন্মও কি হয় না? এইসব প্রশ্নগুলিই সম্প্রতি মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এক এক জন কবির কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, নিশ্চিত ভাবেই এক এক জন কবির উত্তর এক এক রকম হবে সন্দেহ নাই। এইখানে আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসতে পারে, এই যে কবিতার মুহূর্ত- সে কি দূর্লভ না সুলভ? যাঁরা প্রচুর কবিতা লেখেন, তাঁরা কি এক প্রবাহমান কবিতার মুহূর্তের মধ্যেই বাস করেন? নয়তো এত বেশি পরিমাণে কবিতার সৃষ্টিই বা হয় কি করে? আবার সঙ্গে সঙ্গেই আরও একটি যুক্তি মনের কোনে শান দিতে থাকে। মুহূর্ত মানেই তো ক্ষণিকের আয়ু। না কি বড়ো বড়ো কবিদের সৃজনশীল মননে ক্রমাগতই উদ্বোধিত হতে থাকে কবিতার এক একটি অম্লান মুহূর্ত?

মনে হয়, যে কবির সংবেদনশীলতার অনুভবের বিস্তার ও গভীরতা যত বেশি, তাঁর ক্ষেত্রেই হয়তো এই অম্লান মুহূর্তগুলি তত বেশি ঘন ঘন আসে। আর আসে বলেই, তাঁর এক একটি লেখনীর প্রত্যয় এত বেশি সংখ্যক মানুষকে এত বেশিবার করে আন্দোলিত করে। আর করে বলেই আমরা বারবার তাঁদের কাছে ছুটে যাই। এইখানেই হয়তো তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের ভিত। অর্থাৎ কবিতার যে মুহূর্ত নিয়ে কথা বলছিলাম, এই অম্লান মুহূর্তগুলির পশ্চাতে অবশ্যই রয়েছে কবির সংবেদনশীল অনুভবের এক একটি মহাদেশ। এই সংবেদনশীলতা ছাড়া কবিতার কোন অম্লান মুহূর্তের উদ্ভাসন সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। এবং এইখানেই বড়ো কবি আর সাধারণ কবিদের মধ্যে পার্থক্য। বিশ্বসাহিত্যের পাঠ নিতে গেলেই আমরা মুখোমুখি হই এই সত্যের।

ভাবা যাক সকল মহাকবিদের কাছেই এই আর্জি নিয়ে যাওয়া হল, বলতে হবে তাঁদের; এক একটি বিশ্ববিখ্যাত কবিতার সৃষ্টির অন্তরের সেই কবিতার মুহূর্তের কথাগুলি। যে কবিতাগুলি যুগ যুগ ধরে পাঠককে বিমোহিত করে রেখেছে। এক এক কাল তার নিজস্ব মূল্যবোধে যে কবিতাগুলিকে আবিষ্কার করেছে নিজের মতো করে। যে কবিতাগুলির মধ্যে দিয়ে উদ্বোধিত হয়েছে কোন না কোন বিশ্বসত্যের। যে কবিতাগুলি পরবর্তী সাহিত্যধারার ভিত তৈরী করে দিয়ে গিয়েছে। সেই সব কবিতার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা কবিতার মুহূর্তগুলির গল্প যদি শুনতে পেতাম আমরা? যদি ধরে রাখা যেত সেই গল্পগুলিও কবিতার সাথে সাথে। কবির কবিতাগুলির পাশাপাশি! কেমন অভিজ্ঞতা হতো পাঠকের?

অনেকেই আমরা চমকে যেতাম হয়তো। অতি পরিচিত অতি ব্যবহৃত কবিতার আড়ালের অবগুন্ঠিত সত্যের আচমকা আবির্ভাবে। অনেকেরই হয়তো অসুবিধে হতো নিজের জানার সাথে কবির জানা মিলেই নিতে গিয়েই। অনেকেরই সামনে হয়তো খুলে যেত অতি পরিচিত কবিতারই নতুন এক মহাদিগন্তের অনেকান্ত রূপরেখা। আবার অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলতেন এই বলে যে এতে কবিতার অভ্যন্তরীণ যে শক্তি এক এক জন পাঠকের মননশীলতায় এক এক রকম ভাবে জায়মান হয়ে ওঠে; সেই শক্তিটিই হয়তো হারিয়ে যাবে। কবিতার নেপথ্যের এই অবগুন্ঠিত কবিতার মুহূর্তের প্রকাশ্য আবির্ভাবে। কেননা তখন কবির বলে দেওয়া অনুষঙ্গটিই হয়তো কবিতাকে ছাপিয়েই দাঁড়িয়ে যাবে অটল অনড় হয়ে। আর সেই দৃঢ় কাঠোমোটুকুই পড়ে থাকবে পাঠকের হাতে। হারিয়ে যাবে কবিতার মায়াজাল। যে মায়াজালে পাঠক আশ্রয় পায় তার ভালোলাগা কবিতার কাছে। যে মায়াজালে পাঠক বিশ্রাম পায় তার ভালোবাসার কবিতার কাছে। যে মায়াজালে পাঠক শক্তি পায় তার প্রিয় কবিতার থেকে

অর্থাৎ সব সত্যটুকুই জানা হয়ে গেলে আর যেমন সেই বিষয়ে নতুন কিছুই আবিষ্কার করার উন্মাদনা অবশিষ্ট থাকে না, ঠিক তেমনই হয়তো কবিতার সাথে কবিতার নেপথ্যে থাকা কবিতার মুহূর্তের এই গল্পগুলিও জানা হয়ে গেলে, সেখানেই হয়তো থেমে যেতে পারে কবিতার চলন। কবিতার গতি। ঠিক এমনটিও ভাবতে পারেন অনেকেই। কবিতার প্রবাহমান কালোত্তীর্ণ ধারায় পড়ে যেতেও পারে অন্তিম যতিচিহ্ন।  কবিতার পাঠকের কাছে সে তো এক গভীর দুঃসময়। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে কবিতার গবেষকের কাছে খুলে যেতে পারে নতুন এক বড়ো দিগন্ত। উন্মোচিত হতে থাকবে কবি আর তার কবিতার মধ্যেকার নিবিড় সম্পর্কের রসায়নগুলি। যে কোন সাহিত্য গবেষকের কাছে সে এক আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের মতই স্বপ্নময়!

কিন্তু এতো গেল পাঠকের কাছে কবিতার মুহূর্তের অভিঘাত কেমন হতে পারে সেই কথা। আবার সব পাঠকের কাছেই যে এক রকম অভিঘাত হবে বিষয়টি আদৌ সেরকম নয়। এক এক জন পাঠক এক এক ভাবে বেজে উঠবেন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কি ভাবে সৃষ্টি হয় এই কবিতার মুহূর্তগুলি? যে মুহূর্ত এক এক জন কবির অন্তরে এমন কিছু অভিঘাতের জন্ম দিয়ে যায়, যা থেকে সৃষ্টি হয়ে ওঠে সাহিত্যের এক একটি অম্লান সম্পদের? আগেই দেখানো হয়েছে কবির সংবেদনশীলতার বিস্তার ও গভীরতার উপরেই নির্ভর করে কবিতার মুহূর্তের জন্ম হওয়া। কবি তার পরিপার্শ্বের প্রবাহমান জীবনযাত্রার বিভিন্ন অনুষঙ্গগুলির সাথে কি ভাবে সংলগ্ন থাকবেন, সেটি এক এক জন কবির কাছে এক এক রকম হতেই পারে। কিন্তু সময়ের সাথে এই সংলগ্ন থাকা এবং সেই থাকার মধ্যে মানবিক সংবেদনশীলতার আধারেই তৈরী হয়ে উঠতে পারে কবিতার এক একটি অনুপম মুহূর্তের। যে মুহূর্তগুলি কবির মননশীলতায় সৃজনশীলতার ঢেউ তোলে। যে ঢেউগুলি কবির জীবনবোধে পরিপুষ্ট হয়ে কবির কালচেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে আবহমান জীবনপ্রবাহের সারসত্যে। আর তখনই জন্ম হতে থাকে এক একটি চিরকালীন কবিতার। যে কবিতার মধ্যে আশ্রয় ও বিশ্রাম পাবে পাঠক। যে কবিতার মধ্যে শক্তি অর্জন করতে পারবে পাঠক তার মানবিক মূল্যবোধের দিগন্তে। যে কবিতার মধ্যে স্বাক্ষর রাখবেন কবি বিশ্বসাহিত্যের। এইখানেই কবিতার মুহূর্তের অম্লান মূল্য

পাঠক হিসাবে আমরা সেই মুহূর্তের খোঁজ করি আর না করি, তাতে কিছুই যায় আসে না। যায় আসে না আমাদের। যায় আসে না বিশ্বসাহিত্যের। যায় আসে না কবির নিজেরই। কেননা ততক্ষণে সেই দুর্মূল্য কবিতার মুহূর্তের অভিঘাতে কবির বীণায় জেগে উঠেছে সেই বাণী, যে বাণী পথ দেখাবে যুগে যুগে। যে বাণী ভিত তৈরী করে দেবে যুগান্তরের। যে বাণীর আশ্রয়ে পাঠক নিশ্চিন্ত হবে কালে কালে। যে বাণীই সাহিত্য হয়ে উঠে ধরে রাখবে সভ্যতার আয়ুধকে। ধারণ করবে মানবিক প্রত্যয়কে সাহিত্যের মূল্যে। সাহিত্যের শ্রীতে।


কবির অভিপ্রায়

কবিতা লেখেন ভালো কথা। কিন্তু কবিতাই বা কেন? কি হয় কবিতা লিখে? কি পান? আনন্দ! তৃপ্তি! মুক্তি! অর্থ! খ্যাতি! পুরস্কার! যাই পান না কেন, এইগুলিই কি তবে একজন কবির কবিতা লেখার মূল অভিপ্রায়? এই সব স্বপ্ন বলুন আশা বলুন উদ্দেশ্য বলুন, সেগুলির দিকে তাকিয়েই কি কবিতা লিখবেন একজন কবি? অর্থাৎ কবির অভিপ্রায় বলতে আমরা কি এই সব বিষয়গুলিই বুঝে নেব? নাকি এইসব কিছুর বাইরেও কবির কোন অভিপ্রায় থাকতেও পারে? এইসকল বিষয় নিয়েই সম্প্রতি হয়ে গেল কবিতাউৎসব আয়োজিত পাক্ষিক কবিতাউৎসব লাইভের বিগত অধিবেশন। কানাডা নিবাসী কবি মৌ মধুবন্তীর সঞ্চালনায় ও প্রধান অতিথি বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং অন্যনিষাদ কবিতাপত্রের সম্পাদক শ্রী ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে জমে উঠেছিল সমগ্র আলোচনাচক্র। কবিতার নির্মাণ ও কবির অভিপ্রায় নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর উপস্থাপনায় যোগ দিয়েছিলেন দুই বাংলার বেশ কয়েকজন তরুণ কবি। নানান মত ও বিতর্ক উঠে এসেছিল বক্তাদের সুচিন্তিত বক্তব্যে

অধিকাংশ বক্তার বক্তব্যে একটি বিষয় খুব সুস্পষ্ট ভাবেই উঠে এলো যে, কবির অভিপ্রায়ের ধরণ ধারণ সদা পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ বিগত শতকের কবির অভিপ্রায়ের মানদণ্ডে বর্তমান শতকের কবির অভিপ্রায় বিচার করতে গেলে বিরাট ভুল হয়ে যাব। যুগপরিবর্তনের সাথেই সমান্তরাল ভাবে সতত পরিবর্তনশীল কবির অভিপ্রায়। এইখানে একটি কথা স্পষ্ট করে নেওয়ার দরকার আছে, ব্যক্তি বিশেষে কবির অভিপ্রায় যে ভিন্ন হবে সেকাথা নিয়ে কোন বিতর্ক নাই। বিতর্ক শুধু, এক কালের কবির অভিপ্রায়ের ধারার সাথে অন্য কালের ধারার প্রকারভেদ নিয়েই। কিন্তু সেখানেও একটি কথা থেকেই যায়। সতত পরিবর্তনশীল যুগপ্রবণতার মাঝেও যদি শাশ্বত কবিমনের নোঙর না থাকে, তবে কবির কবিতা, তার সৃষ্টি কি কালোত্তীর্ণ হয়ে বহু যুগের মানুষকে আশ্রয় দিতে পারে?  আমাদের ভাবতে হবে ঠিক এই জায়গাটি থেকেই

অনকেই বলবেন, আজ আর কালোত্তীর্ণ নয় কিছুই। সব কিছুই নগদ মূল্যে নগদ বিদায়। দুই যুগ আগের কাব্যধারাই আজকের সাহিত্যের মাপকাঠিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছে যেখানে সেখানে শাশ্বত কবিমন বলে আর কিছু সম্ভবই নয়। সবটাই, সবকিছুই যুগধর্মের সংঘটন। আজকের কবিতা আজকেরই যুগের। আগামীকালকের কবিতায় থাকবে না আজকের ছায়পাত। থাকলে সে তো থেমেই যাওয়ার নামান্তর হবে। সাহিত্য কোনদিনই একজায়গায় স্থির নয়। সাহিত্য গতিশীল। নদীর মতোই এক পার ভেঙ্গে আর এক পার গড়ে নেয়। তাই সাহিত্যের সত্যি যুগধর্মের সত্যি। সাহিত্যের অভিপ্রায় যুগধর্মের অভিপ্রায়। সাহিত্যের মূল্য যুগধর্মের মূল্যেই। এমনটাই বলতে চান অনেকে। বলছেন অনেকেই। সেইরকম বিশ্বাস থেকেই এগিয়ে চলেছেন আজকের কবি সাহিত্যিক এবং পাঠক

কিন্তু সেটাই কি শেষ কথা? ধরে নেওয়াই যাক, সেটাই শেষ কথা। তাহলে এটাই ধরে নিতে হয়, সেটা শুধুই শেষ কথা নয়। সেটাই শাশ্বত কথা। না হলে পরবর্তী যুগধর্মের কথাও যদি পাল্টে যায়? তবে তো বেশ মুস্কিলই! তবে দেখা যেতেই পারে কবি যেমন বলেছিলেন, ‘শেষ কথা নাই, শেষ কথা কে বলবে’। কিন্তু আজকের কবিকুল যদি যুগধর্মের দোহাই দিয়ে যুগসত্যকেই শেষ কথা বলে প্রতিপন্ন করতে উঠে পরে লাগে, তবে তাদের সম্মানার্থেই আমাদের ধরে নিতে হয়, সেটাই শাশ্বত সত্য। আর তখনই আমরা বুঝতে পারবো সাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিটি যুগই তার যুগধর্মকেই, তার সময়ের যুগসত্যকেই শেষ কথা বলে ভুল করে থাকে। ব্যতিক্রম কালো্ত্তীর্ণ কবি সাহিত্যিক। তাদের সাহিত্যজীবন পরিক্রমা করলে দেখা যাবে, তাদের বিশ্বাস ঠিক এই রকম একরৈখিক ছিল না ইতিহাসের কোন পর্বেই।

তারা বিশ্বাস করতেন, প্রতিযুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য তার যুগধর্মকে ধারণ করেই তার সময়ের যুগসত্যকে উপলব্ধি করেই আবহমান কালচেতনার প্রতিভাসে জীবন জিজ্ঞাসার নবনব দিগন্ত উন্মোচন করে তোলাকেই সাহিত্যের সত্য বলে স্বীকার করে এসেছে। এখানেই সাহিত্যের গতি। আবার এখানেই সাহিত্যের নোঙর। নোঙর এই গতিতেইনোঙর এই সত্যতেই। নোঙর এই সাহিত্যবোধেই। সেটা থেমে যাওয়া নয়। অফুরন্ত গতির উন্মাদনায় নিরন্তর এগিয়ে চলার শক্তি। এই বোধটুকু আজ আমাদের চেতনায় যদি অসার হয়ে যেতে থাকে, তবে সময় এসেছে সেই বোধকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার। নতুন করে প্রাণসঞ্চার করার।

তেমনই কবির অভিপ্রায় বিভিন্ন কবিরর কাছে বিভিন্ন হলেও তার মধ্যে একটি আবহমান ধারা আছে। সেই ধারাটুকু সতত পরিবর্তনশীল যুগধর্মের সাথে কোন না কোন ভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেও আবহমান গতিধারার প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। এটাই তার অন্তর প্রকৃতি। শাশ্বত প্রবণতা। যা যুগধর্মের সাথে পাল্টিয়ে পাল্টিয়ে যেতে থাকে না কখোনই। আর সেই কারণেই আজও মহাকাব্যগুলি আমাদের জীবন জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে নিরন্তর প্রাসঙ্গিক। আজও কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিককুল আমাদের চেতনায় সমান ভাবে আধুনিক। আজও কালোত্তীর্ণ সাহিত্য মানেই যুগচেতনার আঁতুরঘর। এইযে বিভিন্ন যুগের পরিবর্তনশীল যুগপ্রবণতাকে ছুঁয়ে যেতে পারা, এটাই কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের প্রাণভোমরা। আর আমরা বলতে চেয়েছি, সেটাই কবির অভিপ্রায়ের অন্যতম এক মহাদিগন্ত।

কবির অভিপ্রায়। না নেহাৎই আনন্দও নয়, নয় খ্যাতির মোহ, নয় পুরস্কারের লোভ, নয় ধনোপার্জন; এগুলির কোনটিই কবির অভিপ্রায় হতে পারে না। হয়ও না কোনদিন। অনেকেই প্রতিবাদ করতে পারেন। নানান দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে। বিশেষ করে বর্তমান যুগের নেট বিপ্লবের হাত ধরে চটজলদী লাইক ও কমেন্টের জয়মাল্য অর্জনের যুগে। আমরা শুধু বলবো, কবির কথাই ধার করে, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। হ্যাঁ আমাদের আলোচনার বৃত্ত কবিমানসিকতার দিগন্তেই থাকুক সীমাবদ্ধ। সেখানেই আমরা বুঝে নিতে চাইবো কবির অভিপ্রায়ের মূল স্বরূপটি। কেন কবিতাই বা লিখতে যান একজন কবি? ব্যক্তি বিশেষের স্বাতন্ত্রতা ধরে নিয়েও বলা যায়, মূলত মুক্তির আনন্দ পেতেই প্রাথমিক ভাবে কলম ধরেন একজন কবি। কিন্তু কিসের মুক্তি? কেনই বা মুক্তি? প্রশ্ন করলে স্বভাবতঃই মিলতে পারে বিভিন্ন রকম উত্তর। মিলবেও নিশ্চয়ই। আর সেই সব নানান রকমের উত্তরের বিভিন্নতার মাঝখান থেকেই অনুভবি চেতনায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়ে ওঠে মুক্তির একটি সাধারণ রূপের। আমার পরিপার্শ্বের নানার বিক্ষুব্ধ উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে থেকে যে আমি প্রতিদিন নিজস্ব ব্যক্তি সত্ত্বার সীমায়িত অস্তিত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকি, সেই বদ্ধতা থেকে মুক্তি। আমার আমি’র কবি কথিত ‘ক্ষুদ্র আমির’ থেকে মুক্তি। কবিতাই একজন কবির কাছে সেই মুক্তির রাজপথ হয়ে উঠতে পারে। আর সেটাই হয়ে উঠতে পারে কবির অভিপ্রায়। প্রতিদিনের অভ্যস্ত ও ব্যতিব্যস্ত জীবনযাপনের পরতে পরতে যে বদ্ধতা, সেই বদ্ধতা থেকেই কবিতার হাত ধরে বা শিল্পসাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের হাত ধরে নানান অনুষঙ্গ বা প্রকরণের রূপরেখায় সৃজনশীল মনন যে মুক্তির দিশা খুঁজে পায়, সেই খুঁজে পাওয়াটিই হয়ে উঠতে পারে কবির কাছে তার একান্ত অভিপ্রায়। সেটিকেই আমরা ধরে নিতে পারি কবির অভিপ্রায়। আর তখনই আমরা বুঝতে পারি, যারা সতত পরিবর্তনশীল যুগধর্মের কথা বলে কবির অভিপ্রায়ের মধ্যে শাশ্বত কোন সত্যরূপ অনুভব করতে পারেননি, সেটা তাদের দুর্ভাগ্য।

আমরা আগেই দেখিয়েছি, কবির কথার সূত্র ধরেই; মুক্তির এই আনন্দ বস্তুত ‘ক্ষুদ্র আমি’র’ থেকেই মুক্তি। কিন্তু মুক্তি কোথায়? কবির কথাতেই আবার বলতে হয়, ‘বৃহৎ আমি”-তে। এইখানেই কবির অভিপ্রায়ের আরেক দিগন্ত। সকল যুগেই সমান সত্য। বিভিন্ন যুগধর্মের আলোতেও সমান অভীষ্ট। আর সেটাই হচ্ছে সংয়োগের অভিপ্রায়। নিভৃতচারী কবিমন নিজস্ব নিরালার একান্ত নিজস্ব সৃষ্টিকেও নিজের কাছে আবদ্ধ করে রাখতে পারেন না। গর্ভবতী নারী যেমন পারে না একান্ত আত্মজকে আপন গর্ভের নিশ্ছিদ্র আশ্রয়ের নিবিড় আদরে ধরে রাখতে চিরকাল। মুক্তি তো দিতেই হয়। কবিও তাই মুক্তি না দিয়ে পারেন না, তার সৃজনশীলতায় সৃষ্টি করা একান্ত আত্মজকে। তার এক একটি কবিতার মধ্যে দিয়েই তাঁকেও ঠিক একই ভাবে মুক্তি দিতে হয় তাঁর একান্ত কবিমনকে। কারণ কবি চান তাঁর নিজস্ব একান্ততা থেকে মুক্তি। সেই মুক্তির পথরেখায় তিনি চান সংযুক্ত হতে বিশ্বমানবাত্মার সাথে। আবহমান কালের ক্যানভাসে। তাঁর কবিতার সৃজনশীলতায় তাই তিনি সংযুক্ত হতে চান বিশ্বচেতনার সাথে। খ্যাতি নয়, পুরস্কার নয়, ধন নয় সম্পদ নয়, একজন প্রকৃত কবির এইটিই মূল অভীষ্ট। এই যে সংযোগের অভিপ্রায়, বিশ্বমানবাত্মার সাথে, বিশ্বচেতনার আবহমান কালের প্রেক্ষাপটে; হ্যাঁ যে কোন প্রকৃত কবির এইটিই মূল অভিপ্রায়। এই অভিমুখ থেকেই মূলত তিনি কলম ধরেন। সে তিনি যে যুগধর্মের বা যে যুগসত্যেরই ধারক বাহক হন না কেন। আবহমান মানবজীবনের এই হলো সাহিত্যের ইতিহাস। কবিতার ইতিহাস। যুগ আসে যুগ যায়। এক এক যুগসত্য, জীবনসত্যের নবনব দিগন্তকে উন্মোচিত করে দিয়ে যাবে। কবিতার ধরণ ধারণ রকম ফেরের নানান রকম বদল হবে, হতেই থাকবে। কিন্তু সব কালেই সব দেশেই কবির অভিপ্রায়ের মূল সত্য আবহমান কালচেতনায় ঐ মুক্তি ও সংযোগের অভিপ্রায়কেই সার্থক করে তোলার প্রয়াসে নিবিষ্ট থাকবে। বলতে পারি এটাই কবির ও কবিতারও ধর্ম। একদিকে মুক্তি আর একদিকে সংযোগ। ব্যক্তিগত তদাত্মতার থেকে নৈর্ব্যক্তিক সত্ত্বায়। সেখানেই কবির অভিপ্রায়ের নোঙর।


কবিতার নির্মাণ

আবেগ ও ভাবালুতার সমন্বয়ের কাব্যিক প্রকাশ হলেই যে কবিতার সৃষ্টি হয় এমনটা বোধহয় নয়। যদিও আমাদের মধ্যে অনেকেই অনেকটা সেইরকমই মনে করে বলতে চান যে, কবিতা মূলত আবেগেরই উৎসরণ। এবং আবেগের ধরণই হলো স্বতঃস্ফূর্ততা। তাই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের মুক্তিই কবিতার প্রাণ শক্তি। এমনটাই ধারণা করেন অধিকাংশ কাব্যমোদী মানুষ। বিশেষত আমাদের দেশের লোকসাহিত্যের দিকেও যদি তাকাই, অনেকটাই সমর্থন পাওয়া যায় সেই কথারই। পাঁচালী কথকতা কবির লড়াই পল্লীগীতি ইত্যাদি সমস্ত কিছুর মধ্যেই এই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের যে বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, সেই প্রকাশেই সাধারণত মজে থাকেন দেশের অধিকাংশ জনসাধারণ। ফলে নাগরিক সমাজেও সাধারণ ভাবে কাব্যপ্রেমীদের ভক্তি ও ভালোবাসা সেই আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসরণের অভিমুখেই যে হবে সে কথা বলাই বাহুল্য। এবং হয়ও। আর সেইখান থেকেই গড়ে ওঠে সহজবোধ্য কবিতা ও দূর্বোধ্য কবিতার দুই শ্রেণীবিন্যাস। যে কবিতা সহজেই বোঝা যায়, সহজেই যে কবিতার বলার কথাটি পাঠক বা শ্রোতার মনে একটি ছাপ ফেলতে পারে, কবিতার বিষয়বস্তুর সাথে পাঠক খুব সহজেই একাত্মতা অনুভব করতে পার, সেই কবিতাই তো সুবোধ্য কবিতা। কিন্তু যে কবিতা পড়ে প্রথমেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়, প্রতিটি লাইন এক একটি ধাঁধার মতো লাগে সেই দূর্বোধ্য জটিল কবিতার মধ্যে স্বভাবতঃই পাঠক কোন আনন্দ খুঁজে পান না। পান না মানসিক সখ্যতা। ফলে দূর্বোধ্য কবিতার থেকে পাঠক সাধারণ নিয়মেই যে অনেকটাই দূরবর্তী থাকতে চাইবেন, স্বস্তি বোধ করবেন সেকাথাও বলাইবাহুল্য। অনেকটা যেন সেই মেইনস্ট্রীম বাণিজ্যিক সিনেমার জনপ্রিয়তার পাশে পড়ে থাকা আর্ট ফিল্মের মতো অবস্থা

এই যে বিশ্বাস, কবির ভাবাবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসরণ মানেই কবিতা, মূলত এই ধারণার বশবর্তী হয়েই অধিকাংশ কবিযশপ্রার্থীরই মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে, সত্যই কবিতা লেখা বিশেষ কোন কঠিন কাজ নয়। ভাষার ওপর একটু স্বচ্ছন্দ চলাফেরা থাকলেই ছন্দতালকে একটু ধরতে পারলেই কবিতার পর কবিতা লিখে ফেলা যায়। এবং তারা লিখেও ফেলেন। বিশেষ করে এই নেটবিপ্লবের সুফলে তাদের এই প্রয়াস বর্তমানে যে বাড়তি মাত্রা পেয়ে গিয়েছে সেকথা বিতর্কের অবকাশ রাখে না। যার প্রমাণ চারিধারে প্রতিদিন জমে ওঠা কবিতার স্তূপ। এ যেন অনেকটা সেই একটু গীটার বাজাতে শিখে গেলেই গলা ছেড়ে হাঁক দিলেই গায়ক হয়ে ওঠার মতো বিষয়। না এই কবিযশ প্রার্থীদের নিয়ে বা গীটার বাগিশদের নিয়ে আমাদের কোন সমস্যা নাই। প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে আমরা সবসময়। কিন্তু আমাদের সমস্য হলো, যে কথাটির সূত্র ধরে শুরু করেছিলাম; সত্যই কি ভাবাবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসরণই প্রকৃত কবিতা? না কি প্রকৃত কবিতা অন্য কিছু। যে কোন কালেই সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলেই দেখা যায়, সমকালে সেই সেই কবিতাই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যে সকল কবিতার মধ্যে দিয়ে এই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবাবেগের আধিক্য বেশি মাত্রায় প্রকট হয়ে ওঠে। অনেকেই আবার এই জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতেই কবিতার ভালোমন্দ উৎকর্ষ অপকর্ষ বিচারের পক্ষপাতী। একথা সত্যি যে প্রত্যেক কালেই অধিকাংশ জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে কবির এই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবাবেগের প্রকাশই পরিলক্ষিত হয়। এখন প্রশ্ন হলো সাহিত্যের মাপকাঠিতে, কালের কষ্টিপাথরে এক যুগের ভাবাবেগ অন্য যুগেও কি সমান জনপ্রিয়তা পেতে পারে? না পায়? আবারও সেই সাহিত্যের ইতিহাসের দিকেই দৃষ্টিপাত করলেই আমরা পেয়ে যেতে পারি আমাদের উত্তর। এককালের ভাবাবেগ যে অন্যকালে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিশেষ কল্কে পায় না, সেই সত্য আমরাও কি কম বেশি জানি না? জানি

জানি বলেই তো আবারও সেই প্রশ্নের দারস্থ হতে হয় আমাদের। কবিতা কি সত্যই ভাবাবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসরণ না তারও অধিক অন্য কিছু? বস্তুত সংবেদনশীল কবিমন তার চারপাশের বহমান সময়কে আপন ভাবাবেগ দিয়ে ধরতে যে চাইবেন, সেকথা খুবই সত্য। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই যখন সেই চাওয়াটি ভাবাবেগের প্রকাশের মধ্যেই গণ্ডীবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ যেন অনেকটাই শৃঙ্খলিত কবিসত্ত্বা। আপন ব্যক্তিত্বের পরিসরেই আবদ্ধ। কিন্তু কবিতা যদি কবির নিজেরই আত্মকথন হয়ে দাঁড়ায়  তাতে সর্বজনীন আশ্রয়ের ভিত গড়ে উঠবে কি করে? এইটিই এক মস্ত বড়ো সমস্যা। আমরা অনেকেই হয়তো এই বিষয়টি নিয়ে ততটা সচেতন নই। সচেতন নই বলেই কবিতা আর না-কবিতার মধ্যের বিরাট পার্থক্যটি আমাদের বোধের বাইরেই পড়ে থাকে অধিকাংশ সময়

সংবেদনশীল কবিমন তার পরিপার্শ্বের সময় ও তার স্বরকে আপন ভাবাবেগে ধারণ করে আবহমান কালচেতনায় সংশ্লিষ্ট করে আপন বৌদ্ধিক মননের মাধুর্য্য ও আত্মোপলব্ধিজাত দূরদৃষ্টির আলোতে সেই আবেগকে সংহত করে যখন কাব্যিক রূপ ও সৌকর্যে বিকশিত করে তুলতে পারে, হ্যাঁ তখনই জন্ম হয় একটি কবিতার। সে কাজ মূলত সাধনার বিষয়। অনেক কষ্টকর অনুশীলন সাপেক্ষ সেই সাধনা। অনেক দিনের অনেক পথচলার পরই আসতে পারে সেই শুভক্ষণ যখন জন্ম হবে একটি সার্থক কবিতার। এ যেন মাতৃগর্ভজাত ভ্রূণের নবজাতক রূপে ভুমিষ্ঠ হয়ে ওঠার মতোই আর এক জন্মবৃত্তান্ত। না কবিতা কেবলই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবাবেগের অক্ষর শব্দ বাক্য মাত্র নয়। আবেগের সংহতি ও উপলব্ধির উৎসরণ ছাড়া কবিতার জন্ম হয় না। আর এই দুইটি অর্জিত হয় তখনই যখন কবির সংবেদনশীলতায় এসে মিলতে পারে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বৌদ্ধিক মননের সৌকর্যে

কিন্তু মুশকিল হয়, অনভ্যস্থ পাঠক মন জীবনের এতটা গভীরে যেতে চায় না অধিকাংশ সময়েই। কবির চেতনার পথরেখা ধরে তার উপলব্ধির সারাৎসারে অবগাহন করার মতো মন মানসিকতা ও ধৈর্য্য আমাদের থাকে না। থাকে না বলেই আমাদের কাছে তখন দূর্বোধ্য হয়ে ওঠে সেই কবিতা। আমরা সরিয়ে নিই আমাদের উৎসাহ আগ্রহ সংবেদনশীলতা সেই গভীরচারী কবিতার হাতছানি থেকে। নির্বাসিত করে ফেলি নিজেদেরকেই অনুপম সাহিত্যরসের আস্বাদন পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ থেকে। ব্যার্থ করি আমাদের সাহিত্যবোধের সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে। আরও বড়ো পরিতাপের কথা এই যে, টেরও পাই না হারিয়ে ফেলি এতকিছুই। অনভ্যস্থ কাব্যবোধে অভ্যস্থ যুগধর্মের সংকীর্ণতায়

তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় সুনামির মতো আছড়ে পড়া অক্ষরবৃত্তই যে কবিতা নয়। জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে খ্যাতির আলো পড়া শব্দবন্ধই যে কবিতা নয়। কবিতা  যে আরও বড়ো কিছু। উপলব্ধি করতে পারি না আমরা সে কথা। কবিতা আসলেই অন্যতর এক সংঘটন। যা কেবল একজন কবির মধ্যেই ঘটতে পারে। প্রকৃত পাঠক যার মধ্যে আশ্রয় পেতে পারে। ঘটতে পারে কবি ও পাঠকের যুগলবন্দী সঙ্গত। এই সঙ্গতটুকুই সাহিত্য। কবিতার ক্ষেত্রে কাব্যসাহিত্য


কবিতার পাঠক

সেদিন বরষা ঝরঝর ঝরে,
কহিল কবির স্ত্রী-
রাশি রাশি মিল করিয়াছো জড়ো,
রচিতেছো বসি পূঁথি বড়ো বড়ো,
মাথার উপরে বাড়ি পড়ো পড়ো
তার খোঁজ রাখ কি!

কাব্যচর্চার সাথে মাথার উপর বাড়ি পড়ো পড়ো’র এই সম্পর্ক বাংলার সমাজ সংস্কৃতির ইতিহাসে এক শাশ্বত সত্য। সেকথা বাঙালি মাত্রেই আমরা জানি। কোন বিখ্যাত কবিই শুধুমাত্র বিশুদ্ধ কাব্যচর্চা করে দুবেলা গ্রাসচ্ছাদনের সুরাহা করতে পারেন নি। তাকে হয় সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও কলম চালাতে হয়েছে, কিংবা অন্য কোন পেশার সাথে সংযুক্ত থেকেই কাব্যচর্চার পরিসরটিকে সজীব রাখতে হয়েছে। এটাই বাংলার কাব্যচর্চার মাহাত্য। আর এইখানেই সমান্য একটি প্রশ্ন জাগে। সাধারণ ভাবেই সবাই বলে থাকেন বাঙালি কবিতা প্রিয় জাতি। তবে তো বলতেই হয় তাহলে সেই কবিতা প্রিয় জাতির কবিদের মাথার ওপর বাড়ি পড়ো পড়ো হয় কি করে?

সত্যই কি বাঙালি কবিতাপ্রিয় জাতি? আচ্ছা বেশ না হয় ধরেই নেওয়া গেল, আমরা সত্যিই কবিতা প্রিয় জাতি। তাহলে আসুন, একটি সামান্য প্রশ্নই বরং করা যাক পরস্পরকে। গত এক বছরে কয়টি কবিতার বই কিনেছেন আপনি? কিংবা প্রশ্নটি যদি করি আমরা নিজেদেরকেই? প্রত্যেকে। কয়টি কবিতার বই কিনেছি আমি গত এক বছরে? গত এক বছরে আমাদের মোট বিন‌োদন ব্যায়ের অনুপাতে কবিতার বইয়ের পেছনে করা খরচের পরিমাণটি ঠিক কতো? অনেকই হয়তো হাসবেনএ কিরকম যুক্তি। অনেকেই হয়তো তর্ক করবেন কবিতার সাথে বিনোদনের তুলনা? না কবিতার সাথে বিনোদনের তুলনা নয় আদৌ। আমাদের বাৎসরিক বিনোদন ব্যায়ের পরিমাণ দিয়েই আমাদের আর্থিক সামর্থ্যের একটি ধারণা করা সম্ভব। সেই সামর্থ্যের প্রেক্ষিতেই কবিতার বইয়ের পেছনে কতটা ব্যয় করি আমরা সারা বছর? আসল হিসেবটা ঠিক এইখানেই। সেটা অর্থ ব্যায়ের বা আর্থিক সামর্থ্যের হিসাব নয়। সেটাই আমাদের প্রকৃত কাব্যপ্রেমের হিসাব।

না হিসাবের কোন গোলমাল নেই এখানে। এই হিসাবের উপরেই বাংলার কবিদের আর্থিক অবস্থা নির্ভরশীল। অর্থাৎ যিনি শুধু কাব্যচর্চা করেই গ্রাসাচ্ছাদনের প্রচেষ্টায় সাধনারত। কিংবা যিনি সেই গ্রাসাচ্ছাদনের কারণেই কাব্যচর্চার পাশাপাশি অন্য পেশায় নিযুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন কবিতা লেখা ও কাব্যচর্চার সাথে অন্যান্য পেশায় সংয়ুক্ত থাকার মধ্যে তো কোন বিরোধ নেই। আর থাকবেই বা কেন? না বন্ধু বিষয়টি বিরোধ থাকা কিংবা না থাকা নিয়ে নয়। একজন পেশাদের মানুষ ডাক্তার উকিল কারিগর অধ্যাপক আধিকারিক, ব্যবসায়ী কাউকেই কিন্তু গ্রাসাচ্ছাদনের উদ্দেশ্যে তার নিজস্ব পারদর্শীতার কাজটির বাইরেও অন্য পেশায় সংযুক্ত থাকতে হয় না। কিন্তু একজন কবিকে হয়। যিনি সত্যই কবি। তাকে একটু সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে গেলে কাব্যচর্চার পাশাপাশি অন্য কোন না কোন পেশায় নিযুক্ত থাকতে হয়। বিশ্বকবিকেও থাকতে হয়েছিল। পারিবারিক জমিদারীতে। নজরুলকে গ্রামোফোন কোম্পানীতে। জীবনানন্দকে অধ্যাপনায়

কারণ সেই আমাদের কাব্যপ্রেম। সারাবছর যে কয়টি কবিতার বই কিনি আমরা, সেই পরিমাণটির উপরেই বাংলার কবিদের ভাগ্য দুলতে থাকে। কেউ কেউ বলতেই পারেন কবিতার বই কেনার উপরেই কি শুধু কাব্যপ্রেম নির্ভর করে? বুদ্ধদেব বসুর সেই অমোঘ গল্পের মামীমার মতো অনেকেই কি নাই, যিনি দেওয়ালের রঙের সাথে মিলিয়ে কাব্যসম্ভার কিনে থাকেন গৃহসজ্জার নিমিত্তে। থাকলেও সেটাই তো সব নয়। আছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু সেই সংখ্যাটিও এতই কম যে তাতেও কবিদের ভাগ্য খোলে না। তাহলে কবিতার বই কেনা আর না কেনার উপরেও তো নির্ভরশীল নয় আমাদের কাব্যপ্রেম। বলতে পারেন অনেকেই। একটু ভেবে দেখলেই আমরা দেখতে পাবো, আমরা নিত্যদিনের প্রয়োজনের বাইরেও সেই সব বিষয়েই বেশি খরচ করে থাকি, যে বিষয়ে আমাদের ভালোবাসা ও টান যত বেশি ও তীব্র। আর দুঃখের বিষয় সেইখানেই কবি ও কবিতা আমাদের জীবনে আজো ব্রাত্যই মূলত। তাই এই বছর কয়টি কবিতার বই কিনলেন আপনি জানতে চাইলে আমরা প্রত্যকেই বিব্রত বোধ করি। আমাদের কাব্যপ্রেমের বিষয়ে অধিক ব্যাখ্যা তাই নিষ্প্রয়জন

তাহলে এই যে বিশাল লিটলম্যাগাজিনের সম্ভার এপার ওপার দুপার বাংলায়, আর রাশি রাশি কাব্যসংকলন? হ্যাঁ সেও সত্য। শুধু তাই নয়, অন্তর্জাল দুনিয়া জুড়ে বাংলা কবিতার আছড়ে পড়া সুনামির কথাও সমান সত্য। এই বিপুল কাব্যচর্চাই মূলত কবিদের পারস্পরিক পিঠচাপড়ানি শুধু। বৃহত্তর জনসাধারণের প্রতিদিনের জীবনের সাথে যার সংযোগ খুবই ক্ষীণ। বা আরও স্পষ্ট করে বললে বলা চলে কোন সংযোগই নেইই প্রায়। জীবনানন্দ সাবধান করে দিয়েছিলেন বহু আগেই। সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি। আর আজকে অন্তর্জালকে কেন্দ্র করে সকলেই কবি। কেউ কেউ নয়। একদিক দিয়ে মনে হতেই পারে, এই তো আমাদের কাব্যপ্রেমের অকাট্য প্রামাণ। কে বলে আমরা কবিতা ভালোবাসি না? বাসি তো। সে যখন নিজে দুপাতা কবিতা লিখে ফেলি তখনই। কিন্তু তখনো কি আমরা অন্যের কবিতা পাঠেও সমান আগ্রহী? যতটা আগ্রহী নিজের দুলাইন কবিতা জনেজনে অন্যদেরকে ডেকে শুনাতে? অন্তর্জালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিপুল পরিমানে ওয়েবপত্রের সম্পাদক মাত্রেই জানেন, কবি মাত্রেই তাঁর ওয়ালে তাঁর প্রকাশিত কবিতার লিংকই কেবল পছন্দ করেন। অন্য কবির কবিতার লিংক কেউই বিশেষ সুনজরে দেখেন না। আর যার যত বেশি বন্ধুবৃত্ত, তার কবিতাতেই তত বেশি লাইক ও কমেন্ট। এবং সেই কমেন্টের বহরেই বাংলা কবিতার পাঠকের কাব্যবোধের দৌড় বোঝা যায় সুস্পষ্ট ভাবেই। আরও একটু লক্ষ্য করলে এটাও দেখা যায়, আমরা নিজ বন্ধুবৃত্তের বাইরের কারুর কবিতা পড়তে আদৌ আগ্রহী নই মোটেই। অর্থাৎ অন্তর্জালকেন্দ্রিক কাব্যচর্চার পরিসরে য়েখানে কবিতা পড়তে অর্থ ব্যায়ের বাধ্যবাধকতাও বিশেষ নাই, সেখানেও আমাদের কবিতা পড়ার আগ্রহ মূলত কোন বন্ধুর সাথে কতটা নিবিড় সম্পর্ক, ঠিক তার উপরেই।

বাংলা কবিতার পাঠক কারা? যারা নিজে কবিতা লেখেন বা লেখার চেষ্টা করেন তারাই তো! তাদের বাইরে নিখাদ কাব্যপ্রেমিক কবিতার পাঠক যৎসামান্যই। আর সেটাই বাংলা কবিতার কবিদের দুর্ভাগ্যের মূল কারণ। আজকের এই অন্তর্জাল বিপ্লবকে কেন্দ্র করে যেখানে আমরা সবাই কবি আমাদের এই নেটের রাজত্বে- সেখানেও কবির তুলনায় পাঠক যৎসামান্য। আর সেটাও বোঝা যায়, অন্তর্জালে প্রকাশিত কবিতার মন্তব্যগুলির সঠিক পর্যালোচনায়। বেশিরভাগ মন্তব্যই কবির সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্যের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ মাত্র। তার সাথে কবিতা বা কাব্যচর্চার কোন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ফলে আমাদের কবিতা লেখা ও পড়ার থেকে সাহিত্য রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে কোন ভাষার সাহিত্যের পক্ষেই সেটা আশার কথা নয়। আশংকার বিষয়। আর সেই সময়েই একটি জাতির সাহিত্য কেবলই ঘুরপাক খেতে থাকে তার নিজ আত্মশ্লাঘার বৃত্তেই। কবিযশপ্রার্থীর বাসনাকে কেন্দ্র করেই মূলত। বিশেষ করে আজকের অন্তর্জাল কেন্দ্রিক কাব্যচর্চার এইটাই মূল বাস্তবতা তবু সেটাই কিন্তু শেষ কথা নয়

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত