দেখা হয় নি স্বদেশ!
দেশ আর দ্বেষের মধ্যে কি কোন
আত্মিক সম্পর্ক আছে?
তা কি করে হয়? সে কথাই কিন্তু মনে হবে প্রথমে।
সকলেরই মনে। মানুষ মাত্রেই কোনো না কোনো দেশের নাগরিক, বাসিন্দা।
যে দেশকে সে মন থেকে ভালোবাসে আপ্রাণ। যাকে আমরা দেশপ্রেম বলে অভিষিক্ত করে থাকি
গাল ভরা বিশেষণে। সেই যে দেশপ্রেমের দেশ, কোথায় তার সাথে
দ্বেষের সম্পর্ক? মানুষ মাত্রেই কোন না কোন দেশের নাগরিক
হলেও মানুষ মাত্রেই কিন্তু কোন না কোন দ্বেষ লালন করেন না সব সময়ে। সবখানে। সকলে।
তাহলে? হঠাৎ দেশের সাথে দ্বেষের একটা যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়ার
প্রয়াস কেন? দেশ আর দ্বেষের মধ্যে সমন্বয় সাধনের অপপ্রয়াস না
কি? না কি দুইটি বিষয়ের মধ্যে তুলনামূলক সমাপতন টেনে
ভালোমন্দের বিচার সভার আয়োজন? সে কথা সম্পাদকই ভালো বলতে
পারবেন একমাত্র। আপাতত, সাধারণ ভাবে প্রতিদিনের ঘুম ভাঙ্গা
চোখ কচলে কি দেখতে পাই আমরা? সকালের প্রভাতী সংবাদের পাতা
থেকে ঘড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা সময়ের সাথে তাল রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকা
রোজকার ইঁদুর দৌড়ে? আসুন বরং চোখ রাখি সেই রেখাচিত্রেই।
আমাদের
মতো এই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে দেশপ্রেমের গল্প যত শোনা যায়, তার থেকে অনেক
বেশি শুনতে পাওয়া যায় মানুষে মানুষে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে,
বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে, পারস্পরিক
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষের ছোট বড়ো নানান রকমের গল্পগুলিই। সেই খবরেই
খবরের কাগজের ব্যবসায় মুনাফার জোয়ার। বৈদ্যুতিন মাধ্যমেও সেই একই চিত্রের সারাদিন
ব্যাপি কুচকাওয়াজ। আর আমরা! রোজকার জীবনের পর্দায় দেশ নয় তার থেকে অনেক বেশি
পরিমাণেই দ্বেষচর্চার প্রতিচ্ছবিই তো দেখতে অভ্যস্ত। তাই নয় কি? তা তো হলো। কিন্তু এই দুটি ভিন্নতর বিষয়ের মধ্যে সম্পর্কসূত্রটি ঠিক কোথায়?
আদৌ কি আছে? থাকাও কি সম্ভব?
কোনটা
আমাদের দেশ? আর কোনটা নয়? আমরা কি আদৌ সচেতন সেই বিষয়ে? নিশ্চয়ই সচেতন। নয়তো গ্রীষ্মের ভর দুপুরেও ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয়
নির্বাচন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করি কেন? আচ্ছা, ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের মধ্যেই কি আমাদের
দেশপ্রেমের পরিচর্যা? না কি, আসলেই
সেটা পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতার মধুভাণ্ডারের চাবিটি
হস্তগত করার প্রয়াসে- আমাদের নৈতিক সমর্থন জ্ঞাপন? এর মধ্যে
দেশপ্রেম কোথায়? বরং এই পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা
লোভী রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক বিদ্বেষ চর্চায় আমরাও কি, যে
যার মতো নানান শিবিরে বিভক্ত হয়েই দাঁড়াই না ভোটার লাইনে? ঐ
একটি দিন। আমাদের সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক অধিকার প্রযোগের সূত্রে। তাহলে যে দেশটি
আমাদের অনেকের বলেই, সেই একই দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা ভোটার
লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি, সেই মূহুর্তেও আমরা আসলেই দেশের জন্যে নয়,
কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরের হয়ে অন্য শিবিরের প্রতি বিদ্বেষ লালন
করেই আমাদের গনতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের
পথে অগ্রসর হতে থাকি ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই। তাই নয় কি?
কিন্তু
আমাদের দেশ? কোথায় পড়ে থাকে সে? রাখি আমরা ঠিক মতো তার খোঁজ? কতটুকু আমার দেশের
সীমানা, পাসপোর্ট ভিসার দৌলতে সেটি হয়তো আমারা জানি ঠিক মতো।
কিন্তু যে বিস্তৃত ভুখণ্ডে আমাদের চলাচলে পাসপোর্ট ভিসা লাগে না, সেই সমগ্র ভুখণ্ডটিকে নিজের দেশ বলে সত্যই কি অনুভব করতে পেরেছি আমরা আজও?
দেশ তো মৃন্ময় নয়, চিন্ময়। বলে গিয়েছিলেন কবি।
সেই দেশকে অন্তরের আবেগ দিয়ে অনুভব, যাকে আমরা বলবো দেশপ্রেম,
কেমন সেই অনুভব? আমাদের মধ্যে কজনের হয়েছে সেই
অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা? দেশ তো আমাকে একা নিয়ে নয়। দেশ তো
সবাইকে নিয়ে। আর সবাইকে নিয়ে যে দেশ, সেই দেশকে ঠিক মতো
অনুভব করতে গেলে সবার আগে, সেই দেশের সবাইকেই তো অন্তরের
অবেগের অনুভববের সীমানায় ধরতে হবে। হবে না? ধরেছি আমারা?
ধরলেও কজনই বা পেরেছি সেই কাজটা করে উঠতে? করে
উঠতে ঠিক মতো! এই যে সবাইকে নিয়েই যে আমার দেশ, এই বোধের
সত্যমূল্যে পৌঁছানো সহজ কথা নয় মোটেই। এর জন্য চাই আশৈশব সুস্থ সামাজিক পরিসরে
প্রকৃত জীবনবোধে মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষার্জন। আর কেবল মাত্র তখনই সবাইকেই অন্তরের
আবেগের সীমানয় ধরা সম্ভব। তার আগে নয় কখোনই। আর সেইটি না হলে, নাহ! দেশপ্রেমও ঐ রূপকথার মতোই অলীক। বাস্তব নয় মোটেই। আর দেশপ্রেম ছাড়া
দেশকে পাওয়াই বা যাবে কি করে নিজের জীবনের প্রতিদিনের পরিসরে? তাই সাধারণ ভাবেই আমরা সাধারণ মানুষ দেশ থেকে চিরকালই নির্বাসিত রাখি
নিজেদেরকে। আর রাখি বলেই কেবলমাত্র ভোটার লাইনেই ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আমরা
নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক মনে করি।
কিন্তু
কেন পারিনি আমরা দেশের সবাইকে অন্তরের আবেগের সীমানায় ধরতে? যেটি ধরতে না
পারলে দেশকেও পাওয়া যায় না আপন করে। পরিনি কেন না, সেই পারার
কোনো ঐতিহ্যই যে নেই আমাদের। নেই উত্তরাধিকার সূত্রেই। উত্তরাধিকার সূত্রেই আমরা
বর্ণভেদেকেই সমাজ সংসারের মূল কেন্দ্র বলে মেনে এসেছি। এই বর্ণভেদ মানুষে মানুষে
যে অলঙ্ঘনীয় দূরত্বের জন্ম দিয়ে থাকে, যে দূরত্বের পরিসর
কেবল বাড়তেই থাকে, সেই দুরত্বই কালে কালে সম্প্রদায়িক
সংস্কৃতির জন্ম দিয়ে পারস্পরিক বিভেদ বিদ্বেষের পরিসর গড়ে তোলে। আর তখনই আমরা
সমগ্র দেশকে অনুভব করার আর কোন শক্তিই খুঁজে পাই না নিজেদের মধ্যে। এইটিই, এই সংস্কৃতিই ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। উত্তরাধিকার সূত্রেই আমরা এই সংস্কৃতিজাত
সন্তান। তাই বিভেদ আর বিদ্বেষের মধ্যেই আমাদের বেড়ে ওঠা। আর সেই বেড়ে ওঠায়,
আধুনিক যুগের আঙিনায় যেখানে নিজেকে টিকিয়ে রাখাটাই প্রাথমিক শর্ত,
যেখানে সমাজ সংসার বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্ষমতালোভী শিবিরে বিভক্ত; সেখানে
দেশচর্চা নয়, দ্বেষচর্চার সংস্কৃতিই আমাদের জীবনের প্রধান
কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। তাই নয় কি? কি দেখতে পাই আমরা নিজেদেরই
জীবনচর্চার চারপাশে? হ্যাঁ ঠিক তাই, সে
কথা আমরা সবাইই জানি।
ভারতীয়
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে দেশের অনুভব কোনদিনই দানা বেঁধে ওঠেনি। তার একটি মূল কারণই হলো
ভারতবর্ষ একটি উপমহাদেশ,
যেখানে বিভিন্ন জাতি সত্ত্বা পারস্পরিক দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে
পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহ করে নিজ নিজ জাতিসত্ত্বার চর্চা করে এসেছে। কিন্তু উল্টোপুরাণ
ঘটিয়ে গেল বৃটিশ। নিজেদের শোষণ ও শাসনের সুবিধের জন্যে একটি সাধারণ মানচিত্রে
ভারতবর্ষকে বেঁধে একটি উপমহাদেশকে দেশের পরিচয়ে পরিচিত করে তুলল। এই রকম উদ্ভট
কাণ্ড এর আগে বিশ্বে আর কোথাও সংঘটিত হয় নি। আর এরপর একবারই মাত্র এই রকম
উল্টোপুরাণের কাণ্ড ঘটিয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সৌভাগ্যের বিষয়, সেই ভুল তারা সংশোধনও করে নিয়েছে গত শতকেই। ফলে এত অসংখ্য জাতিসত্ত্বার
সমবায়ে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক মানচিত্রের দেশ কখনোই দেশপ্রেম চর্চার কেন্দ্র হয়ে
উঠতে পারে না। পারেও নি। পারার কথাও নয়। তাই ভারতবর্ষ আমাদের জীবনের পরিসরে একটি
রাষ্ট্রিক মানচিত্র মাত্র। আমরা যার নাগরিক। কিন্তু আমাদের দেশ? সে তো আমাদের জাতিসত্ত্বার সমন্বয়ে একটি নির্দিষ্ট মাতৃভাষা ও ভৌগলিক
সংস্কৃতির আবহমান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার থেকেই গড়ে উঠবে। অন্তত, আবিশ্ব অধিকাংশ স্থানেই এই ভাবেই গড়ে ওঠে এক একটি দেশ। কিন্তু না আমাদের
গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। আর তার মূলে প্রায় দুই হাজার বছর ব্যাপি সময় সীমানায় একের
পর এক বিদেশী শক্তির অধীনস্ত থাকাই। যে কারণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রভাবে কতগুলি
পরস্পর বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে আমরা গোষ্ঠী ভিত্তিক
সাংস্কৃতিক চেতনার বলয়ের মধ্যে দিয়েই দেশকে দেখে থাকি। ঠিক এই কারণেই হিন্দুদের
দেশভাবনা আর মুসলমানের দেশভাবনা ভিন্ন হয়ে ওঠে। ভিন্ন হয়ে ওঠে উচ্চবর্ণের দেশ ও
নিম্নবর্ণের দেশ। ভিন্ন হয়েই থাকে দলিত ও আদিবাসীদের দেশ ও বহিরাগত অধিকৃতদের দেশ
ভাবনা।
এই
যে বিভিন্ন গোষ্টীভিত্তিক দেশচেতনা, এতে আমরা কখনোই কোনদিনের জন্যেই সমগ্র
দেশকে অনুভব করতে পারিনি আমাদের মধ্যে। আমাদের দেশ চেতনা আসলেই গোষ্ঠীচেতনার আলোতে
গড়ে ওঠা ছিন্নভিন্ন অসম্পূর্ণ একটি অনুভব, যে অনুভবের বাইরেই
পড়ে থাকে দেশের বাকি অংশ নিয়ে সমগ্র দেশটি। আর আমরা নিজেরাই নির্বাসিত থেকে যাই
আমাদের স্বদেশ থেকে। আর অন্যদিকে পারস্পরিক বিভক্ত এই গোষ্ঠী চেতনাই লালন করতে
থাকে বিভেদ ও বিদ্বেষের রসায়নটিকে। সেই রসায়নটিকেই আমরা অধিকাংশ সময়ে দেশপ্রেম বলে
ভুল করে বসি। তাই ভারতীয় হিন্দুর রক্তে মিশে যায় পাকিস্তান বিদ্বেষের সংক্রমণ
দেশপ্রেমেরই নামে। বাঙালি হিন্দুর চেতনায় কাঁটাতার দাঁড়িয়ে যায় স্বচ্ছন্দে,
ওপারের বাংলাদেশী নামক এক বিদেশী জাতিসত্ত্বার থেকে নিজের
স্বাতন্ত্র রক্ষার গোষ্ঠীস্বার্থের তাগিদেই। এইভাবেই চলতে থাকে আমাদের দ্বেষচর্চার
সংস্কৃতি দেশপ্রেম চর্চার ছদ্মবেশে!
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

