ঝুল ও ঝুলকাঠি
পথ চলতি পথিককে হঠাৎ যদি দ্যুম করে
প্রশ্ন করা যায়। ঝুল ঝেরেছেন আজ? অবশ্যই প্রশ্নকর্তার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়েই সন্দেহ
দানা বাঁধবে শ্রোতার মনে। কিন্তু সংসার সামলানো সাধারণ গৃহস্থ মানুষ মাত্রেই জানেন
ঝুল কি সংঘাতিক বস্তু। বিশেষ করে সংসার সুখের হয় যে রমণীর গুণে। তাঁরা জানেন খুব ভালো
করে। যদিও আজকের বিলাসবহুল আবাসনগুলিতে উন্নত প্রযুক্তির দেওয়াল রঙের সৌজন্যে ঝুলের
সাম্রাজ্যবিস্তার কিঞ্চিৎ শ্লথ হয়ে পড়েছে। কিন্তু অত্যাধুনিক ফ্লাটে আর কজন থাকেন?
সাধারণ ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে শুরু করে পৌরাণিক বাড়ি অব্দি সর্বত্রই কম বেশি ঝুলের দাপট
অব্যাহত। পৌরাণিক বাড়ি শুনে ঘাবড়ানোর কিছু নাই। বাপ ঠাকুর্দার গাঁথা দালানকোঠায় থাকার
মতো জনসংখ্যা কম নয়। ঝুলের দাপট সেখানেই সবচেয়ে বেশি। যত বেশি পৌরাণিক উত্তরাধিকার
তত বেশি ঝুলের সাথে নিত্যদিনের যুদ্ধ। নিত্যদিনের এই যুদ্ধ বেশি করে সামলাতে হয় গৃহকর্তীদেরই।
ভুক্তভুগী মাত্রেই জানেন সেই কথা। গৃহকর্তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতেও যে ঝুলের জ্বালাতন
কম বেশি থাকে না, তেমনটাও নয়। সেই ঝুলের দাপটের বিরুদ্ধে নিয়মিত সমরযুদ্ধের কাহিনী
নিয়ে কেউ আলাপ আলোচনা করেন না পরস্পর। বিষয়টি একান্তই সাংসারিক গার্হস্থ সমস্যা। যে
যার সামর্থ্য ও বুদ্ধিমত্তা মতো মোকাবিলা করে থাকেন। এমনকি ঘরের কোণে কোণে ঝুল ঝারার
বিষয়টি এতটাই বিরক্তিকর এক অভিজ্ঞতা যে, সাহিত্য সংস্কৃতির দিগন্তেও এই নিয়ে বিশেষ
চর্চা হয় না কখনো। সিনেমা থিয়েটারেও ঘরের কোণে ঝুল ঝারতে দেখা যায় না পাত্রপাত্রী নায়ক
নায়িকাদের।
ঝুল যে একটি বাস্তব সত্য। সাংসারিক গার্হস্থ্য জীবনে সেই
বিষয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নাই। কিন্তু তাই নিয়ে আলোচনা করা কতটা মানসিক সুস্থতার পরিচয়বাহী
সেই বিষয়টি যথেষ্ঠই বিতর্কিত নিঃসন্দেহে। আমাদের জীবনের হাজার রকমের সমস্যা নিয়ে আমরা
কত কথা বলি। কিন্তু নিয়মিত ঝুল ঝারার বিষয়টা সেই সমস্যার ভিতরে পড়লেও, তাই নিয়ে আমরা
প্রকাশ্যে মুখ খুলি না। স্বামীস্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যাবলীর মতোই ঝুলও একান্ত
সাংসারিক বিষয়। সেই সাংসারিক বিষয়টি সমাজিক আলোচনার বিষয় করে তুলতে গেলে, সেটি হাস্যকর
প্রয়াস নিঃসন্দেহে। তাই এই বিষয়ে সকলেই স্পিকটিনট। কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়। বরং অনেকেই
হয়তো মনে মনে কল্পনা করেন এমন কিছুর। যাতে করে চিরদিনের মতো করেই ঝুলের সাম্রাজ্যবিস্তার
বন্ধ করে দেওয়া যায়। জানা যায় না, এমন কেউ আছেন কিনা। যিনি এই বিষয়ে কোন বৈজ্ঞানিক
গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তলায় তলায়। কিন্তু ঝুল যে একটি নিত্যদিনের সমস্যা। ঝুলের সাম্রাজ্যবিস্তার
রোধ করতে করতে অনেকেই যে ক্লান্ত। হতোদ্যোম। আশা করি সেকথা স্বীকার করতে রাজি হবেন
অনেকেই। কিন্তু একটি বিষয়ে সকলেই একমত হবেন। ঝুলের সাম্রাজ্যবিস্তারের সাথে যুদ্ধটা
সারাজীবন চালিয়ে যেতেই হয়। একবার একদিন সারা বাড়ির ঝুল ঝেরে দিয়ে বাকি জীবন নিশ্চিন্তে
বসে থাকার উপায় থাকে না কোন।
শুধু কি চার দেওয়ালের ঝুল? আমার আপনার মনের পরতে পরতে চিন্তা
চেতনা বিশ্বাস ভরসার ঘরে ঘরে যে ঝুলগুলি জমা হতে থাকে নিত্যদিন? সেগুলিও কি ঝারার দরকার
হয় না? হয় নিশ্চয়। কিন্তু আমরা অধিকাংশই সেই বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন নই। সচেতন থাকি না।
আর থাকি না বলেই, থেকে থেকে আমাদের সাধের ইংরেজি’র পরিভাষায় যাকে বলে মেন্টাল স্ট্রেস,
সেই স্ট্রেসের স্বীকার হয়ে পড়ি। অধিকাংশ গার্হস্থ্য ঝগড়ার সূত্রপাত এই মেন্টাল স্ট্রেস
জনিত মনের কোণে কোণে জমে থাকা ঝুলের কারণে। যে ঝুলগুলি নিয়মিত ঝেরে ফেলে দিতে পারলে,
সংসার সুখের হতো ঝুল ঝারার গুণে। কিন্তু তা হবে কি করে। উল্টে আমরা আমাদের মনের ঝুলগুলিকে
অতি বাস্তব সত্য বলে ধরে নিয়ে অভিজ্ঞতার বড়াই করে থাকি। এবং সেই অভিজ্ঞতার ভারে দিনে
দিনে ন্যুব্জ হতে থাকি। যত বেশি ঝুল জমিয়ে তুলি। নিজেকে তত বেশি অভিজ্ঞ বলে মনে হতে
থাকে। আর তত বেশি মানসিক অশান্তি ও অবসাদে ভুগতে ভুগতে প্রিয়জনের কাছেই হয়তো অপ্রিয়
হয়ে উঠি পদে পদে। এবং এটা এক পাক্ষিকও নয়। পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতরেই এই ঝুল জমার
পর্ব এগিয়ে চলতে থাকে। সংসার নামক যাত্রা পালায়। মনের শান্তি জীবনের সুখও সেই ফাঁকে
পালায়। পালাতে থাকে। ঝুলের ফাঁক দিয়ে। আমরা ঝুলে যাই জীবনের বিষাদ হতাশা গ্লানির চক্রব্যূহে।
অভিমুন্যের মতো তখন চার দেওয়ালে মাথা ঠুকতে থাকি।
অথচ মাথা ঠোকার এই পর্বে প্রবেশের কোন দরকারই হতো না। যদি
না আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার দর্পে অন্ধ হয়ে কালাতিপাত করতাম। মনের কোণে কোণে ঝুল জমিয়ে
তুলতে তুলতে। অর্থাৎ আমাদের পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষার ভিতরেই একটি মস্ত বড়ো গলদ রয়ে
গিয়েছে। মনের কোণে জমা ঝুল নিয়ে আমরা পরস্পর কথা বলি না। উল্টে ছোটবেলা থেকেই আমাদের
সেখানো হয় অপ্রিয় সত্য বলতে নাই। কচি বয়স থেকে অভিভাবকদের কাছ থেকেই ছোটরা ঈর্ষার সাথে
পরিচিত হয়। পারিবারিক সংস্কৃতির ভিতরেই স্বার্থবোধ ঈর্ষাবোধ পরশ্রীকাতরতা এবং হিংসের
মতো বদগুণগুলি আমাদের মনের কোণে গাঢ় ঝুলের জন্ম দিতে থাকে। সেই ঝুল জমিয়ে তুলতে থাকার
যে প্রক্রিয়া। আমরা তাকেই বলি ম্যাচিওরিটি। এতটাই ইমম্যাচিওর আমাদের পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষা।
এর সাথে সামাজিক সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক আবহাওয়া অর্থনৈতিক সংগ্রাম সব যোগ হতে থাকে।
যত বেশি করে সেই যোগফলের অংক বাড়তে থাকে। তত বেশি করে ঝুল জমতে থাকে মনের ঝুল বারান্দায়।
সেই জমা ঝুলের আবছা অন্ধকারের ভিতর দিয়েই আমরা সকল সম্পর্কের দালানকোঠায় পরস্পরকে দেখতে
থাকি। আর মাপতে থাকি। আর বাড়তে থাকে সম্পর্কগুলির ভিতরে পারস্পরিক দূরত্ব। পিতামাতার
সাথে সন্তানের দূরত্ব। ভাইবোনের সাথে দূরত্ব। অত্মীয় পরিজনের সাথে দূরত্ব। বন্ধু বান্ধবের
সাথে দূরত্ব। দাম্পত্য সম্পর্কের ভিতরে স্বামীস্ত্রীর ভিতরে দূরত্ব। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের
সাথে দূরত্ব। এবং শেষে আপন সন্তানের সাথে দূরত্ব। এই প্রত্যেকটি দূরত্বের ভিতরে জমে
থাকে নানান ধরণের নানান বিন্যাসের ঝুল। প্রতিদিনের অভ্যাসে জমতে জমতে প্রায় বিন্ধ্যাচলের
মতো দাঁড়িয়ে যায়। সম্পর্কগুলির অভ্যন্তরে। অনেক সময় আর্থিক সামর্থ্যের উপরে নির্ভর
করে তখন অনেককেই হয়তো কড়া নাড়তে হয় মনোবিদদের দ্বারে দ্বারে।
ঘরে বাইরে মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলির ভিতরে
আমরা নিজেরা নিজে থেকে যদি সুস্পষ্ট থাকতে পারতাম। সমাজ সংসার হয়তো সেই নিয়ে হাসাহাসি
করতো। ইডিয়ট বলে। কিন্তু নিজের মনের কোণে ঝুল জমে উঠতো না কোন। মনের কথা আর মুখের কথার
ভিতর যদি আসমান জমীন ফারাক না রাখতাম। বিশ্বাস আর কাজের ভিতর যদি সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য
গড়ে তুলতে পারতাম। পরিস্কার মনের আনাচে কানাচে ঝুলের আমদানী হতো না। সাম্রাজ্যবিস্তার
তো দূরস্থান। নিজেকে নিজ মনের ঝুল বারান্দায় ঝুলমুক্ত রাখার এই এক উপায়। না। আমরা কেউই
সেই উপায়কে নিজের জীবনে অনুশীলন করতে রাজি নই। আমাদের সমাজসংসার আমাদের শিক্ষাদীক্ষা
আমাদেরকে সেই অনুশীলনের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে অপারগ। আমাদের চরিত্রে সেই অনুশীলনের
সামর্থ্য তৈরী হয় নি। তাই আমরা পারস্পরিক সব ধরণের সম্পর্কের ভিতরেই মেপে কথা বলি।
মন খুলে মিশতে পারি না কারুর সাথে। এমনকি প্রতিদিনের শয্যাসাথীর সাথেও। সেখানেও কত
রকমের হিসাব নিকাশ থাকে। কোন কথটা কখন বলা যাবে। কিভাবে বলা যাবে। কি রকম প্রতিক্রিয়া
হতে পারে। কোন কোন কথা বলাই যাবে না। সম্পূর্ণ আড়ালে রাখতে হবে কি কি বিষয়। কখন কিভাবে
মিথ্যাকে সত্যির মোড়কে এমন ভাবে পরিবেশন করতে হবে। যাতে সন্দেহ না জন্মায় জীবনসাথীর
মনে। পারস্পরিক সম্পর্কগুলিকে টিকিয়ে রাখতে এবং সুন্দর রাখতে মিথ্যা ও ছলনাই হয়ে ওঠে
আমাদের তুরুপের তাস। সেই তাস যে যত দক্ষতার সাথে খেলতে পারে। তার জীবন তত সমস্যাহীন
থাকে। একথা বাস্তব সত্য। কিন্তু সেই বাস্তবতায় পৌঁছানোর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়, নিজের
মনের কোণে ঝুলের পাহাড় জমিয়ে তুলে। একদিন না একদিন সেই পাহাড়ে ধ্বস নামবেই। সেইদিন
আত্মরক্ষার উপায় থাকে না আর।
ঘরের মতো মনের মতো সমাজেও ঝুল জমে্। ঘরের জমা ঝুল পরিস্কার
করা যতটা কঠিন। মনের জমা ঝুল পরিস্কার করা তার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন কাজ। কিন্তু সবচেয়ে
কঠিন হলো সমাজের জমা ঝুল পরিস্কার করা। তার প্রধান কারণ, সমাজের ঝুল দিনে দিনে জমতে
জমতে একদিন সামাজিক সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আচারবিচার হয়ে
সেই ঝুল সমাজকেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে দেয়। যে কোন জাতির ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেই
সেই ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বর্ণভেদ প্রথা সেই এক মস্ত বড়ো ঝুল। যা
আজও সম্পূর্ণ পরিস্কার করা যায় নি। রাজা রামমোহন রায়ের একক উদ্যোগে সতীদাহরূপী জমা
ঝুল থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বিদ্যাসাগর এসে বৈধব্যের জমা ঝুল থেকে নারী
সমাজকে মুক্ত করার পথ তৈরী করলেন। নারীর শিক্ষার অধিকার খর্ব করে রাখার ঝুলকে ঝেরেঝুরে
নারী শিক্ষার পথ সুগম করে তুললেন। এইসবই সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাস। আমাদের বিস্মরণ হওয়ার
কথা নয়। তারও আগে শ্রীচৈতন্য মানুষে মানুষে জাতপাতের বিভেদের ঝুল পরিস্কার করতে গিয়ে
জীবনই দিয়ে দিলেন। মধ্য প্রাচ্যে হজরত মহম্মদ তাঁর সময় ও সমাজের ঝুল পরিস্কার করতেই
গড়ে তুললেন ইসলাম। তারও অনেক আগে। গৌতম বুদ্ধ তাঁর সময় ও সমাজের ঝুল পরিস্কারের পথ
তৈরী করতেই বসে ছিলেন সাধনায়। এই ভাবে মানুষের সমাজ সভ্যতার ইতিহাসে যুগে যুগে যুগপুরুষরা
মহাপুরুষ হয়ে আবির্ভুত হয়েছিলেন। তাঁদের সময় ও সমাজের জমে থাকা ঝুল পরিস্কার করতেই।
এই পথেরই সাম্প্রতিক সময়ের পথিক ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি কোন বিশেষ ধর্মের প্রচারক
ছিলেন না। তিনিও তাঁর সময় ও সমাজের জমে থাকা ঝুল ঝারতেই পথে নেমেছিলেন। সেই কারণেই
তিনি মহাপুরুষ। বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের মুখপাত্র নন। এইভাবেই মানুষের সমাজ ও সভ্যতার
ইতিহাস এগিয়ে চলেছে।
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলেছিলেন ব্যাসদেব।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সেই যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ যাঁর হাতে ছিল। সেই শ্রীকৃষ্ণের
জবানীতে ব্যাসদেব একটি সার সত্য কথা বলে গিয়েছিলেন। সম্ভাবনি যুগে যুগে। অর্থাৎ অন্যায়ের
বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে যুগে যুগে আবির্ভুত হবেন তিনি। এইখানে একটি গূঢ়
প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। শ্রীকৃষ্ণ তো আর মানুষ নন। তিনি তো ভক্তের বিশ্বাসে
সর্বশক্তিমান ভগবান। তাহলে একটি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধেই তো সকল অন্যায়ের বিনাশ সাধন করে
ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করার কথা। সেক্ষেত্রে যুগে যুগে আবির্ভাবের কথা শোনাচ্ছেন কেন ব্যাসদেব?
কেন স্বয়ং ভগবানের প্রতিষ্ঠিত ন্যায়ের বেদীতে অন্যায়ের স্তুপ জমে ওঠে কাল প্রবাহের
হাত ধরে? আসলে সমাজবাস্তবতার অভিজ্ঞতায় প্রখর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মহাকবি ব্যাসদেব জানতেন।
মানুষের সমাজ সভ্যতায় শেষ কথা বলে কিছু নাই। ফিনিশিং টাচ হিসাবে শেষ তুলির টান দিয়ে
দেওয়া সম্ভব নয় কোন কিছুতেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কি আর এমনি এমনি লিখে গিয়েছেন, শেষ
কথা নাই শেষ কথা কে বলবে। ঠিক আমাদের ঘরের ঝুলের মতোই। যতই ঝারা হোক না কেন। ঘরেও যেমন
ঝুল জন্মাবে নতুন করে। আবারও ঝারতে হবে যত্ন করে। সমাজ সভ্যতাতেও ঠিক একই রকম ভাবে,
যুগে যুগে জমে ওঠা অন্যায় আর পাপের ঝুলকে ঝারতে হয়। হবে। তাই একটি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ
কিংবা একজন গৌতম বুদ্ধের কাজ নয়। সব ঝুল ঝেরে দিয়ে যাওয়া। প্রত্যেকেই তাঁর সময় ও সমাজের
প্রয়োজন মতো ঝুল ঝারার বন্দোবস্ত করে দিয়ে যান। যেমন দেখিয়েছিলেন ব্যাসদেব তাঁর সৃষ্ট
কিংবদন্তী চরিত্র শ্রীকৃষ্ণের ভিতর দিয়ে। কিন্তু কোনটিই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। তাই
গৌতম বুদ্ধ’র পর আবির্ভুত হন
যিশু খ্রিষ্ট। হজরত মহম্মদ। শ্রীচৈতন্য।
এটাই মানব সভ্যতার প্রকৃতি। মানব সমাজের ধর্ম। কালের কালিমায়
ক্রমাগত জমতে থাকে ঝুল। যে ঝুল জমতে জমতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকেই দুর্বিষহ করে
তোলে। সেই দুর্বিষহ জীবনের বোঝা থেকে মানুষের ব্যক্তিজীবন ও সমাজিক জীবনকে মুক্ত করতেই
এক একটি সময় ও সমাজে আবির্ভুত হন কার্লমার্কস। লেলিন। নেতাজী সুভাস। মাও সে তুং। হোচোমিন।
চে গুয়েভারা। কাস্ত্রোরা। কেউ ব্যর্থ হন। কেউ সফল হন। কিন্তু কোন সাফল্যই চিরস্থায়ী
কোন বিষয় নয়। তাই শ্রীকৃষ্ণের জবানীতে ব্যাসদেবকে বলতে হয়েছিল সম্ভাবনি যুগে যুগে।
ফলে আজকে একবিংশ শতকের তথাকথিত বিশ্বায়নের জমা ঝুলের স্তুপে বসে যাঁরা মার্কসবাদ ব্যর্থ।
লেলিন ব্যর্থ। মাও সে তুং ব্যর্থ বলে আস্ফালন করেন। কমিউনিজমের শ্রাদ্ধ করতে করতে নিরানব্বই
শতাংশের শ্রমে এক শতাংশের ধনসম্পত্তির বাহারে আহ্লাদে আটখানা হন। তাঁরা ইতিহাসের উল্টোমুখে
দাঁড় টানার ব্যর্থ চেষ্টা করেন মাত্র। তাদের অসার চেতনায় উপলব্ধি করার সক্ষমতাই জন্মায়
নি যে, মার্কস লেলিন মাও সে তুং’রা তাঁদের কাজ সাফল্যের সাথেই করে গিয়েছেন। কালের নিয়মেই
আবার মানুষের সমাজ ঝুলের অন্ধকারে কালিমালিপ্ত হয়ে বসে আছে। বসে আছে পরবর্তী মার্কস
লেলিন মাও সে তুং নেতাজী সুভাসচন্দ্র বোস হো চো মিন চে গুয়েভারাদের অপেক্ষায়। এই ভাবেই
মানুষের সমাজ ও সভ্যতা তার জমা ঝুল ঝারার পথ করে নেয়। এই পথেই যুগে যুগে কালে কালে
এক একটি ও এক এক ধরণের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের
ভিতর দিয়ে মানুষই ঝুল ঝারার ব্যবস্থা করে নতুন করে। ‘সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে- এ
পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে, সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;’ বলে গিয়েছিলেন জীবনানন্দ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো। ঝুল তো পরিস্কার করতে হবে। কিন্তু কবে?
কিভাবে? কাদের হাতে? এক একটি দেশে এক একটি কালে, এক এক রকম ভাবে এর উত্তর দেবে স্থানীয়
সময় ও সমাজ। ঠিক যেমন এই সেদিন উত্তাল সত্তরের দশকে এক দঙ্গল তরুণ ঝুল ঝারতেই জীবন
মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করেছিল। দামী ডিগ্রী চাকরি বাড়ি গাড়ী নারীর মোহ ছেড়ে সমাজ উদ্ধারের
ব্রত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সাম্যবাদের আদর্শকে বুকে ধারণ করে। সমাজের জমে ওঠা ঝুল পরিস্কার
করতেই। কিন্তু তাদের মস্ত বড়ো ভুল হয়ে গিয়েছিল দুটি জায়গায়। প্রথমটি টাইমিং। সমাজ প্রস্তুত
ছিল না ঝুল ঝারার জন্য। সেই প্রস্তুতির পথ বাঁধাতে হতো আগে। আর দ্বিতীয় ভুলটি ছিল হাস্যকর।
ঝুলকাঠিটা তারা ধরেছিল উল্টোভাবে। তাই ঝুল ঝারতে গিয়ে নিজেরাই গোটা একটা প্রজন্ম ঝরে
গেল। যার মূল্য দিতে হচ্ছে আজও। যে ঝুল ঝারতে তারা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ঝাঁপিয়ে
পড়েছিল। সেই ঝুলই আজ হিমালয় হয়ে উঠেছে। সেই ঝুলই আজ নিয়ন্ত্রণ করছে গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে।
প্রতিটি ব্যক্তিমানুষের জীবনকে। কিন্তু তাই বলে হতোদ্যোম হয়ে পড়ার কিছু নাই। মানুষের
ইতিহাস বারবার যেমন প্রমাণ করেছে কোন ঝুল ঝারাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। ঠিক তেমনই
প্রমাণ করেছে। কোন ঝুলও চিরস্থায়ী নয়। সব ধরণের ঝুলেরই ঝারনদার তৈরী হয়ে ওঠে সময় সমাজের
প্রয়োজনে।
না, তাই বলে সেই কথা ভেবে কি আমরা বসে থাকবো আজ? ঠুঁটো জগন্নাথ
হয়ে? নিশ্চয় নয়। যুদ্ধটা শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকেই। ঘরের ঝুল ঝারার সাথে সাথেই
নিজেদের মন মনন চেতনার ঝুলও ঝারা শুরু করে দিতে হবে। অভিভাবকরূপে সন্তান সন্ততির মনের
গঠনকে এমন ভাবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা নিয়মিত মনের কোণে জমে থাকা ঝুল নিজেরাই ঝেরে
ফেলে দিতে পারে। মন থাকলে মনের কোন ঝুল জমবেই। চেতনা থাকলে, চৈতন্যের দিগন্তে আলোর
পাশাপাশি ঝুলের অন্ধকারও জমবে। কিন্তু তাই বলে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকার উপায় নাই। ক্রমাগত
সেই ঝুল ঝারার প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে হবে আমাদের ব্যক্তি জীবনে। ব্যক্তিকে নিয়েই সংসার
পরিবার। আর পরিবার নিয়েই সমাজ। তাই যে সংস্কৃতিকে আমরা ব্যক্তিজীবনে অনুশীলন করতে শুরু
করবো। পারিবারিক সংস্কৃতির হাত ধরে সেই সংস্কৃতিই আমাদের সমাজ সংস্কৃতির রূপ নিতে থাকবে
দিনে দিনে। তখন ঝুল জমা ও ঝুল পরিস্কারের কাজ সমান্তরাল চলতে থাকবে। আর সেইটা হলেই
আমাদের ঘর মন ও সমাজ ঝুলমুক্ত থাকার অবসর পাবে। বড়ো হতে থাকবে ঝুলমুক্ত সময় ও সমাজের
পরিসর ও সম্ভাবনা। ঝুলের বিরুদ্ধে সার্বিক যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে আমাদের
ব্যক্তিগত জীবন থেকেই। তবেই একদিন সমাজ প্রস্তুত হবে ধর্মযুদ্ধের জন্য। ঝুল মুক্ত ঝলমলে
সমাজজীবনের ভিত গড়ে তোলার জন্য। সেদিন আর মনে হবে না। মার্কস ব্যর্থ। লেলিন ব্যর্থ।
মনে হবে না সাম্যবাদ ব্যর্থ। উল্টে, উল্টিয়ে দেওয়া যাবে ধনতান্ত্রিক শোষণবাদী সমাজব্যবস্থার
ভিত। ঝেরে দেওয়া যাবে নিরানব্বই জনের শ্রমে একজনের পুঁজিবৃদ্ধির আসুরিক ঝুলের ক্যপিটালিস্ট
অপসংস্কৃতি। কিন্তু সেও কোন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। আবারও কালে কালে নতুন করে ঝুল
ঝারার প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নতুন করে গড়ে নিতে হবে সময় ও সমাজের উপযুক্ত
ঝুলকাঠি। আর সেই প্রক্রিয়া নিরন্তর চালিয়ে নিয়ে যেতে না পারলে। আবারও মনে হবে মার্কস
ব্যর্থ। লেলিন ব্যর্থ। মার্কসবাদ সাম্যবাদ ব্যর্থ। ব্যর্থ মনুষ্যত্ব। ঝুলের ভিতরে বসে
ঝুলের কালিমাকেই সত্বঃসিদ্ধ বলে ভুল হতে থাকবে। ঠিক আজকের মতোই। যে ভুলের গালভরা নাম
বিশ্বায়ন। নিরানব্বই জনের শ্রমে একজনের পুঁজিবৃদ্ধির নির্লজ্জ কৌশল। মানুষের সমাজ ও
সভ্যতায় সবচাইতে ভয়ঙ্কর যে ঝুল। সবচাইতে প্রাচীন যে ঝুল। সবচাইতে সর্বাত্মক যে ঝুল।
১২ই সেপটেম্বর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

