মৃত্যু
“কী সব কথা যে বলেন।
আমার সত্যিই এই ধরণের কথা একদম ভাল্লাগে না! মন খারাপ হয়ে যায় খুব! মৃত্যুর চিন্তা
কখনোই করি না। জানি তো, যার জন্ম আছে সে মরবেই! চিন্তা করলেও মরবে। না করলেও”। ধ্রুব সত্য। না, কথাগুলি
আমার নয়। বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিকের। আজকেরই কথা। কথা কয়টি শুধু
তো আর তাঁরই নয়। এই কথাই আপামর মানুষের। মরার কথা কে আর কবে চিন্তা করতে ভালোবাসে।
সে যতই রবি ঠাকুরের “মরণ রে তুঁহু মম শ্যামসমান’ আবৃত্তি করুক না কেন। কেউই মৃত্যুর
কথা চিন্তা করে সময় নষ্ট করে না। যে পরিণতি অমোঘ অনিবার্য্য অপরিবর্তনীয়। সেই পরিণতির
কথা ভাবতে কারই বা ভালো লাগে। বরং উল্টে মন খারাপ হতে বাধ্য। বাংলাসাহিত্যের এই শক্তিশালী
সাহিত্যিকেরও ঠিক তেমনই প্রতিক্রিয়া হলো আজ সকাল সকাল। আসলে মৃত্যুর মতো এমন অমোঘ সত্যকে
আমরা সচারচর মনের আড়ালেই রাখতে প্রয়াসী হই না কি? প্রতিদিনের কাজকর্মে, ভাবনা চিন্তায়,
আশা এবং আকাঙ্খায়, পরিকল্পনা এবং হিসেব নিকেশে আমরা তো জীবনকে নিয়েই চর্চা করি। করে
থাকি নিরন্তর। এবং ক্লান্তিহীন ভাবেই। আরেক মহাকবি আমাদের কেমন নির্মোহ চিত্তে তবু
তো বলে গিয়ে ছিলেন, “ তবুও তো পেঁচা জাগে গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায়— অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে”। সত্যিই তাই আমরা জীব জগতের সকল
বাসিন্দাই শেষ মুহুর্ত পর্য্যন্তও জীবনের চর্চাই করে থাকি। বেঁচে থাকার পরিকল্পনায়
কেটে যায় সমগ্র জীবন। তবু মৃত্যু আসে। যেমন আসার কথা হঠাৎ অতর্কিতে।
না, সেই মৃত্যুকে
অমোঘ জেনেও আমরা বরণ করে নিতে পারি না। মেনে নিতে প্রাণ ফেটে যায়। স্মৃতি আঁকড়িয়ে বসে
থাকি বাকি জীবন। যে চলে গিয়েছে তাঁকে নিয়ে স্মৃতির মণিকোঠায়। এক হৃদয় ভালোবাসায় আগলিয়ে।
এই যে ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার কাছে মৃত্যুও কি অকিঞ্চিতকর হয়ে যায় না শেষমেশ? একজন
মানুষ চলে গেলেই কি তার সব গল্প ফুরিয়ে যায় সহজে? যদি থেকে যায় ভালোবাসার অমেয় বন্ধন?
ভালোবাসার বন্ধন, না কি মৃত্যুর অপরিবর্তনীয় সত্য কার জোর বেশি? এই যে আজও আমাদের রবীন্দ্র
নজরুলকে নিয়ে আমরা পড়ে থাকি। সেই ভালোবাসার বন্ধন কি মৃত্যঞ্জয়ী নয়? এখানে মূল যে বিষয়টি।
সেটি কিন্তু মৃত্যুও নয়। সেটি ঐ ভালোবাসার বন্ধন। বন্ধন বলতে বাঁধন। সেই বাঁধন যদি
পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন মৃত্যুও কি পরাজিত হয়ে যায় না ভালোবাসার সেই বাঁধনের কাছে? আর
যদি সত্য সত্যই পরাজিত হয়ে যায় একবার। তখন কোথায় মৃত্যু। কার মৃত্যু? আমাদের ভালোবাসায়
বেঁচে থাকে সকলেই নাকি? আত্মীয় পরিজন। ভালোবাসার মানুষ সকল। তাহলে দেখা যাচ্ছে। মৃত্যু
যতই অমোঘ হোক না কেন। আমরা যাঁকে হৃদয়ে ধারণ করে রাখি। তাঁর মৃত্যু হয় না কখনোই। তিনি
আমাদের যেই হোন না কেন।
ফলে আপাত
দৃষ্টিতে মৃত্যুকে যতই মন খারাপের বিষয় বলে মনে হোক না কেন। যে মৃত্যুর সাথে ভালোবাসার
বাঁধন জড়িয়ে থাকে। সেই মৃত্যু ততটা মন খারাপের বিষয় থাকে না আর শেষমেশ। বরং স্মৃতি
হয়ে একহৃদয় ভালোবাসায় চিরঞ্জীব হয়ে ওঠে দিনে দিনে। মৃত্যুর সাথে সব গল্প শেষ হয়ে যায়
তখনই। যখন ভালোবাসার কোন সংযোগ থাকে না। কিন্তু ভালোবাসার সংযোগ থাকলে। গল্প শেষ হয়ে
যাওয়ার বদলে, গল্প নিত্যনতুন রসে সজীব হয়ে উঠতে থাকে। আর সেখানেই ভালোবাসার সঞ্জীবনী
শক্তি। একদিনের দুঃখ চিরদিনের শোক হয়ে ওঠার বদলে চিরকালের ভালোবাসা হয়ে মৃত্যুকেও বরণীয়
করে নিতে পারে। পারে ভালোবাসার মন্ত্রে। আর পারে বলেই এই সমাজ এই সংসার এই জীবজগত আজও
সজীব এবং রসে টইটুম্বর। না পারলে মৃত্যুশোকের দুঃসহ যন্ত্রণায় আমাদের জীবন থমকে যেত।
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতো। মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। জীবনের গল্পটা আসলে এইখানেই। জীবনের গল্পটা
এই নয় যে আমরা প্রত্যেকেই স্বার্থপর। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা কিংবা আপনি বাঁচলে বাপের
নাম বলে আমরা প্রিয়জন বিয়োগ ব্যাথা কাটিয়ে উঠে জীবনের সামনের দিকে পা বাড়িয়ে থাকি।
না, তা নয়। তা নয়। তাহলে আমাদের মনুষ্যত্ব নিয়ে গর্ব করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না
যে আদৌ। আমরা যে প্রিয়বিয়োগের ব্যাথাকে বুকে নিয়েও সামনের দিকে এগিয়ে চলতে পারি। তার
একটাই কারণ আমাদের ভালোবাসার সেই অমেয় বাঁধন। যে বাঁধনে প্রিয়জনকে আমরা বুকে ধারণ করে
রাখি। না শোকে নয়। শোকে নয়। শোকে ধারণ করা যায় না। শোক বোঝা হয়ে ওঠে। আমরা ধারণ করে
রাখি ভালোবাসার আনন্দে। তবেই না আমরা বিশ্বাস করি স্মৃতি সততই সুখের। এই ভাবেই আমাদের
ব্যক্তিগত জীবনের পরতে পরতে আমরা, যে মৃত্যুর দিক থেকে নিরন্তর মুখ ফিরিয়ে রাখতে চাই।
আসলে ভালোবাসার আনন্দে সেই মৃত্যুকেই আমরা বিফল করতে করতে প্রিয়জনের জীবনকে নিজেদের
ভিতর দিয়েই সার্থক করতে করতে সজীব করে রাখি আসলেই। না রাখলে আজ কোথায় রবীন্দ্রনাথ আর
কোথায় নজরুল। না সে শুধু তাদরে কীর্তি কাহিনী সৃষ্টি সম্ভারেই নয়। সে আমাদের নিখাদ
নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়। কয়জন প্রিয়জন এমন কীর্তি রেখে যায়। কিন্তু আমাদের জন্যে যে ভালোবাসা
মায়া স্নেহ প্রেম রেখে যায়। সেও কি কম কিছু? সেই আসলে সব। সেইখানেই যে নোঙর আমাদের
ভালোবাসার। যে ভালোবাসার শক্তিতে আমরা আসলেই কাটিয়ে উঠি প্রিয়জন বিয়োগ ব্যাথা। যাবতীয়
মৃত্যুশোক।
ফলে আরও একটু
যদি তলিয়ে দেখতে প্রয়াসী হই আমরা। দেখতে পাবো। মৃত্যু কি আসলেই শোকের বিষয় কোন? না
মনে হয়। মৃত্যু না থাকলে যে জীবনের কোন মূল্য থাকে না। জানি আমরা সকলেই সেকথা। শুধু
স্মরণে রাখতে চাই না। অমোঘ মৃত্যুর করাল গ্রাসই যেন একমাত্র সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। আর তখনই মৃত্যুর কোন প্রসঙ্গ উঠলেই মন খারাপ হয়ে যায়।
সকলেরই। বাদ যান না বাংলাসাহিত্যের শক্তিশালী কোন সাহিত্যিকও। মৃত্যুকে যখনই আমরা প্রিয়জনের
সাথে জড়িয়ে ফেলি বিশেষ করে তখনই। অথচ প্রিয়জনের সাথে যখন আমাদের ভালোবাসার বাঁধন পোক্ত
হয়ে ওঠে। সেই বাঁধন যত অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে। ততই সেই ভালোবাসায় আমরাই প্রিয়জনকে মৃত্যুরই
করাল গ্রাস থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসে চিরঞ্জীব করে তুলি নাকি? একবার অন্তত ভেবে দেখতে পারি
আমরা এই ভাবেও। আর এটা পারি আমরা কারণ, মৃত্যু মানেই সব কিছুর শেষ নয় বলেই। আসলেও মৃত্যুতে
শেষ হয়ে যায় না কিছুই। মৃত্যু জীবনকে পরিপূর্ণতা দেয় শুধু। যে পূর্ণতা ছাড়া জীবন দুর্বিষহ
হয়ে উঠতে পারতো। মৃত্যুতে পৌঁছিয়ে আমাদের জীবন পূর্ণতা পায়। তার আগে অব্দি জীবনে পূর্ণতা
আসে না। এই পূর্ণতাটুকু দিতে পারে বলেই মৃত্যুর পরেও আমাদের ভালোবাসার বাঁধন আলগা হয়ে
যায় না। গেলে প্রিয়জনের মৃত্য হওয়ার কথা একমাত্র তখনই। তার আগে শরীর চলে গেলেও মানুষের
মৃত্য হয় না কোনভাবেই। ফলে জীবনের পূর্ণতা মৃত্যুর ভিতর দিয়েই সার্থক হয়ে ওঠে একামাত্র।।
মৃত্যু যতই কষ্টদায়ক হোক না কেন। মৃত্যুতেই জীবন মিলতে পারে শাশ্বতের সাথে। মৃত্যুতেই
জীবনের সমাপন বিশ্বজীবনের বেদীতে। মৃত্যুর ভিতর দিয়েই একমাত্র জীবনের চলন আনাদী অতীত
থেকে অন্তহীন কালের অভিমুখে। না, তাই বলছিলাম। সেই মৃত্যুকে আড়াল করে নয়। তাকে দূরে
ঠেলে নয়। জীবনের সাথে মৃত্যুকে মিলিয়ে নিতে পারলেই আমরা অন্তরে অমোঘ শান্তিলাভ করতে
পারি। তখন মৃত্যুকেও আর শোক বলে মনে হওয়ার কথা নয়। শোক হতে পারে বিচ্ছিন্নতার সাথে।
মৃত্যুতে আমরা বিচ্ছিন্ন হই কি আদৌ জীবনের সাথে? হলে এই জগতে অন্তত আনন্দের কোন স্থান
থাকতো না বলেই মনে হয়। মৃত্যুতে বিচ্ছিন্ন হয় না কিছুই। মৃত্যুর ভিতর দিয়েই অনাদী অনন্ত
চিরজীবিত রয়ে যায়। সেটাই বিশ্ববিধান। আমাদের ভালোবাসার সেই বাঁধন, যে বাঁধনে আমরা প্রিয়োবিয়োগের
ব্যথাকেও আনন্দের স্মৃতির অনুভবে শুদ্ধ করে নিই। সেই বাঁধনও সেই বিশ্ববিধানেরই অংশ।
কোনকিছুই তাই বিচ্ছিন্ন নয় কোন কিছু থেকে। বরং পরস্পর সংলগ্ন। মৃত্যুকে বরং জীবন ও
পূর্ণতার মধ্যবর্তী অনন্ত সাঁকো বলেও অনুভব করতে পারি আমরা। চাইলে। যদি চাই।
১১ই আগস্ট’
২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

