শঙ্খ ঘোষের কলম বনাম রাজ্যরাজনীতি
পরিবর্তনের রাজ্যে চলা উন্নয়নের
সামগ্রিক সত্যকে তাঁর কবিতায় তুলে ধরে অনেকেরই বিরাগভজন হয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। কেউ
আবার হুঙ্কার ছেড়েছেন, উন্নয়ন নিয়ে কথা বলার কে এই শঙ্খ ঘোষ। কবি হিসাবে উদয়ই বা
হলেন কবে? তিনি শঙ্খের নাম অপমান করেছেন। তাঁকে শঙ্খ নামটা দেওয়াই না কি উচিৎ হয়নি
ইত্যাদি। একেবারে সরাসরি ব্যক্তি আক্রমণ কবিকেই। সেই আক্রমণকেই অনুমোদন করতে কেউ
আবার কবির বিরুদ্ধেই দোষারোপ করেছেন ব্যক্তি আক্রমণের। কেউ কবির নাম না নিয়েও
প্রশ্ন তুলেছেন আঁতেলরা হঠাৎ করে কলম ধরেন কেন? কেউ আবার কবির উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গ
করে বিশেষণ জুড়ে দিয়েছেন কাব্যপিতা বলে। কেউ বিষয়টিকে রাজনৈতিক চাপানউতোর বলে
উল্লেখ করে গোটা ঘটনাটিকে এড়িয়ে গিয়ে নিজের অবস্থান পোক্ত রাখতে চেয়েছেন। আবার
হাতে গোনা কেউ কেউ কবির পক্ষেই সওয়াল করেছেন। যাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাবেই তাঁদের
সমাজিক অবস্থানে ও রাজনৈতিক দর্শনে অটল। বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরগুলি খুব স্বাভাবিক
ভাবেই কবির পক্ষেই ওকালতি করতে এগিয়ে আসবে। সেটাই দস্তুর রাজ্যরাজনীতির। সবসময়েই
ঘোলাজলে মাছ ধরার আনন্দই আলাদা। বিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলির বিশ্লেষণ মতো
রাজ্যরাজনীতিতে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে থাকা বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুই
একমাত্র জানিয়েছেন, কবিকে নিয়ে এমন বিতর্ক সভ্য জগতে কেউ মেনে নিতে পারেন বলে তাঁর
বিশ্বাস নাই। কিন্তু মাত্র এই কদিন আগেই রাজ্যে সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিরুদ্ধে
প্রতিবাদ সরূপ মহামিছিলে সকলের সাথে অশীতিপর যে কবি পা মিলিয়ে ছিলেন অশক্ত শরীরেই,
তাঁর এহেন অসম্মানে কি ভাবছেন সেই মিছিলে অংশ নেওয়া সহ নাগরিকরা? আমরা সত্যিই ঠিক
জানি না। অন্তত জানার মতো কোন ঘটনা উঠে আসে নি এখনো সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরায়।
সামান্য কয়েকজন বাদে এখনো অব্দি অধিকাংশ চেনা মুখই জল মেপে যাচ্ছেন নিজের নিজের
বৃত্তে বসে। অনেকেই হয়তো কবি শঙ্খ ঘোষের বয়সেরও হিসাব কষছেন। অশীতিপর এই কবি আর
কদিনই বা আছেন, তাই তাঁর পক্ষ নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে যদি আম ও বস্তা দুই খোয়াতে হয়
শেষমেশ? অন্তত নিজের অবস্থানকে অরক্ষিত করে কোন একটা বিবৃতি দিয়ে ফেলার ঝুঁকিও
নিতে চাইছেন না অধিকাংশ চেনা মুখই। কিন্তু তাতে করে যে সাধারণ জনমানসে তাঁদের
ভাবমূর্তিতে সুবিধাবাদীর তকমা লেগে যেতে পারে, সেকথা বিলক্ষণই জানেন তাঁরা। আসলে
জনমানসে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার অলিন্দের
সখ্যতা। সাধ করে সেটি খোয়ানোর ঝুঁকি নিতে যায় কোন আহাম্মকে? তার থেকে অনেক বেশি
বুদ্ধিমানের কাজ হলো পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে জল মেপে যাওয়া নিজ নিজ বৃত্তে বসে।
সেটাই এই রাজ্যের হাল আমলের সংস্কৃতি। আমরা নিশ্চিত এসবই
জানেন কবি নিজেও। তাই তিনি কারুর ওকালতির অপেক্ষাও করেন না। সেই বিষয় নিয়ে ভাবেনও
না। তাঁর প্রজ্ঞা ও জীবনবোধ, দর্শন ও বিবেকের আলোই তাঁর রক্ষাকবচ। তাঁর আদর্শের
পথে যা যা করণীয় বলে তিনি মনে করবেন, সেটাই করে যাবেন কবি। করেছেনও অক্লান্ত
ভাবেই। বিগত সরকারের আমলেও তাঁকে প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রতিবাদে একেবারে সামনের
সারি থেকেই নেতৃত্ব দিতে দেখেছে রাজ্যবাসি। সেদিনও তিনি রাজরোষের তোয়াক্কা করেন
নি। আজও করেন না। তাঁর প্রতিবাদী কলম কোনদিন আদর্শচ্যুত হয়নি আজ পর্য্যন্ত সময়ে।
সেখানেই কবির মানবিক নোঙর। এদিকে কবির কবিতা নিয়ে বাকবিতণ্ডার বিষয়ে সাংবাদিকদের
তোলা প্রশ্নের জবাবে শাসকদলের মহাসচিব জানান, বিগত সরকারের আমলে নন্দীগ্রাম-পর্বে তৎকালীন
শাসকের ভুমিকার বিরুদ্ধে শঙ্খ ঘোষের কলম ধরা আর আজ উন্নয়ন নিয়ে কবিতা লেখা দুটি
সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অর্থাৎ রাজনীতির নিজস্ব আদর্শটুকু পরিস্কার। সরকার পক্ষে
থাকা আর বিরোধী পক্ষে থাকার ভিতর নীতির এই অতিসূক্ষ্ম ফারাকটুকুর নামই রাজনীতি।
তাই যে শঙ্খ ঘোষ বিগত সরকারে আমলে তৎকালীন বিরোধী দলের সম্মানধন্য, আজকে পরিবর্তিত
রাজনৈতিক অবস্থানে সেই শঙ্খ ঘোষই বর্তমান শাসক দলের বিরাগভজন হয়ে উঠলেন রাতারাতি।
একটি দেশের রাজনীতির এই যখন গতিপ্রকৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে
সমাজব্যবস্থার ভেতরটা বড়ো ফাঁপা হয়ে উঠেছে। যেখানে নৈতিকতার কোন আদর্শিক ভুমিকাই
অবশিষ্ট নাই আর।
নীতিহীন নীতির এই সময়ে কেবলমাত্র দলীয় রাজনীতির স্বার্থ
সংশ্লিষ্ট যা কিছু, তার বাইরে আর কোন কিছুই সহনীয় নয়। ঠিক এই কারণেই বর্তমান
শাসকদলের এতটা বিরাগভজন হয়ে উঠেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি যে লাগাতার ধামাচাপা দিয়ে চালিয়ে
নিয়ে যাওয়া এক সামাজিক বাস্তবকে তার সত্যমূল্যে উদ্ঘাটিত করে দেবেন, তাঁর
শক্তিশালী কলমে, সেটা হয়তো আগেভাগে আন্দাজ করতে পারেননি শাসকদলের অনেকেই। তাই ঝটকা
হয়তো এতটা জোরেই লেগেছে। লেগেছে বলেই তার প্রতিক্রিয়াও এতটাই তীব্র এবং অসংবৃত ও
অসংযত।
ঠিক এইখানেই প্রমাণ হয়ে যায়, প্রকৃত কবির কলমের শক্তির
জায়গাটা। শাসকদলের ভয়, কবির কলমে উদ্ঘাটিত বেআব্রু সত্যের প্রভাব পড়তেই পারে রাজ্যবাসীর
মনে। যাদের মনকে সর্বদা নিজদের রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকুলে রাখতেই সর্বদা স্বচেষ্ট
থাকে সরকারি প্রশাসনের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত যে কোন রাজনৈতিক দলই। এবং এই বিষয়ে ডান
বাম ও রাম কোন পক্ষের লক্ষ্য ও আদর্শের মধ্যেই কোন ফারাক নাই। এখন কেউ যদি হঠাৎ
দুমদাম করে সেই প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেন, তাহলে তো খুব স্বাভাবিক ভাবেই শাসকের
চোখরাঙানির সামনে পড়তে হবে তাঁকে। ঠিক এই জন্যেই রাজরোষের ভয় করে চলেন অধিকাংশ
বুদ্ধিজীবীই। কে আর সাধ করে খুঁচিয়ে ঘা করে। কিন্তু তিনি শঙ্খ ঘোষ। অশীতিপর জীবনে
একটি ভুখণ্ডের মানচিত্রের ওলোট পালোট থেকে নানান রাজনৈতিক ঘাতপ্রতিঘাত ওঠাপড়া ও
সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী তিনি। সেই হিমালয়সম অভিজ্ঞতার প্রজ্ঞায় স্থিতধী এই
মানুষটি সমাজ সভ্যতা আর মানুষের বিষয়ে যতটা সংবেদনশীল, আমরা অনেকেই হয়তো কেন,
নিশ্চয়ই ততটা নই। তাই আমরা আজ পুরোপুরি বুঝতেও হয়তো পারছি না, কতটা যন্ত্রণাদীর্ণ
কালিতে গর্জে উঠেছে কবির কলম। আমরা যারা রাজনীতির কারবারী নই। যাদের পাখির চোখ
সরকারী কোষাগারের দিকে নিবদ্ধ নয়। যাদের বিশেষ কোন দায়দ্ধতা নাই ক্ষমতার ঢাক
পিটিয়ে পিটিয়ে রাজ অনুগ্রহ লাভের। তাঁরা যেন অন্তত কবির কষ্টের কথাটা তাঁর
যন্ত্রণার ব্যাথাটুকু তাঁর লেখনীর মধ্যে থেকে ঠিকঠাক উদ্ধার করে নিতে পারি। কবি তো
কোন রাজনৈতিক পক্ষের জন্যে, কলম ধরেন নি। ধরেন নি কোন রাজনৈতিক পক্ষের বিপক্ষেও।
কবির কলম গর্জে উঠেছে, আমাদেরই ঘুম ভাঙানোর জন্যে। আমরা যেন এই সত্যটুকু অন্তত
অনুধাবনে সক্ষম হই। না হলে তাঁর সকল কথাই অরণ্যে রোদন হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে
কবির লেখা আমাদের পাঠকদের জন্যে। রাজনীতির কুশীলবদের জন্যে নয়। নয় সেই সব রাজ
অনুগ্রহ প্রার্থী বুদ্ধিজীবীদের জন্যেও যাদের মূল কাজই হলো মানুষকে বিভ্রান্ত করে
যাওয়া। তিনি কলম ধরেছেন আমাদের জন্যেই। তিনি দেখেছেন, কি সীমাহীন উদাসীনতায় আমরা
চোখ বুঁজে মনে করছি, ‘এমনি ভাবেই যায় যদি দিন যাক না’। না এই ভাবেই দিন যাবে না।
যেতে পারে না। কবি যে জানেন সে কথা। সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে চান কবি শঙ্খ ঘোষ।
তাঁর অমোঘ লেখনীর জাদুতে।
তাই আজকেও যদি মানুষ জেগে না ওঠে, কেবলই রাজনৈতিক
বাকবিতণ্ডার পক্ষে বিপক্ষে ওকালতি করে যাওয়া রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষীদের কথায়
প্রভাবিতই হতে থাকে, তবে কোন উন্নয়নই জাতিকে রক্ষা করতে পারবে না অদূর ভবিষ্যতেই
মুখ থুবড়ে পড়া থাকে। এমনিতেই সারা ভারতে অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায় থেকে বাঙালি
জাতি হিসাবে আমরা এখনই ধুঁকতে শুরু করে দিয়েছি। আমাদের সেই নুব্জ শিরদাঁড়ায় ধুঁকতে
থাকার দিনও শেষ হবে না। এমনই ভাবে জেগে ঘুমাতে থাকলে। যেখানে উন্নয়নের দামামায়
নাচতে নাচতে উন্নয়নের খাঁড়ায় লেগে থাকা আমারই সহ নগরিকের তাজা রক্তের দুঃসহ ছোপও
দেখতে পাবো না। দেখার চেষ্টাও করবো না। করছি না। করছি না বলেই কবির কলম কথা বলে
উঠেছে। যাতে আমাদের দিবানিদ্রা ভাঙে। তাই মনে রাখতে হবে কবির কলমের এই গর্জন, কোন
রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য নয় আদৌ। নয় কোন নেতা বা নেত্রীর বিরুদ্ধাচারণ করার জন্যেও।
কবি অতখানি সীমিত মাপের মানুষই নন। তাই তাঁর কলমের বিরুদ্ধে কার কি প্রতিক্রিয়া
হলো কি হলো না, তার থেকেও অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের জাগ্রত
ঘুম ভাঙলো কি ভাঙলো না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিবর্তন উন্নয়ন ইত্যাদি শব্দমালার
তালে তালে নাচতে নাচতে প্রকৃত বাস্তবতাকে চিহ্নিত করতে পারলাম কি পারলাম না আমরা।
গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বাস্তবতার মুখেমুখি হতে পিছিয়ে যাবো কি এগিয়ে যাবো সেইসবই।
অন্য কিছুই নয়।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

