প্রসঙ্গ যখন শিক্ষা
মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা
শিক্ষা মানুষের জন্মগত অধিকার। শিক্ষা গড়ে তোলে
সুনাগরিক। সুনাগরিকের হাতে সুন্দর হয় সমাজ। রাষ্ট্রের উন্নতিতে
যার ভূমিকা অনস্বীকার্য্য। ফলে এই শিক্ষা বিস্তারের
সাফল্যের উপরই একটি দেশের সর্বাঙ্গীন উন্নতি নির্ভরশীল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে
প্রথম বিশ্বের সমস্ত দেশে এই প্রাথমিক শর্তটি সফলভাবে রূপায়িত হয়েছে। এই সব দেশে আজকে
প্রায় সব মানুষই শিক্ষার আলোয় আলোকিত। সেই আলো সমাজের সর্বত্র সুফল
ফলাতে কার্যকরি ভূমিকা নিয়েছে। সামাজিক উন্নতির ফল ভোগ করছে
আপামর জনসাধারণ। আমাদের দেশের চিত্রটি একটু ভিন্ন। এ দেশে অধিকাংশ মানুষই
শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত। শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষরাও শিক্ষার আলোকে সমাজে
ছড়াতে তত সফল নন।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড স্বরূপ। তাই শিক্ষাকেই
উন্নতকামী দেশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ধরা উচিত। যেকোনো উন্নত দেশের
শিক্ষা প্রসারের মাধ্যম মাতৃভাষা। কেননা মাতৃভাষা বাদ দিয়ে কোনো
দেশে সার্বিক শিক্ষাবিস্তার সম্ভব নয়। নয় সার্বিক শিক্ষার উৎকর্ষতা
অর্জন। একমাত্র প্রারম্ভিক শিক্ষা থেকে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা সম্বলিত
উচ্চশিক্ষার সমস্ত স্তর অব্দি শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা হলেই; দেশের সার্বিক
মেধার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। তাছাড়া কিছু মানুষ তাদের
মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারলেও, দেশের অধিকাংশ মানুষের মেধাই বিকশিত হয় না। কারণ শিক্ষার উদ্দেশ্য
বই মুখস্ত করে পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানো নয়। মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মনুষত্বের পূর্ণ উদ্বোধন। আর সেটা সম্ভব হয়
একমাত্র, মেধার সম্পূর্ণ বিকাশে। কিন্ত মেধার সেই সম্পূর্ণ
বিকাশ শুধুমাত্র অল্প কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে, জাতির উন্নতি
হয় না। হয় না দেশের উন্নয়ণ। সেই কারণেই একটা জাতির যেটা
প্রাণের ভাষা, তার মাতৃভাষা, সেই ভাষাতেই শিক্ষাবিস্তার একান্ত
জরুরী। এই জরুরী বিষয়টাকে শিক্ষাবিস্তারের প্রথম শর্ত করতে হবে। এটি সর্ব কালেই সব
দেশের পক্ষেই সর্বাংশে সত্য। দুঃখের বিষয় সেই প্রথমিক
শর্তটিই এই বাংলায় আজ পর্য্যন্ত পুরণ করা হয়নি। হয়নি সক্ষমতার অভাবে
নয়। হয়নি সদিচ্ছার অভাবে। হয়নি স্বাজাত্যবোধের অভাবে।
এখন ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে অনেকেই শিক্ষার মাধ্যম
হিসেবে ইংরেজির পক্ষেই যুক্তি সাজাবেন। এত ভিন্ন ভাষার দেশে সাধারণ
ভাষা হিসেবে ইংরেজির গুরুত্ব সর্বাধিক। এমনটাই তাদের যুক্তি। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেটা যোগাযোগের
মাধ্যম হিসেবে সত্য। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সত্য নয়। কারণ শিক্ষার একটা
দেশজ প্রকরণ আছে। যা দেশের সংস্কৃতির সাথে জলবায়ুর সাথে মনমানসিকতার সাথে ওতোপ্রতো
ভাবে জড়িত। সেখানে কেরলের সাথে বাংলার মিল নেই। বাংলার সাথে কাশ্মীরের
মিল নেই। কাশ্মীরের সাথে মিজোরামের কোনো মিল নেই। এই যে বিভিন্নতা এই
বিভিন্নতাকে অস্বীকার করলে শিক্ষার সেই সার্বিক প্রসার ও মেধার সেই পূর্ণ বিকাশ
সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন হল প্রতিটি রাজ্যে সেই রাজ্যের
মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করতে পারলে, প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষার সকল
স্তরে সেই রাজ্যের ভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার শর্ত পূরণ করতে পারলে সেই রাজ্যের
সার্বিক মেধার বিকাশ নয় সম্ভব হল। কিন্তু এত বড় ভারতবর্ষের
কেন্দ্রীয়স্তরে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চাই বা কি ভাবে হবে আর রাজ্যগুলির মধ্যে
পারস্পরিক যোগাযোগের সমন্বই বা কি ভাবে সংগঠিত হবে? এর একটাই উত্তর। মাধ্যমিক স্তরের পর
দুই বছর আবশ্যিক ভাবে কমুনিকেটিভ ইংলিশ শেখানোর বন্দোবস্ত করতে হবে আধুনিক
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। এটা খুবই সম্ভব। এটির জন্য প্রাথমিক স্তর থেকে
ইংরেজি শেখানোর কোনোই দরকার নেই।
অনেকেই ভাববেন মাত্র দুই বছরে কি এমন ইংরেজি
শিখবে যে একেবারে ইংরেজিতে দিগ্বজ হয়ে যাবে? না ইংরেজিতে দিগ্বজ হবে না নিশ্চয়ই। হবার দরকারই নেই। কিন্তু ঐটুকু
ইংরেজীতেই নিজের অধিত বিদ্যা অর্জিত শিক্ষায় সারা দেশের সাথে ও সারা বিশ্বের সাথে
যোগাযোগ সম্ভব। উদ্দেশ্য তো শুধু ইংরেজীতে অনর্গল কথা বলতে পারা নয়? উদ্দেশ্য মানব
সম্পদের উন্নয়ণ। উদ্দেশ্য সম্পদ সৃষ্টি। উদ্দেশ্য জ্ঞানবিজ্ঞান
চর্চার উৎকর্ষতা বৃদ্ধি। এবং সেই সাথে সারাদেশের ও বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ দৃঢ়
করা। সেই যোগাযোগ ঐ কমুনিকেটিভ ইংলিশেই সম্ভব। বিশ্ব আমাদের
জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সুফল নিতে উৎসাহী। আমাদের ইংরেজী ভাষায় বুৎপত্তি
নিয়ে বিশ্বের আগ্রহ নেই।
অনেকেই সন্দিহান হবেন এই প্রস্তাবে। ঠিক, ভারতবর্ষের
বর্তমান শাসন পদ্ধতিতে এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে সম্পূর্ণ
আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই কমুনিকেটিভ ইংলিশ সারা দেশের সব অঞ্চলে শিক্ষার
বন্দোবস্ত করার মতো পরিকাঠামো বর্তমানে নেই। কিন্তু সে তো প্রাথমিক স্তর
থেকে উচ্চশিক্ষাতেও;
মাতৃভাষায় শিক্ষার উপযুক্ত পরিকাঠামো ও ব্যবস্থাও বর্তমানে কোথাও
নেই। কিন্তু নেই বলেই অসম্ভব তা নয়। সম্ভব করার সদিচ্ছা
নেই বলেই পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আমাদের সেই পরিকাঠামো গড়ে
তোলার জন্য সমাজের সর্বস্তর থেকে সদর্থক
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরী। যে আন্দোলনের অভিমুখ হবে মানুষ
গড়ার শিক্ষার সার্বিক প্রসার।
এখন প্রশ্ন হল, ভিনরাজ্যের অধিবাসীদের ছেলে
মেয়েরা কোন মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করবে? এখানে বুঝতে হবে
তারা ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশে গেলে কি হতো? না সেই দেশের
মাতৃভাষায় শিক্ষার্জন করতে হতো। প্রথমে কিছু অসুবিধে হলেও সেই
দেশের পরিবেশেই সময় মতো তাদের ভাষা সরগর হয়ে যেত। এবং এরকমই হয়ে থাকে। ফলে ভারতবর্ষের এক
রাজ্যের ছেলে মেয়েরা অন্য রাজ্যে থাকলে সেই রাজ্যের ভাষাতেই লেখা পড়া করবে একই
রকম ভাবে। এতো গেল শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার গুরুত্ব। মজার কথা সকল উন্নত
জাতিই এই নীতি অনুসরণ করে। কিন্তু ভূতপূর্ব পরাধীন
দেশগুলিই শুধু শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হয়। আমরাও হয়েছি।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ডিগ্রী বিতরণ নয়। কিন্তু এইটিই আমরা
ভুলে থাকি। পরীক্ষার পত্রে নম্বর তোলাই কৃতিত্ব বলে বিবেচিত হলে শিক্ষার মান
অবশ্যম্ভাবি ভাবে নিম্নমুখী হতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে একদিকে
মুখস্থবিদ্যার চর্চা আর অন্যদিকে অসাধু উপায়ে নম্বর তোলার চর্চা বৃদ্ধি পেতে
বাধ্য। এতে ছাত্র ছাত্রীদের মৌলিক চিন্তা বিকাশের স্ফূরণ ঘটে না। ফলে মেধা সম্পদের
বৃদ্ধি হয় না। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে গেলে পরীক্ষা নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায়
আনতে হবে মৌলিক পরিবর্তন। যেখানে ছাত্র শিক্ষকের অনুপাত এমন জায়গায় আনতে হবে, যে প্রতিটি
ছাত্রছাত্রী শিক্ষকের সরাসরি মূল্যায়ণের আওতায় থাকবে। মেধার মূল্যায়ণটি
জরুরী। বিকাশের জন্য।
শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের হতে হবে মানুষ গড়ার
কারিগর। স্কুল কলেজে লেখাপড়ার পদ্ধতিরও চাই মৌলিক পরিবর্তন। হোমটাস্ক দিয়ে প্রকৃত
শিক্ষিত তৈরী হয় না। বিদ্যালয় শিক্ষকের প্রাইভেটে পড়িয়ে; পরীক্ষার
বৈতরণী পাশ করাতে পারা যতদিন কৃতিত্ব বলে বিবেচিত হবে ততদিন মৌলিক মেধার বিকাশ
সম্ভব নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারী ব্যায়বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষাকে সম্পূর্ণ
অবৈতনিক করা সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। মাধ্যমিক শিক্ষা
বাধ্যতামূলক করা ছাড়া সর্বিক শিক্ষার বিস্তার অসম্ভব। মানুষ গড়ার শিক্ষাকে
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক মর্য্যাদা দিতে হবে। শিক্ষা বিস্তারের
উদ্দেশ্য হোক স্বদেশের মানবসম্পদের উন্নয়ন।
পশ্চিমবঙ্গে ছাত্ররাজনীতির
চারদশক
সর্বনাশটা শুরু হয়েছিল নকশাল আন্দোলনের সামূহিক
ব্যার্থতার সরাসরি কুফল থেকেই। রাজ্য মেধাশূন্য এক মধ্যমেধার রামরাজত্বে পরিণত হয়ে
গেল। সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি এইটাই যে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মানসিকতায় দেশ সমাজ ও জাতির
আর কোনো প্রাসঙ্গিকতাই রইল না। কেবলমাত্র নিজের পেশাগত উন্নতিই জীবনের প্রধানতম
লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালো। যার ফলে দেশ থেকে মেধা নিষ্ক্রমণ হয়ে দাঁড়ালো যুগধর্ম। আর এই
বিষয়ে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেসী প্রশাসন চূড়ান্ত সফল হয়েছিল তাদের প্রশাসনিক
তৎপরতায় ও বর্রবতায়। ভীত সন্ত্রস্ত অভিভাবকমণ্ডলী নিজেদের সন্তানদেরকে রাজনীতির
প্রাঙ্গন থেকে সড়িয়ে নিতে ব্যগ্র হয়ে উঠলেন।
আর সেই শূন্যতা ভরাট করতেই রামরাজত্ব শুরু হলো মধ্যমেধার।
এরাজ্যে সত্তর দশকের মধ্যভাগ থেকেই এই সংস্কৃতি
গ্রাস করলো গোটা সমাজ জীবনকে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা মনে করল প্রত্যক্ষ রাজনীতি
চর্চার নীট ফল শূন্য;
তাই তারা নিজেদের পেশাগত উন্নতিকেই পাখির চোখ করা শুরু করল। বাবা
মায়েরাও ছেলে মেয়েদের ডাক্তার ইঞ্জীনীয়র করার ইঁদূর দৌড়ে ঠেলে দিতে থাকলেন।
কারণ নকশাল আন্দেলনের চূড়ান্ত ব্যর্থতার
সুযোগে মধ্যমেধার বুদ্ধিমানেরা ততদিনে সব পাদপ্রদীপের আলোতে আলোকিত হতে শুরু করে
দিয়েছে। ছাত্রদের চেতনায় দেশ ও জাতি গঠনের নতুন দিনের স্বপ্ন দেখার যুগের অবসান ঘটল খুব দ্রুত। আর এই সুযোগে- কংগ্রেসী আমলের অবসান ঘটিয়ে সদ্য ক্ষমতায় আসা সিপিএম তাদের তিন দশকের
সাম্রাজ্য বিস্তারে হাতিয়ার করলো এই মধ্যমেধা চর্চার পরিসরটিকেই। সেই পথেই গোটা
শিক্ষা ব্যবস্থাই হয়ে উঠল সিপিএম-এর ভোটব্যাঙ্কের সেফটি ভল্ট।
সেদিন জ্যোতিবসুর নেতৃত্বাধীন সিপিএম বোঝেনি এই
ব্যবস্থা গোটা জতির পক্ষেই একদিন চূড়ান্ত অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে। বোঝেনি কারণ, বোঝার জন্যে যে
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম লাগে, সেটা তাদের ছিল না। তাদের
কাছে পার্টির প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন ও সেই শক্তি ধরে রাখাই মূল বিবেচ্য ছিল। দেশ গঠন
ও জাতি গঠনে সমাজবিপ্লবের যে ভূমিকা, সেই ভুমিকা পালন করার
মতো কোন যোগ্যতাই এই পার্টি ও তার কোনো নেতৃত্বেরই ছিল না। তার ফল স্বরূপ ক্ষমতার
ননী মাখন খেতে পার্টিতে বেনোজল ঢোকার রাস্তাটাও বিশাল রাজপথ হয়ে গেল। আর সেই পথেই
সিপিএম-এর হাত ধরে এরাজ্যে দূর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণ ঘটল খুব দ্রূত। যার ফলে সামাজিক
অবক্ষয়ের পরিসরটি বিস্তৃত হল পুরোপুরি।
আর সেই অবক্ষয়ের সর্বপ্রথম আঘাত পড়লো
শিক্ষাব্যবস্থার আঁতুরঘর রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিসরে ও শিক্ষা ব্যবস্থার
সামগ্রিক পরিকাঠামোতেই। প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠল ক্যাডার তৈরীর
কারখানা। পার্টির তৈরী করে দেওয়া শেখানো বুলির তোতাপাখি হিসেবে গড়ে তোলা হতে থাকল
যুবসম্প্রদায়কে। যাদের হাতে পড়ে রইল একটাই লক্ষ্য; পার্টির ভোটব্যাঙ্ক বাড়ানো আর
সেই সুযোগে সরকারী চকুরীর প্রসাদ পাওয়া।
মৌলিক চেতনার পূর্ণ বিকাশে শিক্ষার আর কোনো ভূমিকাই থাকল না। একদল তাদের
মেধার যোগ্যতায় পাড়ি দিতে থাকল রাজ্যের বাইরে। আর একদল ছাত্ররাজনীতির নামে আখের
গোছানোর কাজে নিবিষ্ট থাকল। রাজনৈতিক নেতানেত্রীর শেখানো বুলির বাইরে তাদের
বুদ্ধিবৃত্তি পুষ্ট হল না আর। যে কোন জাতির পক্ষেই এ এক ভয়ঙ্কর অবস্থার অশনি
সংকেত। দুঃখের বিষয় সিপিএম-এর নেতৃত্বের, এই আশনি সংকেত
অনুধাবন করার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল না সেদিন। উল্টে তাঁদের নির্দ্দিষ্ট
পরিকল্পনায় ছাত্ররাজনীতিকে গড়ে তোলা হল পার্টির ভোটব্যাঙ্ক বৃদ্ধির দুরন্ত হাতিয়ার
হিসেবেই। গোটা রাজ্যের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের পতাকার তলায় নিয়ে আসতে
পারার বিজয়াল্লসেই তারা তখন মত্ত। সেই সাথে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক
অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগে পার্টির প্রতি আনুগত্যই যোগ্যতার প্রথম ও প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ালো
দিনে দিনে। এইরকম নিষ্ছিদ্র বন্দোবস্তের সফল বাস্তবায়নে সিপিএম যখন আনন্দে
আত্মহারা তখন তলায় তলায় রাজ্যে বছরের পর বছর বিকলাঙ্গ মানসিকতার প্রজন্ম গড়ে উঠতে
থাকল। যাদের কাছে পার্টির পতাকা জড়িয়ে ব্যক্তিগত আখের গোছানোই জীবনের মূলমন্ত্র
হয়ে উঠল। উঠল শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণ থেকেই।
তাই গত তিনদশক ধরেই এরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার মান
ক্রমাগত নীচে নামতে নামতে আজকে সিপিএম-এর বংশধর এই তৃণমুলী আমলে এসে তলানীতে
ঠেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয় আজ আর জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র নয়। সরকারী চাকুরীর
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্যতম আখরা আর সরকারী দলের ভোটব্যাঙ্কের নাটবল্টু উৎপাদনের
কারখানা মাত্র। এই পরিসরে মধ্যমেধার সুবিধেভোগী বুদ্ধিজীবিদেরই রমরমা। তাই তারাই নানান ভাবে
এই শিক্ষাব্যবস্থার পরিকাঠামোতে যুক্ত হয়ে ক্ষমতার ননী মাখন চাটতে ব্যস্ত। আর বর্তমান শাসকদল
সিপিএমের তিনদশকের আখের গোছানোর পরিকল্পনাকে প্রথম তিন মাসেই সফল করে ফেলেছে। তাই
বর্তমানে প্রকৃত সৎ ও মেধাবী শিক্ষাব্রতী মানুষদের পক্ষে এই রাজ্যের কোনো শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানেই কাজ করা শুধু অসম্ভবই নয়, নিরাপদও নয়। তাই যঃ পলায়তি সঃ
জীবতি।
বস্তুত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেসী আমলের নকশাল আন্দোলনকে দমন করার রাজনৈতিক ফয়দাটি
পরিপূর্ণ সদ্ব্যব্যহার করেই সিপিএম-এর সাড়ে তিনদশকের রাজত্ব। দেশে মধ্যমেধার রমরমা
চললেই ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে একটানা রাজত্ব চালানোর সমূহ সুবিধে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের
এই মূলসূত্রটি জ্যোতিবসুর নেতৃত্বাধীন পার্টি খুব ভালো করেই জানতো। আর সেই কাজেই
রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডটি জ্যোতিবসুর আমল থেকেই ভেঙ্গে ফেলা শুরু হয়েছিল
খুব দক্ষতার সাথেই। কিন্তু তখন তাঁরা বোঝেননি, তাঁদের সেই অপকর্মের ফলশ্রুতি একদিন কি ভয়ানক হতে পারে। যে ধারার
সূত্রপাত তাঁরা করে গেলেন, তা যে কি বিদ্ধংসী সংস্কৃতির জন্ম
দিয়ে গেল, আজকে পরিবর্তনের প্রথম চার বছরেই রাজ্যবাসী তা
মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পারছেন। এ যেন সন্ত্রাসীদের হাতে পরমাণু বোমার চাবিকাঠি
তুলে দেওয়ার মতো ব্যাপার।
তাই আজ যখন ভুতপূর্ব শাসকদলের নেতানেত্রীদেরকে
বর্তমান প্রশাসকের দিকে সমালোচনার তর্জনী তুলতে দেখা যায়, রাজ্যবাসী তখন
আর সেই তর্জনীকে বিশ্বাস ও ভরসা কোনোটাই করতে পারে না। চূড়ান্ত দুঃখের বিষয় এটাই, আজকে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার চূড়ান্ত অবক্ষয় দেখেও ভুতপূর্ব শাসকদলের
নেতানেত্রী থেকে একনিষ্ঠ ভক্তদের কাউকেই তাদের পার্টির এমন ক্ষমাহীন অপকর্মের জন্যেও আত্মসমীক্ষা করতে
দেখা যায় না। দেখা যায় না নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে সামান্যতম হলেও লজ্জিত হতে। এটাই
এ রাজ্যের চরিত্র।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

