নারীজন্ম ও ব্যক্তিস্বাধীনতা



নারীজন্ম ও ব্যক্তিস্বাধীনতা

আধুনিক সমাজ সভ্যতায় নারীর অবস্থান সব দেশেই অল্পবিস্তর দ্বিতীয় সারিতে। দ্বিতীয় সারি কারণ আবিশ্ব পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সংসার থেকে সামাজিক পরিকাঠামোয় এবং রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক স্তরে সর্বত্রই পুরুষতন্ত্রের হাতেই মূল কর্তৃত্বের চাবিকাঠি। ব্যক্তি নারীকে এই পরিসরেই তার ব্যক্তি স্বাধীনতাকে রচনা করে নেবার জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যেতে হয় আজীবন। ঘরে বাইরে সর্বত্রই তাকে এই পুরুষতন্ত্রের চোখ রাঙানির আশংকাকে মাথায় রেখেই চলাফেরা করতে হয় নিজের ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েই। ফলে নিজের ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে নিজের ইছামতো কার্যকর করা সম্ভব হয় না অধিকাংশ নারীর পক্ষেই। এই পরিসরেই সম্বচ্ছর নারীদিবস পালিত হচ্ছে বিশ্বজুরে কিন্তু এখন প্রশ্ন হল প্রতি বছর নারীদিবসের এই আনুষ্ঠানিকতায় নারীর ব্যাক্তি জীবনে কতটুকু সুফল ফলেছে। বা ফলেছে কিনা আদৌ?

অনেকেই বলবেন কেন ঘরে ঘরেই তো এযুগের নারীরা যথেষ্ঠই স্বাধীনতা ভোগ করে চলেন। এখানে একটা বিষয় বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করার আছে। ‘যথেষ্ঠ স্বাধীনতা’ আর ‘ভোগ করে চলেন’। যথেষ্ঠ অর্থাৎ সম্পূর্ণ নয়। সম্পূর্ণ নয় কেন? কারণ'এটা অর্জিত স্বাধীনতা নয়। পুরুষতন্ত্র স্বাধীনতার যতটুকু পরিসর যখন যেমন যেখানে যেমন দিয়েছে বা দিচ্ছে নারীকে, ঠিক ততটুকুই। তার বেশি নয় মোটে। এবং দ্বিতীয় যে কথাটি  বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় সেটি হল ঐ ‘ভোগ করে চলেন’ যেন এটা তাদের ভোগ করার কথা নয়, অথচ সমাজ এখন তাদের এটা ভোগ করতে দিচ্ছে। এই দেওয়ার মধ্যে সমাজের যেন একটা বদান্যতাই প্রকাশ পাচ্ছে। লক্ষণীয় হল এইটাই যে এইটিই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন। আমাদের গোটা সমাজটাই  নারী স্বাধীনতার বিষয়ে অল্পবিস্তর এই মনোভভাব পোষণ করে। আর ঠিক এই জায়গাতে এসেই ঠোক্কোর খায় নারী স্বাধীনতার মূল বিষয়টি।

আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ঘর সংসারের পরিধিতেই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার বাস্তব প্রেক্ষাপটটি তৈরী হয়ে যায়। গৃহস্থলীর পরিসরেই শৈশব থেকেই শিশুর ধারণায় পিতা মাতার ব্যক্তি স্বাধীনতার পৃথক ধরণটি মনের মধ্যে গেঁথে যায়। এবং বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথেই সেই ধারণাগুলি আরো পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে চেতন অবচেতন মনের চৌহদ্দিতে। যার থেকে আমরা সহজে আর বেতেই পারি না। ফলে প্রেম বিবাহ ঘরসংসার সন্তান মানুষ করা থেকে সমাজ সংসারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই ধারণাগুলিই আমাদের পরিচালিত করতে থাকে, কি নারী কি পুরুষকে।

বস্তুত আমাদের ব্যক্তি জীবনে পুরুষ তার ব্যক্তিগত মনোবৃত্তির আঙিনায় তার ভালোবাসার নারীকে, সে তার স্ত্রী কিম্বা কন্যা যাই হোক এমনকি জননী হলেও, যতখানি ভালোবাসতে পারে, ততখানিই স্বাধীনতা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ বর্তমান যুগে নারীর ব্যাক্তি স্বাধীনতার প্রাথমিক পরিসরটিই নিয়ন্ত্রিত হয় তারই ভালোবাসার পিতা কিম্বা স্বামী এমনকি পুত্রের হাতে। আর এখানেই নারীর ব্যাক্তি স্বাধীনতার ধারণাটি সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা খায়। আপাত দৃষ্টিতে মনে হওয়া স্বাধীনতাটি যে ঘরের পুরুষের নিয়ন্ত্রানাধীন বা ইছাধীন সেকথা আমাদের অনেকেরই খেয়াল থাকে না স্বভাবতই। সমাজচর্চিত নারীবাদের অসারতার এইটি একটি দুঃখজনক দিক। দুঃখজনক কেননা নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণাটি তার ঘরেই সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হতে থাকে। অথচ ওপর থেকে আমরা টের পাইনা তেমন। হ্যাঁ যে সব সংসারে নারী দৃশ্যতই অবরূদ্ধ, সরাসরি পুরুষের অঙ্গুলি হেলনে ওঠা বসা করতে বাধ্য হয় প্রতিনিয়ত, তাদের কথা আলাদা, সেখানে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার অভাবটি স্পষ্টতই ধরা পরে। বোঝা যায়। কিন্তু তথাকথিত প্রাগ্রসর পরিবারেও নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার সুতোটি যে ঘরের পুরুষদেরই হাতে থাকে সেকথা খোলা চোখে ধরা পরে না অধিকাংশ সময়েই।

অথচ দৈনন্দিন জীবন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আবিশ্ব প্রচার ও উন্মাদনাতেও আমাদের ঘর গেরস্থলীতে নারীর ব্যাক্তি স্বাধীনতার পরিসরটি যেখানে যেমন, সেখানে ঠিক তেমনই দাঁড়িয়ে থাকে। তাতে আমাদের বিন্দুবিসর্গও কোনো পরিবর্ত্তন হয় না। না মনে না চেতনায়, না জীবনবোধের দীপ্তিতে না কর্ম পদ্ধতিতে। ফলে ঘরসংসারের চৌহদ্দিতেই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে নারীদিবসের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। এই ধারণাটিকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বের করে নিয়ে এসে আমাদের মন মনন মানসিকতার পরিবর্ত্তনের কাজে লাগাতে হবে অত্যন্ত সদর্থক ভাবে। মনে রাখতে হবে আমাদের চেতনার আমুল পরিবর্ত্তন ব্যাতিরেখে নারীদিবসের প্রাসঙ্গিকতা সার্থক করে তলা যাবে না কিছুতেই।

এখন কিভাবে সম্ভব চেতনার এই আমুল পরিবর্ত্তন? শুরু করতে হবে সেই ঘরগেরস্থলী থেকেই। শুরু করতে হবে শিশুর শৈশবের পরিসর থেকেই। শিশুর সামনে পিতা মাতার সমান ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিসরটিকে প্রথমাবধি নিশ্চিত করতে হবে। পারস্পরিক নির্ভরতার সৌহার্দ্যের বাতাবরণটি পারস্পরিক শ্রদ্ধার বেদীমুলে যত দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তত সুন্দর ভাবেই গড়ে উঠবে শিশুর চেতনায় পিতা মাতার সমান ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণাটি। শৈশবের এই পরিবেশের প্রভাব শিশুর চেতনায় যে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে তার ঐ মন মনন মানসিকতার ভিত,যার উপর দাঁড়িয়ে থাকবে তার পরবর্তী জীবনের নারী স্বাধীনতার চেতনার মুল ধারাটি। ঘরে ঘরে এই ভাবে শৈশব থেকেই চেতনার বিকাশ সংঘটিত হলেই সামাজিক পরিসরের অনেক বড়ো গণ্ডিতেই সার্থক হয়ে ওঠার সুযোগ থাকবে নারীদিবসের প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি।

ফলে ভবিষ্যতের নাগরিকদের সঠিক ভাবে গড়ে তোলার মধ্যে দিয়েই নারীর ব্যাক্তি স্বাধীনতার বিষয়টি সুনিশ্চিত হতে পারে। এখন দেখতে হবে কিসের উপর ঘর গেরস্থলীর চৌহদ্দিতে নারী পুরুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়টি নির্ভরশীল? আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঘর সংসারের আর্থিক ব্যায়ভারের দায়িত্বটি যেদিন থেকে পুরোপুরি পুরুষের কাঁধে ন্যাস্ত হয়েছিল মূলত সেইদিন থেকেই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়টি গুরত্বহীন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সাংসারিক আর্থিক স্বাধীনতা পুরুষের করতলগত হওয়াই নারীর ব্যাক্তিস্বা ধীনতার পরিসরটিকে সংকুচিত করে দেওয়ার মূল কারণ। আর এই কারণেই মেয়ের বিয়েতে আর্থিক সচ্ছ্বল পাত্রের খোঁজ পড়ে এত বেশি। এটাই ধরে নেওয়া হয় সংসারের আর্থিক ব্যায়ভার পুরুষের এক্তিয়ার ভুক্ত, আর ঘরগেরস্থলী সামলানোর দায়িত্ব নারীর। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য আর্থিক স্বনির্ভরতা যেহেতু সবচেয়ে বড়ো বিষয়, সেইহেতু সংসারে পুরুষের একাধিপত্য নারীর ব্যাক্তিস্বাধীনতার পরিসরটিকেই সংকুচিত করে দেয়। বর্তমানে দিন অনেক বদলিয়েছে। ঘরে ঘরেই স্বামীস্ত্রী উপার্জনশীল,কিন্তু পুরুষ একাধিপত্যের চিত্রটি কিন্তু এতটুকু বদলায়নি। তার আরো দুইটি কারণ রয়েছে। প্রথমত দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বামীর রোজগার স্ত্রীর রোজগারের থেকে বেশি ফলে সংসারের নীতি নির্ধারণ থেকে সংসার পরিচালনা, গুরুত্বপুর্ণ সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহন,সব বিষয়েই স্ত্রী স্বামীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, যার ফলে স্ত্রীর ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিসর স্ত্রীর নিজের গরজেই সংকুচিত। দ্বিতীয়ত, সামাজিক পরিসরে পুরুষ একাধিপত্যের প্রভাবে এবং আজন্ম লালিত চেতনায়, আর্থিক ভাবে বলশালী পুরুষ না্রীর ব্যক্তি সাধীনতাকে স্বীকার করতেই রাজী নয়। ফলত এই বিষম ব্যাক্তি স্বাধীনতার পরিসরটিকে দ্রুত বদলাতে না পারলে সমাজ সংসারের পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন সম্ভবই নয়।   
       
তাই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নটি নির্ভর করছে আর্থিক স্বনির্ভরতা, নারী পুরুষের ভিতর স্বাধিকারবোধের সাম্যের প্রতিষ্ঠার উপরেই মূলত। আমাদের সামাজিক পরিসরে তাই এই বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির আশু প্রয়োজন। তবেই নারীদিবসের সার্থকতা। সমাজের সকল স্তরেই নারীর অবস্থার উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক ভাবে কাজ করে যেতে হবে। আর সেই কাজের সাথে নারীর চেতনার বিকাশের ধারাটিও উন্মুক্ত রাখতে হবে নিরন্তর। নারীকে বুঝতে হবে জীবনযাপনের জন্যে পুরুষ নির্ভরতার ধারণাটিও বদলানোর সময় এসেছে আজ। একজন পুরুষ যদি স্ব-উপার্জনে একটি গোটা সংসারের ভার নিতে পারে, তবে একজন স্বনির্ভর নারীও তাই পারে। আর সেই ক্ষেত্রে কোনো পুরুষের একাধিপত্যের অধীনেও তার থাকার প্রশ্ন নেই। বরং পুরুষকেই সে নির্ভরতা দিতে সক্ষম। এই সক্ষমতার চর্চাই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতাকে বরং সুনিশ্চিত করবে। এই বিশ্বাসের দৃঢ়তাই নারীকে দেবে আপন ভাগ্য জয় করার শক্তি।

এইভাবে নারী যত শক্তিশালী হয়ে উঠবে নারীর সম্বন্ধে পুরুষের চেতনায় ততই সম্ভ্রমবোধ জেগে উঠবে। যে সম্ভ্রমবোধের দীক্ষায় নারীর প্রতি আচরণে ব্যাবহারে পুরুষ আরো মানবিক হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। সক্ষম হবে তার সেই ঘরসংসারের চৌহদ্দি থেকেই। আর যার প্রভাব পড়বে সমাজের সকল স্তর থেকে রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর অলিন্দ হয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরের উন্মুক্ত গণ্ডিতেও। নারীদিবসের সার্থকতা সেখানেই।       


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত