যৌনতা ও ভারতীয় সংস্কৃতি



যৌনতা ও ভারতীয় সংস্কৃতি

প্রশ্নটা হয়তো আমরা এখন ঠিক কোন শতকে বাস করছি তা নয়। অর্থাৎ বলতে চাইছি যে, প্রশ্নটা এই নয় যে এটি একবিংশ শতক কি বঙ্কিমের অষ্টাদশ শতক কিংবা শরৎচন্দ্রের সেই ঊনবিংশ শতক। প্রশ্নটা ন্যায় অন্যায়েরও নয়। প্রশ্নটা জীবধর্মের। জীবধর্ম পালন করা যাবে কি যাবে না। প্রশ্নটা এইখানেই। প্রশ্নটা তথাকথিত আধুনিকতারও নয়। কারণ আধুনিকতা একটি সাময়িক প্রবণতা মাত্র। তার বেশি কিছু নয়। এবং আয়ুর দিক দিয়েও এটি চিরকালই স্বল্পায়ু। যুগধর্মের তালে তালে আধুনিকতার গতিপ্রকৃতি ধরণ ধারণ বিশ্বাস প্রত্যয় সব কিছুই পরিবর্তিত হতে থাকে। অনেকে বলতেই পারেন আধুনিকতা চলমান একটি প্রক্রিয়া মাত্র। তাই প্রশ্নটা আধুনিকতারও নয়। প্রশ্নটা তাই মানুষের জীবধর্ম পালনের অধিকার নিয়েই। পারস্পরিক আনন্দে পরস্পর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে ঠোঁঠে ঠোঁট রেখে হৃদয়ের সমস্ত আবেগের যে চুম্বন, যে চুম্বনের মধ্যে দিয়ে দুটি সজীব প্রাণ পরস্পর পরস্পরের মধ্যে জীবনের গুঢ়তর অর্থ খুঁজে পেতে পারে; সেই চুম্বনকে স্থান কাল পাত্র বিবেচনা করে অশ্লীলতার দায়ে দায়ী করা আদৌ কতটা নৈতিকতার বিষয় প্রশ্ন সেটিও। আপনি বলতেই পারেন, না চুম্বনের বিরুদ্ধে তো কেউ প্রতিবাদ করেনি। করছেও না। যে বিষয়টি নিভৃততম পরিসরের দাবি করে, সেই বিষয়টিই প্রাকাশ্যে হাঠের মাঝখানে বেহায়ার মতো নিয়ে আসাটাই অশ্লীলতা। প্রতিবাদ ঠিক এই জায়গাতেই। কিন্তু সত্যই কি চুম্বনের মতো আবেগঘন মুহূর্ত সর্বদাই নিভৃততম পরিসরের দাবি করে? কে ঠিক করে দিলো সেটি? ঠিক কবে থেকেই বা? আর কেনই বা? জানি কি আমরা সবাই?

একটু সময় করে চিন্তার পরিসরে পা রাখলেই বড়ো বিস্ময় লাগে। প্রায়ই দেখা যায় কথায় কথায় একদল হিন্দুত্ববাদী যখন তখন সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যের ঢেকুর তুলে  নানান বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেন। ঠিক অতটা হিন্দুত্ববাদী না হয়েও আমাদের পারিবারিক পরিসরেই অধিকাংশ প্রিয়জনকেও সেই সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যের দোহাই দিয়েই নানান বিধিনিষেধের বেড়াজাল রচনা করতেও দেখি আমরা। অথচ সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যের যে ঐতিহাসিকতা, সেই বিষয়ে এই দুই পক্ষেরই কোন সঠিক ধারণা আদৌ আছে কিনা সেটাই এক বড়ো প্রশ্ন। আর সেই কারণেই তাদের হম্বিতম্বিও বেশি। বিষয়টা আরও একটু খোলসা করে বললে হয়তো সুবিধা হবে। সমাজে সংসারে কথায় কথায় জেনারেশন গ্যাপের ধুয়ো তুলে 'সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি ক্রমাগত পাশ্চাত্য সংস্কৃতির করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যেতে বসেছে' বলে আক্ষেপ করতে শুনি অনেককেই। পথে ঘাটে তরুণ তরুনীকে আলিঙ্গনাবদ্ধ দেখলেই এই আক্ষেপে জর্জরিত হতে দেখা যায় অধিকাংশ বাঙালিকেই। নতুন প্রজন্মের পোশাক পরিচ্ছদ চলা ফেরা কথা বলা কাজকারবার সবই যেন সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে এক কালাপাহাড়ি প্রলয়। না এই বিষয়টা আদৌ হাল আমলের নয়। বিষয়টি বহু পুরানো বাঙালি ঐতিহ্য। রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা রদ করাই হোক আর বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ প্রচলনই হোক, সমকালীন সময় সবসময়ই এই ভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে গিয়েছে। অর্থাৎ সেই পাশ্চাত্য প্রভাবে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির অবলুপ্তি প্রাপ্তির জন্য হাহাকার। তাই কোথাও কোন পরিবর্তন দেখলেই একদল রে-রে করে তেড়ে ধাওয়া করে। যেন সমাজ সংসারের বিশুদ্ধতা রক্ষার ভার একমাত্র তাদেরই। হ্যাঁ, সেই শ্রীচৈতন্যের ভাবধারার বিপুল জনপ্রিয়তার সময়েও সনাতনী ব্রাহ্মণ্য সমাজও এমন ভাবেই রে-রে করে তেড়ে উঠেছিল। এটা ঠিক, সেই সমাজ আজ আর নাই। আজকে সমাজের রাজনীতিকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে। সমাজ আজ আর নিজে চলে না। রাজনীতি তাকে যেমন করে চালায়, সে তেমন করেই চলার চেষ্টা করে। সমাজের থেকেও রাজনীতির দিকনির্দেশ এখন প্রবলতর। তাই শ্রীচৈতন্য থেকে রামমোহন বিদ্যাসাগর অব্দি যে বাধা ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসতে হয়েছে বাংলার বাঙালিকে, আজকের অবস্থা তার থেকে অবশ্যই ভিন্নতর। তবু রাজনৈতিক সমীকরণগুলি যখন যেমন প্রবল হয়ে ওঠে, সমাজও তখন তেমন ভাবেই রাজনীতির হাতের পুতুল হয়ে নাচতে থাকে। এ সত্যইই এক আজব পরিণতি। আধিকাংশ মানুষও তাই একসূত্রে বাঁধা পড়ে যায়। আর এরই প্রতিফলন দেখি আমরা প্রতিদিনের নানান ঘটনা প্রবাহের ভিতর দিয়ে।

ঠিক এই রকম পরিস্থিতিতে সঠিক চিন্তা ভাবনার পরিসরগুলি দিনে দিনে সংকীর্ণ হয়ে আসতে থাকে। সেটাই তো স্বাভাবিক। ফলত সেই সংকীর্ণ পরিসরে চিন্তাভাবনারও যে পুষ্টি কম হতে থাকবে সেটিও বলাই বাহুল্য। এই কারণটিও আমাদের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। তাই শুধুই পারিবারিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারই নয়, আমাদের সমকালের পরিপার্শ্বের রাজনীতির সমূহ প্রভাবও আমাদের চিন্তা চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে অধিকাংশ সময়েই। এই ভাবেই কোনটা সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি আর কোনটি নয়, সেই বোধও হারিয়ে যেতে থাকে। আর্থ সামজিক রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে চাপা পড়ে যেতে থাকে অতীত ইতিহাস।

সত্যিই আজ সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির অভিমুখে ফেরা কঠিন। তার কারণ এই নয় যে, সেই সংস্কৃতি আধুনিক যুগের বিপ্রতীপে অবস্থানরত। সময়ের চাকাকে উল্টো দিকে ঘোরাতে হবে, সনাতন সেই সংস্কৃতির দিকে এগোতে গেলে। যা সম্ভব নয় উচিতও নয়। আসল কারণ আমরা সনাতন সেই ভারতীয় সংস্কৃতির অভিমুখটাই হারিয়ে ফেলেছি বহু বহু শতাব্দী আগেই। আমদের চেতনায় বুদ্ধিতে বিশ্বাসে যাকে আমরা ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতি বলে মনে করে থাকি, তা কি আদৌ সনাতনী? না কি ইতিহাসের মধ্যপর্বের ভারতীয় সংস্কৃতি? যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল প্রথমে আর্যদের আগমনের সূত্র ধরে ও পরে শক হূণ মোগাল পাঠানের আগমনের সরাসরি প্রভাবে ও অভিঘাতে? ইতিহাসের সত্য বড়ো বিচিত্র। সেই সত্য থেকে একবার বিচ্যুতি ঘটলেই দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে ঝাপসা হয়ে যেতে বাধ্য। আর ঠিক সেইটিই হয়েছে আমাদের বাঙালিদের।

আমরা সম্পূর্ণ ভাবেই ভুলে গিয়েছি, সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যকে খুঁজে পেতে গেলে আমাদের এগোতে হবে প্রথমে আদিবাসী সমাজের ইতিহাসের পথরেখা ধরেই। আমাদের এগোতে হবে অজন্তা ইলোরার হাত ধরেই, আমাদের এগোতে হবে সুপ্রাচীন দ্রাবিড় সভ্যতার ইতিহাসের হাত ধরেই। আমাদেরকে উদ্ধার করতে হবে সিন্ধু সভ্যতার সংস্কৃতিকেই। আমদের বুঝতে হবে আর্যদের আগমন ভারতীয় সংস্কৃতির উপর কতটা প্রভাব ফেলেছিল সেটিও। আর সেই প্রভাবের হাত ধরে ভারতীয় আর্যাবর্তের সংস্কৃতি কিভাবে আধুনিক হয়ে উঠেছিল, কতটা আধুনিক হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসের সেই সব সত্যকেও জানতে হবে আমাদের। তবেই আমরা সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির কিছুটা হদিশ পেতে পারি। কিন্তু মুশকিল হলো, মানুষের চেতনায় অপেক্ষাকৃত নবীন ইতিহাসের দাবিই প্রবল হয়ে ওঠে। সময় যত সুপ্রাচীন হয়, ইতিহাস বোধ তত ক্ষীন হয়ে যেতে থাকে। আর তখনই হাতের কাছে জানা শোনা সমাজিক পারিবারিক পরম্পরায় চলে আসা ইতিহাসের সূত্র ও অনুষঙ্গগুলিই প্রবল হয়ে দেখা দেয়। আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের মূল শিকড়।

এই কারণেই ইতিহাসের মধ্যেপর্বে যখন ক্ষয়িষ্ণু ভারতীয় সংস্কৃতি সমাজিক দুর্বলতার কারণে একের পর এক বৈদেশিক শক্তির কাছে মাথা নত করে পরাভুত হতে থাকলো, তখন সেই সব বিদেশী শক্তির হাত ধরে ভারতবর্ষে ঢুকে পড়তে থাকলো নানান ধরণের বৈদেশিক সংস্কৃতির প্রভাব। আচার বিচার ব্যবহার, নীতি নৈতিকতা, সমাজিকতা, বিশ্বাস ধর্ম ইত্যাদি। ভারতবর্ষের নানান জাতির সমাজজীবনে এর প্রভাব পড়লো মারাত্মক ভাবেই। একদিকে আগেকার ধ্যান ধারণা চলন বলন বিশ্বাস প্রত্যয় সব কিছুই প্রায় ওলোট পালোট হয়ে যেতে থাকলো। আর একদিকে সমাজ প্রাণপনে বৈদেশিক প্রভাবকে ঠেকিয়ে রাখার জন্যে নানান রকম সমাজিক কৌশল সৃষ্টি করে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকলো। এবং মনে রাখতে হবে, এরও অনেক আগেই সনাতনী ভারতীয় সংস্কৃতি কালের নিয়মেই তার যাবতীয় উৎকর্ষতা ও শক্তি হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছিল। সেই কারণেই কোন বৈদেশিক শক্তিকেই ভারতবর্ষ প্রতিহত করতে পারেনি। ব্রিটিশের কাছে পদানত হয়ে যে বৃত্তায়ন সম্পূর্ণ হয়েছিল। ফলে ভারতবর্ষে একটি জগাখিচুড়ি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বহু শতাব্দী ব্যাপী সময় সীমায়। আর এই জগাখিচুড়ি সংস্কৃতির নানান অনুষঙ্গগুলিই আজ আমাদের বিশ্বাসে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি বলে পরিণত হয়ে উঠেছে। এটাই ভারতীয় সংস্কৃতির অমোঘ ট্র্যাজেডি। যেখানে ক্রমাগত নানান সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ সম্পর্কের মধ্যে দিয়েই আমাদের ধ্যানধরণার তথাকথিত সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির গতি প্রকৃতি নির্ধারিত হয়েছে। মূল সমস্যা এইখানেই যে, সঠিক অর্থে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে আমাদের পরিচয়ই ঘটেনি। সেই সনাতনী সম্পর্কের সাথে ছেদ পড়ে গিয়েছে প্রায় সহস্রাব্দ ব্যাপী সময় সীমায়। এটাই আমদের ইতিহাস।

একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাবো, সনাতন ভারতীয় সভ্যতার উপর মূলত তিনটি প্রবল ধারার প্রভাব পড়েছে আজকের সময় অব্দি। প্রথম প্রভাব পড়ে আর্য সভ্যতার। আর্যদের আগমনের হাত ধরে তাদের জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার হাত ধরে সনাতন ভারতীয় সভ্যতার সাথে তাদের এক প্রকার সম্বন্ধসূত্র তৈরী হয়। যার প্রভাবে আর্য অনার্য দুই সভ্যতার মধ্যেই রকমফের ঘটে। কারণ সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেহেতু আর্যরাই এই ভুখণ্ডে আসা প্রথম বৈদেশিক সভ্যতা, এবং সময়টিও অনেক প্রাচীন, যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ছিলই না বললেও খুব একটা ভুল বলা হয় না, ফলে এটি ধারণা করা সম্ভব তখনও সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির খুব ব্যাপক কোন পরিবর্তন ঘটেনি। যা ঘটেছে, ঘটেছে অনেকটাই ধীর লয়ে। এ সবই যদিও অনুমান নির্ভর, তবুও একথা আমরা ভাবতেই পারি। একমাত্র ঐতিহাসিকরাই তাদের গবেষণায় সঠিক অবস্থার বর্ণনা দিতে পারেন। এরপর পরবর্তী যে বিশাল প্রভাব পড়লো, সেটি বৈদেশিক ইসলামের। ধর্ম সমাজ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিয়ে প্রবল পরাক্রান্ত ইসলাম ভারতবর্ষের বুকের উপর জাঁকিয়ে বসলো। এর ফল হলো কিন্তু মারাত্মক। ইসলামের ভালো মন্দ মিশিয়ে ক্ষয়িষ্ণু ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে দ্বন্দ্ব ও ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকলো প্রায় সহস্রাব্দ ব্যাপি সময় সীমায়। এরপর প্রায় উচ্ছন্নে যাওয়া ভারতীয় সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতির দুর্বলতম মুহূর্তেই ইংরেজ এসে পৌঁছালো তাদের গোলা বারুদ কামান বন্দুক বাণিজ্যতরী নিয়ে। সাথে নিয়ে এলো আধুনিক ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের সর্বাত্মক প্রভাব। ভারতীয় তথাকথিত সনাতন সংস্কৃতির সামনে এসে দাঁড়ালো নতুন এক চ্যালেঞ্জ আধুনিকতা।

আর এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতেই আমাদের সনাতন ভারতীয় সভ্যতার দিকে ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে চোখ ফেরানোর ধুম। দৃষ্টি শক্তি ঝাপসা হয়ে গেলে সঠিক বিষয়টিও বেঠিক মনে হয়। তখন বেঠিককেই সঠিক বলে আঁকড়ে ধরে বসতে হয়। আমাদেরও হয়েছিল তাই। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম সঠিক ভাবে কোনটা সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি, আর কোনটা পরিবর্তিত ভারতীয় সংস্কৃতি। আমাদের মূল গণ্ডগোলটাই ঘটেছিল ঠিক এইখানেই। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, বা অনুধাবনই করতে পারিনি যে ইসলামের আগমনে আমাদের সমাজ সংস্কৃতি কি প্রবল অভিঘাতের সম্মুখীন হয়েছিল। তথাকথিত ক্ষয়িষ্ণু ভারতীয় সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতার অবনতির কালেই কিন্তু ইসলাম পা রেখেছিল এই দেশে। সেই বৌদ্ধযুগ বা রামায়ণ মহাভারতের যুগেও নয়। এমনকি ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সময় গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়েও ইসলাম আসেনি। কারণ তখন জন্মই হয় নি তার। কিন্তু কালের নিয়মে ভারতবর্ষের সেই স্বর্ণযুগের পর বহু শতাব্দী ব্যাপি সময় সীমায় যখন সমাজ সংস্কৃতির মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে ব্যাপক অবক্ষয়, তারপরেই ইসলাম প্রবেশ করে ভারতবর্ষে। তখন ভারতবর্ষের সত্যিই বড়ো দুর্দিন। আর সেই সুযোগেই ভারতবর্ষে শকহুণ মোগল পাঠানের জয়যাত্রা। এর যে একটা প্রবল প্রভাব পড়বে সে'তো বলাই বাহুল্য। আর সমাজ সংস্কৃতির উৎকর্ষতা যখন ক্ষয় হতে থাকে, তখন বাইরের শক্তির প্রভাব পড়ে মারাত্মক ভাবেই। এই সত্যটুকু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না কিছুতেই। ঠিক এই কারণেই ইসলামের আগমনের পূর্বের ভারতীয় সংস্কৃতি আর ইসলামের সাম্রাজ্য বিস্তারের পরের ভারতীয় সংস্কৃতির ভিতর ঘটে গিয়েছিল মূলগত পরিবর্তন। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল তারও কয়েক হাজার বছর আগে আর্যদের আগমনের ফলে। ফলে আমাদের চোখে আজ যা সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি বলে প্রতিভাত হয়, তা কিন্তু আসলেই ইসলামের আগমনের পরবর্তী সময়ের ভারতীয় সংস্কৃতি। মনে রাখা দরকার এই সরল সত্যটুকু।

এখন এটা খুবই কঠিন একটি বিষয় যে আজকে এত সহস্রাব্দ অতিক্রম করে এসে সুপ্রাচীন সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির সঠিক রূপ সঠিক ভাবে অনুধাবন করা। ঐতিহাসিকদের কাছে যাও বা কিছু তথ্য আছে, আমাদের সাধারণের কাছে তার ছিটেফোঁটাও নাই। ফলে আমাদেরকে এগোতে হবে যুক্তির হাত ধরে। সাম্ভব্য অসাম্ভব্য পরিণতির দিকে লক্ষ্য রেখেই। ঠিক যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা হয়েছিল, অর্থাৎ চুম্বনের স্থান কাল পাত্র বিবেচনায় চুম্বনের মতো সহজ স্বাভাবিক আবেগঘন একটি বিষয়ও অশ্লীল হয়ে উঠতে পারে কি না। বিশেষ করে আমাদের ভারতীয় সমাজে সংস্কৃতিতে। পক্ষে বিপক্ষে যুক্তিজাল বিস্তারেও শেষ নাই। হবেও না। আমরা শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাইবো ধর্মস্থানের মতো পবিত্র স্থান, যেখানে মানুষের ঐহিক সুখভোগের বাইরে গিয়েই ঈশ্বরের সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্কসূত্রে সম্পর্কিত হওয়ার কথা। সেখানেই অধিকাংশ সুপ্রাচীন মন্দিরগুলির স্থাপত্য ভাস্কর্য্যে কি ধরণের চিত্র শোভা পাচ্ছে হাজার হাজার বছর ধরে? এইগুলি কি সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি নয়? নাকি শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে ইউরোপের নবজাগরণের প্রভাবে তৈরী? হাজার হাজার বছর আগে একদিন মন্দিরের ভাস্কর্যে যা শোভনীয় ছিল, শ্লীল ছিল, তাই আজকের যুগে এসে অশ্লীল হয়ে ওঠে কোন যুক্তিতে? তার থেকেও বড়ো প্রশ্ন, সেদিনের সনাতন ভারতীয় সমাজে যা সহজ সুন্দর জীবধর্মের শৈল্পিক প্রকাশ ছিল, কালে কালে কেনই বা তা অশ্লীলতায় দায়ে দায়ী হয়ে উঠলো। কিভাবে ঘটলো এমন উল্টোপুরান?  আমাদের বক্তব্য, এইখানেই নোঙর ফেলা দরকার আমাদের সন্ধিৎষু মননের প্রজ্ঞার। একমাত্র তাহলেই আমরা পৌঁছাতে পারবো সঠিক লক্ষ্যে। দেখতে পাবো, সুপ্রাচীন ভারতীয় সনাতন সমাজ হাজার হাজার বছর আগেই অধুনিকতর জীবনশৈলীর চুড়ান্ত শিখরেই অধিষ্ঠিত ছিল। প্রকৃতির সাথে সে কালে জীবধর্মের আন্তরিক সাযুজ্য ছিল অটুট। আর ছিল বলেই সেই যুগের শিল্পও সেই অধুনিক মননের সৌন্দর্য্যকে ভাবে ভঙ্গিমায় রূপ দিয়ে যেতে পেরেছিল অম্লানবদনে।

এই প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি উদাহরণ টেনে আলোচনার সমাপ্তির দিকে এগোবো আমরা। আজকের দিনে, পাশ্চাত্য সমাজ সংস্কৃতির এমন উগ্রতর প্রবলতম প্রভাবেও শকুন্তলার মতো কাহিনী বাস্তবে কটা দেখা যায়? বা যেতে পারে? যেখানে তন্বী যুবতী সুন্দরী একটি মেয়ে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় নিজ আনন্দে অচেনা অজানা পুরুষের সঙ্গসুখ উপভোগ করতে পারে বিনা শংকায়? নির্দিদ্ধায়? এইযে যৌবনের কাছে এমন নিঃশঙ্কোচ আত্মসমর্পণ, আজকের এত আধুনিক সময়েও তাই তো অশ্লীলতার দায়েই  দায়বদ্ধ হবে নাকি? অথচ সত্যি কি এই ভারতে এমন একটা সময় ছিল না, যেখানে তন্বী যুবতী তার যৌবনের আবেগকে নিজ আনন্দে স্বাধীনভাবে উপভোগের এমনই অবাধ পরিসর পেতো? সেকি নেহাৎই আমাদের কষ্টকল্পনা? পৌরানিক কাহিনীতে কথায় কথায় যে স্বয়ংবর সভার কথা শোনা যায়, সেও কি কবির বা কাহিনীকারের কল্পনা মাত্র? নাকি তার ভিতরেও কিছু না কিছু ঐতিহাসিকতাও রয়ে গিয়েছে? আমরা কাহিনীর ঐতিহাসিকতার দাবি করছি না। যে কোন কাহিনীই বস্তুত তার সমকাল বা অতীতের দর্পণের কাজ করতে পারে। অনেক সময়েই করে থাকে। ঠিক যেমন সামন্ততান্ত্রিক বাংলার বর্ণহিন্দু সমাজের একটা বিশেষ শতাব্দীর সুস্পষ্ট ছবি খুঁজে পাই আমরা, যারা শরৎচন্দ্রের কাহিনীগুলি পড়েছি একসময়ে গোগ্রাসে। সেইরকম ভাবেই তো পুরাণের মধ্যে থেকে, পৌরানিক কাহিনীর মধ্যে থেকেও সুপ্রাচীন কালের রীতিনীতির ধরণ ধারণের একটা আবছা ছবি হলেও, মোটামুটি একটা ছবি পেতে পারি আমরা। আমরা জানি, আর্যাবর্তে আর্যদের মাধ্যমেই আজকের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয় ভারতবর্ষে। কিন্তু সেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই কি করে স্বয়ম্বর সভার মতো নারীতান্ত্রিক একটি ব্যবস্থার ছবি ফুটে ওঠে গল্প কাহিনীগুলিতে? তখনই কি মনে হয় না, এই স্বয়ম্বর সভার প্রথা মূলতই প্রাক আর্যযুগের ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতি? আর্য সমাজের উচ্চবিত্ত সমাজে একসময় যার প্রভাব পড়েছিল বেশ অনেকটাই? এরকম ভাবে ভাবলে কতোটা ঐতিহাসিক ভুল হবে আর কতটাই বা ঐতিহাসিক সত্যের আরও একটু কাছে পৌঁছানো যাবে? এইপ্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামীর কথাও। আপাত দৃষ্টিতে মহাভারতের কাহিনীক্রমে যা চুড়ান্ত রকমের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থারই নমুনা বলে মনে হয় প্রাথমিক ধাক্কায়। কিন্তু এমনটাও কি হতে পারে না ব্যাসদেব সুকৌশলে প্রাক আর্যযুগেরই মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার একটা ছবি ফুটিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন চুড়ান্ত রকমের পিতৃতান্ত্রিক সমাজবাস্তবতার মধ্যে বাস করেও? যেখানে নারী তার নিজের ইচ্ছাতেই একাধিক স্বামীর সাথে ঘর করতে পারতো। যেখানে সন্তানের বংশপরিচয় ঠিক হতো মাতৃপরিচয়তেই। পাঠক ভাবতেই পারেন এসব নিছকই কষ্টকল্পনা মাত্র। তাহলেও ভারতীয় সভ্যতার নানান অনুষঙ্গেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমনই নানান সব বিষয়, যা থেকে অনুমান করতে বেগ পেতে হয় না যে, এই ভুখণ্ডেই একদিন উড়েছিল চুড়ান্ত আধুনিকতার জয়পতাকা। যেদিন প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনশৈলীর কোন বৈরীতা ছিল না। যেদিন সমাজ সংসারের দোহাই দিয়ে মানুষের জীবন যৌবনকে পর্দার আড়ালে বেঁধে রাখা হতো না। এই প্রসঙ্গেই মনে হয়, ভারতীয় সমাজে নারীকে পর্দানশিন রাখার সংস্কৃতি বৈদেশিক ইসলামী সংস্কৃতির সরাসরি প্রভাবজনিত ঘটনা। না হলে শকুন্তলাদের যুগের চিত্র এমন খোলামেলা ভাবে উঠে আসতো না কবির কলমে।

ফলে আজকে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি বলে যে ছবিটিকে খাড়া করে রাখা হয় তথাকথিত হিন্দুত্ব বলে, এর আয়ু খুব বেশি হাজার বছরের। কিন্তু ভারতবর্ষের ইতিহাস আরও সুপ্রাচীন। আর সেই সুপ্রাচীন ইতিহাসের অনেকটাই দীর্ঘায়িত পর্বে মানুষের জীবনশৈলী ছিল প্রকৃতির মতোই খোলামেলা। উদার ও অবাধ। স্বতঃস্ফূর্ত আবেগঘন নিঃসঙ্কোচ মূল্যবোধের উদ্বোধনে দৃপ্ত ও প্রকৃতির সাথে সরাসরি সম্পর্কসূত্রে সম্পর্কিত। একথা বললে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে না। হবে না সত্যের অপলাপ। আজকের ভারতীয়ত্বকে সঠিক দিশায় এগোতে হলে অন্ধের মতো পাশ্চাত্য সভ্যতাকেও অনুসরণ করার দরকার নাই। দরকার নাই ততধিক অন্ধত্ব নিয়ে তথাকথিত ভারতীয় সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে সমাজ সংসারকে বেঁধে রাখারও। সুপ্রাচীন ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যেই রয়েছে এমনই এক আধুনিকতার শক্তি, যাকে নতুন করে অর্জন করতে পারলে, যার প্রকৃত উদ্বোধনে গোটা বিশ্বকেই আধুনিকতার সম্পূর্ণ এক নতুন দিশা দেওয়া যেতে পারে। যে আধুনিকতা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, যে আধুনিকতা সেলুলয়েডের রঙেই টাঙানো নয়, যে আধুনিকতা অন্ধের মতো অনুকরণ করতে হয় না, যে আধুনিকতা চর্চা করা সম্ভব হয় বিশ্ব প্রকৃতির সাথে মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অনাবিল আনন্দের সম্পর্কসূত্রেই। আর তখন মেট্রোর সিনিয়র সিটিজেন সীটে বসে নবীন প্রজন্মকে আলিঙ্গনরত অবস্থায় চুম্বনে উদ্বোধিত হতে দেখলে নৈতিকতার মেকি ও অন্ধ টিকিদাড়ি নড়েচড়ে উঠবে না। কোনভাবেই।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত