সভ্যতার সংকট ও করোনা




সভ্যতার সংকট ও করোনা

পরিসংখ্যানের মজা হলো প্রতি মূহুর্তেই তা পরিবর্তনশীল। করোনা আক্রান্ত বিশ্বে যে কোন আলোচনারই দিকনির্দেশ করছে আক্রান্ত আর মৃতের পরিসংখ্যান। ঠিক এই মূহুর্তে বিশ্বজুড়ে ১৬ লক্ষ সাত হাজার ৫৯৫ জন আক্রান্ত। মৃত ৯৫ হাজার ৭৯৫ জন। এই লেখার শেষে যে সংখ্যাগুলি অবশ্যই পাল্টিয়ে যাবে। মানুষের মৃত্যু আজ সংখ্যা গণনার বাইরে আর কোন অনুভুতির জন্ম দিচ্ছে না। করোনার থাবা শুধু যে মানুষের শরীর দখল করে নিচ্ছে তাই নয়, আমাদের অনুভুতিকেও গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা শুধুই সংখ্যা গণনা করে যাচ্ছি। আর ততই আমাদের অনুভুতির সূক্ষ্মতায় মরচে পড়ে যাচ্ছে। প্রায় প্রত্যেকের মাথার উপড় মরণের খাঁড়া ঝুলতে থাকলে সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। কেউই জানে না, শেষ অব্দি করোনোত্তর বিশ্বে কে বেঁচে থাকবে আর কে থাকবে না। তাই যতক্ষণ বেঁচে থাকা নিস্পৃহ ভাবে সংখ্যা গণনা করে যাওয়া। কেউ জানে না, সংখ্যা গণনার পরবর্তী পরিসংখ্যানে তার নিজের ঠিকানা লেখা হবে কি হবে না। গত ৩১শে মার্চ করোনায় মৃতের সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৩১৩ জন। তার নয় দিন পরে সংখ্যাটি এই মূহুর্তে ৯৫ হাজার ৭৯৫ জন। অর্থাৎ গত নয় দিনে মারা গিয়েছেন পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ। না, এই ভাবে পঙ্গপালের মতো মানুষের মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতা ছিল না আমাদের। এই হার যদি বজায় থাকে তবে আশঙ্কা হয় আগামি এক সপ্তাহ বা দশ দিনে মৃতের সংখ্যা দুই লক্ষ অতিক্রম করে যেতে পারে। মৃত মানুষের এই বিশ্ব, জীবতদের পক্ষে অচিরেই নরক যন্ত্রণার বিষয় হয়ে উঠবে সন্দেহ নাই।

কেউ জানে না অর্থনীতির উপর করোনার থাবা কোথায় কতটা ভয়াবহ ভাবে হয়ে পড়তে চলেছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে করোনার থাবা এখনো প্রথম বিশ্বের দেশগুলি মতো ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। কিন্তু করলে, সেই ভয়াবহতা প্রথম বিশ্বের সমস্ত রেকর্ড ম্লান করে ভেঙে তছনছ করে দেবে। সেটি বুঝতে আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। জনসংখ্যর আধিক্য, জনবসতির ঘনত্ন, অনুন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো, দূর্বল অর্থনীতি প্রভৃতির কারণে তৃতীয় বিশ্বে করোনার তাণ্ডব মারাত্মক আকার নিতে পারে অচিরেই। অনেকেই আবার এমন আশাও করছেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির তাপমাত্রার কারণে করোনা সংক্রমণ তত মারাত্মক আকার ধারণ নাও করতে পারে। সেই আশা সত্যি হলে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির পক্ষে সেটিই হতে পারে একমাত্র রক্ষাকবচ। কিন্তু করোনার থাবা যেভাবেই পড়ুক, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানোর আর কোন উপায় আছে বলে মনে হয় না। করোনা প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী লকডাউন বিশ্ব অর্থনীতিকে বিকলাঙ্গ করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। যার প্রভাব থেকে তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশই রেহাই পাবে না। পাবে না সেই গালভরা বিশ্বায়ণের কারণেই। এখন কোন দেশই এই বিশ্বায়নের নেটওয়ার্কের বাইরে নাই। ফলে গোটা নেটওয়ার্কে ধ্বস নামলে সব দেশকেই টেনে নামিয়ে দেবে সন্দেহ নাই।

যদি ধরেই নেওয়া যায়, করোনা মানুষের তৈরী ভাইরাস নয়। তাহলেও একটা মূলগত প্রশ্ন ওঠার সময় হয়ে গিয়েছে। মানুষের বিজ্ঞান প্রযুক্তির এমন সীমাহীন উন্নতিও সমান্য একটি ভাইরাস মোকাবিলায় ব্যর্থ হচ্ছে কেন? অনেকেই বলবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। ভাইরাস তো আর আগের যুগের ডাকাতের মত গৃহস্থের বাড়িতে ডাকাতি করার আগাম পত্র পাঠিয়ে আসে না। ফলে ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া অব্দি এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। তাঁরা ইতিহাস ঘেঁটেও সেটিই দেখিয়ে দেবেন, পূর্ববর্তী মহামারীগুলির পরিসংখ্যান তুলে ধরে। কিন্তু তাহলেও একটি প্রশ্ন কি আমরা তুলতে পারি না, চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সত্তেও আমরা আগাম সতর্কতা মূলক কোন ব্যবস্থা নিতে পারি নি কেন? বেশ, ঠিক আছে ধরেই নিলাম, আগাম ভ্যাকসিন তৈরী করা সম্ভব নয়। কিন্তু সারা বিশ্বের সকল মানুষের জন্য হাসপাতালের একটি বেড নির্দিষ্ট রাখার মতো পরিকাঠামো কি তৈরী করা যেত না? প্রতিটি মানুষের জন্য ভেন্টিলেটর, মাক্স, ভাইরাস নিরোধক পোশাক তৈরী করে রাখা কি যেত না? গেলে কে বলতে পারে সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর হার অনেক কমেই ঠেকিয়ে রাখা যেত না? সারা বছরই বিশ্ব জুড়ে নানান ধরণের সংক্রমণ ভাইরাসে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। হ্যাঁ এটা ঠিক আমরা কেউই সেখবর রাখি না। রাখি না কেন, না মিডিয়া সেই খবরকে বিশেষ হাইলাইট করে না। আমরা মূলত সেই সব খবরই রাখি, যে খবরগুলি মিডিয়া আমাদের মাথার ভিতরে গেঁথে দেয়। তার বাইরে আমাদের জ্ঞানবুদ্ধি প্রায় নাই বললেই চলে। ফলে বিশ্বজুড়ে ভাইরাসে লাখো লাখো মানুষের সংক্রমণ ও মৃত্যু নতুন কোন ঘটনা নয়। নতুন ঘটনা এইটাই, এত কম সময়ে এত বেশি ভৌগলিক অঞ্চলে একটি বিশেষ ভাইরাসের এমন দাপটের সাথে আক্রমণ। কিন্তু দশকের পর দশক জুড়ে আবিশ্ব ভাইরাস সংক্রমণকে আরও গুরুত্বসহ মোকাবিলা করতে চাইলে আমরা অবশ্যই প্রয়োজনে প্রতিটি মানুষকে ভাইরাসের সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার বিষয়টিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতাম। কিন্তু আমরা সেটা দিই নি। জানি অনেকেই মাথা নাড়ছেন, কি আজব কথা, আবিশ্ব প্রতিটি মানুষের জন্য হাসপাতালের একটি বেড নির্দিষ্ট করে রাখা কি সম্ভব? রাজার গোলাও তো ফুড়িয়ে যাবে।

বেশ তবে আসুন একবার রাজার গোলার একটু খোঁজখবর করা যাক না কেন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯এ সমারিক খাতে ব্যায় করেছে ৬৮৪.৬ বিলিয়ন মার্কিণ ডলার। এরপর রয়েছে চীন। ১৮১.১ বিলিয়ন মার্কিণ ডলার। সৌদি আরব ৭৮.৪ মার্কিণ ডলার। রাশিয়া ৬১.৬ মার্কিণ ডলার। না অবাক হবেন না, সবচেয়ে বেশি সামরিক খাতে খরচ করার দেশের আবিশ্ব তালিকায় ঠিক পঞ্চম স্থানেই রয়েছে আমার আপনার দারিদ্র্য কবলিত উন্নয়নশীল ভারতবর্ষ বাৎসরিক ৬০.৬ বিলিয়ন মার্কিণ ডলার সহ। না তালিকা আর দীর্ঘায়িত করার দরকার নাই, মানুষ মারার প্রয়াসেই এই পরিমাণ বিপুল উদ্যোম ও খরচ। অথচ মানুষকে বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে মাথাপিছু একটি বেড ও সুচিকিৎসার নিখরচা বন্দোবস্ত করতেই যত গড়িমসি ও হাজারো অজুহাত। নিখরচায় চিকিৎসা ও শিক্ষা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের বিষয় হওয়া উচিৎ। রাষ্ট্র যার জন্য দায়বদ্ধ থাকবে। সেটিই একটি উন্নত সভ্যতার দিকচিহ্ন। সেই স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে প্রভুত মুনাফাবাজির ব্যাবসার মৃগয়া ক্ষেত্র বানিয়ে তুলে মানুষের পরিশ্রমের টাকায় লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র তৈরী ও সমারিক শক্তি বৃদ্ধির মতো বাজে কাজে নষ্ট করা কোন সুসভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয় হতে পারে না। না সাধারণ বুদ্ধিতে যে কথাটা অত্যন্ত সহজেই বোঝা যায়, আমরা আজ আর সেই সহজ কথাটি সহজে বোঝার শক্তি ও বুদ্ধি রাখি না। রাখি না কারণ, মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত ধনতন্ত্রের যাঁতাকলে আমাদের মগজ ধোয়া হয়ে গিয়েছে। একদিকে উগ্র দেশপ্রেম আর একদিকে তীব্র জাতি বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক হিংসার মন্ত্রে দীক্ষিত করে দেওয়া হয়েছে আমাদের। ফলে শয়তানের অন্ধ ভক্তে পরিণত আমরা আজ।

সেই ভক্তিতে চোখ থাকতেও অন্ধ আমরা। তাই দেখও না দেখার ভান করতে হয় আমাদের। যে যত বেশি করে উগ্র দেশপ্রেমের ধুয়ো তুলে দিকে দিকে শত্রু চিহ্নিত করতে পারবে, তারই পেছনে নিঃশর্তে ভিড় করবো আমরা। সাধারণ জনগণ। তাই সেই জনগণের পরিশ্রমের টাকায় মানুষ মারার অস্ত্রে যত বেশি মানুষ মারা যাবে, ততই খুশি হয়ে নৃত্য করবে আমাদের দেশপ্রেমের উগ্রতা। সেই অন্ধ উগ্রতায় আমরা দেখতে পাবো না, আমাদের স্বাস্থ্য আমাদের চিকিৎসা আমাদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার কিভাবে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কিভাবে আমাদেরকে ওষুধ প্রস্তুতকারক শিল্পের সর্বগ্রাসী থাবায় আবদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কিভাবে আমাদের শিক্ষার স্বাধীনতাকে খর্ব করে রাখা হচ্ছে। আমাদেরই টাকায় একদল যুদ্ধাস্ত্র তৈরী করে কোটিপতি হচ্ছে। আর একদল ওষুধ বেচে কোটিপতি হচ্ছে। অথচ আমারা হাততালি দিয়ে দেশপ্রেম জানান দিচ্ছি। না এই ভয়াবহ অবস্থা শুধু কোন একটি দেশে সীমাবদ্ধ নয়। ধনতান্ত্রিক দুনিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশেই এই অবস্থা কম বেশি সত্য। ফলে আবিশ্ব পুঁজির একটা বিপুল অংশ মানুষ মারার কাজে ব্যস্ত। ব্যস্ত নতুন নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও তৈরীতে। সামরিক শক্তিবৃদ্ধিতে। এই বিপুল পরিমাণ পুঁজি যদি মানুষের স্বাস্থ রক্ষায় ব্যায় হতো, তাহলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে নিখরচায় শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা পরিসেবা দেওয়া যেত। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে জীবন রক্ষার নানার প্রকৌশল উদ্ভাবনে ব্যায় করা যেত। অধিকাংশ মানুষকে শরীরে ও মনে সুস্থ সবল রাখা যেত। কিন্তু না। আমাদের লক্ষ্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মুনাফাবাজির কারবারে ফুলে ফেঁপে ওঠা। বিশ্বের মোট সম্পদের পনেরো আনাকে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজনের ভিতরে ভাগ করে দেওয়া। বাকি বিশ্ব আঙুল চোষার জন্য জন্মেছে। এই যে ধনতান্ত্রিক কাঠামো ও দর্শন, এটাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ।

করোনা প্রাকৃতিক ভাইরাস না মানুষের তৈরী সেটি প্রমাণ সাপেক্ষ। কিন্তু মানুষের এই পৃথিবী যে করোনার মতো ভাইরাসের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধ করার বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি বিহীন, সেই সত্য আজ জলের মতোন পরিস্কার। আমরা বহিঃশত্রুর আক্রমণের মোকাবিলায় সব আয়োজন সম্পূর্ণ করে রেখে ভেবেছিলাম আমরা সুরক্ষিত। সুরক্ষিত মানুষের হাত থেকে। মানুষ মানুষের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্যেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এমন অভাবিত উন্নতি ঘটিয়ে ফেলেছে। খেয়াল করে নি, মানুষের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য গোলাবারুদের দরকার ছিল না। ছিল মানবিক হয়ে ওঠা। মনুষ্যত্বের বোধকে জাগিয়ে তুলে গৌতম বুদ্ধ যীশু খৃষ্ট বিবেকানন্দ রবীন্দ্রনাথদের পথ অনুসরণ করা। তাহলেই মানুষ মানুষের কাছ থেকে পরস্পর সুরক্ষিত থাকতো। আর সেটি হলেই রাষ্ট্রপুঞ্জ গঠন সার্থক হতো। ইঙ্গমার্কিণ শক্তির ঠেক হিসাবে রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো একটা স্বাক্ষীগোপাল তৈরী করে রাখার কোন দরকার ছিল না। বাকি বিশ্বকে সর্বদা যুদ্ধের হুমকির সামনে রেখে প্রতিদিন অস্ত্র ব্যবসায় শান দিতে হতো না। আজকরে রাষ্ট্রপুঞ্জের ভুমিকা সেই অস্ত্রব্যাবসায় শান দেওয়াকেই মসৃণ করে তোলার জন্য। এই যে বিশ্ব রাজনীতির কাঠামো, এই কাঠামো কতটা অমানবিক কতটা হটকারীর, করোনা সেটিই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু আমরা কি সত্যই সেটি দেখতে আগ্রহী? বুঝতে প্রয়াসী? যেখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার উপর জোর দেওয়ার কথা, সেখানে আমরা কয়েকজন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিশ্বজুড়ে সম্পদের উপর একছত্র অধিকার কায়েম রাখার বিষয়ে সকল সাধনা ও অধ্যবসায় নিয়োগ করেছি। পশ্চিমী সংবাদ মাধ্যম আমাদেরকে সেই সীমাহীন হঠকারী কাজে হাততালি দিয়ে সমর্থন জানানোর জন্য প্রতিদিন অশিক্ষিত করে রাখে। সেটাই তাদের আসল ও একমাত্র কাজ। এবং সেই কাজে তারা একশ শতাংশ সফল। এবং এই বিষয়ে তাদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। নাৎসী জার্মানীও তাদের কাছে এই বিষয়ে চুষিকাঠি চুষতে থাকার শিশুর মতো।

এই যে বিশ্ব বন্দোবস্ত, করোনা সেই বিশ্ববন্দোবস্তকেই আজ সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। যে চ্যালেঞ্জ করার কথা ছিল সাধারণ লেখাপড়া জানা সচেতন নাগরিকদের। সময়মত সেই কাজ করতে পারলে, কে বলতে পারে আজ করোনা এমন সর্বাত্মক ধ্বংসলীলা চালাতে পারতো কিনা? কিন্তু আমরা সেই পথে হাঁটিনি। আমরা যে বেশি বুদ্ধিমান প্রাণী। আমরা বিশ্বাস করেছি ধনতন্ত্রের শেখানো মন্ত্রকেই। আমরা অনুসরণ করেছি সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতাকেই। আমরা প্রচার করেছি মিডিয়ার শেখানো বুলিকেই। তাই করোনা যেন আজ আমাদের কান ধরে ওঠবোস করিয়ে চোখের ঠুলি খুলে দিতে চাইছে। কিন্তু আমাদের অতি বুদ্ধি আজও আমাদের হতবুদ্ধি করে রেখে দিয়েছে। তাই দরজায় মৃত্যু কড়া নাড়ার সময়েও আমরা নিজেদের ভিতর কলহ করছি পরস্পরকে দোষারোপ দিতেই। সেখানেই আমদের দক্ষতা।

এখানে একটি বিষয় পরিস্কার বলে রাখা ভালো। করোনা একদিন প্রশমিত হবে ঠিকই। বিশ্ব জনসংখ্যার হয়তো মাত্র এক শতাংশেরও অনেক কম মানুষের জীবনে দাঁড়ি বসিয়ে দিয়ে। কিন্তু তাই বলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। নিত্য নতুন রূপে তার আবির্ভাব ঘটবে। এক একটি পর্ব আগের থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে মরণ কামড় দেবে। প্রকৃতিকে আমরা যেভাবে ধ্বংস করছি প্রতিদিন, তাতে এই ভবিষ্যৎ অবধারিত। মারণাস্ত্রের কারবার, মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে মুনাফার কারবার ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির ভরকেন্দ্র। ধনতন্ত্রের কারবারীরা সেই সত্যকে একদিকে দেশপ্রেম ও অপর দিকে প্রতিযোগিতায় চ্যম্পিয়ান হওয়ার গৌরবগাথার টোপ দিয়ে ভুলিয়ে রাখে। সেই ভুলিয়ে রাখার ব্যবসাতেই পশ্চিমী সংবাদ মাধ্যমের ফুলে ফেঁপে ওঠা। এই যে ভয়াবহ চক্র, এই চক্রব্যুহ থেকে বেড়িয়ে না আসতে পারলে এক করোনা থেকে আর এক করোনার কবলে পড়তে হবে নিত্য নতুন ভাবে। কোভিড ১৯ অন্ধ মানুষের ঘুমন্ত চেতনায় আজ কড়া নাড়ছে। সাবধান করার চেষ্টা করছে। এরপরেও যদি মানুষ জেগে ঘুমাতে থাকে আর ধনতন্ত্রের গোলামী করতেই থাকে, তবে এই বিশ্বে মানুষের সুখের দিন আর বেশিদিন বজায় থাকবে না।

এই পরিস্থিতিতে কোন পথে এগোবে বর্তমান বিশ্ব, সেকথা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে আশংকা হয়, একটা করোনায় মানুষের স্তব্ধ চেতনায় সাড়া ফলতে পারবে না হয়তো। আজকে গোটা বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নতুন বিশ্ব গড়ে উঠেছিল, তাতে শক্তির একটা ভারসাম্য গড়ে উঠেছিল দিনে দিনে। সেই ভারসাম্যে সামান্য হলেও একটা রক্ষাকবচ যুগিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সমাজতন্ত্রের পতনের আগে অব্দি। কিন্তু তারপর বিশ্বায়ন নামক খুড়োর কলের আবিষ্কার ও আবিশ্ব সন্ত্রাসবাদের চাষাবাদে সামরিক অস্ত্রের বাণিজ্যের নতুন দিগন্তে একমেরু বিশ্বের আধিপত্তের বিস্তারে আজ যে বিশ্বে রয়েছি আমরা, করোনা তার অত্যন্ত স্বাভাবিক পরিণতি। মানুষের মেধা পরিশ্রম অর্থ লগ্নীর একটা বড়ো অংশই সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাবে ব্যায় হচ্ছে আবিশ্ব সমরাস্ত্রের পিছনে। মানুষ থেকে মানুষের সুরক্ষার বাহানায় মানুষই আজ সম্পূর্ণ অরক্ষিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাতে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় সব সময় বলে কয়ে আসে না। কিন্তু মানুষের শত শত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের বিজ্ঞানচর্চার অর্জন থেকে মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব নয়, কি কি ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের সামনে কড়া নাড়তে পারে। আমারা যদি আমাদের মূল নজর বহিঃশত্রুর দিক থেকে সরিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দিকে ফেলি, তবে সময় থাকতে আত্মরক্ষার কৌশল উদ্ভাবন করা অসম্ভব নয় আদৌ। কিন্তু এই বিষয়ে কোন দেশ আলাদা করে নিজেকে বাঁচানোর কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা করলেও বাঁচাতে সম্ভব হবে না। আবিশ্ব সকল দেশকে যৌথভাবে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সেই কৌশলগুলি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করতে হবে। মানুষের সাথে মানুষের লড়াই আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে মানুষের লড়াই একরম হওয়া সম্ভব নয়। এই সত্য এখনই বোঝার সময়। তাই সকল দেশকে একত্র হয়ে এই যুদ্ধ শুরু করতে হবে। সেটি করতে গেলে ধনতান্ত্রিক দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদী ধ্যানধারণা ও প্রোপাগাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে হবে। ধনতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও গোষ্ঠীস্বার্থ এই যুদ্ধে প্রধান অন্তরায়। তাই বর্তমান বিশ্বের সামনে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রে এটাই প্রধানতম চ্যালেঞ্জ যে, আমরা ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বায়নের দর্শন ও প্রয়োগ থেকে বিশ্বকে মুক্ত করতে সক্ষম হব কিনা? যদি পারি, তবে হয়ত আমরা মানুষের সভ্যতার স্বার্থে জাতি ধর্ম বর্ণ শ্রেণী গোষ্ঠী নিরপেক্ষ ভাবে সকল দেশের একত্র সম্মিলনে সঠিক পথের দিশা খুঁজে পাবো। যে পথে, সকলেই বাঁচলে একজন বাঁচবে। প্রত্যেকের আত্মসুরক্ষা নির্ভর করবে সকলের সম্মিলিত সুরক্ষিত থাকার উপরেই। ধনতান্ত্রিক দর্শন এই সত্য উপলব্ধি করতে চায় না। তাই এই দর্শন আগামী বিশ্বের কাছে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াবে। আমরা সেটি আগে বুঝতে পারলে ভালো। না পারলে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর মূল্যে সভ্যতার বিপর্যয়ের ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে বুঝতে একদিন ঠিকই হবে। কিন্তু সেদিন খুব সুখের হবে না। শত শত সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তুপের ওপর সেদিন নতুন করে মানুষকে জীবনের সত্য পাঠ নিতে হতে পারে। করোনার আজকের কড়া নাড়া সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। হ্যাঁ এই মূহুর্তে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৬ লক্ষ ২৩ হাজার ১২৩। মৃত ৯৭ হাজার ২৩৫ জন।

১০ই এপ্রিল’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত