দাম্পত্যের সীমানায়
"বিবাহটা চিরজীবনের পালাগান; তার ধুয়ো একটামাত্র, কিন্তু
সংগীতের বিস্তার প্রতিদিনের নব নব পর্যায়ে। বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কার্তিক ১৩৪০-এ
লেখা তাঁর "চোরাই ধন" গল্পে। সত্যিই তো চিরজীবনের
এই পালা গানে কতো ঘটনা কতো অভিনবত্ব কতো নাটকীয়তা। প্রতিদিনের সুখ অসুখ, আশা নিরাশার
মধ্যে দিয়েই তো দাম্পত্যের মহাকাব্য রচনা হয়ে চলে পর্বে পর্বে, পর্ব থেকে পর্বান্তরে। তাই দাম্পত্যের সীমানায়
প্রতিদিনই সত্য হয়ে ওঠে বিবাহ। প্রতিদিনের এই টুকরো টুকরো
দাম্পত্যের পরিসরে উভয়ের যৌথ জীবনের প্রেক্ষিতে সার্থক হতে থাকে বিবাহের
ঐশ্বর্য্য। যে ঐশ্বর্য্য সৃষ্টি হয় দাম্পত্যের শরীর মনের একাত্মতায়। এই ঐকান্তিক একাত্মতাই
বিবাহ।
"Marriage is no marriage that is not a
correspondence of blood. For the blood is the substance of the soul; and of the
deepest consciousness." বক্তা ডি এইচ লরেন্স। বিশ্বখ্যাত এই বৃটিশ
ঔপন্যাসিক তাঁর বিশ্ববিতর্কিত উপন্যাস "লেডী চ্যাটার্লিজ লাভার"
প্রসঙ্গে আলোচনা কালে এই মত ব্যক্ত করেন। তিনি এই প্রসঙ্গে এও বললেন, দাম্পত্যেই
নারী পুরুষের বিপ্রতীপ রক্তের নদী এসে ভালোবাসার মহা সঙ্গমে মিলিত হয়। অর্থাৎ তাঁর মতে
মানবাত্মার মূল পরিচয় যে রক্তে, সেই রক্তের ঐকান্তিক মিলনেই দাম্পত্যের বিবাহ বাসর। রবীন্দ্রনাথের মতে, যা চিরজীবনের
পালাগান। এই পালাগানের প্রতিদিনের আসরেই স্বামী স্ত্রীর পরস্পরের মধ্যে
মুক্তি।
নর নারীর এই সম্পর্কের উৎস যদি হয় রক্তের মিলন, তবে সেই মিলনের
পরিধি দেহ মন আত্মাকে কেন্দ্র করে পরস্পরের সত্ত্বাজাত। এবং এখানে কোনো অংশের
গুরুত্ব কম নয়। দেহ মন আত্মার পরিপূর্ণ মিলনের মধ্যে দিয়েই দাম্পত্য সত্ত্বার
পূর্ণ বিকাশ সাধন সম্ভব হয়। বিবাহের পূর্বে নর নারী কেউই
সম্পূর্ণ নয়। দাম্পত্যের রাজপথেই পরস্পরের মধ্যে তাদের পূর্ণতা প্রাপ্তি। এবং এই পূর্ণতার পথেই
বিশ্বের সাথে তাদের যোগ হয় সম্পূর্ণ। ঠিক এখানেই দাম্পত্যের
সার্থকতা। লরেন্স এবং রবীন্দ্রনাথ, দুই ভিন্ন মেরু থেকে এই সার্থকতার
প্রতিই দিক নির্দেশ করে গিয়েছেন। লরেন্স জোর দিয়েছেন রক্তের
মিলনের উপর, রবীন্দ্রনাথের জোর, হৃদয়ের উপর।
হৃদয়ের এই প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক
লেভ টলস্টয় তাঁর বিখ্যাত গল্প "খ্রয়েটৎসার সোনাটা"-য় লিখছেন, "...marriage without
love is no marriage at all; that only love sanctifies marriage; and that the
only true marriage is that sanctified by love." ভালোবাসার এই
পবিত্র বন্ধনের উৎস কি শুধুই নির্মল হৃদয়? নিশ্চয়ই না,
লরেন্স কথিত রক্তজাত অনির্বাণ সত্ত্বাও এই পবিত্র বন্ধনের অন্যতম
উৎস। তাই দেহ মন আত্মার পরিপূর্ণ মিলনেই দাম্পত্যের পবিত্রতা রক্ষিত হয়। এবং এই মিলন
প্রতিদিনের সূর্য ওঠার মতোই প্রাত্যহিক ঘটনা। চিরজীবনের পালাগান বলে
রবীন্দ্রনাথ যে বিষয়টির উপর এত গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পালাগানে ঘটে যায় অনভিপ্রেত
ছন্দপতন। ভালোবাসার সম্পর্কে নেমে আসে মনোমালিন্যের অন্ধকার। আত্মিক সম্পর্কের
মধ্যে ঘটে যায় দূরত্বের দূরতিগম্য ব্যবধান। কিন্তু কেন? কেন এমন ভাবে
দাম্পত্যের সীমানায় মোহনবাঁশিতে বিচ্ছেদ বেদনা মন্দ্রিত হয়ে ওঠে যখন তখন?
দেহ মন আত্মার এই মিলনবিন্দুতে বয়ে যায় বিষাদসিন্ধুর ধারা?
খ্রয়েৎসার সোনাটায় এর একটি কারণ তুলে এনেছিলেন
টলস্টয়। দাম্পত্যের সম্পর্ক যখন কেবলই বাসনা সম্পৃক্ত, তখন দেখা যায়
বাসনার চরিতার্থতায় ভালোবাসার আগুন নিভে আসে। টলস্টয় বর্ণিত এই
কারণের উল্টপুরাণেও কিন্তু একই ফল ঘটে। অর্থাৎ বাসনা চরিতার্থ না হলেও
দাম্পত্য ভাঙ্গতে থাকে। আর এটা হয় তখনই যখন টলস্টয়ের ভাষায়, "....two completely
alien and completely selfish individuals who only wanted to get the greatest
amount of satisfaction out of each other."; (খ্রয়েৎসার
সোনাটা)। বিশেষত ভোগবাদী ধনতান্ত্রিক বিশ্বের এই বিশ্বায়নে দাম্পত্যের
সম্পর্কগুলি পারস্পরিক প্রয়োজনের উপর নির্ভরশীল। কোনো ভাবে সেই
প্রয়োজনের সূতো কোনো স্থানে ছিঁড়ে গেলেই দাম্পত্য সম্পর্কে তৈরী হয় নানারকম
জটিলতা। এই সমস্যা যদিও শুধুমাত্র বর্তমান যুগের নয়। বস্তুত
শিল্পবিপ্লবোত্তর আধুনিক সমাজ জীবনের এটাই অন্যতম লক্ষণ। আর সেইখানেই
দাম্পত্যের সীমানায়,
ধরা পড়ে আধুনিক যুগের দূর্বলতা ও জটিলতা।
এই প্রসঙ্গে "লেডি চ্যাটার্লিজ
লাভার্স"-এর আলোচনা কালে লরেন্স একটা মূল্যবান কথা বলেছিলেন। "Vitally; the human race is
dying. It is like a great uprooted tree...." আধুনিক
যন্ত্রসভ্যতার সম্বন্ধে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষন। স্মরণ করা যেতে পারে
এই যন্ত্রসভ্যতার আর এক অনবদ্য গভীর চিত্র এঁকে গেছেন বিশ্বকবি, তাঁর
রক্তকরবীতে। সেখানেও যন্ত্রসভ্যতার অন্তরে প্রাণপ্রবাহের বিচ্ছেদের যন্ত্রণাকে
ফুটিয়ে তুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর্থসামাজিক জীবনের পরিসরই
দাম্পত্য সম্পর্কের সূত্রটি ধরে থাকে। দৈনন্দিন জীবন পরিক্রমায় তাই
পারস্পরিক প্রয়োজনের অনুষঙ্গগুলিই ভালোবাসার বাসনা হয়ে দাম্পত্যকে নিয়ন্ত্রণ
করতে থাকে।
আধুনিক জীবনব্যবস্থায় আমাদের অহং যা আমাদের
ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলে,
আমাদেরকে কেবলেই নিজের স্বার্থের গণ্ডীতে আবদ্ধ করে রাখে। এই অহং দাম্পত্যের
সীমানায় যখনই আপন স্বার্থের হিসেব নিকেশ কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিতে যায়, তখনই হয় বিপদ। তখনই সম্পর্ক বিন্যাসে
পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের সৃষ্টি হয়ে জটিল করে তোলে দাম্পত্যের আবহাওয়া। কামনা বাসনার
পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান ছাড়া বর্তমান যুগে দাম্পত্যের সুস্থতা ধরে রাখা অসম্ভব।
এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই যন্ত্রসভ্যতার যুগে, দাম্পত্যের যে
প্রাথমিক শর্ত, অর্থাৎ- দেহ মন আত্মার পারস্পরিক মিলনের
মধ্যে দিয়ে অভিন্ন সত্ত্বায় পৌঁছানো, সেইটি অধরা রয়ে যায়
স্বামী স্ত্রীর মধ্যে। অর্থাৎ বর্তমান যুগে
দাম্পত্যের সুস্থতা নির্ভর করে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তাদের পারস্পরিক প্রয়োজনের
সামঞ্জস্য বিধানের সূত্রে "মিউচ্যুয়াল আণ্ডারস্ট্যাণ্ডিং জাত এডজাস্টমেন্টের
মধ্যেই।" আর এইখানেই দাম্পত্যের শেষ, সহবাসের শুরু। দাম্পত্য লরেন্স কথিত
দুটি রক্ত ধারার মিলন। যে মিলনে নর নারী পূর্ণতর মানবিক বিকাশের পথে এগোয়
অনায়াস ছন্দে। আর সহবাস নিতান্ত জাগতিক প্রয়োজনে পারস্পরিক স্বার্থের অভীপ্সা
পূরণ। আর তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবাহ আর চিরজীবনের পালাগান নয়, যেমনটা বলে
ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিবাহের স্থায়িত্ব তাই
পারস্পরিক প্রয়োজন পূরণের সাফল্যের ওপরেই নির্ভরশীল। দেহ মন আত্মার মিলন
সেখানে অপ্রসাঙ্গিক।
আর এই কারণেই লরেন্স বলেছিলেন, "The modern cult of
personality is excellent for friendship between the sexes; and fatal for
marriage."
সত্যিই তার পর প্রায় এক শতাব্দী চলে গেলেও তাঁর কথা এ যুগে আজও কি
প্রবল ভাবেই সত্য হয়ে উঠেছে আরও। দাম্পত্যের সীমানা আজ
নির্ধারিত হচ্ছে দেহ মন আত্মার মিলনে নয়, পারস্পরিক দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণের
সাফল্যে ব্যর্থতায়। তাই বিবাহ আজ চিরজীবনের
পালাগানের বদলে আজকের শিরোনামে পর্যবসিত। সভ্যতার সামগ্রিক অসুস্থতার
ছাপ অঙ্গে ধারণ করে আজকের দাম্পত্য সহবাসের অনিশ্চয়তায় ভরপুর। দাম্পত্যের এই
অসম্পূর্ণতার অন্ধকারেই গর্ভস্থ হচ্ছে মানুষের ভবিষ্যৎ। সৌন্দর্য হারাচ্ছে
দাম্পত্যের সীমানা
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষীত

