নির্বাচনী পর্যালোচনা
লোকসভা ২০১৯
অনেকেই ২০১৯ এর নির্বাচনী ফলাফল
দেখে বিস্মিত। বিস্মিত এই কারণেই যে, ভারতীয় গণতন্ত্রে এই প্রথম ক্ষমতাসীন একটি দল
পুনর্নিবাচিত হল, যারা
পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকেও একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রতিও পূরণ করতে পারেনি। বা করার
চেষ্টাই করে নি। বরং পাঁচ বছরে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনধারণকে ক্রমশ কঠিন
থেকে কঠিনতর করে তুলেছে। তাসত্ত্বেও এই বিপুল জয় ভারতীয় গণতন্ত্রে অভিনব সন্দেহ
নাই। সেই কারণেই অনেকের চোখই কপালে উঠে গিয়েছে আজকের এই
নির্বাচনী ফলাফলে। বিশেষত গত বছর অব্দি একাধিক রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে, একাধিক লোকসভা
উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের হারের পর হারের ধাক্কায় বিজেপির অতি বড় সমর্থকরাও এই
বিপুল জয় আশা করতে পারে নি। তাদের ভয় ছিল, ২০১৪’র মিথ্যা নির্বাচনী
প্রতিশ্রুতির প্রভাব এবারের লোকসভায় নির্বাচনে পড়বে। আর সেক্ষেত্রে নিরুঙ্কুশ
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। যে কোন গণতান্ত্রিক পরিসরে সেটাই
স্বাভাবিক। এবং এরই সাথে কংগ্রেসের তোলা রাফায়েল দুর্নীতির বিতর্ক এবং সেই সূত্রে
সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূত্তির নিয়ে সন্দেহের অবকাশ সৃষ্টি হওয়ায় বিশেষত বিজেপি
বিরোধীরা খুব আশা করেই বসে ছিলেন পাশা উল্টে যাবে। কিন্তু শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে
মোদী শাহ জুটি দেখিয়ে দিলেন ওস্তাদের মার শেষ রাতে।
সত্যইই
ওস্তাদের মার শেষ রাতে। ১৯শে জানুয়ারীর ব্রিগেড জনসমাবেশে সারা ভারতের বিজপি
বিরোধী শক্তিগুলির একত্র সমাবেশে অনেকেই আশা করেছিলেন এবার চাকা ঘুরবে। বিশেষত মাস
কয়েক আগের পরপর কয়েকটি রাজ্যে বিজেপিকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের ঘটনায় মানুষের আশার
পারদ চড়ছিলই। মানুষ তাকিয়ে ছিলো বিরোধী ঐক্যের দিকে। আর সেই ঐক্যের অভিমুখে একাধিক
রাজনৈতিক হেভিওয়েটই পরস্পর কাছাকাছি হতে থাকায় মানুষের আশাও উর্ধমুখী হচ্ছিল। সারা
ভারতেই যখন মোদী বিরোধী হওয়া জোরদার হয়ে উঠছিল, মোদী হটাও দেয় বাঁচাও স্লোগানে
মুখরিত রাজনৈতিক অঙ্গন যখন ক্রমশই উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল ঠিক সেই সময়, একেবারেই প্রায়
মাহেন্দ্রক্ষণেই বলা যায় ঘটে গেল পুলওয়ামার ঘটনা।
সাধারণত
এই রকম ঘটনায় প্রশাসনিক দায়দ্ধতার প্রসঙ্গই সবকিছুর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
দেখা দেয়। প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে সুরক্ষার প্রশ্নে প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল কিনা। থাকলে
কতখানি। বিশেষত বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলি এই ধরণের ঘটনার ফয়াদা তুলতে সরকারকে
বিপদে ফেলতে সকলের আগে তৎপর হয়ে ওঠে বেশি করে। এতগুলি মানুষের প্রাণের জন্যে দায়ী
করে সরকারের অপদার্থতা প্রমাণের জন্যেই বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলি সরব হয়ে ওঠে
বেশি করে। তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে এই অজুহাতেই সরকারকে কোনঠাসা করে ফেলার। কিন্তু
পাকিস্তানের জঙ্গিগেষ্ঠী জৈশইমহম্মদ পুলওয়ামার ঘটনার দায় স্বীকার করে নেওয়ায়, সরকারের অপদার্থতার
বিষয়টা ধামা চাপা পড়ে যায়। ধামাচাপা পড়ে যায় প্রশাসনিক সুরক্ষা গ্রহণের বিষয়ে
গাফিলতি থাকার সম্ভাবনার বিষয়টিও। সমগ্র বিষয়টার অভিমুখ ঘুরে যায় পাকিস্তানের
দিকে। নির্বাচনের ঠিক আগে এটাই হয়ে উঠল ক্ষমতাসীন দলের তুরুপের তাস। যে মুহুর্তে
পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠী পুলওয়ামার ঘটনার দায় স্বীকার করে নিল, ঠিক সেই মুহুর্তেই
ভারতের ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভবিষ্যৎ ঠিক হয়ে গেল।
সারা
ভারত এক হয়ে গেল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আর সেই সুযোগে বিজেপি সুকৌশলে দেশপ্রেমের
ধুয়ো তুলে জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গটাকেই মানুষের মনে গেঁথে দিতে প্রস্তুত করল অপারেশন
বালাকোট-এর নীলনকশা। ফল মিলল হাতে হাতে। নির্বাচনী প্রচারের মহিমায় জাতীয়তাবাদের
ধারণা হয়ে দাঁড়ালো মূলত হিন্দুজাতীয়তাবাদ যার একমাত্র রক্ষক বিজেপিই। মানুষ মনে
করল, বা আরও স্পষ্ট করে বললে
বলা ভালো মানুষকে মনে করানো হলো পাকিস্তানের মতো বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা
করতে হলে বিজেপিই একমাত্র বিকল্পহীন ভরসা। এবং এই ধারণাটাই তলায় তলায় জমাট বাঁধতে
থাকলো,
মুসলিম
সন্ত্রাস থেকে হিন্দুত্বের সুরক্ষায় বিজেপিরও কোন বিকল্প নাই। ফলে দাও ভোট
বিজেপিতে। এটাই ওস্তাদের মার শেষ রাতে। ২০১৪-র নির্বাচনী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, পাঁচ বছর ধরে সাধারণ
মানুষের জীবনযাত্রার উপর দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির ব্যাপক প্রভাব, টাকার ক্রম অবমূল্যায়ন, নোট বাতিল, জিএসটি, বেকারিত্বের সর্বকালীন
রেকর্ড,
চাকরি
থেকে ছাঁটাই,
কৃষকের
আত্মহত্যা,
দলিত নিধন, সংখ্যালঘুদের উপর
অত্যাচার,
গোরক্ষকদের
তাণ্ডব ইত্যাদি সকল বিষয়গুলি ধামাচাপা পড়ে গেল। উঠে আসলো দেশপ্রেমের জোয়ার। উঠে
আসলো জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গ। উঠে আসলো বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশরক্ষার বিষয়। তুলে
ধরা হলো বাহান্ন ইঞ্চি ছাতির বালাকোট। হ্যাঁ ওস্তাদের মার শেষ রাতে।
অনেকেরই
মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, নির্বাচনের
ঠিক আগে পুলওয়ামার ঘটনার ফয়াদা তুলতে ক্ষমতাসীন দল যে ঝাঁপিয়ে পড়বে, সে’তো স্বাভাবিক। অন্য
যে কোন দল ক্ষমতায় থাকলে তারাও ঠিক একই ভাবে এর নির্বাচনী ফয়দা তোলার চেষ্টা করতো।
গণতান্ত্রিক পরিসরে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির কি
স্বার্থ থাকতে পারে? তারাই
বা কেন লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে পুলওয়ামার ঘটনা ঘটালো। যাতে ক্ষমতাসীন সরকার
একটা বালাকোট করে পুনরায় নির্বাচনে জিতে ফিরে আসতে পারে? মূল রহস্য কিন্তু এইখানেই। এবং
এর সাথেই মনে রাখতে হবে যেভাবে লাইভ টেলিকাস্ট করে পাকিস্তানের মাটিতে বন্দি
অভিনন্দন বর্তমানকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হলো সেটিও বিশ্ব ইতিহাসে অভিনব।
অভিনন্দনের প্রত্যার্পণের কৃতিত্ব নিশ্চয় বিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য পাবে না। সেই
কৃতিত্ব অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষমতাসীন দলের ভোটবাক্সে গিয়েই জমা হবে। এবং এই
সূত্রেই মনে রাখতে হবে একাধিক নির্বাচনী প্রচারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পুলওয়ামার
শহীদদের স্মরণেই ক্ষমতাসীন দলকে পুনরায় নির্বাচিত করতে ডাক দিয়েছিলেন সারা ভারত
ঘুরে। আবার স্বয়ং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তো সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাকে পছন্দ। কাকে আবার পুনরায় ক্ষমতাসীন দেখতে
চান। ফলে পুলওয়াম তার সাথে বালাকোট এবং সব শেষে অভিনন্দন-এর প্রত্যার্পণ সব কয়টি
ঘটনাই কিন্তু একই সূত্রে গ্রথিত। আর তার সরাসরি প্রভাব ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের
ফলাফলে।
এবং
যার ফলে ধরাশায়ী বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক শিবির। ফলে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের
ফলাফলে পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীর সরাসরি প্রভাব রয়ে গেল। এটিও ভারতীয় নির্বাচনী
ইতিহাসে অভিনব। এখন দিল্লীর মসনদে বিজেপিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পাকিস্তান বা সেদেশের
জঙ্গিগোষ্ঠীর কি স্বার্থ থাকতে পারে? আবার কোন স্বার্থই যদি না থাকে, তবে পুলওয়ামার ঘটনা কেনই বা ঠিক
লোকসভা নির্বাচনের আগে ঘটানো হলো? আগামী দিনগুলিতে এই প্রশ্নগুলিই ঘুরেফিরে আলোচিত হবে
ভারতীয় রাজনীতিতে।
এখন
অনেকেই জানেন,
পাকিস্তানের
রাজনীতি ও সেদেশের সামরিক বাহিনীর উপর খোদ মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কতখানি
সর্বাত্মক। বস্তুত সিআইএর অনুমতি ছাড়া পাকিস্তানের গাছের পাতাও নড়ে না।
পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির কার্যকলাপও মার্কিণ প্রশাসনের নজরের বাইরে ঘটানো
সম্ভবপর নয়। বরং বহুযুগ ধরেই বিশেষত আফগানিস্তানে রাশিয়ার অবস্থানের সময় থেকে খোদ
মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিকে কিভাবে পুষ্ট করেছে ও গড়ে
তুলেছে সেকথাও অধিকাংশ রাজনীতি সচেতন মানুষের অজানা নয়। ফলে পুলওয়ামার ঘটনা ঘটিয়ে
দিল্লীর মসনদে ক্ষমতাসীন দলকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার বিষয়ে পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীর
সরাসরি কোন স্বার্থ না থাকলেও দিল্লীর মসনদে ক্ষমতাসীন দলকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার বিষয়ে
মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রে স্বার্থ যে জড়িয়ে নাই, সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না। বরং
মার্কীণ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয় নীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, মৌলবাদী রাষ্ট্র
পাকিস্তানের পাশে একটি মৌলবাদী ভারত গড়ে উঠলে মার্কিণ বিদেশনীতি ও অর্থনীতি
দুইয়েরই পোয়াবারো। আর মার্কিণ প্রশাসন যদি সেই স্বার্থকেই পাখির চোখ করে থাকে, তবে বিজেপির থেকে ভালো
ক্যান্ডিডেট আর কে আছে? সেই ক্যান্ডিডেটকে মসনদে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে এক আধটা
পুলওয়ামা ঘটানো কি আর এমন শক্ত কাজ? সারা বিশ্বকেই যারা পকেটে পুরে ফেলেছে।
২৩শে মে’ ২০১৯
কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত

