এনকাউন্টার না হত্যাকাণ্ড?



এনকাউন্টার না হত্যাকাণ্ড?


হোক এনকাউন্টার। ঘটুক জাস্টিস। এটাই এখন ভারতজুড়ে মূল আবেগ। জনতার দাবি। উল্লসিত আট থেকে আশি। বিশেষত নারী সমাজ। এতদিনে ধর্ষণের ন্যায় বিচার হয়েছে। ঠিক এমনটাই মনে করছেন ভারতীয় নারী সমাজ। হায়দ্রাবাদ পুলিশের জয়জয়াকর সারা ভারতবর্ষ জুড়ে। ধর্ষিত ও খুন হওয়া পশু চিকিৎসকের পিতামাতাও এনকাউন্টারকে স্বাগত জানিয়েছেন। আপামর ভারতবাসী মনে করছে, এইটিই সঠিক ও ন্যায় সঙ্গত পথ। এবং তাঁদের আশা এই পথেই ধর্ষণের ঘটনা কমানো সম্ভব। তার একটিই কারণ, ভারতীয় আইন ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রীতা। যার সুযোগ নিয়ে ধর্ষকরা অনেক সময়ই পার পেয়েও যায়। অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়ে ধর্ষিতার জীবন তছনছ করে দেয়। ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে বাহুবলের প্রয়োগে মামলা তুলে নিতেও বাধ্য করে। জনতা এইসব দেখে দেখেই ভারতীয় আইন ব্যবস্থার উপরে এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে হায়দ্রাবাদের এই এনকাউন্টার তাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বিপুল ভাবে। অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন, এটাই ন্যায় বিচারের একমাত্র পথ। আর ঠিক সেই কারণেই আজকে সারা ভারতজুড়ে হায়দ্রাবাদ পুলিশের নামে জয়ধ্বনি আসমুদ্র হিমাচল।

এই জনজোয়ারে সামিল সকলেই। যে কোন উন্মাদনার ধর্মই হলো, উন্মাদনার আবেগ মানুষকে বিহ্বল করে তোলে। আর ঠিক তখনই মানুষ আর তার সাধারণ বোধবুদ্ধিকে কাজে লাগাতে রাজি থাকে না। সকলেই জনজোয়ারে সামিল হয়ে পড়ে। আর মিডিয়ার কাজই হলো সেই জোনজোয়ারের পালে আরও বেশি করে হাওয়া লাগানো। ফলে প্রায় দাবানলের মতোই এই উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। রাষ্ট্রযন্ত্র এই তত্বটুকু সম্বন্ধে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবেই ওয়াকিবহাল থাকে। পৃথিবীর সকল দেশেই। আর থাকে বলেই, রাষ্ট্রযন্ত্র সময়ে অসময়ে সেই অনুযায়ী এমন কিছু ঘটায়, বা ঘটানোর চেষ্ট করে, যাতে দেশের জনরোষকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। বা প্রশমিত করতে পারে।

এখন সামান্য কয়েকটি প্রাথমিক বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। অপরাধীকে ধরতে গিয়ে পুলিশি এনকাউন্টার আর হেফাজতে থাকা অভিযুক্ত বন্দীকে এনকাউন্টার কখনোই এক বিষয় না। পুলিশ যখন কোন অপরাধীকে গ্রেফতার করতে যায়, তখন অপরাধী মাত্রেই প্রথমে পালানোর চেষ্ট করবে। সেটাই মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। এবং সেই পালানোর প্রয়াসে অপরাধী যদি সশস্ত্র হয়, সে পুলিশের উপর হামলাও করতে পারে অবস্থা বুঝে। যাতে ধাওয়া করা পুলিশকে আহত বা নিহত করে সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। সেই ক্ষেত্রে প্রথমত আত্মরক্ষার্থে, এমন কি দাগী অপরাধীকে পালাতে না দেওয়ার স্বার্থেও পুলিশ এনকাউন্টারে অপরাধীকে আহত বা নিহত করতেই পারে। এবং এইক্ষেত্রে এনকাউন্টার করা বিশ্বের সকল দেশেই পুলিশের কর্মপদ্ধতিতে একটি মৌলিক অধিকার স্বরূপ। বিতর্ক এই নিয়ে নয়। বিতর্ক হেফাজতে থাকা বন্দীকে এনকাউন্টার করা নিয়ই। পুলিশ যখন কাউকে গ্রেফতার করে নিজ হেফজতে নিয়ে নেয়, তখন সেই ব্যক্তি শুধু নিরস্ত্রই থাকবে না, তার স্বাধীন ভাবে চলাফেরার কোনরকম অধিকারই থাকার কথা নয়। এবং সেই সময় সে পালানোর চেষ্টা করলেও তাকে সহজেই ধরে ফেলার কথা। আর যদি পুলিশের হেফাজতে থাকা কোন বন্দী পালাতে সক্ষম হয়, বা পুলিশেরই অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পুলিশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করে, তবে সেটা দায়িত্বে থাকা পুলিশের কর্তব্যের গাফিলতি বলেই গণ্য হওয়ার কথা। এবং যথাযথ তদন্ত ও বিচারে সেই পুলিশের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

এখন হায়দ্রাবাদ কাণ্ডের উপর একটু আলোকপাত করা যাক বরং। রাতের অন্ধকারে ধর্ষণ ও তারপর ধর্ষিতাকে তারই গাড়ীর পেট্রল দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে একদল দিব্যি স্থানত্যগ করলো। ধর্ষিতার বাড়ির লোকজন যখন পুলিশের সাহায্য নিতে দারস্থ হয়েছিল, নটনড়নচড়ন হায়দ্রাবাদী পুলিশ যদি তখন উঠে পড়ে লাগতো, যদি পুলিশের সঠিক ফোর্স নিয়ে তখনই খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিত, কে বলতে পারে, তাহলে মেয়েটি ধর্ষিত হলেও, হয়তো পুড়ে মড়া থেকে রক্ষ পেলেও পেতে পারতো। কারণ গোটা ঘটনাটাই যখন পুলিশেরই দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হাইওয়ের কাছেই সংঘটিত হয়েছিল। তখন হাইওয়ে পেট্রলকে মবিলাইজ করতে পারলেই হয়তো সোটি সম্ভব হতে পারতো। কিন্তু এই হায়দ্রাবাদী পুলিশ তখন কোনরকম সহযোগিতাই করে নি। করেনি কারণ, সেটাই ভারতীয় পুলিশি ব্যবস্থার প্রচলিত রেওয়াজ। তার যা ফল হওয়ার তাই হয়েছে।

এরপর সেই পুলিশই যখন তথাকথিত ধর্ষকদের খুঁজে পেতে গ্রেফতার করে, তখন কিন্তু অপরাধীরা পুলিশের জাল কেটে পালিয়ে যেতে পারেনি। তারা পুলিশের হাতে নিরস্ত্র অবস্থায় ধরা পড়েছে। পুলিশ তাদের নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। এই অব্দি সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু গোটা বিষয়ে পুলিশের চরম অপদার্থতা ও দায়িত্বপালনের অনীহা নিয়ে আসমুদ্র হিমাচল ব্যপি মানুষ যখন গর্জে ওঠা শুরু করলো, তখনই ঘটনা তার স্বাভাবিক অভিমুখ বদলানোর পরিকল্পনায় বসে গেল। কারণ মানুষের মূল ক্ষোভ অতিদ্রুত ধর্ষকদেরকে উপলক্ষ করে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের উপর গিয়ে আছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। মানুষ বিগত ছয় সাত বছরের হিসাব কষতে শুরু করলো।

এবার দেখা যাক হেফাজতে থাকা বন্দিদেরকে নিয়ে বিশেষত এইরকম হাইসেনসেটিভ কেসে পুলিশ যখন মুভ করে, স্বভাবতঃই বন্দীদের হাতে হাতকড়া ও কোমড়ে দঁড়ি বা শিকল থাকার কথা। এবং সাথে বিশাল পুলিশ বাহিনী থাকাও উচিত। নিশ্চয় গুটিকয়েক কনস্টেবল ও একজন পুলিশ আধিকারিকের জিম্মায় বিষয়টি ছেড়ে দেওয়ার কথা নয়। ফলে হাতে হাতকড়া কোমরে দঁড়ি বা শিকল নিয়ে বিশাল পুলিশ কর্ডনের ভিতর থেকে নিরস্ত্র বন্দিরা কোন পথে হাতে অস্ত্রই বা পাবে, আর কোন মন্ত্রবলে নিজেদেরকে মুক্ত করে নিয়ে পুলিশের উপর হামলা চালাবে? এদের কি মিলিটারী ট্রেনিং ছিল? নিশ্চয়ই নয়। তারপর তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নেওয়া যায়, সেই অবিশ্বাস্য অসম্ভব কাজও সম্ভব, তাহলেও একই জায়গায় একসাথে চারজন বন্দীই সেই অসম্ভব কাজ করে ফেলল? একজন করলেও না হয়, ঘটনাটা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারতো। তাই বলে একসাথে চারজনই? হ্যাঁ যদি ধরেও নিই, তাই। তাহলেও সেটা হতে পারে, একমাত্র তখনই, যখন পুলিশ থেকেই তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। একমাত্র তখনই। তার আগে নয়। তাহলে আসল প্রশ্নে আসা যাক, পুলিশি হেফাজতে থাকা বন্দিদের হাতে অস্ত্র আসলো কোন পথে? যে পথেই আসুক, সেটির দায় ভারপ্রাপ্ত পুলিশেরই নিশ্চয়। আবার যদি ধরেই নেওয়া যায়, বন্দীদের হাতের হাতকড়া বা কোমরের দঁড়ি বা শিকল, খুলে দেওয়ার পড়েই তারা পুলিশের সার্ভিস রিভলবার হাতিয়ে নিয়েছিল; তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, তাদের হাতকড়া বা দঁড়ি-শিকল খুলে দেওয়া হয়েছিল কোন উদ্দেশে? উদ্দেশ্য নিশ্চয় সাধু ছিল না। কারণ তার ফল কোন দিকে গড়াতে পারে, সেটা না জেনে পুলিশে চাকুরী পাওয়া অসম্ভব নিশ্চয়। অন্তত আমাদের দেশের পুলিশি ব্যবস্থার উপর এইটুকু ভরসা আমাদের অটুট থাকুক।

তাহলে দেখা যাচ্ছে গোটা বিষয়টাই সাধারণ যুক্তিবুদ্ধি, সাধারণ জ্ঞানগম্যির বাইরেই। যদি ধরেই নিই, বেশ, কারণ যাই হোক, চারজন বন্দীই একসাথে পালাতে সক্ষম হচ্ছিল দেখেই তাদেরকে এনকাউন্টার করা হয়েছে। বেশ তাই হলো। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলেও চারজনকেই স্পটডেড করতে হলো? একজনকেও জখম করে ধরা গেল না? তাদের হাতে কি একে৪৭ এর মতো মারাত্মক অস্ত্র ছিল? নাকি আরডিএক্সের মতো বিস্ফোরণ? যাতে কোনরকম রিক্স নেওয়া সম্ভব হয়নি আর?

না বিষয়টি যেমন শোনানো হচ্ছে, আদৌ যে তা নয়, সেটি এই প্রশ্নগুলি করলেই বোঝা সম্ভব। তখনই প্রশ্ন জাগে, তবে হায়দ্রাবাদী পুলিশ এইভাবে জনগণকে ধোঁকা দিতেই বা যাবে কেন? যাবে তখনই যখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের চাপ বা রাষ্ট্রীয় কোন নির্দেশ থাকবে। এখন দেখা যাক, কখন কখন এই চাপ বা নির্দেশ অনুসারে পুলিশকে কাজ করতে হয়। ধর্ষণকাণ্ডে যাদের ধরা হয়েছে, তারাই যে আসল ধর্ষক, সেই বিষয়টি এখনো কিন্তু আদালতে প্রমাণ হয়নি। ধর্ষিত মেয়েটি বা তার পরিবারের কেউ যে ধর্ষকদের চিহ্নিত করেছে, তাও নয়। ধর্ষিতাতো হায়দ্রাবাদী পুলিশের কর্মদক্ষতায় পুড়ে মরতেই বাধ্য হয়েছে। তাহলে এই চারজনই যে এই ঘটনায় আসল খুনী ও ধর্ষক, তার প্রমাণ কি? কই? কিংবা, গোটা অপরাধে যে এই চারজনের সাথে আর কেউ জড়িত ছিল না, তারই বা কি প্রমাণ? যদি সেইরকম কেউ এই কাণ্ডের মূল পাণ্ডা হয়ও তাতে তো অবাক হওয়ার কিছু নাই। অবাক হওয়ার নাই, যদি সেই এক বা একাধিক ব্যক্তি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কেউ বা দলের আশীর্বাদধন্য হয়। এবং যার সাথে যোগাযোগ আছে অনেক উপরমহলের! ভারতীয় রাজনীতিতে এটাই তো স্বাভাবিক। ফলে সেই ক্ষেত্রে আসল অপরাধীকে নিস্তার দিতেই কি, এইরকম ফেক এনকাউন্টার ঘঠিয়ে অপরাধী বলে ধৃত চারজনকে হত্য করে দেওয়া হলো? যাতে সাপও মরলো আর লাঠিও ভাঙলো না? এমনকি সেক্ষেত্রে এমনও হতেই পারে, এই চারজন হয়তো এই অপরাধের সাথে কোনভাবেই জড়িত ছিলও না। আসল অপরাধীদের বাঁচাতে কেসটাকে আদালত অব্দি যেতে দেওয়া হলো না।

কিংবা যদি ধরেও নিই, হায়দ্রাবাদী পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতায় দক্ষতার সাথেই পশুচিকিৎসকের ধর্ষক ও হত্যকারীদেরকে সত্যই ধরতে সক্ষম হয়েছিল; তাহলেও প্রশ্ন জাগে, এত যাদের দক্ষতা, তাদের হেফাজতে থাকা বন্দী, পুলিশের উপরেই হামলা করতে পারে কি করে? নাকি গোটা ঘটনাটাই সাজানো হয়েছে, দেশজুড়ে ধর্ষক বিরোধী আন্দোলন যাতে কোনভাবেই দানা বেঁধে না উঠতে পারে তার উদ্দেশেই। আমাদের মনে রাখতে হবে বর্তমান লোকসভায় নির্বাচিত সাংসদদের মধ্যে ৪০% সাংসদের বিরুদ্ধেই ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি, নানবিধ দুষ্কর্মের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আদালতে মামলা চলছে। এবং কেন্দ্রে বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ১১৬ জন সাংসদই এই ৪০% অভিযুক্তের অন্তর্গত কিন্তু। ফলে বিষয়টা ভয়াবহ। একটি লোকসভার ৪০% সাংসদদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা চলা যেকোন দেশের গণতন্ত্রের পক্ষেই চরম বিপদজনক।

ফলে দেশব্যাপি জনরোষ যেন এদের উপর গিয়ে না পৌঁছায়, সেই উদ্দেশেই কি এইরকম এনকাউনটার নাটক ঘটিয়ে দেশবাসীর ক্ষোভ প্রশমনের প্রয়াস? বিষয়টা তাই আর ধামাচাপা দেওয়ার মতো অবস্থায় নাই। জনগণকেই বুঝে নিতে হবে, কোনটা ঘটনা আর কোনটা গল্প। যে গল্পের গরুকে গাছে ওঠানোর প্রয়াস এদেশের রাজনীতির অন্যতম একটি ভয়ানক ধারা। ভারতবর্ষের মানুষকে ঠিক করতে হবে, সেই ধারাকেই চলতে দেওয়া ঠিক হবে, নাকি সেই ধারাকে প্রতিরোধের ভিতরেই ভবিষ্যতের ভারতের মুক্তি!

৭ই ডিসেম্বর’ ২০১৯

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত