লে লে বাবু ছ আনা


লে লে বাবু ছ আনা

যাক, বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম কলিকাতা পুস্তকমেলা অবশেষে শেষ হলো। বইয়ের সাথে বাঙালির বাৎসরিক সম্পর্ক অনেকটা সেই দুর্গাপুজোর মতোই আর কি। আসছে বছর আবার হবে। বইয়ের কেনাবেচা যাই হোক, ভালো কিংবা মন্দ। বাঙালি এখন সারা বছর বই মুখে করে বসে থাকবে, এমন কষ্টকল্পনা কেউই করে না। কিন্তু বই প্রকাশের ছবি নিয়ে এখনো বেশ কিছুদিন দেওয়াল জুড়ে ফটোশেসন চলতে থাকবে। অনেকটা ফ্যাশন প্যারেডের মতো। যাঁদের বই প্রকাশিত হলো, ঠিক মতো খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তাঁদের নিজের বাড়িতেই সকলেই সেই বইয়ের পাঠক নন। পরিচিত যতজনকে কবি তাঁর সংকলন বিলোলেন, সকলেই যে তার আদ্যপান্ত পড়ে ফেলবেন, স্বয়ং কবিও সে আশা করেন না। এমনও শোনা গিয়েছে, কবির অটোগ্রাফ সমেত উপহার দেওয়া বই ফুটপাথে পুরানো বইয়ের ভাঁড়ারে ঠাঁই পেয়েছে। এতে কবির কবিতার যাই হোক, বাঙালি ক্রমশ যে অর্থসচেতন হয়ে উঠছে সেই ছবিটি স্পষ্ট হয়। তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লবের হাত ধরে, ফেল কড়ি মাখো তেল আপ্তবাক্যের মতো এখন পকেটে কিছু টাকা থাকলেই নিজের লেখা, বই আকারে প্রকাশ করা যায়। কারণ প্রকাশক আর বই প্রকাশে অর্থ লগ্নীতে রাজি নন। ফলে কবিরই অর্থে কবির বই। আবার সেই বই নিয়ে কবিই বিপননের প্রয়াসে। প্রকাশকের ঠেকা নেই। কবির টাকায় প্রকাশিত বই বিক্রী হলো আর না হলো। যত দায় কবির কাঁধে। তাই প্রতিদিন বইমেলায় ছুটোছুটি না করলে চলবে কেন? ওয়াল জুড়ে বই প্রকাশের ছবি টাঙিয়েও যদি কয়েকটি বইয়ের সদগতি হয়, মন্দ কি! অনেকেই হয়ত কবিকে সেলসম্যান রূপে দেখতে চান না। কিন্তু বাজার মন্দা। বাঙালি নিজে থেকে পকেটের টাকা খসিয়ে কবিতার বই কিনবে। সেই বই পড়বে। আলোচনা করবে। এমন কষ্টকল্পনা কেউ করে না। ফলে চেনা অচেনা অনেককেই বই গছাতে না পারলে কপাল মন্দ। না, অনেকেই যে নিজের বই নিজে গছাতে উঠে পড়ে লেগে যান, তাও নয়। অনেকেই আছেন নিজের টাকায় বই প্রকাশ করে চেনা পরিচিত ভালোলাগা মানুষদের নিজের বই উপহার দিয়েই আনন্দ পান। কিন্তু সেই উপহার পাওয়া বইও কি সবাই পড়ে দেখেন? আছে নাকি অত সময় আমাদের? যেটুকু সময়, সেতো বই উপহার নেওয়ার ফটোশেসনেই খরচ হয়ে যায়।

না বই পড়ার মতো সময় আমাদের কারুরই নাই। বই পড়ার কথা তো কোন ছাড়। সারাদিনে যতবার ফেসবুকের ওয়ালে ঢুকে সময় ব্যায় করতে হয়, তার ভিতর একটু বড়ো লেখা দেখলেই মানুষের পিলে চমকে যায়! সেখানে আস্ত আস্ত বই পড়ার সময় কোথায়? ফলে বই এমনই একটি জিনিস, সেটি ছাপানো হবে। মেলায় যাবে। উপহার দেওয়া হবে। কিছু মানুষকে গছানোও যাবে। কিন্তু পড়ানো নৈব নৈব চ! কারুক হয়ে তো আর পড়ে দিয়ে আসা যায় না। ফলে মূল প্রশ্নটা দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে মানুষ নিজের টাকা খরচ করে এত এত কবিতার বই ছাপাচ্ছেই বা কেন? ছাপাচ্ছে কারণ এই সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানে প্রত্যেকের সামনে নানান ভাবে প্রখ্যাত হওয়ার একটি সুযোগ চলে এসেছে। কবিতার বই প্রকাশ করে সহজেই অনেকের ভিতর একজন হয়ে ওঠা যায়। বড়ো বড়ো প্রকাশনী কবে আমার বই প্রকাশ করবে বা আদৌ করবে কিনা, তার জন্য বসে থেকে জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করার মানে হয় না। তার থেকে ফেল কড়ি হও কবি। নিজের টাকায় নিজেই কবি। বইমেলায় সাড়ম্বরে বই প্রকাশ করতে পারলেই কবি হিসাবে একটি পরিচিতি লাভ ঘটে যাবে। বাঙালির জীবনে সেটা একটা বড়ো প্রাপ্তি। অন্তত দুই কলম লিখতে পাড়ার ক্ষমতা যাঁদের আছে। সোশ্যাল মিডিয়ার দৈলতে সেই পরিচিতি ভাইরাল হলেই কেল্লাফতে। বাঙালি আর বিশেষ কিছু চায় না। তার কোন কবিতা কে পড়লো আর না পড়লো, সেটা তত বড় বিষয় নয়। কবি পরিচিতির দিগন্তে তাঁর নামটা কতবার উচ্চারিত হলো কি না হলো সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সুকুমার রায় বেঁচে থাকলে হয়তো লিখতেন ‘বই দিয়ে যায় চেনা’।

হ্যাঁ সত্যিই বই দিয়ে যায় চেনা। কার কটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কার কোন বই কত বেশি মানুষ পড়েছে, সেটি নয়। ফলে অধিকাংশ সেল্ফি প্রকাশকই অর্থাৎ যাঁরা নিজের অর্থে নিজের লেখা বই ছাপাচ্ছেন, সব বইয়েরই মূলত একটিই সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই কারণেই বছর বছর নতুন নতন বই প্রকাশের এত ধুম। অনেকেই মনে করেন, এতে তো ক্ষতি কিছু নাই। কবিতার বই প্রকাশের মতো এমন সুন্দর একটি কাজ, যত বেশি মানুষ সেই কাজে এগিয়ে আসবে ততই তো বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির উন্নতি ঘটবে। বাংলা সাহিত্যের উন্নতি হলে তো খুবই ভালো কথা। কিন্তু এই যে নিজেই নিজের কবিতার প্রকাশক, এতে বাংলা সাহিত্যের মান কতটা রক্ষা হচ্ছে, সেটিই একটি বড়ো প্রশ্ন। সাহিত্যের উন্নয়ন অনেক পরের কথা। বরং উল্টে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রাখা যায়। এই যে এত কবিতার বই প্রকাশিত হচ্ছে, এর বাইরে কবিতা কিংবা সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা মূলক গবেষণাধর্মী বইও কি এমন সুনামির মতো আছড়ে পড়ছে? যাঁরা নিজেরই কষ্টার্জিত অর্থে বই ছাপাচ্ছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তাঁরা শুধুই কবিতার বইই ছাপিয়ে চলেছেন। দুই একজন বড়ো জোর গল্প উপন্যাসের বইও প্রকাশ করছেন। কিন্তু সেই সংখ্যাটি হাতে গোনা। আর সাহিত্য নিয়ে, কিংবা শুধু সাহিত্য নিয়েই বা কেন, জগৎ ও জীবনের সব ধরণের বিষয় নিয়েও তো বই প্রকাশে এগিয়ে আসতে পারেন এই সব সেল্ফি প্রকাশকেরা। এইখানেই আরও একটি মূল প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হবে আমাদের। আমরা যারা দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় কবিতা আপলোড করে করে বছর শেষে কাব্যসংকলন প্রকাশ করে চলেছি, আসলে আমাদের ক্ষমতার দৌড় ঐ কবিতা লেখা অব্দিই। কারণ আমাদের ধারণায় কবিতা লেখাই সবচেয়ে সহজ কাজ। প্রকৃত পক্ষে, সাহিত্যের সাথে আমাদের সংযোগ খুবই ক্ষীণ। না, সত্যি হলো এই যে, আমরা হাজারটা কবিতা লিখলেও বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে আমাদের বিশেষ কোন আগ্রহ কোনদিনই ছিল না। আজও নাই। আগেই বলেছি, এই সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতেই আমাদের কবিতা লেখার শুরু। একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, আমাদের ভিতর অধিকাংশেরই সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার আগে কবিতা লেখার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ ছিল না। আর যাঁরা নিয়মিত কবিতাও লিখতেন, তাঁরাও এমন বছর বছর বই প্রকাশের করতেন কিনা সন্দেহ। ফলে আজকে কবিতার বই প্রকাশের এত যে ধুম তার মূলে রয়েছে সহজে আত্মপ্রচার।

এই সত্যি কথাটা স্বীকার করতে আমরা সকলেই অপারগ। মুখ আয়নায় যতই নিজেদের দেখি না কেন, আসল ছবিটার দিকে আমরা তাকাতে অভ্যস্থ নই। তাই আত্মপ্রচারকে সাহিত্যপ্রেম বলে চালাতে হয় আমাদের। এবং নিজেকে আড়াল করতে পরস্পরকে সাহিত্যপ্রেমী বলে স্বীকৃতি দিতেই হয়। এই ভাবে এই আবর্তেই চলছে আমাদের কাব্যচর্চা। সাহিত্যকীর্তি। না কোথাও এগিয়ে চলেছে নয়। দিশাহীন আবর্তনে আত্মপ্রচারের চৌহদ্দীতেই ঘুরপাক খাচ্ছে ক্রমাগত। সেই ঘুরপাকেরই বাৎসরিক উৎসব বইমেলা। আসছে বছর আবার হবে।

মাঘীপূর্ণিমা ১৪২৬

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত