দাঁড়িভিট গুলি মৃত্যু এবং…….




দাঁড়িভিট গুলি মৃত্যু এবং….

দাঁড়িভিটের গুলি চালনা ও দুইজনের মৃত্যু নিয়ে জল আরও কয়েকদিন বিস্তর ঘোলা হবে। তারপর আরও কোন মৃত্যুর বা রাজনৈতিক কাজিয়ার শিরোনামে দাঁড়িভিটের ঘটনা আমাদের মন থেকে মুছে যাবে, যেমন যায়। আমরাও নতুন থেকে নতুনতর শিরোনামের আলোড়নে ঠিক একই ভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠবো। আমাদের খেয়াল থাকবে না, দাঁড়িভিটের ঘটনার মধ্যে দিয়ে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে। আপাতত খবরে যতটুকু প্রকাশ, তাতে জানা যাচ্ছে দাঁরিভিটের ঘটনার সূত্রপাত বাংলার বদলে উর্দূভাষার শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করেই। বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি যাই থাকুক, এই বাংলায় যে, দিনে দিনে বাংলার বদলে হিন্দি ইংরাজি উর্দূর পাল্লা ক্রমেই ভারি হয়ে উঠছে সেই সত্যটুকুই এই ঘটনা আরও স্পষ্ট করে দিল। রাজ্যে এমনিতেই বাংলা মাধ্যমে পঠন পাঠনের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পড়েছে মূলত ইংরাজী মাধ্যমের রমরমার দৌলতেই। বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাত্র শিক্ষকের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশাও প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে। অধিকাংশ অভিভাবকেরই লক্ষ্য সন্তানকে ইংরাজি মাধ্যমে শিক্ষিত করে তোলা। আবার এরই সাথে রয়েছে হিন্দী ও উর্দূ মাধ্যমের বিদ্যালয়ের প্রসার। যেখানে ভাষা হিসাবেও বাংলা পঠন পাঠনের সুযোগ থাকেই না অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

অনেকেই হয়তো বলবেন, এই বাংলায় যেখানে এক তৃতীয়াংশের বেশি মানুষই মূলত হিন্দিভাষী এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড়ো অংশই মূলত উর্দূভাষী, সেখানে এমন হওয়াই তো অত্যন্ত স্বাভাবিক। হিন্দিভাষী উর্দূভাষী জনগন তাদের সন্তানদেরকে কোন দুঃখে বাংলা শেখাতে চাইবেন। বাংলা তো আর তাদের মাতৃভাষা নয়। খুবই সঙ্গত যুক্তি। প্রত্যেক জাতিই চাইবে তাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠুক। এই রাজ্যে বংশ পরম্পরায় বসবাস করেও হিন্দুস্তানী হিন্দিভাষী উর্দূভাষীরাও ঠিক তেমনই চাইবেন বিদেশী বাংলাভাষা শেখার চাপ থেকে নিজেদের সন্তানদেরকে মুক্ত রাখতে। তাই রাজ্যের অধিকাংশ হিন্দিভাষী উর্দূভাষী বিদ্যালয়ে বাংলায় কোন পাঠক্রমই থাকে না।

দাঁড়িভিটের ঘটনার প্রাসঙ্গিতা বুঝতে হবে ঠিক এইখান থেকেই। একই রাজ্যে যেখানে হিন্দি ও উর্দূ বিদ্যালয়ে বাংলায় কোন পাঠক্রম থাকে না, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলিতেও দিনে দিনে হিন্দি ও উর্দূভাষার পাঠক্রম চালু করতেই বাংলা মাধ্যমের স্কুলেও হিন্দি ও উর্দূ শিক্ষক নিয়োগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাচ্ছে কারণ রাজ্যের নাম পশ্চিমবাংলা। যেখানে প্রতিদিন হিন্দুস্তান থেকে হিন্দিভাষী উর্দূভাষী জনগনের অনুপ্রবেশ ঘটছে। তাদের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব তো এই রাজ্যেরই। তাই হয়তো বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলিতেও হিন্দি ও উর্দূ শিক্ষক নিয়োগের দ্রুত প্রয়োজন পড়েছে। এর আরও একটি প্রাসঙ্গিক দিক রয়েছে নিশ্চয়ই। এত বিপুল পরিমান হিন্দিভাষী উর্দূভাষী জনগনের ভোট নিজেদের দিকে ধরে রাখতে গেলে এইটুকুতো করতেই হবে। ফলে বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলিতেও হিন্দি শিক্ষা উর্দূ শিক্ষার পরিসর আরও বাড়িয়ে তুলতে হবে। প্রশাসন নিশ্চয়ই সেই বিষয়টি দেখছেন। এবং সেটি নিশ্চিত করতেই বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়েও এই ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করতে হচ্ছে প্রশাসনকেই। সংবাদে প্রকাশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও দ্যর্থহীন ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ইসলামপুরে ১০ শতাংশর মতো মুসলিমের বাস। যেখানে একটি উর্দূ একাডেমিও রয়েছে। ফলে সেখানের বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়েও যে উর্দূ শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা সমধিক সেকথা তাঁর বক্তব্যেই পরিস্কার। বলাইবাহুল্য ঐ ১০ শতাংশের ভোট নিজেদের পক্ষে রাখার দায়বদ্ধতাও কম কথা নয়।

আর এইখানেই এইরাজ্যে শতাব্দী ব্যাপি নিরন্তর অনুপ্রবেশকারী হিন্দিভাষী উর্দূভাষী হিন্দুস্তানী জনগনের মূল গুরুত্ব। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই এই বিষয়ে এককাট্টা। প্রত্যেকেরই পাখির চোখ অবাঙালি ভোটব্যাংক। তাই তাদের খুশি রাখতে তাদের সাচ্ছন্দের জন্য তাদের সন্তানদের মঙ্গলের জন্য তাদের ভাষা সংস্কৃতির শ্রীবৃদ্ধির উদ্দেশকেও মাথায় রাখতে হয় প্রশাসন থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বকে। এই বিষয়ে বাঙালির ঐক্য দেখার মতো। কোন প্রকার মতভেদ মতান্তর বা ভিন্ন কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী নাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির ভিতর। তাই এই রাজ্যে হিন্দি উর্দূ বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে শিক্ষাদীক্ষার পরিসর বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশাসনিক স্তর থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা স্বাধীনতাত্তর সকল সরকারের আমলেই কম বেশি দেখা গেছে। এবং এই বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের দলগুলির মধ্যে কোনদিন কোন বিরোধীতাও দেখা যায়নি। যায় না।

রাজ্যে বাংলামাধ্যমের বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেভাবে দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে, এবং হিন্দি ও উর্দূ মাধ্যমের বিদ্যালয়ের সংখ্যা ধীরে ধীরে হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে প্রশাসনিক স্তর থেকে বাংলামাধ্যমের বিদ্যালয়গুলিকে বাঁচিয়ে রাখতেই হয়তো আরও বেশি করে হিন্দি ও উর্দূ পাঠক্রমের দিকে ঝুঁকতে হবে সরকারকে। সেক্ষেত্রে এইরকম হিন্দি উর্দূ শিক্ষক নিয়োগ অদূর ভবিষ্যতেই ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে দেখলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। অন্যদিকে হিন্দিবলয় থেকে রাজ্যে অনুপ্রবেশের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের বিষয়টাও মাথায় রাখা জরুরী। যে হারে রাজ্যে বাঙালি অবাঙালি জনসংখ্যার অনুপাতের মধ্যবর্তী বৈষম্য কমতে শুরু করছে, তাতে সেদিন আর খুব বেশি দূরে নাই, যেদিন এই অনুপাত সমান সমান হয়ে যাবে। সেদিন কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার চাপেই রাজ্যের একাধিক বাংলামাধ্যমের বিদ্যালয়কে হিন্দি ও উর্দূ মাধ্যমে পরিণত করতে হতে পারে। সেদিক থেকে বিচার করলেও বর্তমানের ঘটনা প্রবাহের গুরুত্ব সমধিক।

একথা স্বীকার করার সময় এসে গিয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গকে এখন আর কোন ভাবেই বাঙালির রাজ্য বা প্রদেশ বলায় উপায় নাই। কারণ জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশিই কিন্তু অবাঙালি। আবার যদি রাজ্যের মোট সম্পদের শতাংশের হিসাব করা যায়, দেখা যাবে সেই বিচারে রাজ্যের মোট সম্পদের বেশিরভাগের মালিকানাই বাঙালির হাতে নাই আর। ফলে দুই দিক থেকেই বিচার করলে এই রাজ্যের উপর বাঙালিদের যতখানি দাবি, অবাঙালিদের দাবিও কিন্তু তার থেকে কম নয় মোটেই। ফলে অচিরেই অবাঙালিদের দাবিগুলি যদি সামনের সারিতেই চলে আসে তবে কোনভাবেই তাকে আর অস্বীকার করা যাবে না। কারণ ইতিমধ্যেই তারাও রাজ্যের ভুমিপুত্র হয়ে গিয়েছেন। এমনকি রাজ্যে চাকুরী ব্যবসাবাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই তারা এগিয়ে চলেছেন। এবং লক্ষ্য করে দেখার রাজ্য রাজনীতিতেও তাদের বলিষ্ঠ উপস্থিতি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আজ যদি হিন্দি উর্দূ ভাষা সংস্কৃতি তাদের ন্যায্য অধিকার বুঝে নিতেও চায় তাহলে তাকে অস্বীকার করারও উপায় নাই কোনভাবে আর। এটাই পশ্চিমবঙ্গের বাস্তব পরিস্থিতি। দড়িভিটের ঘটনা বিচার করে দেখতে হবে এই প্রেক্ষিতেই।

এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিকক্রমে আরও একটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করার প্রয়োজন সময়েরই দাবি। রাজ্যে পর্যাপ্ত চাকরি বা উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রের অভাবে যেখানে বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের একটা বড়ো অংশই রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেখানে সেই চাকরি বা কর্মক্ষেত্রের সন্ধানেই উত্তর ভারত থেকে দলে দলে অবাঙালিরা এই রাজ্যে এসে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে প্রতিদিন। এই যে একদলের চলে যাওয়া আর অন্য দলের চলে আসা, এর ফলেই রাজ্যে জনসংখ্যার বিন্যাস বেশ দ্রুততার সাথেই পরিবর্তনের সম্মুখীন। ফলে এই পরিবর্তনের সর্বগ্রাসী প্রভাব যে সমাজের সর্বস্তরেই আরও বেশি করে পরিলক্ষিত হবে সেকথা বলাই বাহুল্য। ফলে বাঙালির পশ্চিমবঙ্গে অবাঙালি ভাষা সংস্কৃতি উৎসব পার্বণের চর্চাও যেমন বৃদ্ধি পাবে পাচ্ছে, তেমন করেই শিক্ষাক্ষেত্রেও বাংলাকে হিন্দি উর্দূর জন্যে আরও বেশি পরিসর ছেড়ে দিতে হবেই দিনে দিনে। আর এই ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া জনসংখ্যার স্বাভাবিক দাবিতেই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ধীরে ধীরে হলেও দিনে দিনে এবং নিশ্চিত ভাবেই।

দাঁড়িভিটের ঘটনা তাই কোন বিছিন্ন ঘটনা নয়। বিষয়টির রাজনৈতিক আবর্ত যাই থাকুক না কেন, মূল গুরত্ব যে আরও গভীরে, বাঙালি হিসাবে আমরা সেই সত্য যত দ্রুত বুঝতে চাইবো হয়তো ততই আমাদের ভভিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গল।

২৩শে সেপটেম্বর

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত